Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০২-০৫-২০১৬

হিজাবের পক্ষে বসনিয়ার নারীদের সংগ্রাম 

রাশেদ শাওন


হিজাবের পক্ষে বসনিয়ার নারীদের সংগ্রাম 

সারায়েভো, ০৫ ফেব্রুয়ারী- বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার আদালতে ‘ধর্মীয় পক্ষপাতিত্ব’ হতে পারে সন্দেহে গত বছরের শেষ দিক থেকে সব ধরনের বিচারিক প্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা নিষিদ্ধ করেছে দেশটির বিচার বিভাগ। এরপর থেকে দেশটির আদালতে আসামি কিংবা সরকার পক্ষের আইনজীবী এবং বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা কর্মক্ষেত্রে আর হিজাব পরিধান করা বন্ধ রয়েছে। তবে সাক্ষী বা অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষ চাইলে শুনানির সময় হিজাব পরে আদালতে আসতে পারবে। 

এই প্রথম বসনিয়া এবং হার্জেগোভিনাতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। গত বছরের সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবরের দুইটি আদালত সেশনে সিদ্ধান্তটি নেয়া হলেও দুই সপ্তাহ আগে ঘটনাটি প্রকাশিত হয়। সিদ্ধান্তটি দেশটির নাগরিক ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। যদিও বলা হয়েছে, সব ধরনের ধর্মীয় প্রতীকের ব্যাপারেই এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। তবে অনেকেই যুক্তি দেখিয়েছেন, চাইলেই যেকোনো খ্রিস্টান তাদের গলায় পরা যিশুর ক্রুশবিদ্ধ মূর্তিটি লুকিয়ে ফেলতে পারেন। কিন্তু হিজাবের বেলায় এটি সম্ভব না।

দেশটির আদালতে ২০০৭ সাল থেকে আইনজীবী হিসেবে কাজ করে আসছেন হানাদি সালসিকা। আল জাজিরাকে তিনি জানান, ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে নয়, ব্যক্তিগত পছন্দের পোশাক হিসেবেই তিনি হিজাব পরেন। তার ভাষায়, এটি তার ‘লাইফ স্টাইল’। ধর্মীয় কারণে সালসিকা কখোনোই কোনো বিচারক কিংবা অন্য কারো বিরোধীতা করেননি বলেও জানান তিনি। এ নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে আরো অনেক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের একটি অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে তাদের উৎসাহী হয়ে পড়া দুঃখজনক। কারো পেশাদারিত্বের ওপর তার ব্যক্তিগত পছন্দের পোশাকের প্রভাব থাকুক বা না থাকুক- এটি নিয়ে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা মেনে নেয়ার মতো না।’

বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিচার বিভাগের একজন প্রতিনিধি একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, একজন হিজাব পরা নারী তার পোশাকের কারণে সাক্ষী বা তৃতীয় পক্ষের কারো বিরক্তি কিংবা ক্রোধের কারণ হতে পারে। সালসিকা বলেন, ‘বিষয়টিকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? বিরক্তি কিংবা ক্রোধ বলতে কী বুঝায়? আসলে আমার পোশাক তাদের বিরক্তির কারণ এজন্য যে এই পোশাক প্রমাণ করে, আমি একজন বসনীয় মুসলিম।’ এ ধরনের সিদ্ধান্তকে অবিশ্বাস্য বলে বর্ণনা করেন তিনি। সালসিকার মতে, সমস্যাটি যারা হিজাব পরে তাদের নয়। যারা এই পোশাকটি দেখে বিরক্ত হয় তাদের। 

বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোর আইনজীবী দালিদা বুরজিক গত সপ্তাহে গণমাধ্যমকে জানান, হিজাব নিষিদ্ধ হওয়ার পর আদালতে হিজাব পরিহিতা এক নারী কর্মকর্তাকে বিচার বিভাগীয় সচিবালয়ে বদলি করা হয়েছে। বিচার বিভাগের সভাপতি মিলান তেগেলতিজা বিষয়টিকে ‘বিদ্যমান আইনের বাস্তবায়ন’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন করে কিছু করিনি। আমরা শুধু বিদ্যমান আইন কার্যকরের নির্দেশনা দিয়েছি। যদি কেউ মনে করে আইনটি ঠিক নয় তবে তার পার্লামেন্টের দ্বারস্থ হওয়া উচিত।’

সালসিকা জানান, ২০০৩ সাল থেকে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাতে ধর্মীয়, রাজনৈতিক কিংবা জাতীয় সখ্য প্রকাশ করতে পারে- এমন কোনোকিছু আদালতে প্রকাশ না করতে একটি আইন আছে। তবে এর আগ পর্যন্ত আইনটি কেউ কার্যকর করার চেষ্টা করেনি। তেগেলতিজা অবশ্য মনে করেন, বসনিয়া একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। আর একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশে সবকিছুই ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া উচিত। বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো, যেগুলো জনগণের অধিকার ও স্বার্থ নিয়ে কাজ করে।

তবে সমালোচকরা মনে করছেন, ‘ধর্মীয় প্রতীক’ কথাটি অস্পষ্ট এবং স্বৈরতান্ত্রিক। এ সিদ্ধান্ত ধর্মীয় স্বাধীনতা, জাতিসংঘের ঘোষণা পত্রের অধীনে সুরক্ষিত পরিবেশে কাজ করা, মানবাধিকার বিষয়ে ইউরোপীয় সম্মেলন এবং বসনিয়ার সংবিধানে ঘোষিত মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী।

গণতান্ত্রিক সমাজেও প্রয়োজনে মৌলিক অধিকারগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। তবে বসনিয়াতে এ ধরনের কোনো পরিস্থিতি দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেন দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক কমিশনের সভাপতি দেরমানা সেতা। তিনি বলেন, ‘যদিও এটাকে আপাত দৃষ্টিতে নিরপেক্ষ এবং সবার ওপরে সমানভাবে কার্যকর বলে মনে হলেও এর দ্বারা আসলে নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠিকে টার্গেট করা হয়েছে। অর্থাৎ, হিজাব পরিধানকারী শিক্ষিত নারীদের।’

বসনিয়ার সারায়েভো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন ফিক্রেট কারকিক তার মন্তব্যে বলেন, একজন ব্যক্তি তার ধর্মীয় আদর্শের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ পোশাক পরলে তার কখনোই নিরপেক্ষ এবং স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য বাধা হতে পারে না। ইসলামে বিশ্বাসী বিচারক এবং আইনজীবীরা মামলা ও রায়ের ব্যাপারে নিরপেক্ষ। কারণ তাদের ধর্ম তাদেরকে ন্যায় বিচারের শিক্ষা দেয় বলেও মন্তব্য করেন অধ্যাপক কারকিক।

২০১৩ সালের আদমশুমারি অনুসারে, বসনিয়ার মোট জনগণের অর্ধেকই মুসলিম। এর আগে সমাজতান্ত্রিক যুগোশ্লাভিয়ার ছয়টি রাজ্যের একটি ছিল বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। সমাজতান্ত্রিক শাসনামলে ধর্মকে সেখানে নিরাৎসাহিত করা হতো এবং ধর্মানুসারিদের ওপর নির্যাতন চালানো হতো। নব্বইয়ের দশকে যুগোশ্লাভিয়ার ভাঙন এবং সমাজতন্ত্রের পতনের পর থেকে কোনো প্রকার ভীতি ছাড়াই আবার ধর্ম চর্চা করার সুযোগ পায় বসনীয়বাসী।    

নতুন করে হিজাবের ওপর এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির বিভিন্ন শহরে শুরু হয়েছে আন্দোলন। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে হিজাবের পক্ষে একটি অনলাইন পিটিশন। ১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব হিজাব দিবস উপলক্ষে হিজাবের পক্ষে আন্দোলনকারীরা নিজেদের হিজাব পরা ছবি সামজিক মাধ্যমে পোস্ট করে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। হিজাব নিয়ে দেশটিতে এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম নয়। এর আগে ২০১২ সালে ইমেলা মুজানোভিক নামের এক নারী সেনা কর্মকর্তা হিজাব খুলতে অস্বীকার করলে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। 

ইউরোপ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে