Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 1.2/5 (6 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০২-২৫-২০১৬

ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের প্রকৃত দাবিদার কারা?

সাব্বির হোসাইন


ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের প্রকৃত দাবিদার কারা?

জেরুসালেম, ২৫ ফেব্রুয়ারী- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও এখনো চলমান সংঘর্ষ হচ্ছে ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বের আন্তর্জাতিক প্রভাব এতটাই প্রবল যে, একে কেন্দ্র করে তিনটি মেরুতে মানবসমাজ বিভক্ত। এক দল ইসরাইলের পক্ষে, আরেক দল ফিলিস্তিনের, তৃতীয় দলটি হলো অগ্রগামী। এরা উভয় জাতির সহাবস্থানে বিশ্বাসী। এই প্রবন্ধে মূলত এই দ্বন্দ্বের মূল কারণ, ফিলিস্তিন-ইসরাইল ভূখ-ের প্রকৃত দাবিদার কারা, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রথমেই এই অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটের দিকে সংক্ষেপে আলোকপাত করা যাক। একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার, ইহুদিরা একটি নৃতাত্ত্বিক জাতি। ইহুদিদের আদি নিবাস বর্তমানের সিরিয়া-জর্দান-লেবানন-ইসরাইল-ফিলিস্তিন অঞ্চল। কিন্তু ইতিহাসের নানা সময় নিপীড়নের শিকার হয়ে ইহুদিরা তাদের মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হয় এবং সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। উনবিংশ শতাব্দীতে অধিকাংশ ইহুদি বসবাস করত ইউরোপজুড়ে। বিশেষত জার্মান ও রুশ অঞ্চলে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপে খ্রিস্টধর্মানুসারীদের সঙ্গে ইহুদিদের ওপর নতুন নিপীড়ক হিসেবে অবতীর্ণ হয় জাতীয়তাবাদীরা। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ইহুদি নেতারা তাদের আদি ভূখ-ে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনার বিষয়ে আলোচনা শুরু করে। এর মূল লক্ষ ছিল ইহুদিরা তাদের আদি ভূখ-ে ফিরে যাবে। ১৮৯৭ সালে ইহুদিদের আদি নিবাসে ফিরে যাওয়া ও তাদের জন্য একটি রাষ্ট্র সৃষ্টির বিষয়টি রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে বর্তমান ইসরাইল-ফিলিস্তিন অঞ্চল অটোম্যান সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে অটোম্যান সাম্রাজ্যের পতনের পর বর্তমান ইসরাইল, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, জর্দান, লেবানন অঞ্চলগুলো ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের ম্যান্ডেটের অধীন চলে যায়। এই সময় ইউরোপে ইহুদিদের আদিভূমি ফিলিস্তিন অঞ্চলে ফিরে যাওয়ার আন্দোলন তীব্রতর হয়। এর প্রেক্ষিতে ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বালফোর ফিলিস্তিন অঞ্চলে ইহুদিদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন। বেলফোর ঘোষণার আগে ফিলিস্তিন ভূখ-ে ইহুদির সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার। বেলফোর ঘোষণার পর ইহুদিরা দলে দলে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ফিলিস্তিনে এসে বসতি স্থাপন করতে থাকে। ফলে ফিলিস্তিন অঞ্চলে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার আগ পর্যন্ত ফিলিস্তিন অঞ্চলে ইহুদিদের সংখ্যা লাখের ঘরে পৌঁছায়। ফিলিস্তিন অঞ্চলে তখন চূড়ান্ত অশান্ত, আরব-ইহুদি দ্বন্দ্ব তখন তুঙ্গে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনী ব্যাপক ও বীভৎসভাবে ইহুদি নিধনের (হলোকাস্ট) ফলে ফিলিস্তিন অঞ্চলে ইহুদিদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি দৃঢ়তর হয়। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিন ভূখ-কে দ্বিখ-িত করা সংক্রান্ত ১৮১ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত ও পাস হয়। ফলে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরাইল স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং এর সঙ্গে শুরু হয় ফিলিস্তিন-ইসরাইল জাতিগত ও রাজনৈতিক সংঘর্ষ।

ইসরাইল-ফিলিস্তিনি ইস্যুতে সাধারণত দুটো প্রশ্ন করা হয় : ১. ফিলিস্তিনিরা কি ইসরাইলিদের আদিনিবাস বের করে দিয়েছে? ২. কারা ইসরাইল-ফিলিস্তিনের আদিবাসী ইসরাইলিরা নাকি ফিলিস্তিনিরা? বিভিন্ন বই-পুস্তক থেকে আমি এই দুটো প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করার চেষ্টা করছি। আমার অনুসন্ধান থেকে পাওয়া ফলাফল নিয়েই মূলত এই লেখা। লিভান্ত অঞ্চল সম্পর্কে আশা করি সবার ধারণা আছে। লিভান্ত অঞ্চল বলতে পূর্বাঞ্চলীয় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলকে বুঝায়, অর্থাৎ বর্তমান ইজিপ্ট রাষ্ট্রের উত্তরাংশ থেকে বর্তমান তুরস্ক রাষ্ট্রের দক্ষিণাংশের মাঝে বিস্তৃত অঞ্চল; আরো ভেঙে বললে বর্তমান ফিলিস্তিন, ইসরাইল, সিরিয়া, জর্দান, লেবানন, সাইপ্রাস, মিশরের উত্তরাংশ (সিনাই উপত্যকা), দক্ষিণ তুরস্ক (তুরস্কের আলেপ্পো প্রদেশ), ইরাকের দক্ষিণাংশ।

লিভান্ত অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব ৪ হাজার অব্দের আগে (প্রস্তর যুগ) আহমারিয়ান, অ্যানতেলিয়ান, ক্যাবারান, ন্যাটুফিয়ান, হারিফিয়ান, গাসসুলিয়ান কালচারের বিকাশ ঘটেছিল। এই সময় মানুষ শিকার ও সংগ্রহের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত এবং ধীরে ধীরে মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশ হচ্ছিল। এই মানুষ আফ্রিকা থেকে আগমনকারীদের বংশধর। পরবর্তীকালে লিভান্ত অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব ৪ হাজার থেকে ১ হাজার খ্রিস্টাব্দে (ব্রোঞ্জ যুগ) একাধিক গোত্রভিত্তিক নগরের উত্থান হওয়া শুরু করে। এই নগরগুলোর উত্থান হওয়ার সময় গোত্রপতি, কিনশিপ, ধর্ম, বিনিময় প্রথা, কৃষিকাজ, ঘরবাড়ি নির্মাণ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, লেখার পদ্ধতি, যানবাহন ইত্যাদি বিষয়গুলোর প্রচলন শুরু হয়। এই সময় বিভিন্ন সভ্যতা, যেমন পার্শ্ববর্তী মেসোপটেমিয়ায় সুমেরীয়, অ্যাসিরিয়ান, আক্কাডিয়ান, আমোরাইটস ও ইজিপ্টে ইজিপ্টিয়ান সভ্যতা, তুরস্কের আনাতোলিয়ায় হিত্তিতে সভ্যতা বিকশিত হয়। এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, ধর্ম ও যুদ্ধ বিষয়টি এই অঞ্চলে খুব স্পর্শকাতর ছিল। এই অঞ্চলের মানুষ ধর্মকে অত্যধিক প্রাধান্য দেওয়া শুরু করে এবং বিভিন্ন গোত্রের মাঝে যুদ্ধ নিত্যকার বিষয় ছিল।

লিভান্তের দক্ষিণ অংশকে বলা হতো ক্যানান। দক্ষিণ লিভান্ত বলতে বর্তমান ইসরাইল, ফিলিস্তিন, জর্দান, লেবাননের উপকূলীয় অঞ্চল ও সিরিয়ার দক্ষিণ সীমান্ত অংশকে বুঝায়। ক্যানানে বসবাস করা নগরভিত্তিক গোত্র ছিল; যারা মোয়াব, জেশুর, ফিলিস্তিয়া, অ্যাম্মোন, ত্যাজেকার, উপকূলীয় এবং জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টি। এরাই ইসরাইলটদের পূর্বপুরুষ। এদের সমষ্টিকে বলা হতো ক্যানানাইটস। এদের মধ্যে জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টি এই অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ অব্দের দিকে প্রাধান্য বিস্তার করা শুরু করে। স্বাভাবিক কারণে এই প্রাধান্য বিস্তার ও প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াটি ছিল এই অঞ্চলের অন্য অধিবাসীদের সঙ্গে বিশেষত ফিলিস্তিয়াদের সংঘাতপূর্ণ। ধীরে ধীরে পুরো দক্ষিণ লিভান্তে জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টি তাদের প্রাধান্য বিস্তার করে। বিজেতার ও এগিয়ে যাওয়া গোত্রের ধর্ম, ভাষা, আচার সে আমলে প্রভাব বিস্তার করত। তাই, জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টি ধর্ম-ভাষা-আচার দক্ষিণ লিভান্ত অঞ্চলের অন্য আদিবাসীদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে এবং ক্যানানে বসবাস করা গোত্রগুলোর ধর্ম-ভাষা ও আচার পরস্পরের সঙ্গে সিনক্রোনাইজ করে।

এখানে কয়েকটি কথা বলে রাখা ভালো, ইহুদিদের পূর্ব-পুরুষ হলো এই জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টি ও অন্যান্য ক্যানানাইটস গোত্র এবং ক্যানানাইটসদের ধর্মই হলো ইহুদি ধর্মের পূর্বরূপ। আরো সোজা করে বললে, ক্যানানাইটসদের ধর্মের বিবর্তিত রূপ হলো বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন সেমেটিক (আব্রাহামিক) ধর্ম। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের দিকে লিভান্ত অঞ্চলটি পার্শ্ববর্তী ইজিপ্টিয়ান সভ্যতা ও বর্তমান তুরস্কের আনাতোলিয়াকেন্দ্রিক হিত্তিতে সভ্যতার সংঘর্ষভূমিতে পরিণত হয় এবং এই অঞ্চল ইজিপ্টিয়ানদের অধিকারে ছিল। এই সময়টিতে ইজিপ্টিয়ানরা ক্যানানাইটসদের দাস হিসেবে ব্যবহার করত। মোজেসের কাহিনির উৎপত্তিও এই সময়টিতে এবং ইহুদি ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিও এই সময়টিতে রচিত হয়। খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দের দিকে জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টির উত্তর-পুরুষদের ‘ইসরালাইট’ বলে সম্বোধন করা শুরু হয়। খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দের দিকে ক্যানান অঞ্চলের উপকূলীয় অংশে (বিশেষত বর্তমান লেবানন, ইসরাইল-ফিলিস্তিনের উপকূল) ফোনিশিয়ানরা প্রাধান্য বিস্তার করে। ফোনিশিয়ানরা হলো, ক্যানানাইটস (বিশেষত ফিলিস্তিয়া গোত্র) ও অন্যান্য সেমিটিক গোত্র (বিশেষত বর্তমান দক্ষিণ আরব ও আরব-উপকূলের গোত্রগুলো) এবং আশপাশের বিভিন্ন গোত্র ও সভ্যতার মানুষের মিশ্রণ। এরা দক্ষ নাবিক ছিল, এদের নিজেদের বর্ণমালা ছিল এবং সভ্যতার নানা দিকে এরা অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছিল।

ইজিপ্টিয়ান সভ্যতা ও বর্তমান তুরস্কের আনাতোলিয়াকেন্দ্রিক হিত্তিতে সভ্যতা মূলত এই অঞ্চলে তাদের প্রাচুর্য ও গুরুত্ব ফোনিশিয়ানদের কাছে হারায় এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ফোনিশিয়ানরা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ অব্দের কাছাকাছি পারশিয়ান ও গ্রিকদের কাছে ফোনিশিয়ানদের চূড়ান্ত পতন হয়। ১১৭৫ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দে ইজিপ্টিয়ান শাসক তৃতীয় রামেসিসকে পরাজিত করে ফোনিশিয়ানরা তাদের পূর্বপুরুষ ফিলিস্তিয়াদের নামে একটি নগর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, যার নাম ফিলিস্তিয়া। এখানে একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিই, ফিলিস্তিয়া গোত্রের সঙ্গে ইসরালাইটদের পূর্বপুরুষ জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টির দ্বন্দ্ব ছিল, যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সময়টিতে (খ্রিস্টপূর্র্ব ১২০০ থেকে ৭৪০ অব্দ) পুরো ক্যানান অঞ্চলটি প্রশাসনিকভাবে ফোনিশিয়ানদের রাজ্যভুক্ত ছিল এবং ক্যানানাইটস গোত্রগুলো বস্তুত অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ছিল স্বাধীন। ঐতিহাসিকভাবে ক্যানানাইটস গোত্রগুলোর ধর্মের উপাদানভিত্তিক প্রচুর মিল থাকলেও পরবর্তীকালে ইসরালাইটদের ধর্ম ভিন্নরূপ লাভ করতে শুরু করে এবং ক্রমেই ইসরালাইটদের ধর্ম ‘ঈশ্বর ও রীতির’ ক্ষেত্রে অন্য ক্যানানাইটসদের ধর্মের চেয়ে আলাদা হতে থাকে। প্যাগান ফিলিস্তিয়া ও অন্যান্য ক্যানানাইটস গোত্রের সঙ্গে একেশ্বরবাদী ইজরালাইটদের ধর্মীয় বিরোধ সুস্পষ্ট হতে থাকে।

পরবর্তীকালে সভ্যতা চর্চার দৌড়ে ইসরালাইটরা এগিয়ে যায় এবং এই অঞ্চলে তাদের ভাষা-ধর্ম-আচারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেই সঙ্গে প্যাগান ক্যানানাইটস ভাষা-ধর্ম-আচারও প্রচলিত ছিল। ততদিনে ইহুদি ধর্মের ভিত্তি রচিত হয়ে গেছে এবং এই অঞ্চলে দুটো ইসরালাইট রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় খ্রিস্টপূর্র্ব ৯০০ অব্দে ইসরাইল-রাজ্য ও ৮০০ অব্দে জুদেয়া-রাজ্য। খ্রিস্টপূর্র্ব ৭৪০ অব্দে অ্যাসিরীয়রা ইসরাইল রাজ্য দখল করে। এই সময় প্রথম ইহুদিদের উচ্ছেদ করা হয়। অ্যাসিরীয়রা ৭৩২ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইহুদিদের তাদের বসতি থেকে উচ্ছেদ করে এবং ইসরাইল রাজ্য ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এখানে একটি কথা বলে রাখা জরুরি, অ্যাসিরীয়রা ইসরাইল-রাজ্যের শাসক ও তার গোত্র তথা ইহুদিদের শুধুমাত্র উচ্ছেদ করে, অন্য ক্যানানাইটস গোত্রগুলো এই উচ্ছেদের আওতামুক্ত ছিল। খ্রিস্টপূর্র্ব ৬২৭ সালে ব্যাবিলোনিয়ানরা অ্যাসিরীয়দের পরাজিত করে নিজেদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। ব্যাবিলোনিয়ানদের সঙ্গে ইজিপ্টিয়ানদের রাজ্যবিস্তার নিয়ে বিরোধ ছিল। খ্রিস্টপূর্র্ব ৬০৯ থেকে ৬০৫ অব্দ পর্যন্ত ইজিপ্টিয়ানরা ব্যাবিলোনিয়ানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ইহুদি রাজ্যগুলো অধিকার করে রাখে। ৬০৫ অব্দে ব্যাবিলোনিয়ানরা এই অঞ্চল পুনর্দখল করে।

পরবর্তীকালে ইজিপ্টিয়ান ও ব্যাবিলোনিয়ানদের মাঝে ব্যাপক যুদ্ধ হয় এবং এই যুদ্ধে ইসরালাইটদের (ইহুদিদের) বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যাবিলোনিয়ানরা। ফলে ৫৮৬ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দে ব্যাবিলোনিয়ানরা জেরুজালেম ও সলোমনের মন্দির ধ্বংস করে দেয় ও পৃথিবীর ইতিহাসে ‘দ্বিতীয়বার’ ইহুদিরা উচ্ছেদের সন্মুখীন হয়। এখানে একটি কথা বলে রাখা জরুরি, ব্যাবিলোনীয়রা এবার শুধু ইসরালাইটদের (ইহুদিদের) নয়, পুরো দক্ষিণ লিভান্ত অঞ্চলের সব গোত্রকে হত্যা ও উচ্ছেদ করে। খ্রিস্টপূর্র্ব ৫৪০ অব্দে পারশিয়ানরা ব্যাবিলোনিয়ানদের পরাজিত করে দক্ষিণ-লিভান্ত অঞ্চলকে (ক্যানান) নিজেদের দখলভুক্ত করে। এরা এই অঞ্চলকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করে : ১. ফোনেশিয়া, যা বর্তমান লেবানন ও ইসরাইলের দক্ষিণ অংশ। ফোনিশিয়ানরা অধিকাংশ ছিল সেমিটিক প্যাগান। ২. জুদেয়া ও সামারিয়া, জুদেয়া ও সামারিয়ার মানুষরা ছিল ইসরালাইট ইহুদি ও ফিলিস্তিয়া সেমিটিক প্যাগান। ৩. আরব ও সেমেটিক বিভিন্ন গোত্রের জন্য একটি অঞ্চল (বর্তমান গাজা, নেগেভ মরুভূমিসহ বর্তমান ইসরাইলের উত্তরাংশ, পশ্চিমতীর থেকে শুরু করে জর্দান, সিরিয়া) আরব ও সেমেটিক বিভিন্ন গোত্র ছিল সেমিটিক প্যাগান। এই সময় ইসরালাইটরা (ইহুদি) মন্দির পুনর্নির্মাণ করে এবং ইহুদি ধর্ম ও ইসরাইলাইটাদের রিভাইব হয়। হিব্রু ভাষা ও ইসরালাইটদের ধর্ম (বর্তমান ইহুদি ধর্মের পূর্বরূপ) পারশিয়ানদের শাসনামলে বিকশিত হয়।

৩৩০ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দে দক্ষিণ লিভান্ত (ক্যানান) গ্রিকদের হস্তগত হয় এবং ১৪০ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দ পর্যন্ত গ্রিকরা প্রকারান্তরে এই অঞ্চল নিজেদের অধিকারে রাখে। এই সময় এ অঞ্চলটি গ্রিকদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেও অভ্যন্তরীণভাবে স্বাধীন ছিল। এই সময় ১৬৭ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দে গ্রিকরা ইসরালাইটদের ধর্মপালনে বাধা দেওয়া শুরু করে। গ্রিকরা এই অঞ্চলকে ফিলিস্তিন বলে সম্বোধন করত। এর কারণ, ফোনিশিয়ানদের পূর্বপুরুষ ছিল প্যালেস্তিনা; তাদের সঙ্গে গ্রিকদের অসংখ্য যুদ্ধ হয়েছিল, তাদের পতনের মূলে গ্রিকরা অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল।

১৪০ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দে জুদেয়ায় ইসরালাইটদের স্বাধীন রাজ্য স্থাপিত হয়। এই রাজ্য শাসন করত হ্যাসমোনিয়ান ডাইনেস্টি। এই রাজ্য ৬৩ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল। এই সময়টিতেই ইসরালাইটরা রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি অগ্রসর হয়। দক্ষিণ লিভান্তের (ক্যানান) অধিকাংশ অংশ ইসরালাইটদের রাজ্যভুক্ত হয়। এই সময় ইসরাইলাইটরা তাদের উন্নতি ও বিকাশের সর্বোচ্চ সময়ে আরোহণ করে। রোমানরা ৬৩ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দে জুদেয়া রাজ্য দখল করে।

 রোমানরা তাদের শাসন এই অঞ্চলে পাকাপোক্ত করার জন্য স্থানীয় ইসরালাইটদের থেকে একজন রাজা নিয়োগ করেছিল, যার নাম হেরোদ। এই সময়ে ইসরালাইটদের মধ্যে অনেকে তাদের ধর্মে বর্ণিত মেসাইয়া (প্রেরিত পুরুষ) বলে দাবি করে। ইসরালাইটদের একটি ধর্মীয় উপগোত্র হিসেবে খ্রিস্টান ধর্মের আবির্ভাব হয়। কিন্তু ইসরালাইটদের এই সুদিন খুব বেশি সময় টিকে ছিল না। ইসরালাইটদের সঙ্গে রোমানদের যুদ্ধ বেধে যায়। টাইটাস ৭০ খ্রিস্টাব্দে জেরুজালেম ধ্বংস করে এবং প্রায় এক মিলিয়ন ইসরালাইটকে হত্যা করা হয় ও তাদের উচ্ছেদ এবং এটিই ইসরালাইটদের সর্ববৃহৎ উচ্ছেদ; ইসরালাইটরা এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপের নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। ১৩২ খ্রিস্টাব্দে রোমানরা সম্রাট হাদ্রিয়ানের সময় থেকে জুদেয়া অঞ্চলকে অফিসিয়ালি প্যালেস্টিনা বলে সম্বোধন করা শুরু করে। কেন রোমানরা এই অঞ্চলকে প্যালেস্টিনা বলে সম্বোধন করা শুরু করে? তার কারণটাও খুব ইন্টারেস্টিং। সে সময় জুদেয়া অঞ্চলে বসবাস করত দুটো ধর্মভিত্তিক সম্প্রদায় : ১. ইহুদি ধর্মাবলম্বী ইজরালাইট, এরা ছিল শাসক ও এলিট শ্রেণি। ২. সেমিটিক প্যাগান ধর্মাবলম্বী অন্যান্য ক্যানানাইটস ও সেমিটিকরা। এরা ছিল প্রজা শ্রেণি।

এখানে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, উপরে বর্ণনা করা হয়েছে, হাজার বছর আগে এই অঞ্চলের অন্য গোত্রগুলোর, বিশেষত ফিলিস্তিয়াদের সঙ্গে ইসরালাইটদের পূর্বপুরুষ জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টির সম্পর্কের টানাপড়েনের কথা এবং আরেকটি বিষয় মনে করিয়ে দিই, এরা সবাই কিন্তু এই অঞ্চলেরই আদিবাসী। রোমানরা জুদেয়াতে বসবাসকারী সেমিটিক প্যাগান ধর্মাবলম্বী অন্যান্য ক্যানানাইটস ও সেমিটিক গোত্রগুলোকে ইসরালাইটদের বিপক্ষে একটি শক্তি হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করে। ঠিক যেন ডিভাইড অ্যান্ড রুল তত্ত্ব আর এই লক্ষ্যে রোমানরা জুদেয়া অঞ্চলকে প্যালেস্টিনা বলে সম্বোধন শুরু করে এবং ইসরালাইট বাদে অন্যান্য প্যাগান ধর্মাবলম্বী ক্যানানাইটস ও সেমিটিক গোত্রকে প্যালেস্টিনিয়ান বলে সম্বোধন করা শুরু করে। এখানে রোমান হঠকারিতাটি হলো, যে ফিলিস্তিয়া গোত্রের সঙ্গে ইসরালাইটদের পূর্বপুরুষ জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টির দ্বন্দ্ব ছিল, সে ফিলিস্তিয়া গোত্র এবং জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টির কেউই তখন আর বিদ্যমান ছিল না। যারা ছিল, তারা ওদের বংশধর এবং তাদের গোত্রের নাম-ধর্ম-আচার-ভাষা হাজার বছরের ব্যবধানে বিবর্তিত হয়ে গেছে। রোমানরা তাদের এই হঠকারিতা এই অঞ্চলে তাদের শাসনক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। কিন্তু তারপরও এই অঞ্চলে শান্তি আসে না। ১৩৫ খ্রিস্টাব্দে ইসরালাইটরা রোমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।

রোমান সম্রাট হাদ্রিয়ান ১৩৬ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দে ইসরালাইটদের প্রকাশ্যে ধর্মপালন নিষিদ্ধ করেন, তাদের ধর্মগ্রন্থ পুড়িয়ে ফেলা হয়, পবিত্র মন্দির ধ্বংস করা হয়, জেরুজালেম ধ্বংস করে দেন, জেরুজালেমে ইসরাইলাইটদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়, জেরুজালেমের নাম পরিবর্তন করে করা হয় এইলিয়া, ছয় লক্ষাধিক ইসরালাইটকে হত্যা করা হয় এবং অধিকাংশ ইসরালাইট প্রাণ বাঁচাতে এই অঞ্চল ত্যাগ করে এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার আগে ইসরালাইটরা (ইহুদি) যে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল, তার কারণ হলো রোমানদের হাতে ৭০ ও ১৩৫ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত ইসরালাইটদের গণহত্যা ও উচ্ছেদ। একটি কথা বলা দরকার, রোমানরা এবং তাদের পূর্বতন বিভিন্ন শক্তি অ্যাসিরীয় ও ব্যাবিলোনিয়ানরা যে শুধু ইসরালাইটদের হত্যা ও বিতাড়ন করেছে তা কিন্তু নয়; এই অঞ্চলে হাজার বছর ধরে প্রভাব বিস্তার করা শাসক-শ্রেণি ইসরালাইটদের স্থানীয় অন্য গোত্রগুলোর যারাই সমর্থন দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তাদেরও হত্যা ও বিতাড়ন করা হয়েছিল। তবে এখানে এটাও বলা জরুরি যে, এই অঞ্চলের প্রজা শ্রেণি সেমিটিক গোত্রগুলো স্বাভাবিক কারণেই অ্যাসিরীয়, ব্যাবিলোনিয়ান ও রোমানদের করা এসব অত্যাচারের সম্মুখীন খুব বেশি হয়নি। কারণ এই অঞ্চলের শাসক শ্রেণি ইসরালাইটদের সঙ্গে অ্যাসিরীয়, ব্যাবিলোনিয়ান ও রোমানদের দ্বন্দ্বগুলো তাদের কাছে ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ করে’ জাতীয় ছিল; এসব যুদ্ধে প্রজা শ্রেণির তেমন আগ্রহ ছিল না।

তবে এই অঞ্চলের সব গোত্রই কোনো না কোনো সময় বিজেতাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। ফিনিশিয়ান, সামারাটিয়ান, বেদুইন-গাসসানিদসহ বিভিন্ন আরব গোত্র ও অন্যান্য সেমিটিক গোত্র নানা সময় বিজেতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে এবং অধিকাংশ সময়ই বিজেতারা এদের গণহত্যা ও উচ্ছেদ করেছে। ইসরালাইটদের ইহুদি ধর্ম ও প্যাগান সেমিটিকদের ধর্ম নিয়ে একটি কথা বলে রাখা উচিত হবে যে, এই দুটো ধর্মের অনেক উপাদানের মিল ছিল, এমনও দেখা গেছে একই ব্যক্তি উভয় ধর্মে সম্মানিত, একই আচার উভয় ধর্ম পালন করছে; এর কারণ, উভয় ধর্ম একই উৎস থেকে এসেছে। পরবর্তীকালে ইসরালাইটদের ঈশ্বর-ধারণা একেশ্বরবাদিতায় রূপান্তরিত হয়েছে এবং অন্য সেমিটিক গোত্রগুলোর ঈশ্বর-ধারণা আগের মতো বহু-ঈশ্বরে রয়ে গেছে। রোমানদের ইসরালাইট তথা ইহুদি নিধন এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, বস্তুত ইহুদি ধর্মের গতি-প্রকৃতি পরিবর্তন হয়ে যায়। রোমানদের নিপীড়ন শুরু করার আগে ইহুদি ধর্ম ও পরের ইহুদি ধর্মের ব্যাপক পার্থক্য আছে। এর কারণ রোমানরা যেভাবে পেরেছে সেভাবে ইসরালাইটদের নিধন,  প্রায় সব ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে হত্যা, উপাসনালয়, ধর্মগ্রন্থ ধ্বংস করেছে।

বর্তমানে ইসরালাইট তথা ইহুদিদের যে ধর্ম আমরা দেখি তার চর্চা মূলত ৬০০ খ্রিস্টাব্দের দিক থেকে শুরু হয়। ৩১৩ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে রোমান সম্রাট কন্সটানটাইন এবং ৩২৪ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টান ধর্মকে রোমানরা ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়; কন্সটানটাইনের সময় খ্রিস্টান শহর হিসেবে জেরুজালেমের নাম পূর্ণ প্রচলন করে। এসময় মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে ইসরালাইটদের নতুন শত্রু সৃষ্টি হয় আর তারা হলো খ্রিস্টানরা। খ্রিস্টানরা যিশুর মৃত্যুর জন্য ইসরালাইটদের দায়ী করে। শুরু হয় সংঘাতের নতুন অধ্যায়, খ্রিস্টান-ইহুদি দ্বন্দ্ব। ৩৫১-৩৫২ খ্রিস্টাব্দে রোমানদের বিরুদ্ধে ইসরালাইটরা বিদ্রোহ করলে কঠোর হস্তে তা দমন করা হয় এবং আগের মতো ইসরালাইটদের হত্যা ও উচ্ছেদ করা হয়। ৩৬১ সালে রোমানরা ইসরালাইটদের জেরুজালেমে প্রবেশাধিকার দেয়, তাদের মন্দির তৈরির ও প্রার্থনা করার অনুমতি দেওয়া হয়। রোমান সম্রাট থিওডোসিয়াস খ্রিস্টান ধর্মকে ৩৮০ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন। এসময় যিশুর অঞ্চল হিসেবে জেরুজালেম ও তৎসংলগ্ন এলাকা খ্রিস্টানদের কাছে গুরুত্ব পেতে থাকে।

এর মধ্যে ৩৯৫ সালে চূড়ান্তভাবে রোমান সাম্রাজ্য দু ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে; পূর্বতন অংশকে বলা হতো বিজান্টিয়াম সাম্রাজ্য। বিজান্টিয়ামদের সময় জেরুজালেম খ্রিস্টান ধর্ম চর্চার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ৬১৪ সালে পারশিয়ান-বিজান্টিয়াম যুদ্ধে ইসরালাইটরা পারশিয়ানদের পক্ষ নেয়। পারশিয়ান-ইসরালাইটদের যৌথবাহিনী জেরুজালেম জয় করে খ্রিস্টানদের চার্চগুলো ধ্বংস করে ফেলা হয়, খ্রিস্টানদের ওপর চালানো হয় গণহত্যা। ইসরালাইটরা পারশিয়ানদের অধীন প্যালেস্টিনা ও জেরুজালেম শাসন করতে থাকে। ৬১৭ সালে পারশিয়ান-ইসরালাইটদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। পারশিয়ানরা ইসরালাইটদের হাত থেকে প্যালেস্টিনার ক্ষমতা কেড়ে নেয়, ইসরালাইট সৈন্য ও সরকারি কর্মকর্তাদের সপরিবারে হত্যা করা হয়। জেরুজালেম থেকে তাদের বের করে দেয়, এর তিন মাইলের মধ্যে কোনো ইসরালাইটের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করে দেয়। ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে বিজান্টিয়াম সম্র্র্র্র্রাট হেরাক্লিয়াস জেরুজালেম পুনরায় জয় এবং পারশিয়ানদের বিতাড়িত করেন। এসময় অধিকাংশ ইসরালাইট বিজান্টিয়ামদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে, তারা ইসরালাইটদের হত্যা ও উচ্ছেদ করা থেকে বিরত থাকে কিন্তু ইসরালাইটরা জেরুজালেমে বসবাস করতে পারত না। মূলত ইসরালাইটদের অধিকাংশই ১৩৫ খ্রিস্টাব্দের পর জেরুজালেম ও দক্ষিণ লিভান্ত ছেড়ে এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপের নানা প্রান্তে চলে যায়।

এখানে ঐতিহাসিক কিছু কথা বলে নেওয়া ভালো। ৬১০ খ্রিস্টাব্দে প্যালেস্টিনার ঠিক পাশেই আরব উপদ্বীপে হেজাজ অঞ্চলের মক্কা নগর রাষ্ট্রে ইসলাম নামে নতুন একটি সেমিটিক একেশ্বরবাদী ধর্মের আবির্ভাব হয়। উল্লেখ্য, আরবরাও একটি সেমিটিক জাতি। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের আগ পর্যন্ত ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা প্রার্থনার জন্য জেরুজালেমকে কিবলা হিসেবে ব্যবহার করত, পরে মক্কার কাবাকে কিবলা করা হয়। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে চুক্তিভঙ্গ করায় আরব মুসলমানরা ইসরালাইট গোত্র বনু কুনাইকাকে উচ্ছেদ করে। ৬২৫ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের রাসূলকে হত্যা পরিকল্পনা করার অভিযোগ এনে আরব মুসলমানরা ইসরালাইট গোত্র বনু নাদিরকে উচ্ছেদ করে। ৬২৭ খ্রিস্টাব্দে চুক্তিভঙ্গ করার অভিযোগ এনে আরব মুসলমানরা মদিনার ইসরালাইট গোত্র বনু-কুরাইজার প্রায় এক হাজার পুরুষের শিরñেদ এবং তাদের শিশু ও স্ত্রীদের দাস-দাসীতে পরিণত করে।

৬৪১ খ্রিস্টাব্দে আরব মুসলমানরা হেজাজ অঞ্চল (বর্তমান সৌদি আরব) থেকে খ্রিস্টান ও ইসরালাইটদের বসতি অন্যত্র সরিয়ে নেয়। ৬৩৪-৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে মুসলমান আরবরা জেরুজালেম ও লিভান্ত জয় করে। তখন জেরুজালেম খ্রিস্টানদের একটি পবিত্র শহর হিসেবে গণ্য হতো। আরবরা লিভান্ত জয়ের সময় খ্রিস্টান ও ইসরালাইটদের গণহত্যা বা উচ্ছেদের বিষয়ে কৌশলগত কারণে সংযত ছিল, লিভান্ত জয়ের সময় আরব মুসলমানরা লিভান্তের খ্রিস্টান ও ইসরালাইটদের গণহত্যা বা উচ্ছেদ করেনি কিন্তু জিজিয়া কর চালু করে। এদিকে ১৩৫ খ্রিস্টাব্দে রোমানদের দ্বারা উচ্ছেদের পর ইসরালাইটদের অধিকাংশই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। তবে অধিকাংশ ইসরালাইট ইউরোপে আশ্রয় নেয়। ইউরোপিয়ানরা ৩৮০ খ্রিস্টাব্দের পর শাসকের ধর্ম হিসেবে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করা শুরু করে। খ্রিস্টান ধর্ম অনুসারে, ইসরালাইটরা যিশুকে ত্রুশবিদ্ধ করেছে। ফলে খ্রিস্টানরা ইসরালাইটদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করত। এর প্রভাব আমরা দেখতে পাই, ইউরোপে ইউরোপিয়ান খ্রিস্টানদের দ্বারা ইসরালাইটদের হত্যা ও উচ্ছেদের অসংখ্য ঘটনার মধ্য দিয়ে।

স্প্যানিশ-পর্তুগিজ ও ক্যাথলিক ইনকুইজিশানের সময় ক্যাথলিক খ্রিস্টানরা নানা সময় ইউরোপে অবস্থানরত অসংখ্য ইসরালাইটকে হত্যা ও উচ্ছেদ করেছে, ক্রুসেডের সময় এবং পরবর্তীকালে মধ্য ও আধুনিক যুগে খ্রিস্টানরা ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসরালাইটদের গণহত্যা ও উচ্ছেদ করেছিল। স্পেন থেকে মধ্যযুগে ক্যাথলিক খ্রিস্টানরা ইসরালাইটদের উচ্ছেদ করলে অটোম্যানরা সে সময় ইসরালাইটদের আশ্রয় দিয়েছিল। ইউরোপের মুরিশ স্পেনে বেশ কয়েকবার মুসলমান ও খ্রিস্টানরা মিলে ইসরালাইটদের গণহত্যা ও উচ্ছেদ করেছে, মুসলমানদের সূচনালগ্ন হতে আধুনিক যুগ পর্যন্ত মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে যে সব ইসরালাইট বসবাস করত, তারা বহুবার মুসলমানদের হাতে গণহত্যা ও উচ্ছেদের শিকার হয়েছে। সত্যি বলতে কি, প্রাচীন আমল থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর অর্ধাংশ পর্যন্ত ইজিপ্টিয়ান, অ্যাসিরিয়ান, ব্যাবিলোনিয়া, গ্রিক, রোমান, খ্রিস্টান, মুসলমান, আরব, অটোম্যান, পারশিয়ান, ইউরোপিয়ান, নাজি, ফ্যাসিস্ট, রুশ, সোভিয়েত সবাই নানা সময়ে ইসরালাইটদের পার্সিকিউট করেছে। পরিশেষে, এত বড় একটি লেখা লিখতে হয়েছে শুধুমাত্র দুটো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য।

প্রশ্ন ১ : ফিলিস্তিনিরা কি ইসরাইলিদের আদিনিবাস থেকে বের করে দিয়েছে?

উত্তর : না, ফিলিস্তিনিরা ইসরালাইটদের তাদের আদিনিবাস দক্ষিণ লিভান্ত থেকে বিতাড়িত করেনি। ইসরালাইটদের তাদের মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করেছে মূলত রোমানরা। ফিলিস্তিনিরা বর্তমান ইসরাইল-ফিলিস্তিন ভূখ-ের আদিবাসীদের বংশধর এবং ইসরালাইটরাও এই ভূখ-ের আদিবাসীদের বংশধর। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, ফিলিস্তিনিরা কারা, ওরা কীভাবে মুসলমান হলো ও তাদের ভাষা আরবি কেন? ফিলিস্তিনিরা ঐতিহাসিক দক্ষিণ লিভান্ত অঞ্চলে নানা সময়ে বসবাসকারী বিভিন্ন গোত্রের বংশধর। ফিলিস্তিনিরা মূলত ক্যানানাইটসদের বংশধর। ফিলিস্তিনিদের বর্তমানে ক্যানানাইট না ডেকে ফিলিস্তিনি ডাকা হয়, কারণ ১৩২ খ্রিস্টাব্দে এই অঞ্চলের শাসক রোমানরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই অঞ্চলকে প্যালেস্টিনা এবং ইসরালাইট বাদে এর অন্য অধিবাসীদের প্যালেস্টাইন বলে সম্বোধন করত। এর কারণ উপরে বর্ণনা করা হয়েছে। আগেই বলেছি, শাসকের ভাষা ও ধর্ম প্রজাদেরও ভাষা ও ধর্মে রূপান্তরিত হয়। কারণ এতে শাসক শ্রেণির অংশ হওয়া যায়, নিরাপত্তার বিষয়টির সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতাও উপভোগ করা যায়। আরব-মুসলমানরা লিভান্ত জয় করার পর, লিভান্তের প্যাগানরা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলের প্যাগানদের মতো ধর্মান্তরিত হয় এবং দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে আরবির প্রচলন থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য জায়গার মতো লিভান্তের মানুষও আরবিকে মূল ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে।

প্রশ্ন ২ : কারা ইসরাইল-ফিলিস্তিনের আদিবাসী। ইসরাইলিরা নাকি ফিলিস্তিনিরা?

উত্তর : বস্তুত উভয়ের মাতৃভূমি ইজরাইল-ফিলিস্তিন। কারণ উভয়েই ক্যানানাইটসদের বংশধর। ক্যানানাইটস গোত্রগুলোর মাঝে ইসরালাইটদের এই অঞ্চল রোমানরা উচ্ছেদ করেছিল বলে ওরা নানা জায়গায় মাইগ্রেট করে কিন্তু বর্তমান ইসরাইল-ফিলিস্তিন ভূখ- এদের পূর্বপুরুষের মাতৃভূমি। বর্তমানে ফিলিস্তিনি যাদের বলা হয়, এরাও ক্যানানাইটস গোত্রসমূহ, আরবসহ অন্যান্য সেমিটিক গোত্র ও এই অঞ্চলে বসতি স্থাপনকারীদের বংশধর। এরা প্রাচীনকাল থেকে হাজার বছর ধরে বংশপরম্পরায় এই অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। বর্তমান ইসরাইল-ফিলিস্তিন ভূখ-টি ফিলিস্তিনিদের হাজার হাজার বছরের বসতভূমি ও মাতৃভূমি। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়। আর এর মাধ্যমে ইসরালাইটদের বড় অংশ তাদের পূর্বপুরুষের মাতৃভূমিতে আসতে শুরু করে এবং এ নিয়ে ইজরালাইটসহ এই অঞ্চলে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতি ও গোত্রের বর্তমান বংশধরদের তথা ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরালাইটদের সংঘাত শুরু হয় যা ক্রমেই বড় হয়েছে এবং বর্তমানে এর কোনো সমাধান আমরা পাইনি। বর্তমান বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে ইসরাইল রাষ্ট্রের বিলুপ্তি সম্ভব নয় এবং এই চেষ্টা করা উচিতও হবে না। এছাড়া ক্যানানাইটসদের বংশধর হিসেবে এই ভূমিকে ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিরা উভয়েই নিজেদের বলে দাবি জানাতে পারে। ইসরাইল-ফিলিস্তিনের অধিবাসীদের পরস্পরের সহাবস্থান সহ্য করা ছাড়া ভিন্ন কোনো বিকল্প আছে কি?

লেখক : অনুবাদক, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক এবং বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক।

এশিয়া

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে