Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.9/5 (16 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০২-১৯-২০১৬

শোকে স্তব্ধ সুন্দ্রাটিকি

উজ্জ্বল মেহেদী


শোকে স্তব্ধ সুন্দ্রাটিকি

হবিগঞ্জ, ১৯ ফেব্রুয়ারী- জাকারিয়া এখানেই বসত। খালি বেঞ্চটি দেখিয়ে সে কথাই বলছে এক সহপাঠী। বাহুবলে নিহত চার শিশুর তিনজনই ছিল সুন্দ্রাটিকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। বন্ধু হারানোর শোকে গতকাল এমনই ফাঁকা ছিল শ্রেণিকক্ষ l ছবি: আনিস মাহমুদ

কোলে তাঁর ১০ মাস বয়সী মেয়ে। একটি পাঠ্যবই হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন আর দুচোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। বইটি কার—এমন প্রশ্নে হাউমাউ শব্দ করে আমেনা খাতুন বললেন, ‘আমার পুতের গো, বইখানোত আর আমার জাদুর হাত পড়ত না...!’

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার সুন্দ্রাটিকি গ্রামে মানুষের পৈশাচিকতার শিকার চার শিশুর একজন মো. তাজেল মিয়া। তারই (১২) দুখিনী মা আমেনা খাতুন। থেমে থেমে বিলাপ করছেন তিনি। পাশে থাকা তাঁর স্বজনদের চোখও নতুন করে ভিজে উঠছিল তাতে।

তাজেলের বাবা আবদুল আজিজ পেশায় শ্রমিক। তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে তাজেল দ্বিতীয়। পরিবারে কেবল তাজেল স্কুলে যেত। নিখোঁজ হওয়ার দিন গ্রামের পাশের মাঠে ফুটবল খেলা দেখতে বয়সে অপেক্ষাকৃত বড় তাজেল সঙ্গী হিসেবে তার দুই চাচাতো ভাই জাকারিয়া আহমদ (৮) ও মনির মিয়া (৬) এবং প্রতিবেশী ইসমাইল মিয়াকে (৭) নিয়েছিল। সেখান থেকে ফেরার পথেই নিখোঁজ হয় চারজন। পরে বুধবার বাড়ি থেকে এক মাইল দূরের ছড়ায় (ছোট নদী) বালুচাপা অবস্থায় তাদের লাশ পাওয়া যায়।

শুধু তাজেলের বাড়িতেই নয়, নাড়িছেঁড়া ধনের জন্য প্রতিটি বাড়িতে চলছে আহাজারি। সব মায়ের কষ্ট সেখানে একই রকম। সব স্বজনের মুখই ব্যথাতুর। এর মধ্যে নিহত তিন চাচাতো ভাইয়ের দাদি মরমচাঁদ বিবি সটান মাটিতে শুয়ে আছেন। মুখে কোনো কথা নেই। এই ব্যথা বহনের শক্তি নেই বয়োবৃদ্ধ মানুষটির।

গতকাল বৃহস্পতিবার এলাকায় গিয়ে দেখা গেল, শুধু চার শিশুর বাড়িই নয়, পুরো সুন্দ্রাটিকিই যেন শোকে স্তব্ধ। ঘটনার বীভৎসতায় গ্রামের মানুষ বিমূঢ়। অনেকের চোখেমুখে ছিল আতঙ্কের ছাপও।

গ্রামে ঢুকতেই সুন্দ্রাটিকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নিহত তিন চাচাতো ভাই পড়ত এই বিদ্যালয়ে। সকাল সাড়ে নয়টায় বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল, শিক্ষকেরা আছেন, কিন্তু শিক্ষার্থী হাতে গোনা কয়েকজন। ৩৪০ জন ছাত্রছাত্রীর বিদ্যালয়টিতে নেই কোনো প্রাণচাঞ্চল্য।

নিহত তিন ছাত্রের মধ্যে মো. তাজেল মিয়া চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। তাদের বাড়িতে গেলে তাজেলের খালা আনা বানু জানান, গত শুক্রবার থেকে ছেলেরা হারিয়ে যাওয়ায় খোঁজাখুঁজিতে ব্যস্ত ছিলেন সবাই। কিন্তু কারও ভাবনায় ছিল না, তাদের লাশ মিলবে। আর বলতে পারলেন না আনা বিবি। দলা পাকানো কান্না এসে তার সব স্বর-শক্তি যেন কেড়ে নিল। অনেক কষ্টে বললেন, ‘পুয়াটা (তাজেল) ভাত না খাইয়া মাঠো খেলাত গেছিল। না খাইয়া গেল, আর তো ফিরতে দিল না...!’

তাজেলের বড় ভাই তাহের মিয়া (১৯) বলেন, ‘আমরা তো চাইছিলাম তাজেলই পড়ুক। এর লাগি আমিও কামো (কাজে) ডুকছিলাম। অনে দেখলাম আমরার একটা মাত্র আশাই মাটি অইগেল।’

তাজেলদের ঠিক পাশের ঘর জাকারিয়া আহমদদের। আর বিপরীত দিকেরটি মনির মিয়ার। তিন ভাই এক বোনের পরিবারে মনির দ্বিতীয়। তার পিঠাপিঠি বয়সের আরও এক ভাই ও বোন স্কুলে পড়ে। মনির সবে প্রথম শ্রেণির ছাত্র। বাবা আবদাল মিয়া বর্গাচাষি। জানালেন, পরিবারের তিনজন স্কুলগামী হওয়ায় মনিরের কথায় ভাঙা বসতঘরটা নতুন করে নির্মাণ করছিলেন।

মনিরের মা সালমা বেগমকে পাওয়া গেল ঘরে। তিনি শয্যাশায়ী। কথা বলতে পারলেন না। শুধু কাঁদলেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।

জাকারিয়ার বাবা আবদুল ওয়াহিদ কাঠমিস্ত্রি। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র জাকারিয়ারা দুই ভাই। সে-ই বড়। তার ঘরে গিয়ে দেখা গেল মা পারুল বেগম বিছানায়। ভরদুপুরে কাঁথামুড়ি দিয়ে নির্বাক তিনি। ‘কোনো কথা নেই’—মাথা নেড়ে শুধু এটুকু জানাতে পারলেন। পাশে থাকা জাকারিয়ার চাচি হেনা বেগম জানান, নিখোঁজ হওয়ার দিন থেকে তিনি এভাবেই আছেন। কোনো কথা বলতে পারছেন না। এর মধ্যে দুবার হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসাও দেওয়া হয়েছে।

তাজেল-জাকারিয়া-মনিরের ঘরের পেছনে ইসমাইল মিয়ার বসতঘর। সে-ই কেবল মাদ্রাসাছাত্র। ‘আউয়াল’ (প্রথম) শ্রেণির ছাত্র ইসমাইলের বাবা আবদুল কাদির একজন দিনমজুর। চার বোন ও তিন ভাইয়ের বড় পরিবার। ইসমাইল দ্বিতীয়। গত শুক্রবার থেকে কাদির কাজে যেতে পারছেন না, এ জন্য ঘরে রান্নাবান্নারও বন্দোবস্ত নেই। ইসমাইলের বড় ভাই এমরান মিয়াও পেশায় শ্রমিক। চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘মা আর ছোট বোনরে নিয়ে আমরা বেসামাল। নিখোঁজের সময় সান্ত্বনা দিছিলাম ফিইরা পাইমু। অনে তো আর কোনো সান্ত্বনাই থাকল না।’

সুন্দ্রাটিকি গ্রামের উত্তর দিকে আছে একটি ছড়া। এই ছড়ার তীরে বালুচাপা দেওয়া যে জায়গা থেকে চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সেখানে গিয়ে কাউকে পাওয়া গেল না। অনেকটা দূরের সবজিখেতে কাজ করছিলেন আরজু মিয়া। সুন্দ্রাটিকির দক্ষিণ পাড়ায় তাঁর বাড়ি। আরজু বলেন, ‘এই রকম ঘটনা এই ময়ালে (পুরো এলাকায়) অতীতে আর ঘটছে না। আগে ঘটছিল বলে বাপ-দাদার মুখেও আমরা হুনছি না। আমরা অ্যার বিচার চাই।’

বেলা দুইটায় গ্রাম থেকে ফেরার পথে আবার তাজেল-জাকারিয়া-মনিরদের বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল, সেটি তখন শিক্ষার্থীশূন্য। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহজাহান তালুকদার বলেন, ‘ছোট-বড় সব মানুষ ভয়ের মধ্যে আছে। কেন, কোন পাষণ্ড কী কারণে এমন ঘটনা ঘটাল—এর একটা সুরাহা না হলে পরিস্থিতি বোধহয় সহজ হবে না।’

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে