Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০১-২১-২০১৬

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায় নিয়ে নতুন বিতর্ক

খোরশেদ আলম


তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায় নিয়ে নতুন বিতর্ক

ঢাকা, ২১ জানূয়ারি- 'অবসরে যাওয়ার পর রায় লেখা সংবিধান পরিপন্থি' প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার এ বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক ও আইন অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। আইনজ্ঞদের অনেকের মতে, প্রধান বিচারপতির বক্তব্য সঠিক হলে তত্ত্ববধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল ঘোষণা করতে হবে। তবে অনেক আইনজ্ঞ বিষয়টিকে বাস্তবতার নিরিখে বিশ্লেষণ করার দাবি জানিয়েছেন।

প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দলটির নেতারা দাবি করছেন,  ওই রায় যে অবৈধ ছিল তার প্রমাণ মিলেছে প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে।

মঙ্গলবার (১৬ জানুয়ারি) দায়িত্ব গ্রহণের একবছর পূর্তিতে উপলক্ষ্যে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা বলেন, বিচারপতিদের অবসরে গিয়ে রায় লেখা আইন ও সংবিধান পরিপন্থি। কোনো কোনো বিচারক রায় লিখতে অস্বাভাবিক বিলম্ব করেন, আবার কেউ কেউ অবসর গ্রহণের দীর্ঘদিন পর পর্যন্ত রায় লেখা অব্যাহত রাখেন, যা আইন ও সংবিধান পরিপন্থি। এ প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায় নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ, ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ে তৎকালীন বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক সাক্ষর করেছিলেন অবসর গ্রহণের প্রায় ১৬ মাস পর। কারণ, তিনি অবসর গ্রহণ করেন ২০১১ সালের ১৭ মে আর রায়ে স্বাক্ষর করেন ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১২ তারিখে।

২০১১ সালের মে মাসে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল বলে রায় দেন। ওই রায়ের ভিত্তিতে পঞ্চদশ সংশোধনী করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। খায়রুল হক অবসরে যাওয়ার পর ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয় পূর্ণাঙ্গ রায়।

এ প্রেক্ষপটে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সদস্য নজরুল ইসলাম খান তত্ত্ববধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের রায়কে অসাংবিধানিক বলে মন্তব্য করেছেন। জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের উদ্যোগে জিয়াউর রহমানের ৮০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এই আলোচনা সভায় নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘তাহলে যে রায়ের রেফারেন্স দিয়ে আপনারা পঞ্চদশ সংশোধনী করলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে দিলেন; সেই রায় তো আজকের প্রধান বিচারপতির ভাষায় বেআইনি ও অসাংবিধানিক।’

প্রধান বিচারপতির ওই বক্তব্যের পর পঞ্চদশ সংশোধনী ‘বাতিলযোগ্য হয়ে গেছে’ এবং বাংলাদেশের জনগণও ‘তা-ই চায়’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি নেতা নজরুল।

আর বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন দাবি করেছেন, ‘ওই রায় যে অবৈধ ছিল’।

বুধবার অন্য একটি অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতা ও সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন মন্তব্য করেন, ‘সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে যে রায় ঘোষণা করেছিলেন সেটি অবৈধ, তার প্রমাণ মিলেছে প্রধান বিচারপতির ভাষণে।’

মাহবুব বলেন, ‘বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার ওই অবৈধ রায়ের সুযোগে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বিলুপ্ত করেন।’

তবে বিষয়টিকে বাস্তবতার নিরিখে দেখার দাবি জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান। তিনি ওই রায়কে বেআইনী কিংবা সংবিধান পরিপন্থি হিসেবে মনে করেন না।

হাফিজুর রহমান বলেন, রায়ের সংক্ষিপ্ত রূপ তো আদালতে উপস্থাপন করেন বিচারকরা।কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায় লিখতে হয় ৩শ’ থেকে ৮শ’ পৃষ্ঠায়। এই রায় পূর্ণাঙ্গ লিখতে হলে সেখানে সময়ের ব্যাপার রয়েছে। রায় ঘোষণা হলো আর পূর্ণাঙ্গ রায় লেখা হলো বিষয়টি এমন নয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘একজন বিচারপতি অবসরে গিয়ে রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি লিখলে তা বেআইনি বা অসাংবিধানিক হবে, বিষয়টি আমার কাছে মনে হয় না। অবসরের পরে বিচারপতিদের রায় লেখার এই পদ্ধতি তো অনেক দিনের প্রাকটিস। এখানে তো সমস্যার কিছু নেই। আর প্রধান বিচারপতি বিষয়টি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন বা বলেছেন তা আমার জানা নেই।’

প্রধান বিচারপতির বক্তব্য নিয়ে ‘বিতর্ক প্রাসঙ্গিক তবে তা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে’ দেখার অবকাশ রয়েছে বলে মনে করেন এই আইন বিশষেজ্ঞ।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে এমনও বিচারক আছেন, যারা নিজে কম্পিউটারে ভালো লিখতে পারেন না। সে ক্ষেত্রে তিনি তার অফিসের কারো সাহায্য নিয়ে সেটি লেখেন। আবার বিচারক সেটিতে অনেক কিছু সংযোজন-বিয়োজন করেন। একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি যে, এখনো দেশ সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল হয়নি। সুতরাং অবসরে যাওয়ার পরে রায় লেখাকে অসাংবিধানিক বলে আমার মনে হয়না’- যোগ করেন হাফিজুর রহমান।

শেখ হাফিজুর রহমানের মতে, অবসরে যাওয়ার পর রায় লেখা নিয়ে প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের বিষয়টির অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে। ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘কোনো বিচারপতি একটি রায় ঘোষণা করলেন। এরপর তিনি অবসরে গেলেন। কিন্তু রায়ের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করলেন না। সে ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির কথার যুক্তি রয়েছে ব্যাপক।’

এ বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালতের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলাম একটি গণমাধ্যমকে জানান, দায়িত্ব পালনের সময় ঘোষিত রায় অবসরে যাওয়ার পর লেখার ক্ষেত্রে আইনি কোনো বাধা দেখছেন না তিনি।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার শফিক বলেন, যখন বিচারপতি রায় ঘোষণা করেন, তখন তিনি বিচারক হিসেবে শপথে ছিলেন। ঘোষিত তারিখের দিন হিসেবেই রায়ে সই করা হয়। এই চর্চা দীর্ঘদিনের। এ চর্চা ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে, এমনকি ইংল্যান্ডেও আছে।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি রায়ে সই করার ব্যাপারে যে বক্তব্য দিয়েছেন, এটা আমার বিশ্বাস বর্তমান যে পরিস্থিতি এ বিষয়টি বিবেচনা করেই দিয়েছেন। কারণ, হাইকোর্টে একটি কথা উঠছে, অনেক রায় অনেক আগে হয়ে গেছে, সই হয়নি ইত্যাদি। রায় ঘোষণার পর পরই রায় যাতে জনসাধারণ পায়, এই উদ্দেশ্য থেকে উনি কথাগুলো বলেছেন বলে আমি মনে করি।’

২০১১ সালের ১০ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা-সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে গঠিত সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ।

সংক্ষিপ্ত আদেশে বলা হয়, সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে আপিল মঞ্জুর করা হলো। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন, ১৯৯৬ (আইন-১: ১৯৯৬) এখন থেকে বাতিল ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করা হলো। দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন উল্লিখিত সংশোধনীর অধীনে হতে পারে। আইনের বহু পুরোনো নীতি এই—কোনো কিছু বেআইনি হলে প্রয়োজনের তাগিদে তা বৈধ হতে পারে, রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তা হচ্ছে সর্বোচ্চ আইন। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের বিচারপতিদের রাখার বিধান বাতিলে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে সংসদের স্বাধীনতা রয়েছে।

এর আগে ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। ওই রায়ের বিরুদ্ধে পরের বছরই আপিল করা হয়।

২০১১ সালের ১ মার্চ আপিল বিভাগে এ আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। আদালতে আপিলকারী ও রাষ্ট্রপক্ষ ছাড়াও শুনানিতে অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের আইনি সহায়তাকারী) হিসেবে শীর্ষস্থানীয় আট আইনজীবী বক্তব্য দেন। অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী টি এইচ খান, ড. কামাল হোসেন, এম আমীর-উল ইসলাম, মাহমুদুল ইসলাম ও রোকনউদ্দিন মাহমুদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। তবে রফিক-উল হক ও এম জহির বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংস্কারের পক্ষে মত দেন। অপর অ্যামিকাস কিউরি আজমালুল হোসেন কিউসি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটা সংবিধানের মৌল কাঠামোর পরিপন্থী। ১০ দিন শুনানি শেষে ৬ এপ্রিল আদালত বিষয়টি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। এরপর ৫ মে কার্যতালিকায় বিষয়টি রায় ঘোষণার জন্য আসে। কয়েক মিনিটে রায় ঘোষণা করেন আদালত।

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে