Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০২-২৪-২০১৬

গার্মেন্ট খাতে নারী: ঝুঁকি বেশি, কর্মতুষ্টি কম

গার্মেন্ট খাতে নারী: ঝুঁকি বেশি, কর্মতুষ্টি কম

ঢাকা, ২৪ ফেব্রুয়ারী- পোশাক শিল্প খাতের কর্মীরা বাংলাদেশের গার্মেন্ট সেক্টরের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। দাবি-দাওয়া, অন্দোলন, সুপারিশ হয়েছে অনেক। তারপরও অনেকের ভাগ্যে জোটে না মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ভাতা। চাকরি বাঁচানোর জন্যে অসুস্থ শরীরেও কাজ করতে হয়। নেই পেনশন স্কিমের ব্যবস্থা। উৎপাদন কম হলে সইতে হয় নির্যাতন। অর্থনীতির চাকা যারা সচল রাখছেন শ্রমে-ঘামে, তাদেরই নেই প্রাপ্য স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা।

ঢাকার সাভারে গ্রিন টেক্সটাইল গার্মেন্টে কাজ করেন নিলুফার ইয়াসমিন নামের এক নারী শ্রমিক। সারা মাস কাজ করে যে বেতন পান, তা বাবা-মায়ের হাতে তুলে দেন। নিলুফার বলেন, আমার কোনো প্রয়োজনে স্বামীর কাছে টাকা চাইলে প্রশ্নের মুখোমুখি হইতে হইত। টাকা দিয়া কী করমু! গার্মেন্টে কাম কইর‌্যা নিজের পায়ে দাঁড়াইছি। এখন নিজের দরকারে টাকা খরচ করতে কারও কাছে কৈফিয়ত দিতে হয় না। নিজের ইচ্ছামতো বাবা-মাকে দেখাশোনা করতে পারি। সন্তানরে লেখাপড়া শিখাইয়্যা একজন ভালো মানুষ হিসাবে গইড়্যা তোলার স্বপ্ন দেখি। গার্মেন্ট শিল্প মানুষের জীবন বাঁচাইতাছে। সেই গার্মেন্টে কাজ করি বইল্যা অনেকেই কয় গার্মেন্টে যারা কাজ করে তারা ভালা না। গ্রাম থাইক্যা শহরে আসছি দুইটা টাকা রোজগারের জন্য। কাজ না করলে সন্তান, বাবা-মায়েরে দেখমু কেমনে? যারা এসব কথা কয়, তাগো গার্মেন্ট কর্মীগো সম্পর্কে না জাইন্যা, না বুইঝ্যা কিছু বলা ঠিক না।

তিনি আরও বলেন, গার্মেন্ট যেমন আমাগো জীবন বাঁচাইতাছে, তেমনি অনেক সমস্যাও আছে। কাম করতে করতে পেরেশান হইয়া পড়ি। ছুটি চাইলে ছুটি পাই না। তিন দিন কামে না গেলে চাকরি চইল্যা যায়। অসুস্থ শরীরে কাম করতে না পারলে, দুই পিস মাল কম তৈরি হইলে বলে, তোমার আর কাম করতে হইবো না, গেট খোলা আছে, চইল্যা যাও। পাঁচ-দশ পিস মাল কম বানাইলে নির্যাতন করে। গার্মেন্টে এর বিচার তো নাই-ই. উল্টা চাকরি চইল্যা যায়। সুপারভাইজার বলে, ‘কী করতে পারবি, কিছুই করতে পারবি না।’ আমরা অসুস্থ হইলে মেডিকেলও নাই। গার্মেন্টে কাম করি বইল্যা রাস্তা দিয়া চলাফেরায় নিরাপত্তা নাই। বেডারা খারাপ দৃষ্টিতে তাকায়। মাথার ঘাম পায়ে ফেলাইয়া কাম কইর‌্যা টাকা রোজগার করি, আর মানুষ খারাপ চোখে দেখবো এইটা মোটেও ঠিক না।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে ‘পোশাক শিল্পে নারীর অবস্থান’ শীর্ষক একটি গবেষণা করা হয়েছিল ২০১৩ সালে। বিজিএমইএ-র সদস্যভুক্ত ঢাকা, গাজীপুর এবং নারায়ণগঞ্জের ৪৮টি পোশাক কারখানার নির্যাতিত এক হাজার ২৬ জন নারী পোশাক শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে উল্লে¬খ করা হয়েছে, শতকরা ৯৭ দশমিক ৩৩ ভাগ মুসলমান এবং শতকরা ৩ ভাগেরও কম হিন্দু নারী পোশাক-কারখানায় কাজ করেন। তাদের মধ্যে শতকরা ৬৫ ভাগ বিবাহিত। ১৮ বছরের নিচে শতকরা ৮ ভাগ, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সের মধ্যে শতকরা ৮৭ ভাগ এবং ৩৫ বছরের ওপরে শতকরা ৫ ভাগ নারী শ্রমিক বিবাহিত। বিবাহিত নারী শ্রমিকদের এক বা একের অধিক সন্তান রয়েছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি পাননি শতকরা ১৭ ভাগ। অবিবাহিত নারী শ্রমিক শতকরা ৩০ ভাগ। তারা খুব সকালে কাজে যান এবং রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত কাজ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা জানান, শতকরা প্রায় ৮২ ভাগ নারী পোশাক শ্রমিক তাদের বাড়িতে সাপ্লাইয়ের পানি ব্যবহার করেন। গার্মেন্টে কর্মরত এসব নারী শ্রমিকের মধ্যে শতকরা ৯৭ ভাগ নারীকে বাথরুম শেয়ার করতে হয়। দেখা গেছে, একটি বাথরুম গড়ে প্রায় ১০ থেকে ২০ এমনকি ৪০ জন পর্যন্ত ব্যবহার করেন। এর ফলে তাদের মধ্যে নানা ধরনের শারীরিক অসুস্থতা যেমন ইউটিআই ইনফেকশন ইত্যাদি লক্ষ্য করা যায়। স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়ে যায়। সারাদিন কাজ শেষে বাসায় ফিরে রান্নার জন্য চারজনের পর অপেক্ষা করতে হয়। শতকরা ৯৮ ভাগ নারী পোশাক শ্রমিক এভাবে তাদের রান্নাঘর শেয়ার করেন। একজন নারী শ্রমিক কর্মক্ষেত্র ও বাসস্থানের পরিবেশগত কারণে স্বামী, সন্তান এবং নিজেকে সময় দিতে পারেন না।

এছাড়া অর্থনৈতিক টানাপড়েনের কারণে তারা প্রোটিন এবং আমিষ জাতীয় খাদ্য অনেক কম খান। শতকরা ৮৭ ভাগ শাক-সবজি, শতকরা ৯০ ভাগ ঝাল, শতকরা ৮৮ ভাগ স্নেহ বা চর্বি জাতীয় খাবার, প্রোটিন জাতীয় খাবার ডিম শতকরা ৩১ ভাগ, দুধ শতকরা ৫ ভাগ, মাংস শতকরা ৪ ভাগ, ফল শতকরা ৫ থেকে ৯ ভাগ এবং মিষ্টি শতকরা ১৭ ভাগ খান। এর ফলে পুষ্টিগত বিচারে তারা শারীরিকভাবে দুর্বল ও অসুস্থতার পর্যায়ে রয়েছেন। এর অনিবার্য প্রভাব পড়ে পরবর্তী প্রজন্মের ওপর। এত সমস্যা সত্ত্বেও পোশাকশিল্পে নারী শ্রমিক বাড়ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. জাহিদ চৌধুরী জানান, নিম্ন মজুরি, পুরুষ সহকর্মী কিংবা কর্মকর্তা কর্তৃক যৌন হয়রানি, অনিয়মিত বেতন থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশে ৯০ শতাংশ গার্মেন্ট কর্মী হলেন নারী। কর্মক্ষেত্রে সুপারভাইজারের হয়রানির কারণে গার্মেন্টে কর্মরত নারীদের কর্মতুষ্টি কম। পারিবারিকভাবেও তারা নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হন। শহরাঞ্চলে অভিবাসী নারীরা নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন। যার মধ্যে প্রধান হচ্ছে পুষ্টির অভাব, নিম্ন মজুরি, জীবনযাত্রার নিচু মান, অস্বাস্থ্যকর বাসস্থান এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাব। পোশাক শিল্পে অভিগম্যতার ফলে নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি পেয়েছে, এটা ঠিক। যার ফলে তাদের কথা বলা এবং নিজে সিদ্ধান্ত নেয়ার মত জায়গা তৈরি হয়েছে। কিন্তু দেখা যায়, নারীরা অধিকাংশ সময় ব্যক্তিগতভাবেও ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। পরিবার থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রে যাওয়া পর্যন্ত এমনকি কর্মক্ষেত্রেও নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার অভাব থাকে।

পোশাক শিল্পে নানা সমস্যার পরও নারীরা উপার্জন করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন পোশাক কর্মীরা। এটা দেশের উন্নয়নে একটা ইতিবাচক দিক। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, বাংলাদেশের অনেক ইতিবাচক উন্নয়নের মধ্যে এটি একটি। পোশাকশিল্পে নারী তার জায়গাটি করে নিয়েছেন। এই শিল্পে শ্রমিক হিসেবে নারীর অভিগম্যতার ফলে তারা আজ কথা বলতে পারছেন, নিজের জন্য কিছু অর্থ ব্যয় করতে পারছেন। নারীরা আজ দলবেঁধে রাস্তায় হেঁটে তাদের কর্মক্ষেত্রে যান। নিঃসন্দেহে এটা নারী সমাজের জন্য এক বিশাল অর্জন। এগুলো সবই পোশাকশিল্পে নারীর অবস্থানের ইতিবাচক দিক। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে নারী-পুরুষের যে বৈষম্য সমাজে বিরাজমান, তা থেকে নারী বের হয়ে আসতে পারেনি। শ্রমবিভাজনের কারণে নারী সব সময়ই দ্বিতীয় মাত্রায় অবস্থান করে যাচ্ছে। পোশাকশিল্পের ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করার জন্য আমরা সবাই কাজ করে যাব এবং সমাজ থেকে এই বৈষম্য দূর করে এগিয়ে যাব এই আমাদের প্রত্যাশা।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ড. বিনায়ক সেন বলেন, পোশাকশিল্পে বর্তমানে নারীর যে অবস্থান ও অবস্থা, তা নারীর জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক, আবার অনেক ক্ষেত্রেই নেতিবাচক। তাই কিছু সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে নারীর অবস্থা ও অবস্থান পরিবর্তন সম্ভব নয়। পোশাক শিল্প-শ্রমিকদের শহর থেকে দূরে বাসস্থানের ব্যবস্থা করলে তাদের যাতায়াত খরচ এবং শহরের প্রাণকেন্দ্রে থাকলে বাসা ভাড়ার খরচ অনেক বেড়ে যাবে। গার্মেন্ট এলাকার কাছাকাছি তাদের বাসস্থান কিংবা যাতায়াত ভাড়ার সুবিধা না দিলে কখনোই এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব নয়। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে: নারী শ্রমিকদের মূল চিত্রটি বিজিএমইএ ও সরকারের তথ্যে উঠে আসে না। এই দিকটিতে দৃষ্টি দিতে হবে।

বিজিএমইএ-র সাবেক সভাপতি মো. আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, অর্থনীতিবিদ ও তরুণ প্রজন্ম যদি গার্মেন্ট সেক্টরে সম্পৃক্ত থাকেন, তবে গার্মেন্ট শিল্পের উন্নয়ন হবে। বাংলাদেশে নারী পোশাক শ্রমিকদের যে অবস্থান, তা তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় দিয়ে বিচার করা। নারী শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে নির্ধারণ করা। নারী পোশাক শ্রমিকদের অবস্থানের পরিবর্তনের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ অন্যসব ক্ষেত্রে সরকারের সহায়তা প্রয়োজন। বিজিএমইএ গার্মেন্টে শিশু শ্রমিক নেয়া নিষিদ্ধ করেছে। যে গার্মেন্টে শিশু শ্রমিক পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। পোশাককর্মীর সন্তানদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে বিজিএমইএ পাঁচটি স্কুল খুলেছে। ব্যবস্থা করেছে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদানের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়। অধিকাংশ সময় তারা ন্যূনতম মজুরি পান না। কারণ সামাজিকভাবে তারা ন্যায়বিচার পান না। বাংলাদেশের পোশাক খাতে শ্রম আইনের সংস্কার করা দরকার। গার্মেন্টের মূল লাভের শতকরা ৫ ভাগ শ্রমিকদের জন্য ব্যয় করার কথা থাকলেও তা ব্যয় করা হয় না। নেই পেনশনের ব্যবস্থা। গার্মেন্ট সেক্টরে পেনশন স্কিম জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর করা প্রয়োজন। নারী শ্রমিকদের এই অবস্থার পরিবর্তন আনতে হলে ট্রেড ইউনিয়নের যথাযথ প্রয়োগ ও এর গুরুত্ব দিতে হবে। নইলে নারী শ্রমিকরা ক্রমাগতভাবেই শাসন ও শোষণের শিকার হবে। -বাসস

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে