Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.9/5 (30 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০১-২৯-২০১৬

‘বাঙ্গালির জঙ্গনামা’ ভনে তাজুল মোহাম্মদ

মহসীন বখ্ত


‘বাঙ্গালির জঙ্গনামা’ ভনে তাজুল মোহাম্মদ

কথাকোবিদ শওকত ওসমান কোথায় যেন বলেছিলেন, ’হিন্দুরা পাকিস্তানি হয় মরিবার পরে আর মুসলমান পাকিস্তানি হয় মরিবার তরে ।‘ তাঁর এই নসিহতের শানেনজুল খুব সরল । বেদাস্রিত সনাতনী হিন্দুরা স্বর্গবাসি হলে নামের আদ্যাক্ষরের কপালে রসকলির আদলে একখান চন্দ্রবিন্দু স্থাপন করাই শাস্ত্রবিধি। পাকসার জমিন পাকিস্তানের পতাকা-প্রতীকেও এরকমই অর্ধচন্দ্রের গহ্বরে একখান তারা খচিত।হিন্দুরা মরে গিয়ে স্বর্গবাসী হলেই কেবল চাঁদতারা ভূষিত হতে পারেন। পাকিস্তানের তেইশ বছরের গরল শাসনে হিন্দুদের আবহমানকালের বশংবদ  বাস্তুভূমির নাম দেওয়া হয়  শত্রুসম্পত্তি।বাঙ্গালি হিন্দুদের অস্তিত্ব হয়ে পড়ে জীবস্মৃত। ইতিহাসের এই পর্বে কেবল লাঞ্চনা আর পীড়নের কাহন।বৈষম্যের মহাজাল তৈরী হয় দূরারোগ্য ধর্মবিকারে।আর বাঙালি মুসলমানরা কেমন ছিলেন সে উপাখ্যান তো সকলেরই জানা।দ্বিজাতিতত্ত্বের পাখনা গজিয়ে সেই ছয়চল্লিশ সাতচল্লিশে ‘হাতমে বিড়ি মুখে পান লড়কেলেঙ্গে পাকিস্তান’ স্লোগান দেওয়া বাঙ্গালি মুসলমানরা সাধের পাকিস্তানি হয়েছিল একাত্তরে রক্তচক্ষু পাক-কাপালিক জল্লাদের শানিত খর্গ্বতলে বলির পাঠা হবার জন্যে।পাকিস্তানপর্বে বাঙ্গালি হিন্দু-মুসলমান সকলেরই ললাটলিখন শওকত ওসমান বিঘতখানেক সারগর্ব বাক্য দিয়েই চিত্রিত করে দিয়েছেন।

দ্বিজাতিতত্ত্বের অন্ধ বিদ্বেষ ও উন্মাদ ধর্মবিকারের হিংসা-উন্মত্ততায় জন্ম নেয় এক কপট রাষ্ট্র পাকিস্তান।পশ্চিম আর পূর্ব।আদতে পূর্ব-পাকিস্তান নামের আড়ালে আমরা হলাম বিবমিষার এক বিকলাঙ্গ জাতক।আপন ভাইয়ের বিরুদ্ধে ঘোরতর জাতিবৈরীতার বশে বাঙ্গালি মুসলমানরা সেই  সাতচল্লিশে কোনোরকম প্রজ্ঞাদীপ্ত এষণা ছাড়াই পশ্চিমের মনজুলে মকসুদটি পূর্ণ করেছিল কপট রাজনীতির কুহকের ভেতর ধর্মজিগিরের ক্রীড়নক সেজে।সেই অপরিনামদর্শীতার পালে হাওয়া দিয়ে দেশ ভাগ  করা হল মূলত বাঙ্গালির ভূখন্ডটিকে দু’ভাগ করে দিয়ে।পাকিস্তান নামের সেই গরল রাষ্ট্র গড়া যে বাঙ্গালির জন্যে সারবত্তা কোনো কামিয়াবি ছিলনা সেই সত্য বুঝতে আমাদের বেশিদিন সময় লাগেনি।কারন,ধর্মান্ধদের কোনো ধর্ম নেই।তারা প্রয়োজনে ঘৃণ্যৃ চতুরতায় ক্ষমতার লোভ আর লালসায় ধর্মীয় অন্ধ কুপমুন্ডকতার আত্মাভিমান দিয়ে সাধারন জনতাকে তাতিয়ে তুলে যেকোনো স্বার্থ-শিকারে।ফলশ্রুতিতে পাকিস্তানপর্ব্বে ধর্মান্ধতার তমসায় বিপর্যয় নেমে আসে বাঙ্গালির এই ভাঙ্গা-  বাংলায়।পূর্ববাংলার মানুষ পাকসার জমিনে পড়ে খাবি খায় অন্ধ তিমিরেই।ধর্মের গায়ে তখন দিব্যি শরিয়তি আসকান। নতুন মাত্রার প্রকৃ্তি-রসায়নে শাসন-শোষন-জুলুমের ছায়াপাত ঘটে বাঙ্গালির জীবনে।সর্বত্র বিপর্যয়ে বাঙ্গালির দিবাস্বপ্নের ঘোর কাটতে অনেক জল গড়িয়ে যায়।তেইশ বছর বাঙ্গালি করে দাসত্বের অন্নভোজন। দীর্ঘ তেইশ বছরের দিনযাপনের গ্লানি মুছে দিতে বাঙ্গালি জাতির জীবনে আসে একদিন একাত্তর।

আর সেই একাত্তরপরবর্তী বাঙ্গালিপ্রজন্ম আপন চোখে দেখেনি তারই লড়াকু পূর্বপুরুষের  সর্বব্যাপি  দীর্ঘ নয় মাসের জনযুদ্ধটির ভয়াবহতা।ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে বাঙ্গালির ভূঁইমাটি কাঁপানো সর্বগ্রাসী মুক্তিযুদ্ধে পাকি-দানবের নখরে আগ্রাসনে বিধ্বস্ত বাংলার বিরান চিত্রটি দেখেনি নতুন প্রজন্মের বাঙ্গালি।তাদের জানতে দেওয়া হয়নি প্রকৃত ইতিহাস।সেই ধর্ষিত ,পীড়িত প্রেতপুরী বাংলা তাদের কল্পনায়ও আসেনা আজ।সেদিন ছিল সারা বাঙলা এক রণাঙ্গণ।একদিকে অত্যাধুনিক প্রশিক্ষিত ও উন্নত অগ্নিশ্রাবী সমরাস্ত্রে সজ্জিত  পাকি-হায়েনার দল,অন্যদিকে বাংলার ঘরেঘরে দামাল মুক্তিসেনা।হাতে নানা সোর্স থেকে নিয়ে আসা স্বল্প সংখ্যক অনুন্নত অস্ত্র-থ্রিনটথ্রি রাইফেল,জংধরা গাদাবন্দুক।গোটা বাঙলার মাঠেঘাটে,ঘুপচিগলিতে মাত্র কয়েক ঘন্টার ট্রেনিং গ্রহণই ছিল প্রথমদিকের মুক্তিবাহিনীর আদতেই পুঁজি।আপন খুন ঢেলে স্বাধীনতা কেনার অমিত সাহস বুকে তাঁদের।দেশমাতৃকাকে দখলদার পাকহায়েনাদের নখর থেকে রক্ষা করতেই এই রক্তক্ষয়ী অসম জনযুদ্ধ।বাঙলার যত্রতত্র অস্তিত্বের এই লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ পাকবাহিনীর সমরসজ্জিত অবস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে বাঙালি ছাত্র-জনতা প্রারম্ভেই।প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়ে লড়াই করতে হবে- এই ছিল সাড়ে সাতকোটি বাঙালির প্রত্যয়।সেদিনের সেই অস্তিত্বের লড়াইয়ে তুফানের বেগে ঝাপিয়ে পড়তে কেউ কাউকে বলে দেয়নি,বাধ্য করেনি অনভ্যস্ত হাতে মারণাস্ত্র তুলে নিতে।ডাক এসেছে যেন- ‘জাগো বাহে,কোনঠে সবাই।‘ সারা বাংলা উথালপাথাল কাঁপছে তখন একজন বঙ্গসার্দূলের অগ্নীমন্ত্রে।বিষ্ণুচক্রের মত ঘূর্ণীচক্রে সেই ডাক টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায়, বাংলার অন্তরাত্মায় পৌঁছে যায়।বানের ঢলের মত তরতর করে নেমে আসে একাত্তরের কুরুক্ষেত্রে নানা বয়েসী ছাত্র-জনতা,কুলি,মুঠে-মজুর,মাঠে লাঙ্গল ফেলে কিষাণের দল।৭ই মার্চের রেসকোর্সের জনসমুদ্রে বজ্রনিনাদে গর্জে উঠেছিল বঙ্গবন্ধুর বজ্রকন্ঠ।সেদিন থেকে মিছিলে –মিটিঙ্গে-স্লোগানে মুখরিত সারা বাংলার অলিগলি,রাজপথ,গ্রামগঞ্জ,শহর-বন্দর।অশান্ত-উদ্বেল জনতা যার যা হাতে তাই নিয়ে শুরু করে সশস্ত্র জঙ্গের প্রস্তুতি।অন্যদিকে বর্বর পাক-হানাদার বাহিনী অত্যাধুনিক ট্যাঙ্ক,সাঁজোয়া বহরে মেশিনগানের ব্যারেল তাক করে আছে স্বাধীনতাকামী বাঙ্গালির বুকে।বাঙ্গালির হাড়মাংশ শোষণের টাকায় কেনা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল,কামান নিয়ে বাঙালি নিধনে প্রস্তুত ভীমদর্শন পাকপশুর দল।রাজাসনে বসেথাকা সামরিকজান্তা আলোচনার নামে কালক্ষেপণে অস্ত্র আর ঘাতক পাক-হায়েনা সেনার প্লাটুনগুলো আমদানি করতে থাকে গোপনে।বাঙ্গালিও বসে থাকেনা।যুদ্ধে অনবিজ্ঞ ছাত্র-জনতার সাথে যোগ দেয় বাঙালি পুলিশ-আনসার-ইপিয়ার প্রভৃতি।গড়ে তোলা হয় প্রতিরোধব্যুহ্ন।মরণপন জঙ্গের জন্যে প্রস্তুত হয় বাঙালি।

একাত্তরে বাঙ্গালির সেই বীরগাথা ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলব্যাপি দীর্ঘ নয় মাসের বাঙ্গালির জঙ্গনামা  তিলেতিলে লিপিবদ্ধ করেছেন একজন মুক্তিযুদ্ধপাগল চারন।তিনি তাঁর জীবনের নবীন যৌবনের প্রারম্ভ  থেকে মধ্যবয়েসের সারা বেলাটা তিলেতিলে লিপিবদ্ধ করেছেন বাঙ্গালির শ্রেষ্ট অর্জন মুক্তিসংগ্রামের ভেতর-বাহির,এর বিশালতা,সর্বব্যাপ্তি আর বিস্তারের সাতকাহন।মুক্তিযুদ্ধের নানা দিক উপজিব্য করে তিনি গড়ে তুলেছেন বাঙ্গালির ইতিহাসের ক্রান্তিকালের প্রামান্য দলিল,তথ্য-উপাত্ত।তূণমূল থেকে বিশ্বের যত্রতত্র যেখানেই আছে একাত্তরের বহুমাত্রিক বাস্তবতার একফোঁটা নির্জলা তথ্য সেখানেই ঐকান্তিক পরিব্রজ্যা তাজুলের।মুক্তিসংগ্রামের বহুধাবিস্তৃত মাত্রা তাজুল তাঁর একনিষ্ট অনুসন্ধানে পূর্ণাঙ্গ তথ্যপুষ্ট করে তুলেছেন।আমি নিশ্চিত,তাজুল মোহাম্মদ নামের সেই মুক্তিযুদ্ধের চারন তাঁর যাপিত জীবনের মধ্য থেকে পড়তি বেলাটাও যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ-এই চাষবাসই করে যাবেন,গোলা ভরে তুলবেন ফসল দিয়ে।একাত্তরে বাঙ্গালির ত্যাগ ও রাজ-ক্ষ্মতাদর্পের রক্তলুলোপ হিংস্র পাকি জল্লাদদের মারণাস্ত্রের মোকাবেলায় দামাল মুক্তিসেনার মরনপণ জঙ্গের প্রকৃ্ত বিবরণী একান্ত নিষ্ঠায় লিপিবদ্ধ করেছেন তাজুল।মুক্তিযুদ্ধ যে কোনো আষাঢ়ে গল্প নয় বা রাজায় রাজায় যুদ্ধ নয়,দখলদার রক্তচোষা পাকিদের জবরদখল থেকে ছাপ্পন্ন হাজার বর্গমাইলের প্রতিইঞ্চি ভূমিতে আপামর জনতার মুক্তির জঙ্গনামা যে এই একাত্তর-তাজুল বাঙ্গালির সেই নন্দিত কাহনই বিবৃত করেছেন।নবীন প্রজন্ম আসবে যুগেযুগে,তারা জানবে একাত্তর এসেছিল এই বাংলায় একদিন।তাজুল মোহাম্মদের সাতকাহন থেকে তারা মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপ্তি চাক্ষুষ করবে-দেখবে একাত্তরে মরছে মানুষ,পাকি জন্তুর অগ্নিসংযোগে দাউদাউ পুড়ছে তার পূর্বপুরুষের কুঁড়ে,ঘাতক পাক-হায়েনার দেওয়া অগ্নীতে প্রজ্জ্বলিত সারা বঙ্গভূমি পরিনত হয়েছে বিরান ধ্বংসস্তুপে।দানবের নৃসংশ হত্যাযজ্ঞে সারা  বেহুলা বাংলার মর্মন্তুদ আর্তচিৎকার,মৃত্যু,হাহাকার,মরাকান্না শুনতে পাবে তারা।দেখবে বিভীষিকা গ্রাস করে নিয়েছে বাংলার সমূহ ভূঁইমাটি,আকাশ,সারা সংসার। শুনবে রোদন আর্তমানবতারর।সিঁথির সিঁদুর মুছে যাওয়া হরিদাসী,ইন্দুবালা,সখিনা বেওয়ার হাহাকার যেন ভাসছে দেখবে সমুদ্রমেঘলা বঙ্গের বিসন্নবিঁধুর আকাশে।

তাজুল মোহাম্মদের মাঠঘাটের উপাত্ত খুব জরুরী হয়ে পড়ে যখন দেখি,পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতার দর্পে রাজ-প্রসাদভোগী একশ্রেণীর বর্ণচোরার দল একাত্তরের সত্যগুলোকে মুছে ফেলার জঘন্য প্রচেষ্টায় লিপ্ত হতে।যখন বাঙালি জাতির মুক্তিযুদ্ধের সকল অনুভুতিগুলোর গলা টিপে ধরা হয়েছে রাষ্টযন্ত্রের আনুকুল্যে,যখন জনমানষের স্মৃতি থেকে একাত্তরকে মুছে দিতে আবদ্ধ কারার বদ্ধ দুয়ারে  ধাতব কপাট  লাগানোর পালা,যখন সেনাপতি জিয়ার প্রসাদপুষ্ট হয়ে একাত্তরের হরেক কিসিমের মোনাফেক পর্দার অন্তরাল থেকে চলে আসে পটে,যারা ঘটিয়েছিল নির্বিকার চিত্তে ধ্বংশযজ্ঞ একাত্তরে,প্ররোচিত করেছিল পাকিদের স্বাধীকারকামী জনতা নিধনের নরমেধযজ্ঞ ঘটাতে এই বাংলায়।তারা চোরচোরে মাসতুতো ভাইবেরাদর কীর্তিনাশার দল আবার মাঠে নামে বাঙ্গালির মহৎ কীর্তি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অভিযাত্রাটিকে ঠেকিয়ে দিতে।যখন গহন আঁধারে নিমজ্জিত বাঙ্গালির বিরত্ব ও গৌরবের সকল ইতিহাস-ঠিক সেই শ্বাসরুদ্ধ বিপন্ন সময়টাতেই তাজুল একদিন প্রত্যন্ত পল্লীর কোনো এক বধ্যভূমির আখ্যান পুনরুদ্ধার করে নিয়ে আসেন।আমাদের নবীন যৌবনের দিনগুলোতে সিলেট  শহরের বন্দরবাজারের রেস্তোরা ‘নীরা’র সান্ধ্যকালীন আড্ডার আসরে বসে সেই আখ্যান আমরা পড়ি আর পুলকিত হই এই ভেবে যে,মাত্র ক’দিন আগেই আমাদের অস্তিত্বের উপর দিয়ে ঝড়ের মত  বয়ে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধকে আমরা বিস্মৃত হতে বসেছি।এই আত্মভোলা বাঙ্গালির স্মৃতি জাগাতে তাজুল তুলে নিয়ে আসেন একের পর এক বেদনার অর্ঘ।একাত্তরের দুর্যোগকালে বাঙালি যখন যুথবদ্ধ হয়েছিল স্বাধীনতার স্বপ্নে,তখন কিছু দেশীয় ধর্মধ্বজী কুলাঙ্গার দখলদার হানাদারদের প্ররোচিত করে বাঙালি নিধনে,তারা  অগনিত নারীদের তুলে দেয় হায়েনার খাঁচায়।বেশুমার গ্রামপল্লী উজাড় করে অগ্নীদাহনে।আগন্তুক পাকহানাদারদের কাছে বঙ্গভূমিটা ছিল অজ্ঞাত,দুর্বোধ্য।তারা জানতোনা কোথায় করতে হবে ধ্বংসযজ্ঞ,নির্বিচারে আগ্নেয়াস্ত্র ব্রাশ করে মারতে হবে মানুষ কোনখানে। কিন্তু সেইসব রাজাকার আলবদর আলশামস আর ফুলতলী কাউতলী তালতলীর মৌলানারা স্বাধীনতার স্বপ্নেভাসা বাঙ্গালিদের  হত্যার প্রকল্প নিয়ে আবাহন করে হানাদারদের।কোথাও কোথাও তারা নিজেরাই পাকিস্তানপ্রেমে মশগুল হয়ে নিজের হাতে মানুষ জবাই করার পূণ্য অর্জনে এগিয়ে আসে।আপন খায়েশে তুলে দেয় মা-বোনদের হানাদারদের পাশবিক নির্যাতনের নিমিত্তে।ধর্মের মর্দগুলো নিজেরাও করে বলাৎকার অসহায় অবলা বন্দিনীদের।তাজুল মোহাম্মদ গ্রামগঞ্জ মহল্লা চষেচষে এসব তথ্য লিপিবদ্ধ করেছেন শতশত।সাম্প্রতিককালে স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছর পর যুদ্ধাপরাধের দায়ে নরকের বাসিন্দা হয়েছে যে কসাই কাদের মোল্লা,সে ছিল এরকমই এক রক্তচক্ষু কাপালিক।সে নিজ হাতে বাঙালি কুরবানি দেবার রক্তনেশায় বীরদর্পে পাকসার জমিনে বিরাজমান ছিল একাত্তরে।কসাই কাদেরের যুদ্ধাপরাধ প্রমাণে ট্রাইবুন্যালকৃ্ত মৃত্যুদন্ড কার্যকরের পর মুক্তিযুদ্ধের জাতক এই বাংলার গ্রামেগঞ্জে ওয়াজ বয়ান করে বেড়াচ্ছে একশ্রেণীর ভন্ড মৌলভীর দল,তারা অশ্রুবির্সজন অভিনয় করে মানুষকে তাতানোর কসরৎ করছে এই বলে যে,আল্লামা শফী তেতুলুল্লা হুজুর নাকি খোয়াবে দেখেছেন কামেল কসাই কাদের মোল্লা নবির পাশে দাঁড়িয়ে আছে।নাউজুবিল্লাহ!বাঙালি  মুসলমানের বিষম লজ্জা যে,এই কুফরি কালাম টুপিদাড়ির বর্মপরিহিত একশ্রেণীর পাপেট মৌলভীর দল ইসলামের নামে সারা দেশে ধর্মসভা করে প্রচার করে যাচ্ছে। মানুষ কাঙ্গালের মত শুনছে কুলাঙ্গার মওদুদীর প্রেতাত্মাদের চতুর বক্তব্য।দ্বিজাতিতত্বের বিষের বটিকা সেবন করিয়ে এভাবেই বাঙালি মুসলমানদের আত্মপরিচয় বিস্মৃত করানোর মহড়া শুরু করা হয় পাকিস্তান-আন্দোলনের মোড়কে।বাঙালি মুসলমান যে অহাবী-মওদুদীর কোনো কুটুম্ব হয়না এই সত্যটা ভুলিয়ে দেওয়া হয়।বঙ্গের মুসলমান মধ্যযুগের সেকুলার সুফিসন্ত গৌস-কুতুবের উত্তরাধিকার।তাপসি রাবেয়া বশরী, ‘আনাল হক’ বলা মনসুর হাল্লাজের  গল্পে বিমোহিত বাঙালি মুসলমানদের ভুলিয়ে দেওয়া হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির স্বভাবসুলভ ঐতিহ্য।পঁচাত্তরের কালো অধ্যায়ের মাহেন্দ্রক্ষণে স্বাধীনতার পর আত্মগোপনে গর্তে লুকিয়ে থাকা এইসব বর্ণচোরা ধর্মধ্বজীরা  শীতঘুম থেকে বেরিয়ে আসে ক্ষুধার্ত গোক্ষুরের মত।দীর্ঘ তিনযুগেরও অধিক  সময়ব্যাপি তারা ছানায়পানায় লতায়পাতায় রক্তবিজে ছড়াতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের সেকুলার বাংলায় কচুরিপানার মত দুষণ বিস্তারে।দুষ্ট-রাজনীতিকচক্র এইসব আঁধারের বাসিন্দা চামচিকা আর  গন্ধমুষিকদের আলোতে বেরিয়ে নানা বর্ণে ক্যামোফ্লেজ হবার সুযোগ করে দেন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়া।তিনি এদের জন্যে দয়াময় অবতার হয়ে আসেন বাংলাদেশের রাজনীতির মঞ্চে।তিনি যেন মুক্তিযুদ্ধের কেউ নন।জিয়া  মসনদে রাজাধিরাজ হয়ে আসেন তাঁর আঁখিকোঠর নিকষ কালো চশমায় আড়াল করে দিয়ে।যেন তাঁকে মনে নাহয় একাত্তরের কেউ তিনি,যেন দেখতে অবিকল পাকি সামরিক জান্তার পদাঙ্ক অনুসারী পরম কুটুম্ব একজন।তখনও তাঁর পদযোগে সৈনিকের ভারি বুট।সেই ভয়ঙ্কর বুটে দর্পিত আওয়াজ তুলে সারা দেশের মাঠঘাট চষে বক্তব্য দিয়ে বেড়াচ্ছেন আর কুদাল দিয়ে যত্রতত্র খাল খননের ধুম লাগিয়েছেন।তারপর মঞ্চে চড়ে বলতে শুরু করেন, ‘আপনারা গরু......আপনারা ছাগল...মাঠে চরাবেননা...।‘ আমরা মুক্তিযুদ্ধদেখা নবীন যুবার দল বক্তার কথার আসল মহিমা কিছুই ঠাহর করতে পারিনা।প্রতিটা শব্দ ‘গরু’ ‘ছাগল’ ‘মাঠ’এমন কায়দায় টেনে সঙ্গীতের মত করে উচ্চারণ করতেন অনেকখানি সময় খর্চা করে তখন নিজেকেই ‘গরু’ ‘ছাগল’ ‘মাঠ’ ইত্যাকার অভিধার প্রতিরূপ বলেই ভ্রম হত আমাদের।একটিবারও জিয়া বলতেননা যে, ‘আসুন,যে হাত দিয়ে রাইফেল ধরে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি সেই হাত দিয়েই রোপন করি ধানের চারা।‘ না, কখনো জিয়া মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেননি।মুক্তিযুদ্ধ যেন জেনারেল জিয়ার কাছে দূর গ্রামের বেগানা ভাসুরের মত। মুক্তিযুদ্ধের নাম মুখে নেওয়া যেন পাপ।মনে পড়ে,সিলেটে প্রথম আসেন জিয়া ফেঞ্চুগঞ্জ দিয়ে পায়ে হেঁটে।শতশত আমলা,পাইকপেয়াদার দঙ্গলের ভেতর দিয়ে রামধুম করে আসেন জিয়া।মৌলভীবাজারের মহকুমা প্রশাসক বেচারা নধর আমলা-ছন্দেছন্দে মিলিটারী তরিকায় জেনারেল জিয়ার সাথে হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ হৃদবৈকল্যে  ধপাৎ হয়েছেন শুনলাম।শহরের উপান্তে সিলামের মাঠে সভার আয়োজন।শহর আর শহরতলির সবগুলো  শিক্ষাকেন্দ্র থেকে ট্রাকবোঝাই আমরা কুরবানীর পশুর মত গিয়ে হাজিরা দেই সিলাম মাঠে।মফস্বল থেকে সারা শ্রীহট্র-জাহানের চেয়ারম্যান,মেম্বার সাহেবানরা থৈথৈ করছেন শীতঋতুর আরামদায়ক দুপুরিয়া রোদের সাথে মাখামাখি করে।আমাদের এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বার সাহেবরা আমাদের পেয়ে পরম কুটুম্বের মত চা-মিষ্টি,সিঙ্গাড়া,জাম্বুরার চাটনি ইত্যাদি দরাজ হস্তে কিনে দিয়ে সমাদর করেন আর আসরের মধ্যমনি জিয়াউর রহমানের স্বরে গলা মিলিয়ে বলতে থাকেন, ‘তোমরা  হলে দেশের  ভবিষ্যৎ,তোমরা যুবকরা হলে দেশের স্বপ্ন।’ আমরা পুলকিত হই আদরে-সোহাগে-আপ্যায়নে।কিন্তু পরক্ষণে আমরা মুক্তিযুদ্ধ গায়-সওয়া আর গায়-মাখা নবীন যুবকের দল  নিজেদেরকে আবিষ্কার করি  শূন্যতার তেপান্তরে।যে স্লোগান শুনলে আমদের রক্ত ছলকে উঠতো,উদ্দাম পেশিতে বাজতো অমিত বিক্রমের তেজ।সেই  ‘জয় বাংলা’ আমরা বিস্মৃত হই।হারিয়ে ফেলি দুর্দম-দুর্মদ শোণিতে ঝংকৃত দ্রোহের সঙ্গিত।হাহাকারের গহ্বরে আমরা তখন এক বিপন্ন স্যাড জেনারেশন!আমরা  যেন চকিতে ভুলে যাই যুদ্ধবিজয়ের অহংকার।অথচ সেই আমরাই দেখেছিলাম জনতার অদম্য স্বাধীনতার স্পৃহা।দেখেছিলাম ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সেই সময়ে বাঙ্গালির স্বাধীনতার স্বপ্নবীজটি প্রচন্ড প্রাণশক্তিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।টগবগ করে ফুটছে দেশ নিরন্তর।সাড়ে সাতকোটি জনতার গায় লেগেছে সেই জ্বলন্ত চুল্লির তাপ।স্বাধীনতা অর্জনের দর্পিত উত্তেজনা ছিল রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে অপার প্রাণশক্তির আধার।অথচ সেই স্ফলিংগের আলো নিবে গেল,একাত্তরে বাঙ্গালির মহামিলনের স্রোতে সকল মুক্তির  আকাঙ্খা যেন ভারাক্রান্ত হল দীর্ঘশ্বাসে।এখনও মনে আছে সেদিন রাতের নৈকট্যলগ্ন আমি নদী সুরমার মৃদু টাঙনের জলে আকাশগঙ্গায় নক্ষত্রের বিভ্রম  নিয়ে কবিতা লিখেছিলাম।সেই মাঠে তাজুল মোহাম্মদের সাথে দেখা হয়েছিল কিনা মনে করতে পারিনা।তবে সান্ধ্যরতির ‘নীরা’য় আমাদের দেখা হয় প্রায়ই।সিলেট শহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের হরেক পৌঢ়,যুবা,নবীনের নিয়মিত আড্ডা বন্দরবাজারের দুতলার চিলেকোঠাটিতে। আত্মমগ্ন এক যুবকের গলায় ঝুলানো চিরসঙ্গী একখান ক্ষৌমবস্ত্রের ঝুলি। ভেতরে বাদামি কাগজের খাম আর খামের ভেতরে পরম যত্নে রক্ষিত প্রত্যন্ত পল্লীর কোনো বধ্যভূমির  প্রত্নসংবাদ। সেই থেকেই পথে নেমেছেন তাজুল মোহাম্মদ একাত্তরে বাঙ্গালির ত্যাগ ও গৌরবের মনিমুক্তো কুড়োতে।

তখন ভাবতে পারিনি যে,দুই যুগেরও অধিককাল পরে একদিন তাজুল মোহাম্মদের ‘কুরুক্ষেত্রী   সেনা ১৯৭১’ বইটি পড়তে পড়তে অকালে ঝরে যাওয়া একজন বারীর কথা মনে পড়ে যাবে আমার। আমাদের চেয়ে বছর কয়েকের বড় ছিল সে।বিধবা মাকে একলা  ফেলে সে মুক্তিযুদ্ধে চলে যায়।অধ্যক্ষ আব্দুল আজাদ চৌধুীর দলে যোগ দিয়ে বেশ কয়েকটি অপারেশনে অংশ নিয়েছে বারী ভাই।স্বাধীনতার পরে স্কুলের একটি নাটকের মহড়ায় আমার সাথে পরিচয় হয় তার।পরে জানতে পারি আমার বন্ধু  আশরাফুল আলম বাবুলের চাচাত ভাই সে। একদিন সে পকেট থেকে বের করে একটা ভোলা গ্রেনেড দেখায় আর ভয় দেখিয়ে বলে যে,গ্রেনেডটি চার্য করে আমাকে মেরে ফেলবে।ভর্তা হয়ে যাব আমি।তাচ্ছিল্যে মৃদু হেসে আমি মনেমনে বলি,কাড়িকাড়ি গ্রেনেডবোঝাই  খাকির ছালা কাঁধে ঝাকেঝাকে মুক্তিসেনা দেখতে দেখতে চোখ ছানাবড়া হয়েছে আমার।আর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে ইছড়েপাকা এই আমি,আমাকে এইসব পঁচা ভোলা বারুদের গ্রেনেড দেখিয়ে লাভ নাই।ভয় পাইনি দেখে বারী ভাই খুব দুঃখ পেয়েছিল।সবাই জানতো,বিধবা মায়ের একখানমাত্র নিধি এই বারী এক বকে-যাওয়া যুবক,তার কোনো  বৈষয়িক স্বপ্ন নেই,আকাঙ্খা নেই।কিন্তু আমি তাকিয়ে দেখেছি একআকাশ স্বপ্নভরা একজোড়া চোখের তারায় তার দূর আকাশে যেন আলোর দীপ্তি।আশ্চর্য একজোড়া মায়াবী চোখ  ছিল তার।কোথায় যেন আগুনের ফুলকি জ্বলছে মণিকোঠরে।এমন  দ্রোহের অগ্নি তাকে মুক্তিযুদ্ধে টেনে নিয়ে গিয়েছিল বুঝি সদ্য যৌবনে।সম্ভবত চব্বিশ কি পঁচিশ বছরের যুবক বারী নাকি একদিন মায়ের হাতেই মরে যায়  ভেদবমিতে কি হৃদবৈকল্যে।পঁচাত্তরের পরে একদিন গবীন্দবাটী বাজারে একজন মুক্তিযোদ্ধা এক রাজাকার দ্বারা হঠাৎ প্রহত হবার কথা শুনতে পাই।খোঁজ নিয়ে জানলাম সে আমাদের বারী ভাই।স্বাধীনতার প্রাক্কালে হিন্দুদের ভূঁইমাটি জবরদখল ও লোটতরাজের অভিযোগে এই রাজাকারটিকে বারী ধরে নিয়ে গিয়েছিল রাজনগর ক্লাবে মুক্তিযোদ্ধা-ক্যাম্পে।সেকথা ভুলেনি এই কুটিল রাজাকার।একাত্তরের দানবদের প্রতিশোধ নেবার সময় চলে এসেছে তখন।বদলা নেবার পালা।মওকা পেয়ে সেদিন একজন মুক্তিযোদ্ধাকে প্রহার করতে উদ্যত হয় সে।বাজারের লোকজন আটকায়।আচম্বিৎ এই ঘটনায় তড়িতাহত বারী নাকি ঝাড়া দশঘন্টা একটি চেয়ারে নির্বাক বসে থাকে।একটা কথাও কারো সাথে বলেনি সে।মনের ভেতরে বুঝি পরাজয়ের গ্লানি তাকে দীর্ঘ প্রহর কয়েদ করে রাখে।ঘটনাটির পর বারী ভাইয়ের সাথে আমার আর দেখা হয়নি কোনোদিন।সেদিনের পর কি তার চোখের তারায় আলোর ফুলকি আমি আর দেখতে পেতাম!এই পরাজয় এই বিপর্যয় কি মুক্তিযোদ্ধা বারীর একার?তাজুল  মোহাম্মদের ‘কুরুক্ষেত্রী সেনা ১৯৭১’ বইটি পড়ে বারীর কথা খুব মনে পড়ে আর একটি অশোক তরুর সৌধতে বারীকে জিইয়ে রাখার স্বপ্ন আমাকে গ্রাস  করে তখন থেকেই।সেদিন থেকেই  তাজুল মোহাম্মদ ও দ্বিজেন শর্মা-এই দুইজনকে সঙ্গে  নিয়ে মজিদপুর নামক একটা গ্রামের অকালে ঝরেপড়া একজন অখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা যুবকের মাটির সমাধীতে একটা অশোক তরু রোপনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করি আমি।দ্বিজেনদা নিশ্চয় এমন একজন টগবগে তাজাপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধার সমাধীতে নিজহাতে স্মৃতিবৃক্ষটি রোপন করার আহবান ফেলতে পারবেননা।কারণ,দ্বিজেন শর্মা’র লেখা রাশিয়ার সেই চাষীমাতার নিজ হাতে লাগানো পপলার তরুর স্মৃতিসৌধটি আমাকে প্ররোচিত করেছে স্বপ্নটি নির্মাণে।রাশিয়ার একটি প্রত্যন্ত গাঁয়ের একজন চাষীমা ছয়টি পপলার বৃক্ষ লাগান পথের পাশে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্রন্টে সেই মা একজন একজন করে ছয়টি পুত্র হারান আর ছয়টি জীবন্ত তরু দিয়ে গড়েন বিশ্বের শ্রেষ্ট স্মৃতিসৌধটি।রাশিয়ার চাষী বধুটির স্মৃতিসৌধটি আমাকে মোহিত করেছে।মনেমনে দিব্যি কেটেছি,ফের দেশে গেলে তাজুল মোহাম্মদের সাথেই যাব আর আমার স্বপ্নটি নির্মাণ করব।যেন আগামী দিনের মজিদপুর-গ্রামবাসী মহীরূহটির পত্রপল্লবের স্বননধ্বনিতে মহাকালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া এই মুক্তিসেনা বারীর যুদ্ধদিনের কথকতা শুনতে পায়।একজন বিধবা মায়ের একখানমাত্র নিধি হারানোর কান্না যেন শোনা যায় স্মৃতিবৃক্ষটিতে বায়ু তাড়নায়।চৈত্র-দুপুরের দাবদাহে বিষন্ন ঘুঘুরা যেন সেই বৃক্ষের ডালে বসে আকুল কন্ঠে গেয়ে যায় আমাদের বারীর যুদ্ধে যাবার সমস্ত কথা।‘কুরুক্ষেত্রী সেনা ১৯৭১’ বইটি দুশো উনচল্লিশ জন মুক্তিযোদ্ধার নিজস্ব তথ্যকথা ও আপন আপন হরেক চেতনার গল্প আর স্বপ্ন দিয়ে সাজিয়েছেন তাজুল।পড়তে পড়তে মনে হয়েছিল,আহা এই বইটিতে যদি বছর উনিশ কি কুড়ির  নবীন মুক্তিসেনা বারী ভাইয়ের চোখভরা স্বপ্নের বয়ান পড়তে পারতাম। কিন্তু তা কি সম্ভব ?একজন তাজুল মোহাম্মদের কি  লক্ষলক্ষ মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন বয়ান করার সাধ্যি আছ?তাজুল তবু বিন্দুতেই মহাসিন্দুর মহামিলন ঘটিয়েছেন।একাত্তরের লক্ষ দামাল মুক্তিসেনার মিলিত স্বপ্নের রক্তাক্ত মোহনাকে বারবার তাজুল ছুঁয়ে গেছেন।

মনে পড়ে, একালের জননন্দিত লেখক হুমায়ুন আহমেদের নাটকের টিয়েপক্ষী  ‘তুই রাজাকার ‘  বলতে শুরু করেছে কি করেনি,তাঁর আরেকটি নাটকের একটি চরিত্র মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নাম সংগ্রহে বেরিয়েছে কি বেরোয়নি,ঠিক এরকম বিপন্ন কালপর্বটিতে তাজুল আপন উদ্যমে নেমেছেন স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মযন্ত্রণার খোঁজে।এর বহুবছর পরে  হুমায়ূন আহমেদ লিখলেন ‘জোছনা ও জননীর গল্প ‘ নামের উপন্যাস।মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে এই উপন্যাসটি লিখে দেশমাতার ঋণ শোধের কথা হুমায়ূন বলেছেন বইটির ভূমিকায়।লিখেছেন,’প্রকাশিত হবার আগেই এই উপন্যাসের পান্ডুলিপি অনেককে  পড়িয়েছি।যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি তারা পড়ার পর বলেছে-উপন্যাসের অনেক ঘটনাই তাদের কাছে কাল্পনিক বলে মনে হচ্ছে,এরকমও কি হয়?......তাদের কাছে আমার একটাই কথা – সে বড় অদ্ভুত সময় ছিল।স্বপ্ন ও দুঃস্বপনের মিশ্র এক জগৎ।সুবই বাস্তব,আবার সবই অবাস্তব।আমি সেই ভয়ংকর সুন্দর সুররিয়েলিস্টিক সময় পার করে এসেছি।তার খানিকটাও যদি ধরে রাখতে পারি,তাহলেই আমার মানবজীবন ধন্য।‘ দেশী বিদেশী তিরানব্বইখানা বই ও মুক্তিযুদ্ধের দলিল-দস্তাবেজ ব্যাবহার করেছেন হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাসটির কথাবস্তু নির্মাণ করতে।সহায়ক গ্রন্থপঞ্জির তালিকায় তাজুল মোহাম্মদের দুখানা বইও রয়েছে।ঘটনাটার উল্লেখ করছি এজন্যে যে,’জোছনা ও জননীর গল্প’ নামের উপন্যাসটির  নতুন প্রজন্মের পাঠক অর্থাৎ যারা স্বাধীনতাযুদ্ধ দেখেনি নিজ চোখে,তাদের কাছে উপন্যাসের অনেক ঘটনাই কাল্পনিক বলে মনে হয়েছে এবং তারা প্রশ্ন করেছে,’এরকমও কি হয়?’ আপাতদৃষ্টিতে খুবই সরল একটি নির্দোষ প্রশ্ন।কিন্তু জাতির অস্তিত্বের প্রশ্নে বড়ই ভয়ংকর এই জিজ্ঞাসা।এই প্রশ্নটি সৃষ্টি করতে তিনযুগেরও অধিককাল ধ্যান ও দুষ্কর্মের কারিগরি করেছে স্বাধীনতাবিরোধী চক্রটি।আজ তারা মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকার করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে।সেনাপতি জিয়ার ক্ষমতা দখলের পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধকে আড়াল করার  মহড়া শুরু হয় আর  যুদ্ধাপরাধী হন্তারক আল-বদর রাজাকারদের মন্ত্রী বানিয়ে তাদের গাড়ীতে লালসবুজের পতাকা তুলে দিয়ে সেই অপরিনামদর্শী পাপের ষোলকলা পূর্ণ করেন জিয়ার বেওয়া বেগম খালেদা জিয়া।তারা সেকুলার বাংলায় আবার নিয়ে আসে ধর্মকে রাষ্ট্রের সংবিধানে।মুক্তিযুদ্ধের জাজ্বল্যমান ইতিহাস লোপাট করতে,জনযুদ্ধটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে মাঠে নামে বাংলাদেশবিরোধী চক্রটি।আপামর বাঙ্গালির স্বাধীকারের মরণপন লড়াই এই মুক্তিযুদ্ধকে এত অপমান বাইরের কেউ  করেনি,করেছে স্বাধীনতাবিরোধী এই দেশীয় ঘাতকচক্র পাক-হায়েনার বীজ রাজাকারা।সেই বিষের মন্ত্রটি ফুঁৎকার করে পরবর্তী প্রজন্মের অগনিত সর্পশাবক ফণাধর গোক্ষুর জন্ম দিয়ে সারাদেশ ছেয়ে ফেলেছে তারা।রাজাকার আলবদর হতে একাত্তরের আগে জন্ম নিতে হয়না।জনযুদ্ধের দুইযুগ পরে জন্ম নিয়েও চিন্তাচেতনায় কায়মনোবাক্যে নিরেট রাজাকার অগনিত।পাকিস্তানের গোলামি করার দাস্য মনোবৃত্তির মন এদের।মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে উল্টোরথে চালিয়ে এই ভয়াবহ  স্খলন,পতন দেশটির।আজ মধ্যযুগের কালাপাহাড় ঠাকুর কালাচাঁদ রায়ে ছয়লাব বাংলাদেশ।লক্ষকোটি রক্তবীজের হন্তারক জন্ম নিয়েছে।কথায়কথায় সেকুলার মানুষদের নাস্তিক অভিধা দিয়ে হত্যা করছে আজ।অপরাধ জায়েজ করতে বর্ণচোরা স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবিরা ধর্মানুভুতির সারিন্দা বাজিয়ে যাচ্ছে।মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দলিত সর্বত্র।দিব্যি ঢাকঢোল পিটিয়ে একাত্তরের ঘাতকদলের মুক্তিযুদ্ধ ও দেশবিরোধী বক্তব্য দিতে কুন্ঠিত হয়না আজ তারা।কারণ, ‘জেনোসাইড ডিনাইয়্যাল’ বিরোধী কোনো আইন আমাদের নাই।সদ্য স্বাধীন দেশের স্তপতিকে হত্যা করে আরো অনেক কিছুর সাথে সেই পথটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়।সেজন্যে নরকের কীট মুজাহিদ বলতে পারে,’এদেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি,যুদ্ধাপরাধী বলে কিছু নাই।‘ কসাই কাদের মোল্লা বলতে পারে,’কেউ সুন্দরীর লোভে ,কেউ ভারতের স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধ করেছে।‘ ইসলামিক ইউনিভার্সিটির আইন অনুষদের ডীন মাহবুবুল ইসলাম নামের প্রেতাত্মা বলে বেড়ায়, ‘যুদ্ধাপরাধী হতে হলে দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ হতে হয়।কিন্তু আমাদের এখানে যুদ্ধ হয়েছে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে।বাংলাদেশ সেই যুদ্ধের অংশ ছিলনা।একারণে বাংলাদেশে কখোনই যুদ্ধাপরাধী ছিলনা।‘ প্রেস ইন্সটিটিউটের সভাপতি আরেক নমরুদ সাদেক খান দাবী করে এই বলে যে,’একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধারাও যুদ্ধাপরাধ করেছে,বিচার করতে হলে তাদেরকেও বিচার করতে হবে।‘ সর্বোপরি বেগম খালেদা জিয়া শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মুক্তিযুদ্ধকে করেন বিতর্কিত ও তিরিশলক্ষ শহীদের আত্মাকে করেন অপমান।গনহত্যাকে অস্বীকার করা,এর তীব্রতা ও ব্যাপক বিস্তারের মাত্রা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ কিংবা অস্বীকার করার ক্ষেত্র তৈরি করে ধুম্রজাল সৃষ্টি করা একটি অপরাধ বটে।এই অপরাধটির আইনী নাম হল ‘জেনোসাইড হলোকাস্ট ডিনাইয়্যাল’।যেকোনো উপায়ে গণহত্যা ও ধ্বংযজ্ঞকে অস্বীকার করা একটা অপরাধ।মুখচোরা মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা এইসব কন্টোভার্সিয়াল যুক্তি দিয়ে যুদ্ধাপরাধকে হালাল করতে গিয়েই এই গর্হিত অপকর্ম করে থাকে।জার্মানী,বেলজিয়াম,ফ্রান্স,হাঙ্গেরী,চেক-রিপাবলিক,অস্টিয়া,রুয়ান্ডাসহ ষোলটি দেশে এই আইন চালু করা হয়েছে।বাংলাদেশে যদি এই ‘ডিনাইয়্যাল ল’টি করা হয় তাহলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাজুল মোহাম্মদ ও অপরাপর মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের অক্লান্ত শ্রমের প্রাথমিক সাফল্য বিবেচিত হতে  পারে।তাজুল যখন গণহত্যা ও ধংশযজ্ঞ নিয়ে প্রাণনাশের হুমকি উপেক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধ অনুসন্ধানে ব্রতী তখন কেহ কল্পনাও করতে পারেনি যে দীর্ঘ সময় রাহুক্রান্ত বেদনার কাল অতিক্রান্ত করে একদিন ঘাতকের গর্হিত অপরাধের বিচার হবে।কিন্তু ইতিহাসের চাকা আজ আপন গতিতে যেন ফিরে এসেছে।তাজুলের এপর্যন্ত যাপিত জীবনের সারাবেলা এই যে নিরন্তর অনুসন্ধানব্রত ও অব্যাহত পরিব্রজ্যা ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে প্রায় অর্ধশত গ্রন্থ রচনার সার্থকতা এখানেই।মুক্তিযুদ্ধের নানা দিক নিয়ে তাজুলের অনন্য গবেষণাগ্রন্থগুলো নতুন প্রজন্মের ব্যাপক পাঠকদের কাছে সহজলব্য করা খুব হিতকর হবে বলেই আমার ধারণা।নতুনদের জানাতে হবে একাত্তরে দেশীয় দোসরদের মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধের মাত্রা।তাহলে মাতৃহন্তা এইসব কুলাঙ্গার জল্লাদ কুশীলবগুলো যতই মেহেদীরাঙ্গা হোক,তখন চাঁদমামার দেশে এইসব মামাদের বদন-দেখা ভাগিনাদের সংখ্যা কমে আসবে।যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে পঁচাত্তরের পট-পরিবর্তনের পর থেকে গোটা জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ করে রাখার জন্য এর পেছনে মিথ্যে প্রোপাগান্ডা ও অপরাধ অস্বীকার করার বিপুল আয়োজন কসরৎ স্বাধীনতাবিরোধীচক্র করে যাচ্ছে দীর্ঘ দুই যুগেরও অধিককালব্যাপি।তাজুল তৃণমূলে হানাদার ও দোসরদের সংঘটিত গণহত্যা ও ধ্বংশযজ্ঞের বিবরণ লিপিবদ্ধ করে প্রকাশ করার দুঃসাহস দেখিয়ে পথিকৃতের মর্যাদা লাভ করেছেন সেই কবে।তাঁর ‘সিলেটে গণহত্যা’ বইটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় মাইলফলক হিসেবেই সুধীজন ও ইতিহাস-গবেষকদের কাছে সমাদৃত।মনে পড়ে, ‘সাপ্তাহিক স্বচিত্র সন্ধানী’ নামের একটি প্রতিনিধিত্বশীল জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত এই মর্মঘাতি আখ্যানমঞ্জরীর প্রতিটি কাহন আলোড়িত করে সারা দেশের পাঠকদের।
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের রূপসী  বাংলার বুকে অগনিত শহীদের খুনঝরা বধ্যভূমি অবহেলা-অনাদরে পড়ে আছে সবখানে।মহাকালের রোদনের মত সেসব বধ্যভূমিতে নিশিরাতে ঝরে পড়ে শিশিরের অশ্রুবিন্দু ,মেঘবালিকাদের অঝর কান্না।ফুটে বুনোফুল শহীদের রক্তের রংমেখে পাপড়িতে।সংখ্যাহীন শহীদের অস্থিমজ্জা মিশেযাওয়া বাংলার দুঃখিনী মাঠঘাট,গ্রামগঞ্জ,শহর-প্রান্তর ঢুরে তাজুল রচনা করেছেন যেন একাত্তরের মহাকাব্যের পংতিগুলো।বর্ণনা করেছেন কোথায় কোন নিভৃত শান্ত পল্লীতে ঘাতক পাকি দানব ও তাদের জানেমন্দ দেশীয় দোসর রাজাকার আল-বদরদের নির্মম হত্যালীলা,নিরীহ নিরস্ত্র মানুষ বলির উৎসব।কোথায় কোন শহর ও শান্ত নিস্তরঙ্গ জনপদ গ্রামপুঞ্জে জ্বলছে দাউদাউ দাবানল।চাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলব্যাপি বাঙ্গালির থোকাথোকা নিশ্চিন্দিপুরগুলো চাষার তনয় ভূমিপূত্রদের তাজা রুধিরে ভিজে গেছে।দিকবিদিক ছুটছে  আক্রান্ত মানুষ,ঘাতকের মারণাস্ত্রে বাণবিদ্ধ হয়ে মরছে নিরস্ত্র গ্রামবাসী।শতশত দূর্গা আর অপু হচ্ছে পিতৃহারা,স্বজনহারা।আদিগন্ত বেহুলা-বাংলায় মৃত্যুর মিছিল।সারা দেশটিতে তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পাকি দানবের দল ও হিংস্র নেকড়ের মত রাজাকার,আল-বদর।বাঙ্গালির রক্তে আর্তনাদে নিনাদে ভাসছে দেশ।তাজুল মোহাম্মদ একাত্তরের জটর থেকে মুক্তিপাগল মানুষের হাঁড়মাংশ দিয়ে গড়া সংখ্যাতীত আহুতির কাহন তুলে রেখেছেন তাঁর গবেষণাপত্রগুলোতে।মৃত্যুর মিছিল,আর্তনাদ আর পাঁজর কাঁপানো বিভীষিকায় ভারাক্রান্ত সেসব ত্যাগ ও আত্মাহুতির অনন্য ইতিহাস।

দ্বিজাতিতত্ত্বের এক অন্ধ রাজনৈতিক লড়াই ধর্মের নির্বোধ নিদান সেই পাকিস্তান আন্দোলনের নামে বাঙ্গালির দেশটিকে করে বিভক্ত।ধর্মীয় রাজনীতির নিগঢ় বাঙ্গালির মননে বিকশিত স্বাভাবিক মানবিক মানবজমিনটিকে করে অন্ধ আর মিথ্যে জাতিবিদ্বেষের ঘৃণায় ক্ষতবিক্ষত।বাঙ্গালি তখন বুঝতে পারেনি যে,বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে জাতীয়তাবাদের উন্মেষে বাঙ্গালির চেতনায় জন্ম নিয়েছিল সার্বভৌম বঙ্গের স্বপ্নটি,অখন্ড বঙ্গের নামে আত্মশাসনের সেই অহঙ্কারে ধাতস্থ হতেনাহতেই বাঙ্গালি ভাসে নতুন এক প্রবঞ্চনার পথে।পরিনামে ক্ষমতালোভী ধর্মব্যাবসায়ী রাজনীতিকদের আগ্রাসী হস্ত লক্ষলক্ষ মানুষকে করে ঘরছাড়া বাস্তুহারা।সাতচল্লিশে ধর্মবণিকদের প্ররোচনায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আপন মানুষের রক্তে রাঙ্গে মানষের হাত।পরবর্তীতে বাঙ্গালি মুসলমানের রক্ত ঝরে দেখতেনা দেখতেই দূরসম্পর্কের পাতানো গুনের ভাই পাকি পিশাচের বুলেটের তলে বায়ান্নতে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে।পাকিস্তান কায়েমের পর বাঙালি দেখে কালমেঘ ছেয়ে গেছে চারদিকে।ইসলামী সৌভ্রাতৃত্বের মায়াঘোর কাটতে সময় লাগেনি বেশী।দলন পেষন পীড়নে বাঙালি আবার জাগে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে । আরবী হরফে বাংলা প্রবর্তনের আকসার আস্ফালন রক্তে আগুন ধরিয়ে দেয় এই ভূখন্ডের মানুষের।মানুষ ইতিহাসের একটা বিশেষ লগ্নে ধর্ম নিতে পারে কিন্তু সংস্কৃতি বিকিয়ে দিতে পারেনা।বাঙ্গালির আত্মশাসনের স্বপ্নের জন্ম হয় ফের।একাত্তর বাঙ্গালির সেই জাগ্রত জাতীয়তারই প্রতীতি।স্বাধীকার অর্জনের বাঁধভাঙ্গা বানে বাঙ্গালি উজ্জীবিত হয় আর রক্তগঙ্গা বয়ে যায় প্রাচীনকালের গঙ্গাহ্রদি একাত্তরের এই বঙ্গে।ভূরাজনৈতিক মানচিত্রের বলয়ে বাংলাদেশের জন্মের প্রসবোন্মুখ যন্ত্রণার কান্না তাজুল মোহাম্মদ তুলে এনেছেন অগনিত মানুষের হৃদয়ের কুঠরিতে কান পেতে।একাত্তরের গনদুষমন আল-বদর,আল-শামস,রাজাকার ইত্যাকার কুলাঙ্গারদের পুনর্বাসন আর রাজনীতিতে এদের গাঁটছড়ায় আবার সেকুলার বাংলা কলুষিত ধর্ষিত হল পুনর্বার।নবীন রাষ্ট্রটিকে অজু দিয়ে কলমা পড়িয়ে পুতপবিত্র করে তোলা হয়।সংবিধানে বিসমিল্লা সংযোজন করে সেকুলার এই বাংলায় আবার ইসলামকে সর্বরোগহর বিশল্যকরণী বটিকা হিসেবে বিকিকিনি শুরু করে রাজনীতির নষ্ট ধর্মবণিকের দল।একাত্তরের  পাকপদলেহী দেশীয় অনুচরদের রক্ষাকবচ জেনারেল জিয়া পাকিস্তান থেকে ফিরিয়ে আনলেন বাঙালি নিধনের হোতা একাত্তরের পিশাচ গোলাম আজমকে।অগনিত বাঙ্গালির রক্তের আহুতিতে কেনা আর  লক্ষলক্ষ মা-বোনের ইজ্জত-বিকানো মুক্তিযুদ্ধের জাতক বাংলাদেশের নাগরিকত্ব এই কাপালিককে ফিরিয়ে দিয়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের অস্তিত্বের অবমাননা।দেশটির প্রসবযন্ত্রণার নিদারুন গল্পগুলো নিষিদ্ধ   চারদিকে তখন।একাত্তর বাঙ্গালিকে দিয়েছিল আত্মপরিচয়ের অবারিত বর্ণিল আকাশ,বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার মত মাটি।খুনঝরা স্বাধীনতা দিয়েছিল বাঙ্গালিকে মানবতার চাষযোগ্য একটা উর্ব্বর মানবিক ভূমি।যে মুক্তভূমিটির স্বপ্ন একাত্তরে হানাদার-অবরুদ্ধ ঘেরাটোপে বাস করেও বাঙালি দেখেছিল।পঁচাত্তরপরবর্তী বাংলায় স্বাধীনতালাভের অনন্য বোধটুকুর প্রকাশ কোথাও দেখা যায়না।মুক্তিযুদ্ধ শব্দটি কীএক গোপন হুলিয়ায় আক্রান্ত।যেন ঘোষণা করিল রাজ  সপ্তশত ঢোলে,যে লইবে মুক্তিযুদ্ধের নাম তারে দিব শুলে!কিন্তু সেই ঘোর দুর্দিন নিদানকালে আমাদের স্যাড-জেনারেশনের বলয় থেকে একজন তাজুল মোহাম্মদ ভাঙলেন সেই অচলায়তন।নবীন বয়েসী এই যুবকের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হল নতুন করে।তাজুল হয়ত উপলব্ধি করলেন,একাত্তরকে চিনলে বাঙালি নিজের জাতীসত্বার জন্মপ্রেরণাকে জানবে।দেশের জন্যে মানবতার মুক্তির জন্যে একাত্তরের ত্যাগ জাতির স্বপ্নের সিঁড়ি নির্মাণের পাথেয় হতে পারে আগামী দিনে।নতুন প্রজন্ম জাতির প্রসবোন্মুখ বেদনার চিৎকার শুনতে পাবে কান পেতে।সেদিন শতজলঝর্ণার বেগে এই ভূখন্ডের মানুষ জঙ্গে নেমেছিল স্বাধীনতার  আকাঙ্খায়।বাঙালি জন-জাতির হৃদস্পন্দনে মিশেথাকা একাত্তরের কীর্তিগাথা তাজুল কীর্তন করেছেন ঘাতকের বুটের তলায় পিষ্ট আর অগ্নিশ্রাবী বুলেটে ঝাঝরা বিপন্ন মানুষের অশ্রু ও রক্তের রংমেখে।পাক নরখাদক শকুনের নখর বাংলার প্রতিইঞ্চি ভূমিতে।ধমনীর শেষ রক্তবিন্দু বিকিয়ে শত্রুমুক্ত করতে হবে আবহমানকালের মমতাময়ী মা-মাতৃভূমির মাটি।সেদিন বাঙালি মুছে দেয় সাতচল্লিশের  ধর্মবিকারগ্রস্ত ঘৃণীত ইতিহাসের জঞ্জাল।সাম্প্রদায়িকতাদুষ্ট ধর্মনিগঢ় থেকে বেরিয়ে সকল পশ্চাদপদ মানবতাবিধ্বংশী চর্চা ও আরাধনার বিরুদ্ধে দাঁড়ায় বাঙালি সেদিন।যেন শতজনমের আত্মপরিচয়ে হয় উদ্ভাসিত ভূমিপুত্রের দল।মৌলবাদী রাষ্ট্রদশায় আবদ্ধ বাঙালি বন্ধীদশার শিকল ছিন্ন করে জাগে মুক্তির পথে।মধ্যযুগের  নিশিরাত্রে যেন গর্জমান নুরুলদীন হায়দরী হাঁক পাড়ছে ,ঘূর্ণীপাকে উথালপাথাল রব উঠেছে ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেবো’।দেহের শেষ বিন্দু খুন দিয়ে হলেও দেশমাতৃকার মুক্তি চাই ,চাই স্বাধীনতা।সেদিন এরকমই বাঙ্গালির প্রত্যয়।হানাদাররা কেয়ামত ঘটিয়ে দিচ্ছে সারা বাংলায়।মানুষ মারছে নির্বিচারে।মাংশাসী শেয়াল-কুকুরে খাচ্ছে মরদেহ বাঙ্গালির।হরণ করছে কৃষকের ভিটা থেকে গৃহবধু ,বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ,গ্রামগঞ্জের ষোড়শী বঙ্গবালাদের।পশুর মত করছে বলাৎকার ক্যাম্পে ক্যাম্পে,সেনাছাউনীতে,রাজাকারের আস্তানায়।চারলক্ষ বাঙালি নারী পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয় বন্যবর্বর পাকি আক্রমণে সহযোগী দেশীয় কুলাঙ্গারদের যোগসাজসে।এদেশী কতেক পীর-মাশায়েক,ধর্মবনিক মৌলভীর দল ফতোয়া দিয়ে জায়েজ করছে হানাদারদের পৈশাচিকতা ।তারা বলছে,যুদ্ধবন্দী নারীরা ইসলামী শরিয়ায় গনিমত।অতএব,ধর্মযোদ্ধা পাক-সৈনিকদের জন্যে এইসব নারীদের সাথে সহবাস হালাল করেছেন মাবুদে এলাহী।সৈনিক ভাইয়েরা পাকিস্তান রক্ষায় ইসলামের জন্যে যুদ্ধ করতে এসেছে।তারা তাদের নিজের নারী সঙ্গে নিয়ে আসেনি।আল্লাহ তাদের জন্যে কবুল করেছেন বন্দীনিদের।ধর্মযোদ্ধা সৈনিকেরা পূণ্যাত্মা,আল্লার পথের জিহাদী।তাদের খেদমতে বেহেস্তে রাখা হয়েছে হুরীর বাগান।যুদ্ধক্ষেত্রে গনিমতের বন্দীনিদের সাথে খানিক সহবত-সে আর এমন কি?সারা বাংলায় ভয়াল অরাজকতা।নরকের তান্ডব সৃষ্টি করেছে পাকি পিশাচের দল।পাশবিকতার তরাসে  মর্মভেদী গোঙানির আর্তি বঙ্গজুড়ে।হালের সিরিয়ায় বর্বর আইএস জিহাদী নামের নরপশুরা হাজার  হাজার নারীদের বন্দী করে আনছে।অগনিত মুমীনা ললনার দলও নাকি পূণ্যলোভে স্বেচ্ছায়  ধর্মজেহাদীদের পবিত্র যৌনজেহাদ কুশিশ করতে এসেছে। ইউরোপ,আফ্রিকা,মধ্যপ্রাচ্য,এশিয়ার নানা দেশ থেকে তারা এসেছে।আপন খায়েশে এসে বন্য এই হিংস্র-বরাহদের খাঁচায় আটকে গেছে জনমের মত।কী বীভৎস বলাৎকার অসহায় নারীদের করা হচ্ছে ধর্মের নামে,আল্লার নামে।দিনে পঞ্চাশজন আইএস নামের মর্দ শুয়োর মিলে ছিড়েখুঁড়ে ধর্ষন করছে একেকজন অবলাদের।পবিত্র কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে আইএস হায়েনারা নির্যাতিত নারীদের দিচ্ছে যৌনজেহাদ দানকারী মুমীনার মর্যাদা।মানবসভ্যতার ইতিহাসের চরম বীভৎসতা অবলোকন করছে গ্রহবাসী মানুষ আজ ধর্মের নামে।বাঙ্গালির একাত্তর ছিল এরকমই পবিত্র ধর্মের নামে গণহত্যা,নির্যাতন ও বলাৎকারের দুর্দিন দীর্ঘ নয়মাসব্যাপি।পীড়িত মানবতার কান্না গুমরে মরেছে।তাজুল তাঁর যাপিত জীবনের সারাবেলা সেইসব জঘন্য পাক জান্তাদের অত্যাচার ও নিপিড়নের স্বরুপ উন্মোচন করেছেন।দলিত মানবতার হাহাকার খোঁজে ফিরছেন একজন সত্যসন্ধানী  পরিব্রাজকের ধ্যানে।কান পেতেছেন একাত্তরে ক্ষতিগ্রস্থ বঙ্গের ইতিউতি।মুক্তিযুদ্ধ ছুঁয়ে গেছে সারা বাংলা,প্রতিইঞ্চি ভূমিতে রয়ে গেছে গভীর ক্ষতের দাগ।প্রতিটি অঞ্চল ও অসংখ্য মানুষ আর একাত্তরের সূর্যসন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের সেই সময়ের ঘটনাধারায় রয়েছে যুদ্ধাক্রান্ত সময়ের খন্ডখন্ড অবিচ্ছেদ্য নিবিড় সংযোগ।বৃহত্তর সিলেট থেকে শুরু করে বাংলার নানা প্রান্তের অনেকগুলো অঞ্চল নিয়ে তাজুলের মুক্তিযুদ্ধ গবেষণার অতুলনীয় ভাষ্যগুলো বাংলার মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে যাদুঘরের মর্যাদা লাভ করেছে।

তাজুল অসংখ্য বীরাঙ্গনাদের জানেন যাদের নামপরিচয় প্রকাশ করেননি।একথা আমার সাথে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তিনি জানিয়েছিলেন একদিন।পাশবিক নির্যাতনের শিকার এইসব অবলা নারীরা ভয়ঙ্কর সেই দুঃস্বপ্নের মত লাঞ্ছনা ও ভয়াল যন্ত্রণার স্মৃতিতে তাড়িত জীবনভর।নিকৃষ্ট পাকিপশুদের বিকারগ্রস্ত যৌন পীড়নের শিকার বাঙালি বীরাঙ্গনারা এই কৃষ্ণ অধ্যায়ের গ্লানি ও হতাশার একাকিত্বে ক্ষতবিক্ষত।অবমাননা ও বন্যবরাহ পাকিদের আগ্রাসী নির্যাতনের স্মৃতিবিপন্নতা তাঁদেরকে আত্মশক্তিতে দাঁড়াতে দেয়না কোথাও।একাত্তরের নির্মম নির্যাতনের দুঃসহ স্মৃতির কাতরতা নিয়ে আমাদের সেইসব মা-বোনেরা কোনোরকমে জীবস্মৃত বেঁচেবর্তে আছেন সমাজের নানা স্তরে।আক্রান্ত নারীরা প্রকাশিত হতে চাননা।যেহেতু সমাজে বীরাঙ্গনাদের সন্মানে কোনো মানবিক নৈতিক দর্শন তৈরি হয়নি-এরকম পরিবেশে তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করা হবে আরেকবার নির্যাতিতাদের গ্লানির পীড়নে নিপতিত করার শামিল।আরেক প্রস্থ অপমান।তাজুল মোহাম্মদ এরকমই মনে করেন।স্বাধীন বাংলাদেশে সেইসব মা-বোনদের যোগ্য মর্যাদা দেবার ফুরসৎ হয়নি আমাদের।সদ্য-স্বাধীন দেশে বেগম ফজিলতুন্নেসা মুজিবের কল্যানে যে পুনর্বাসন কেন্দ্রটি গড়ে উঠেছিল সেই কেন্দ্রটিও ঝেটিয়ে বিদেয় করা হয়।মুক্তিযুদ্ধে বাঙ্গালির যত রক্তের অর্ঘ –সবকিছু মুছে দিতে হবে।প্রাচীনকালের গঙ্গাহ্রদি এই বঙ্গে একাত্তর এসেছিল,রক্তগঙ্গা বয়ে গিয়েছিল দেশটির আত্মশাসনের অধিকার ছিনিয়ে আনতে,একথা যেন প্রকাশিত নাহয়।ইতিহাসের গোপন কুঠুরীতে লুকিয়ে রাখ মুক্তিযুদ্ধের কথা।তাজুল মোহাম্মদ সেই বৈরী সময়টাতেই গুপ্তঘাতক হন্তারকদের উপেক্ষা করে অচেনা,অদেখা প্রান্তিক জনপদ চষে বেড়িয়েছেন,তুলে এনেছেন একের পর একেকটি বধ্যভূমির মর্মান্তিক হত্যালীলার বিবরণী।দিনের পর দিন তাজুল করেছেন পথকে ঘর।প্রাণহরণের বার্তা যখন আর উপেক্ষা করার উপায় নাই তখন পরবাসী হন।বিভূঁই বাসেও পরিযায়ী তাজুল গুটিয়ে নেননি নিজেকে।ইউরোপ,আমেরিক,মধ্যপ্রাচ্য,এশিয়ার নানাদেশে খুঁজতে গিয়েছেন বাঙ্গালির মুক্তিযুদ্ধকে।সংশ্লিষ্ট মানুষজন,বিদেশী সাংবাদিক ও মিশনগুলো,পরবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ধর্ণা দিয়েছেন যদি কোনো জরুরী তথ্য-উপাত্য পাওয়া যায়।বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাকে বিস্মৃতির অতল থেকে তুলে এনেছেন তাজুল,শুনিয়েছেন তাঁদের প্রাণহরা যুদ্ধদিনের গল্প।মুক্তিযুদ্ধের দিগন্তপ্রসারী ব্যাপ্তির স্বরূপ এইসব কিংবদন্তীর দামাল মুক্তিসেনাদের ত্যাগ আর মহিমার পরতেপরতে লুকিয়ে রয়েছে।তাজুল ঠিকই খুঁজে বের করেছেন তাঁদের অলিক বীরত্বের স্মৃতিগুলো।আগামীদিনের গবেষকদের জন্য তাজুলের যত্নকৃত প্রায় অর্ধশত বই বিকৃ্তির জটাজাল ছিন্ন করে বাঙ্গালির মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার স্বরূপটি উন্মোচনে বিশ্বস্ত রাজসাক্ষ্যের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে নিশ্চয়।

        মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রাশিরাশি বই এখন বাজারে।সম্ভবত প্রকাশনা সহজলব্য বিধায় প্রায় প্রতিটি অঞ্চল থেকেই মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে অনেক বই বেরুচ্ছে প্রতি বছরই।কেবল মুক্তিযুদ্ধ কেন,হরেক বিষয়ে বই প্রকাশের হিড়িক। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের প্রতিনিধিত্বমূলক বই হিসেবে চালু হয়ে গেছে এরকম বইগুলো লিখেছেন সামরিক বাহিনীর নামজাদা মুক্তিযোদ্ধারা।সেগুলোতে মাইক্রস্কোপ দিয়ে আকাশ-পাতাল-অন্তরীক্ষ-মর্ত্যব্যাপি যে জনযুদ্ধের ব্যাপ্তি সেই মুক্তিযুদ্ধটিকে পাওয়া যায়না।মুক্তিযুদ্ধের বহিরাবরণে সামরিকীকরণের প্রবনতা সর্বত্র।বাংলার ভূমিপুত্র চাষার তনয় দামাল মুক্তিসেনাদের প্রবল বিক্রমের গল্প শুনতে পাইনা যেন।মুক্তিযুদ্ধ সেখানে বিকলাঙ্গ।আর স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের অনুঘটক যারা নানা বর্ণে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিতে লিপ্ত সেই তারা ইনিয়েবিনিয়ে শতকন্ঠে মেজর জিয়ার একটা ঘোষণাপত্র পাঠকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধের হাটে বিরাট বানিজ্যের পসরা বসাতে দেখা যায়।বুদ্ধিজীবি নামধারী একঝাক বর্ণচোরার আবির্ভাব ঘটে এবং তারা মুক্তিযুদ্ধকে হরেক রঙ মাখিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করতে সুদূরপ্রসারি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।সেদিন জনযুদ্ধটির সঠিক ইতিহাস তো কল্পতরুর নামান্তর।স্বাধীনতাকে বলা হল ভারতীয় অনুকম্পার ফসল। ’পঁচিশ বছরের গোলামি চুক্তি’নামে এক বানোয়াট কল্পকথার জিগির তুলে মুক্তিযুদ্ধের দুরন্ত চেতনার বাতিটি নিবিয়ে দেবার সকল কসরৎ সরকারের ঠিকাদারিতেই সম্পন্ন হয়।তখন একাত্তরের পরাজিত প্রেতাত্মার দাপাদাপি আর উল্লাসে মুক্তিযুদ্ধকে ফিরে দেখার বা জেনোসাইড হলোকাস্টের মাত্রা বা ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যানের কোনো সুযোগ থাকেনা।এক অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা  মুক্তিযুদ্ধের  আসল স্বরূপ উন্মোচনে অন্তরায় হয়ে পড়ে।তাজুল মোহাম্মদ তবু দমে যাননি।শত বিকৃ্তির আচ্ছন্নতা ভেদ করে অন্তরাল থেকে জনযুদ্ধটির ব্যাপক বিস্তৃত অনুষঙ্গের নির্যাস আহরণে তাঁর কোনো ক্লান্তি নাই।চার দিকে ফেনায়িত মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ইয়াংকিচক্রের ক্রমাগত অপপ্রচারে এক নতুন বায়নার ঘনঘটা শোনা যায়। ‘মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা’ নাম দিয়ে নতুন বাতাবরণে বিতর্কের জন্ম দেওয়া হয়।বলা হয় মেজর জিয়া চট্রগ্রাম কালুরঘাট বেতার ভবন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে দিলেন।এরকম কথা কেবল অর্বাচীনরাই বলতে পারে।সত্যিটা হচ্ছে এই,একাত্তরের সাতাশে মার্চ ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’র জনক বেলাল মোহাম্মদ মেজর জিয়াকে আহবান করে নিয়ে এসে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাপত্রটি পাঠ করান।এর আগের দিন ছাব্বিশে মার্চ চট্রগ্রামের আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুল হান্নান  একই ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন রেডিওতে।একটি ঘোষণাপত্র পাঠের যদি এমনই মহিমা তাহলে তো মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক আব্দুল হান্নান এমপি সাহেব হবার কথা।তাজুলের মনে আছে কিনা জানিনা,বেলাল ভাই সিলেট রেডিওতে থাকাকালীন সময়েই বাঙ্গালির মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি অনবদ্য দলিল ‘স্বধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ বইটির বৃহৎ অংশটি লিখেন ও কাগজে প্রকাশ করেন।‘ইতিহীন ইতিবৃত্ত’ নামের সিলেটে মুক্তিযুদ্ধের একটি স্মারকগ্রন্থ বেরোয়। সে বইটিতেও বেলাল মোহাম্মদের বইটির একাংশ প্রকাশিত হয়।  জিয়া বেলাল ভাইকে একাধিকবার ফোন করেন লেখাটি পড়ে।আমার এখনও এই কথাটি মনে পড়ে যে,ক্ষমতার মসনদে বসে থাকা জিয়া ফোনে প্রশ্ন করেছিলেন,’আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি,চিনতে পেরেছেন আমাকে ?’এই ফোনালাপটি নিয়ে  অনেক হাসাহাসি করেছি আমরা বেলাল ভাই সমেত।মীরের ময়দান রেডিও ষ্টেশনে ,বেলাল ভাইয়ের বাসায় ও ভার্থখলার খান মঞ্জিলে অনেকবার প্রসঙ্গটি আমাদের হাস্যরসের যোগান দিয়েছে।তো গভীর সত্যটা এই,জিয়া সর্বোচ্চ ক্ষমতার শিখরে বসে নিজের সম্পর্কে এমন অর্বাচীন কথা ভাবেননি। ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ বইটি পড়লে এইসব তথ্য যেকোনো জন জানতে পারেন।প্রায় একই সময়ে আরেকটা ঘটনা খুব মনে পড়ছে আজ। তাজুল মোহাম্মদও নিশ্চয় ভুলে যাননি ঘটনাটা। সিলেট শহরে একটি মঞ্চে একাত্তরের পরাজিত প্রেতাত্মাচক্র পিরালী কাব্যনাট্য একখান মঞ্চস্থ করছে খুব ঘটা করে। কুশীলব সারা মঞ্চে দাপাচ্ছে আর আবেগ ঢেলে চিৎকার করছে ‘হে পৃথিবী নিরাময় হও !নিরাময় হও !’ বলে।আমরা তখন ক্ষ্যাপা বৈশাখের  শিলাঝড়ের বেগে ইট আর পাথরের ডায়লগ মঞ্চ তচনচ করতে ফিরিয়ে দিচ্ছি আর সমস্বরে চিৎকার করছি, ’তুই নিরাময় হ রাজাকার! তুই নিরাময় হ!’

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে