Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 1.5/5 (2 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০২-২৮-২০১৬

মসলিনের সৌন্দর্যে হৃদয় জয়ের কাহিনি

রাজু আনোয়ার


মসলিনের সৌন্দর্যে হৃদয় জয়ের কাহিনি

ঢাকা, ২৮ ফেব্রুয়ারী- ঢাকার ঐতিহ্য বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল যে বস্ত্রটির জন্য তা হল মসলিন। মিহি সুতোয় বোনা সূক্ষ্ম এ কাপড়টি সেসময় দুনিয়াজোড়া খ্যাতি লাভ করেছিল। বিশ্বের তাবৎ রাজা-বাদশা, আমির-ওমরাহ শুধু নয় তাদের প্রিয় (ভালোবাসার) মানুষটিও তখন হুমড়ি খেয়ে পড়তো এ বস্ত্রটির জন্য। মসলিন তার সূক্ষ্মতা ও রমণীমোহন সৌন্দর্যের কারণেই জয় করে নিয়েছিল সম্রাট, সম্রাজ্ঞী, নায়েব, শাহজাদা-শাহজাদীদের হৃদয়। ঠিক এভাবেই সারাবিশ্বের মানুষের হৃদয় জয়ের কাহিনি রচিত হয়েছিল।

মাত্র আড়াইশ কাউন্টের চেয়ে মিহি সাদা সুতা দিয়ে মসলিন তৈরি করা হতো শত বছর আগে। রাজ পরিবারের মেয়েদের পছন্দের শীর্ষে থাকা এই শাড়ি বোনা হতো কার্পাসের সুতায়। রকমারি বস্ত্রশিল্পের মাঝে এদেশের চারু ও কারু শিল্পীদের সৃষ্ট আপন মনের মাধুরী মেশানো মসলিন বস্ত্র ছিল প্রধান। কথিত আছে, প্রথম খ্রিস্টাব্দের প্রথম শতকেই রোম সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে অভিজাত রোমান নারীরা মসলিনের ক্ষীণ আব্রুর ফাঁকে দেহের বঙ্কিম রেখা প্রকাশ করতে পছ্ন্দ করতেন।

মসলিন তৈরির জন্য প্রয়োজন হতো বিশেষ প্রকারের সূক্ষ্ম সুতো, যা অন্য কোথাও থেকে আমদানি করা হতো না। বরং বাংলাদেশের মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদী তীরবর্তী এলাকায় বয়রাতি ও ফুটি কার্পাসের আবাদ করা হতো। সেই কার্পাসের তুলা দিয়ে ১৬ থেকে ৩০ বছরের মেয়েরা তাদের স্পর্শকাতর আঙুলের সাহায্যে মিহি সুতা তৈরি করতেন। তবে মেঘনা নদী-তীরবর্তী ফুটি কার্পাসের তুলা থেকে তৈরি সুতোই ছিল উন্নত মানের মসলিন তৈরির মূল উপকরণ। সেই সুতা তৈরি হতো নদীতে নৌকায় বসে, উপযোগী আর্দ্র পরিবেশে।

কার্পাস তুলা থেকে সুতো উৎপাদনের পর সুতা নাটান, টানা হোতান, সানা বাঁধা, নারদ বাঁধা, বু-বাঁধা ইত্যাদি পর্যায় অতিক্রম করার পর মসলিন বোনা হতো। কিন্তু মসলিন বোনার পর আরও অন্তত তিনটি পর্যায় অতিক্রমের মাধ্যমে মসলিন বাজারজাত হতো। এসবের মধ্যে ছিল কাপড় ধোয়া, সুতা সুবিন্যস্ত করা, রিফু করা এবং ইস্ত্রি, রঙ ও ছুঁচের কাজ। পরিশেষে থাকত কাপড়ের গাঁটরি বাঁধা। প্রতিটি পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি বা পেশাজীবী কাজগুলো সম্পন্ন করতেন। তাই মসলিন তৈরি ও বিপণন ছিল মূলত এক ধরনের সামাজিক পেশাজীবীর কর্ম, যার প্রতিটি স্তরে দক্ষতার সুষম বিন্যাস ছিল। মসলিনের বিভিন্ন ধরনের কাজে নিয়োজিত থাকতেন হাজার হাজার শিল্পী-কারিগর।

গবেষকদের মতে, মসলিন তৈরির প্রাচীনতম কেন্দ্র ছিল অধুনা ভাওয়াল জঙ্গলে পরিবেষ্টিত কাপাসিয়া। মধ্যযুগে ঢাকাই মসলিন তৈরির প্রধান উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয় সোনারগাঁ এবং আধুনিকযুগে পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনাবেষ্টিত ১ হাজার ৯৬০ বর্গমাইলজুড়ে উৎকৃষ্ট মসলিন তৈরি হতো। এ অঞ্চলে ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে ৪ হাজার ১৬০টি তাঁতে মসলিন তৈরি করা হতো। ঢাকা, সোনারগাঁ, ডেমরা,তিতবদ্ধী, বালিয়াপাড়া, নাপাড়া, মৈকুলি, বাছারক, চরপাড়া, বাঁশটেকি, নবীগঞ্জ, শাহপুর, ধামরাই, সিদ্ধিগঞ্জ, কাঁচপুর প্রভৃতি জায়গা মসলিন তৈরির প্রধান কেন্দ্র ছিল।

গবেষণায় ১৫ প্রকারের মসলিনের নাম পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে আছে ‘মলবুস খাস’ যা মোগল বাদশাহ ও পরিবারের লোকজন ব্যবহার করতেন। বাংলার নবাব-সুবাদারদের জন্য তৈরি হতো ‘সরকার-ই-আলা’। ‘আব-ই-রওয়ান’ প্রবহমান পানির সঙ্গে মিশে যেতে পারার মত একধরনের মসলিন। নবাব, বাদশাহ ধনী ও বিত্তশালী পরিবারের মেয়েরা ‘ঝুনা ’ব্যবহার করতেন। গায়িকা ও নর্তকীরাও ঝুনার তৈরি জামা ব্যবহার করতেন। ‘শবনব’ এত মিহি ছিল যে, ভোরবেলা শিশির ভেজা ঘাসে শুকোতে দিলে শিশির আর এ মসলিনের পার্থক্য বোঝা যেত না। সাধারনত গলাবন্ধ রুমাল হিসেবে ব্যবহৃত হতো ‘নয়নসুখ বা তনসুখ’, ইউরোপীয় মেয়েরা ‘সরবন্দ’ দিয়ে তৈরি জামা, রুমাল ও স্কার্ফ ব্যবহার করতেন। উচ্চপদস্থরা ‘সরবন্দ’ মসলিনে তৈরি মাথার পাগড়ি পরতেন। যেসব মসলিনে তাঁতেই নকশা করা হতো, সেগুলোকে ‘জামদানি’ বলা হতো। সূক্ষ্ম বুননের ‘বদন-খাস ’দিয়ে গায়ে পরার সাধারণ জামা তৈরি করা হতো। এছাড়াও ছিল ‘আলাবালি বা আলিবালি’, ‘তনজেব’, ‘তরন্দাম’, ‘ডুরিয়া বা ডোরিয়া’, ‘চারকোনা’, প্রভৃতি মসলিন।


বাংলাদেশের মসলিন ও বস্ত্রের সূক্ষ্মতা ও সৌন্দর্য বহু বিদেশী পর্যটককে মুগ্ধ করেছে। খ্রিস্টীয় নবম শতকে আরব পর্যটক ও ভূগোলবিদ সুলেইমান সিলসিলাত-উত-তাওয়ারিখ শীর্ষক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন— রুমী নামের এক রাজ্যে (খুব সম্ভবত বর্তমান বাংলাদেশ) এমন এক ধরনের মিহি ও সূক্ষ্ম বস্ত্র পাওয়া যায় যে, ৪০ হাত লম্বা ও দুই হাত চওড়া এমন একটি কাপড় একটা ছোট আংটির মধ্য দিয়ে অনায়াসে চালাচালি করা যায়।

চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি বাংলাদেশে আসেন আফ্রিকার মরক্কো দেশীয় পর্যটক ইবনে বতুতা, তিনি সোনারগাঁয়ে উৎকৃষ্ট মসলিন তৈরি হতে দেখে মন্তব্য করেন, এমন উন্নত মানের বস্ত্র হয়তো সারা দুনিয়ায় আর কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়।

ব্রিটেনের কার্পাস শিল্পের ইতিহাস প্রণেতা বেইন্সকে বাংলার মসলিন এতোটাই বিস্ময়ের ধাঁধায় ফেলে দেয় যে, তিনি বলতে বাধ্য হন  ‘এগুলো কোনো পরী বা কীটপতঙ্গের বোনা— মানুষের দ্বারা এ বুনন সম্ভব নয়।’

মসলিন নিয়ে গাঁথা, কিংবদন্তীর কোনো শেষ নেই। পাশাপাশি মসলিন যারা তৈরি করতেন সেই তাঁতীদের প্রতি অত্যাচারের কাহিনী, আঙুল কেটে ফেলার কাহিনী এসব আমাদের সবারই কম বেশি শোনা। কথিত আছে, সাত প্যাঁচ আবরোঁয়া মসলিন পরার পরও উলঙ্গ ভ্রমে শাহজাদীজেব-উন্নেছাকে পিতা বাদশাহ আওরঙ্গজেব তিরস্কার করেছিলেন। বিভিন্ন দেশকালের এসব ঘটনা মসলিনের সূক্ষ্ম বুনন শৈলী ও মিহি কাপড়ের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা দেয়।

মসলিন আমাদের ঐতিহ্যের নাম। মুঘল আমলের আগে থেকেই সারা বিশ্বে এটি অধিষ্ঠিত হলেওমুঘল সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ শিল্প  তার আপন মহিমায় মহিমান্বিত। কিন্তু ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে মুঘল সাম্রাজ্য তার ঐতিহ্য, ক্ষমতা, সম্মান সবই হারিয়ে ফেলে। তার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বিখ্যাত মসলিন শিল্প ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে। পাওয়ার লুমের মাধ্যমে তার স্বকীয়তা হারায়।

মডেলিং

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে