Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.5/5 (4 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০১-০৫-২০১৬

কম্পনপ্রবণ কলকাতার পায়ের নীচেই রয়েছে চোরাবালি!

শান্তনু মিশ্র


আগ্নেয়গিরির উপর পিকনিক নয়! বরং বলা যেতে পারে, কলকাতা বসে রয়েছে চোরাবালির উপর! এ যেন ব্যোমকেশ-কাহিনির সেই গা ছমছমে চোরাবালি, যাতে কেউ তলিয়ে গেলে উপরে কোনও চিহ্ন থাকে না!

কম্পনপ্রবণ কলকাতার পায়ের নীচেই রয়েছে চোরাবালি!

কলকাতা, ০৫ জানুয়ারি- কথাটা বলতে হচ্ছে ভূমিকম্পের পটভূমিতে। ভূমিকম্পের কোনও পূর্বাভাস সম্ভব নয়। তবে এটাও ঠিক যে, কম্পনপ্রবণ এলাকাগুলি ভূতাত্ত্বিকেরা কমবেশি চিহ্নিত করতে পারেন। আমরা জানি, ভূকম্পের একটি বড় কারণ, পরিভাষায় যাকে বলে ‘ফল্টলাইন’ বা চ্যুতিরেখা। ফাটলের মতো এই রেখাগুলি তৈরি হয় প্রস্তরপৃষ্ঠ সরে যাওয়ার ফলে।

কলকাতার আশপাশে তেমন বড় কোনও চ্যুতিরেখা নেই। একটি অবশ্য বঙ্গোপসাগরের তলদেশে রয়েছে। কিন্তু সেটা সক্রিয় কি না, কেউ জানে না। অন্য কোথাও ভূমিকম্প হলে কলকাতায় যদি তার অভিঘাত তেমন তীব্র হয়, তাহলে সমস্যা হবে অন্য ধরনের। ভূতত্ত্বের পরিভাষায় যাকে বলে ‘লিকুইফ্যাকশন এফেক্ট’। যদিও এটা এখনও গবেষণার বিষয়।

আমরা জানি, অপরিকল্পিতভাবে কূপ বসিয়ে জল তোলার ফলে শহরের অনেক জায়গাতেই ভূগর্ভস্থ জলস্তর কমেছে। মাটির নীচে সেই জায়গাগুলি বহুক্ষেত্রেই ফাঁকা থাকবে। এর উপরে শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে গঙ্গা। বেশ কিছু জলাশয়, খাল ইত্যাদিও রয়েছে। এর ফলে, তীব্র কম্পনে এখানকার মাটি কোথাও বসে যেতে পারে, কোথাও গলে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে নামতে পারে শহরজোড়া ধস। যা হয়ে উঠতে পারে চোরাবালির মতো। সবকিছুই যার নীচে তলিয়ে যায়! এ নিয়ে তাত্ত্বিকভাবে বেশ কিছু কাজ হলেও সমস্যাটা নিয়ে সাধারণ মানুষ বোধহয় তেমন ওয়াকিবহাল নন। এ নিয়ে মানুষকে সচেতন করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
গত এপ্রিলে নেপালের পরে সোমবার ভোরে মণিপুর। ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান, মায়ানমারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল কেঁপে ওঠার পরে অনেকেরই প্রশ্ন, এই কম্পনের সঙ্গে নেপালের সেই কম্পনের কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না। উত্তর হল, না। তফাৎটা শুধুমাত্র রিখটার সূচকের তীব্রতাতেই নেই; দু’টি কম্পনের চরিত্রও ভূতত্ত্বের দিক থেকে স্বতন্ত্র।

নেপালের কম্পনের কারণ ছিল ভারতীয় টেকটনিক প্লেটের তিব্বতের টেকটনিক প্লেটের নীচে ঢুকে যাওয়া। আর আজ মণিপুরে যা হয়েছে, তাকে ভূতত্ত্বের ভাষায় বলে ‘স্ট্রাইক স্লিপ ফল্ট’। সহজ করে বললে, দু’টি প্রস্তরতলের আনুভূমিক ঘষে যাওয়া। নেপালের ভূমিকম্পে মাটি দুলে উঠেছিল। আর সোমবার যেটা হয়েছে, তাকে বলা যায় ঝাঁকুনি।

ভারতের সবচেয়ে ভূকম্পপ্রবণ এলাকা হল গোটা হিমালয়। এই কম্পনপ্রবণ বিস্তৃতিকে আমরা দু’ভাগে ভাগ করতে পারি। যার একটা ‘বেল্ট’ হল আফগানিস্তান থেকে মণিপুর। এই রেখাটা যাচ্ছে পশ্চিম থেকে পুবে। আর ব্রহ্মপুত্র যেখান থেকে বাঁক নিচ্ছে, সেখান থেকে শুরু হচ্ছে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর দ্বিতীয় ‘বেল্ট’, যাকে বলা হয় হিমালয়ের ‘ইন্দো-বর্মা রেঞ্জ’। এখান থেকে চ্যুতিরেখা আন্দামান হয়ে সোজা চলে গিয়েছে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত।

এছাড়া ভারতের আরেকটি কম্পনপ্রবণ এলাকা হল ১২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ শোন-নর্মদা-তাপ্তি লিনিয়ামেন্ট। অন্য একটি কম্পনপ্রবণ অংশ রয়েছে গুজরাতে। দক্ষিণ ভারতেরও কয়েকটি জায়গা কম্পনপ্রবণ।
ভারতের মানচিত্রে তীব্রতা অনুযায়ী কম্পনপ্রবণ এলাকাগুলিকে পাঁচটি সাইজমিক জোনে (ড্যামেজ রিস্ক জোন) ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ‘জোন ১’ বা সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ (কম্পনের তীব্রতার নিরিখে) এলাকা মানচিত্রে নেই। কম্পনে সর্বাধিক বিপদের আশঙ্কা (‘জোন ৫’) যেখানে, তার মধ্যে পড়ে কাশ্মীর, পশ্চিম এবং মধ্য হিমালয়, উত্তর এবং মধ্য বিহার, উত্তরপূর্বাঞ্চল, কচ্ছের রাণ। এর ঠিক নীচের পর্যায়েই রয়েছে দিল্লি। এ রাজ্যের উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাও এই জোনেই পড়ে। এই দুই জেলার লাগোয়া কলকাতা পড়ে ‘জোন ৩’এ।

কোনও জায়গায় নতুন চ্যুতিরেখা আবিষ্কার হলে ভূবিজ্ঞানীরা সেখানকার কম্পনপ্রবণতার মাত্রাও বাড়িয়ে দেন। যেমন ঘটেছে চেন্নাইয়ের ক্ষেত্রে। কম্পণপ্রবণতায় আগে চেন্নাই পড়ত ‘সাইজমিক জোন ২’এ। ২০০৪ সালের সুনামির পরে তা পরিবর্তিত হয়েছে ‘সাইজমিক জোন ৩’এ। অর্থাৎ, চেন্নাই আগের তুলনায় বেশি কম্পনপ্রবণ বলেই ধরা হয়েছে।

ভূমিকম্প কোথায় হতে পারে, তা বুঝতে গেলে চ্যুতিরেখাগুলি চিহ্নিত করা দরকার। যে রেখাগুলি ভূপৃষ্ঠের উপরে রয়েছে, সেগুলি সহজেই চিহ্নিত করা যায়। যে সব চ্যুতিরেখায় ১০-১১ হাজার বছরের মধ্যে কম্পন হয়েছে, সেগুলিকেই সক্রিয় চ্যুতিরেখা বলে ধরা হয়।

সমস্যা হল, যে সব চ্যুতিরেখা ভূপৃষ্ঠের নীচে রয়েছে, সেগুলি নিয়ে। কারণ, কেউ জানে না সেগুলি কোথায় রয়েছে, কবে কেঁপে উঠবে!

(লেখক কানপুর আইআইটি’র আর্থ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক)

পশ্চিমবঙ্গ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে