Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০১-০৫-২০১৬

ভারতে বছরজুড়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নেপথ্যে

জাহিদুল ইসলাম জন


ভারতে বছরজুড়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নেপথ্যে

নয়াদিল্লি, ০৫ জানুয়ারি- ভারতে ২০১৫ সাল জুড়ে আলোচনায় ছিল সাম্প্রদায়িক সহিংসতা। ভিন্ন ভিন্ন সময়ের এই সহিংসতার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছেন ভারতের জামিয়া ইসলামিয়া মিলিয়ার গ্র্যাজুয়েট ও ফ্রিল্যান্সার সাংবাদিক সাইফ আহমেদ খান। মতামতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘ডেইলি ও’তে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি তুলে ধরেছেন, অসহিষ্ণু ঘটনা প্রবাহে রাজনৈতিক নেতাদের মদদ কীভাবে সংখ্যালঘুদের জন্য ভারতকে অনিরাপদ করেছে। নিবন্ধটি প্রিয়.কম-এর পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

সম্প্রতি শেষ হওয়া বছরে আমরা ভারতে বেশ কয়েকটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা দেখেছি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের জুন থেকে বেশিরভাগ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে থেকে উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং বিহার রাজ্যে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় শুধু এই রাজ্যগুলোতেই অন্তত ৬০০ মানুষের আহত হওয়ার খবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই দিয়েছে। অন্যান্য আক্রান্ত রাজ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান এবং গুজরাট।

বছরের প্রথম দুই মাসে নয়াদিল্লিতে সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কয়েকটি চার্চে রহস্যময় হামলার ঘটনা ঘটে। দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের আগে ধারাবাহিক এসব চার্চ হামলাকে প্রাথমিকভাবে সংবাদমাধ্যমগুলো অগ্নিসংযোগ এবং অপবিত্র করে দেওয়ার ঘটনা বলে বর্ণনা করে।

তদন্ত শেষ হওয়ার অনেক আগেই এপ্রিলের শুরুতে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি এসব ঘটনাকে ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি দাবি করেন, ‘একটি ঘটনায়ও সংখ্যাগরিষ্ঠদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি, এমনকি এসব ঘটনায় রাজনৈতিক বা সম্প্রদায়গত বৈশিষ্ট্যও ছিল না।’

এসব অস্পষ্টতার মধ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ভিড়ে সংবাদমাধ্যম থেকে হারিয়ে যায় চার্চ হামলার ঘটনা। দাদরিতে ঘরে গরুর মাংস রাখা বিতর্কে মোহাম্মাদ আখলাক হত্যার ঘটনায় এটি আবারও আলোচনায় আসে।

কাঠখড় পুড়িয়ে ক্ষমতায় আসা কিছু রাজনীতিবিদরা ভয়াবহ মন্তব্য করে আলোচনায় থাকতে চান। যেমন কেন্দ্রীয় সংস্কৃতিমন্ত্রী মহেশ শর্মা বেশ কয়েকবার সংবাদ শিরোনাম হন তার বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য। দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যের সিরিজ তৈরি করে তিনি বলেন, ‘আখলাখের ছেলে দানিশের শরীরে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিসংতার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।’

শুধু তাই নয় তিনি বলেন, ‘আক্রমণকারীদের হামলায় আখলাকের বাড়ির মহিলারা কোনোভাবেই আক্রান্ত হননি।’ ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)’র সাংসদ (এমএলএ) সঙ্গীত সোম দাদরিতে গিয়ে বলেন, ‘এই ঘটনায় হিন্দুদের  অযৌক্তিকভাবে জড়ানো হচ্ছে।’ হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী মনোহর লাল খাত্তার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘মুসলিমরা শুধু গরুর মাংস খাওয়া ছাড়তে পারলেই ভারতে থাকতে পারে।’

কিন্তু শুধু খ্রিস্টান এবং মুসলিম সংখ্যালঘুরাই এসব অসিহষ্ণুতায় ক্ষতিগ্রস্থ ছিল না। জৈন, বাহাই এবং সমকামীরাও এসব ঘটনায় আক্রান্ত হন। জৈনদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব পর্যুসনের সময় মুম্বাইতে আক্রান্ত হন তারা।  অযৌক্তিকভাবে তাদের উপবাসের সময় মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করতে মত দেন অনেকেই।

শিবসেনা এবং মহারাষ্ট্র বিনির্মান সেনা (এমএনএস) আক্রমণের ঘটনাকে উস্কে দেয়। ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে তারা ঘটনাটিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায়, যা পুরো জৈন ধর্মালম্বীদের উপর আঘাত হানে। এরপরের ঘটনা জৈনদের প্রতি শুধুই গোঁড়ামি, ঘৃণা এবং হুমকির।

শিব সেনাদের মুখপাত্র সামনায় প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘মুসলমানেরা পাকিস্তানের কারণে যদিও মাংস খেতে পারে। কিন্তু জৈনদের এই ধর্মান্ধতা বাড়তে দেওয়া হলে দেশের কী অবস্থা হবে? যদি এদেশের সন্তানদের নোংরা খেতে বাধ্য করা হয় তাহলে অল্প সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যও ভেঙে পড়বে।’

ওই সম্পাদকীয়তে পরিষ্কার করে দেওয়া হয় শিব সেনারা ভারতীয় মুসলমানদের দ্বিতীয় বাড়ি হিসেবে পাকিস্তানকেই দেখে থাকে। তারা জৈনদের সম্পর্কে তাদের ধারণা পরিষ্কার করে দেয়।

এমএনএস প্রধান রাজ ঠাকরে জৈন এবং গুজরাট ভাষি মানুষদের প্রতি সহিংসতার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপি চেয়ারম্যান অমিত শাহকে দায়ী করেন। রাজ ঠাকরের ঘৃণা এবং বিভক্তির রাজনীতির উত্তরাধিকারী শিব সেনা এবং এমএনএস নিরামিষভোজী জৈনদেরকে গুজারটিদের কাতারে নামিয়ে আনার চেষ্টা করে। রাজ ঠাকরে হিন্দুদেরকে জৈনদের উপরে খেপিয়ে দিয়ে ঘটনাটিকে সম্প্রদায়গত রং দেন।

এমএনএস কর্মীরা মুম্বাইয়ে নিরামিষভোজী জৈনদের একটি কমিউনিটি হলের সামনে মুরগির মাংস ছড়িয়ে দিয়ে উত্তেজনা ছড়ায়। সেখানে রাজ ঠাকরে নিজেই বলেন, ‘দিগম্বর জৈনরা তাদের শরীর দেখাতে পারলে মাংস নিষিদ্ধ হবে কেন।’

ব্যক্তিগত পছন্দ বা খাবারের স্বাধীনতাকে শিব সেনা বা এমএনএস কর্মীরা বর্ণবাদী করে তুলতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। তারা জৈন সম্প্রদায়ের উপর সহিংসতায় নেমেছে।  এর আগে তারা উত্তর, দক্ষিণ ভারতীয় এবং মুসলমানদের উপর আক্রমণ চালিয়ে এই ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে। মাংস নিষিদ্ধ বিতর্ক এবং এটা নিয়ে বাকযুদ্ধ সৃষ্টির জন্য শিব সেনা এবং এমএনএস দায়ী। এবং এটা তারা ঘটিয়েছে এমন এক সম্প্রদায়ের প্রতি যারা ভারতের মোট জনসংখ্যার মাত্র দশমিক চার শতাংশ।

এরপর বাহাই বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের লক্ষ্যে পরিণত হয় অক্টোবরে এসে। দি ওয়ারের এক রিপোর্টে জানা যায়, রাজস্থানে স্থানীয় বিজেপি নেতার নেতৃত্বে বাহাই সম্প্রদায়ের লোকের সমাধি ক্ষেত্রে হামলা চালানো হয় অক্টোবরের ৩০ তারিখে। ২০ হাজার বাহাই বিশ্বাসী লোক সেখানে বসবাস করে। ওই রিপোর্টে বলা হয় ৫০-৬০ জনের একদল দুষ্কৃতিকারী শুধু সমাধিক্ষেত্রের চৌকিদারকেই মারেনি, নির্মাণাধীন প্রার্থনাশালার দেয়ালও ভেঙে দিয়েছে।

জয়পুরের সীমান্তবর্তী ‘রাম-জি-কি-নানজল’ গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। বাহাই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, বিজেপি নেতা এবং স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধান নাথু জানগিদ তাদের সমাধিক্ষেত্র গুড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। খেলার মাঠের জায়গায় বাহাইদের সমাধি ক্ষেত্রের জায়গা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করে পঞ্চায়েত তা ফেরত আনার প্রচেষ্টা চালায়।

আমরা সবাই ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ইতিহাস সম্পর্কে জানি। আমরা কীভাবে ভুলে যেতে পারি, যেভাবে তারা অযোধ্যায় সংঘ পরিবারকে এক করেছিল। অযোধ্যার নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ে সেখানে তারা জমায়েত সৃষ্টি করে এবং যার ফলাফল হয় বাবরি মসজিদ ধংস।

নাথু জানগিদ একজন বিজেপি কর্মী এবং রাজস্থানে বাহাইদের সমাধি ক্ষেত্রে খেলার মাঠ বানানোর তার ইচ্ছা কাউকে বিষ্মিত করেনি। হিন্দুত্ববাদী দাঙ্গা উদ্ভাবনী বিজ্ঞানীদের জন্য এটা একটা উপলক্ষ হিসেবে পরিবেশিত হয়।

এবং শেষে ডিসেম্বর মাসে সমকামীদের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ হয়। ২০০৯ সালে দিল্লী হাইকোর্ট সমকামীতাকে বৈধতা দেয়। এতে ভারতীয় সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পেনাল কোডের ৩৭৭ ধারা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট ২০১৩ সালে দিল্লি হাইকোর্টের এ রায়কে উল্টে দেয়। এবং সংসদকে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার দেয়। কিন্তু সরকার ও সংসদ কী একই প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে?

বর্তমান সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তৎকালীন বিজেপি প্রেসিডেন্ট রাজনাথ সিংহ ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে সমকামিতা প্রাকৃতিক নয় দাবি করে বলেছিলেন, ‘আমরা এরকম কিছু সমর্থন করতে পারি না’।

কিন্তু অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি সম্প্রতি সমকামিতা বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় প্রসঙ্গে তাকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে আইনশাস্ত্র বিকশিত হলেও আমি মনে করি এটা সঠিক রায় নয়, তাদের পুর্নবিবেচনা করা উচিত।’

অবশেষে পার্লামেন্টের শীতকালীন অধিবেশনে এ বিষয়ে শেষ মন্তব্য দেখতে পাওয়া যায়। শশী থাপুরের এ সংক্রান্ত একটি বেসরকারি বিল লোকসভায় আটকে যায়। এবং ভারতীয় সংসদকে একটি সমকাম-ভীত পার্লামেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভারতের ইতিহাস সম্প্রদায়গত সহিংসতার সঙ্গে জড়িত। একুশ শতকের প্রথম দশকে আমরা খ্রিস্টান ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে গুজরাট এবং উড়িশ্যায় সহিংসতা দেখি। ১৯৮০ এবং ’৯০-এর দশকে হিন্দু সংখ্যালঘুদের উপর পাঞ্জাব ও কাশ্মীরে ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীদের নির্যাতন এবং খুনের চিত্র দেখেছি। ১৯৮৪ সালে শিখ দাঙ্গার সময়ে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতাও আমরা দেখেছি।

কিন্তু আমরা কখনই রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তিদের প্রকাশ্যে জৈন বা বাহাইদের মতো ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য বানাতে দেখিনি। সারাবিশ্ব যখন লৈঙ্গিক সংখ্যালঘুদের সমানাধিকারের পক্ষে লড়ছে তখন ভারতীয় সংসদ তাদের বিরুদ্ধে ভোট দিচ্ছে। আর এসব কিছুই ২০১৫ সালজুড়ে ঘটেছে এবং একারণেই ২০১৫ সাল অবিশ্বাস্যভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য ভারত এতটা অসহিষ্ণু।

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে