Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 4.0/5 (1 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০২-০৪-২০১৬

জিকা ভাইরাস : ওদিকে আতঙ্ক এদিকে সংশয়

ওয়ারেছুন্নবী খন্দকার


জিকা ভাইরাস : ওদিকে আতঙ্ক এদিকে সংশয়

অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত শুধু ব্রাজিলে ৪০ হাজারের বেশি শিশু ‘ছোট মাথা’ নিয়ে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর দক্ষিণ আমেরিকায় ভয়াবহ আতঙ্ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘জিকা ভাইরাস’। গত বছর ব্রাজিলে নতুন করে জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর খোঁজ মেলার পর মাত্র চার মাসের মধ্যে বার্বাডোজ, বলিভিয়া, কলম্বিয়া, ডমিনিকান রিপাবলিক, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, ফ্রেঞ্চ গিনি, গুয়াতেমালা, গুয়াদেলোপ, গায়ানা, হাইতি, হন্ডুরাস, মেক্সিকো, পানামা, প্যারাগুয়ে, পুয়ের্তো রিকো, সুরিনাম ও ভেনিজুয়েলাসহ দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকার ২৪টি দেশ ও অঞ্চলে জিকা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে দ্য প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন। সম্প্রতি যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও জিকা ভাইরাস প্রবেশ করেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ।

সর্বশেষ ভারতের পশ্চিমাঞ্চল বিশেষত দেশটির কর্নাটক রাজ্যের রাজধানী বেঙ্গালুরু ও পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় শহরগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় থাকতে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বেঙ্গালুরুর চিকিৎসকরা বলছেন, এখান থেকে অনেক মানুষ দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণ করছেন। আর দক্ষিণ আমেরিকায় ইতোমধ্যেই ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে জিকা ভাইরাস। সে কারণে বেঙ্গালুরুসহ পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় শহর ঝুঁকিপূর্ণ।

বেঙ্গালুরু থেকে বাংলাদেশের দূরত্ব খুব বেশি নয়। কিন্তু জিকা ভাইরাসের প্রতিকার বা প্রতিরোধের বিষয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য তেমন পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি।

স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, জিকা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই। এর আগেও ইবোলা ভাইরাসের আক্রমন দেখা দেয়ার সময় বাংলাদেশে যথাযথ প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। এবারো নেয়া হয়েছে। তাই এ ভাইরাস সম্পর্কে আতংকিত হবার কিছুই নেই।

এ ব্যাপারে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, এই ইস্যুতে এখনো পর্যন্ত তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। তবে আগামীকাল মিটিং আছে। সেখানে কিছু সুপারিশ আসতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিরা কর্মরত। তাদের কারো মাধ্যমে যদি এ ভাইরাস দেশে ঢুকে পড়ে? এর জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কালকের মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। নবজাতকদের উপর আমাদের নজর রাখতে হবে। তবে আপাতত: আমাদের মশা থেকে দূরে থাকতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

জিকা ভাইরাসের বাহক এডিস এজিপ্টি মশা। এছাড়া যৌন সম্পর্কের মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ছে এ ভাইরাস। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের জেলাগুলোতে এডিস মশা বিস্তার রয়েছে। এছাড়া কোনো অভিবাসীর শরীর থেকে জিকা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায়না। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপ কি হওয়া উচিত? এমন প্রশ্নের জবাবে রোগতত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক চিকিৎসক ও গবেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জিকা ভাইরাস যেহেতু খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে সেহেতু এ ক্ষেত্রে সজাগ হওয়া জরুরি। বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে এ ব্যাপারে দেশব্যাপী সচেতনতা ছড়িয়ে দেয়ার সময় এসেছে। অভিবাসী বিশেষ করে জিকা আক্রান্ত দেশগুলো থেকে যেসব অভিবাসী দেশে ফেরত আসবেন তাদের রক্ত পরীক্ষা করা যেতে পারে। আর পাহাড়ী অঞ্চলগুলোতে মশা নিয়ন্ত্রণে আনতে জোড়ালো উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। 

মশাবাহিত এ রোগ মোকাবেলায় এরই মধ্যে দুই লাখ সেনা নামিয়েছে ব্রাজিল। সতর্কতায় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে। কলম্বিয়া, ইকুয়েডরসহ বেশ কয়েকটি দেশে দম্পতিদের ‘গর্ভধারণ’ পেছানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হুঁশিয়ারিতে শঙ্কায় পড়েছে চলতি বছরের অলিম্পিকও।

পূর্ব আফ্রিকার দেশ উগান্ডার অতি পরিচিত জিকা (স্থানীয় ভাষায় ‘বাড়ন্ত’) বনাঞ্চলে ১৯৪৭ সালে প্রথম এ ভাইরাসের সন্ধান মেলে। রকফেলার ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে উগান্ডা, আমেরিকা ও ইউরোপের বিজ্ঞানীরা ওই বনে তখন ‘পীত জ্বর’ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। গবেষণার এক  পর্যায়ে দুর্ঘটনাবশত’ বানরের দেহে নতুন এক অণুজীবের খোঁজ পান বিজ্ঞানীরা, যার নাম দেওয়া হয় ওই বনেরই নামে।

সন্ধান পাওয়ার সাত বছর পর নাইজেরিয়ায় প্রথম মানবদেহে এ ভাইরাস সংক্রমণের তথ্য পাওয়া যায়। এরপর তা ছড়িয়ে পড়ে পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলোতে। এরপর দীর্ঘ সময় পরপর দুই দফায় এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে এশিয়া ও মাইক্রোনেশিয়া অঞ্চলে। অবশ্য কখনোই এ রোগ এবারের মতো হুমকি হয়ে আসেনি।

জিকা ভাইরাসে সচরাচর মৃত্যুর ঘটনা দেখা যায় না। তবে এর লক্ষণও সবসময় স্পষ্ট থাকে না। প্রতি ৫ জন রোগীর মধ্যে একজনের মধ্যে হালকা জ্বর, চোখে লাল হওয়া বা কালশিটে দাগ পড়া, মাথা ব্যথা, হাড়ের গিঁটে ব্যথা ও চর্মরোগের লক্ষণ দেখা যায়। বিরল ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি গিলিয়ান-ব্যারি সিনড্রোমেও ভুগতে পারেন; এর ফলে সাময়িক পক্ষাঘাত কিংবা ‘নার্ভাস সিস্টেম ডিজঅর্ডারের’ মতো ঘটনা ঘটতে পারে। এ ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক বা ওষুধ নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিশ্রাম ও বেশি করে তরল খাবার খেতে পরামর্শ দেয়া হয়।

জিকা ভাইরাস সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে এসেছে নবজাতকদের নিয়ে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, গর্ভবতী মা জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তার অনাগত শিশুর মাথা স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট হতে পারে, মস্তিষ্কের গঠন থাকতে পারে অপূর্ণ। এ রোগকে বলে মাইক্রোসেফালি। এর ফলে আক্রান্ত শিশু ‘বুদ্ধি প্রতিবন্ধী’ হতে পারে; কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবিকশিত মস্তিষ্ক শিশুর মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। তবে জিকা ভাইরাস ঠিক কীভাবে গর্ভের শিশুর এই ক্ষতি ঘটায় তা এখনো উদ্ঘাটন করা যায়নি।

জিকা ভাইরাসের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সোমবার এ বিষয়ে সংস্থা জরুরি বৈঠকে বসে। সেখানে বিশ্ব স্থাস্থ্যের বড় হুমকি এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে একীভূত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়।

এতে বলা হয়, যেভাবে এ ভাইরাস দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে তাতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ভাইরাসের সংক্রমণে আক্রান্ত নবজাতকরা অপরিণত ব্রেন নিয়ে জন্মাচ্ছে। তাই ইবোলা নিয়ে যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছিল সেই একই রকম সচেতনতা সৃষ্টির এলার্ট জারি করেছে ডব্লিউএইচও।

এডিস এজিপ্টি ফলের রসেই জীবনধারণ করে। তবে ডিম পাড়তে মেয়ে মশার প্রয়োজন হয়- মানব রক্ত। ওই রক্তের মাধ্যমেই আক্রান্ত ব্যক্তির দেহ থেকে জিকা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে নীরোগ দেহে। এ প্রজাতির মেয়ে মশা দিনের বেলাতেও কামড়ায় বলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জিকার বাহক মশা এডিস জন্মস্থানের কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসে। ১০০ মিটারের বেশি উড়তে চায় না। স্বভাবে ‘অলস’ হলেও এ মশা ‘ভ্রমণপিপাসু’। যানবাহনে চড়ে পৌঁছে যেতে পারে কয়েকশ মাইল দূরে। এ  প্রজাতির মশা সাগরে ভাসমান কোনো নৌকায় ওঠার পর পুরো জীবনচক্র সেখানেই কাটিয়ে দিতে পরে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক মার্গারেট চ্যান জিকা ভাইরাসকে একটি ব্যতিক্রমী ইভেন্ট হিসেবে উল্লেখ করে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি অন্তঃসত্ত্বা নারীদের রক্ষা ও তাদের গর্ভস্থ শিশুদের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। বলেছেন, যে মশার মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে তার বিস্তার রোধ করতে হবে। তিনি অন্তঃসত্ত্বা নারীদের এ ক্ষেত্রে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। বলেছেন, যে এলাকা জিকা ভাইরাস কবিলত সেখানে সফর করা বিলম্বিত করতে হবে। যদি জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত এলাকায় কোনো অন্তঃসত্ত্বা থাকেন তাহলে তাকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। একই সঙ্গে এমন কিছু পরিধান করতে হবে যাতে মশার কামড় থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। বর্তমানে জিকা প্রতিরোধে কোনো টিকা বা ওষুধ আবিস্কৃত হয়নি। এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যবস্থা হলো এডিস জাতীয় মশা যাতে কামড়াতে না পারে সে দিকে লক্ষ্য রাখা। কারণ, এ মশার কামড়ের মাধ্যমে এই ভাইরাসের বিস্তার ঘটে।

ওয়েলমকাম ট্রাস্টের পরিচালক ড. জেরেমি ফারার বলেন, এখনও সামনে অনেক পথ। ইবোলার মতো এবার জিকা বিশ্বকে বিপন্ন করে তুলছে। বাড়ছে এই সংক্রামক ভাইরাস। এর আক্রমণে বড় মাত্রায় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

জিকা মোকাবেলায় ডব্লিউএইচওর গঠিত ‘জিকা রেসপন্স ইউনিটে’র জন্য বিশেষ তহবিল সংগ্রহের কথা গতকাল জানায় সংস্থাটি।

ডব্লিউএইচওর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ফরাসি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি সানোফি জিকা ভাইরাসের ভ্যাক্সিন আবিষ্কারে কাজ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। ভারত দাবি করেছে তারা জিকা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিস্কার করেছে। হায়দরাবাদের একটি গবেষণা সংস্থা জিকার টিকা আবিষ্কার করার দাবি করেছেন। তাদের এ দাবি সত্যি হলে, বিশ্বের প্রথম ‘জিকা টিকা’ আবিষ্কারের শিরোপা উঠতে চলেছে ভারতের মাথায়।

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে