Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.5/5 (2 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০১-০৩-২০১৬

বিশ্বের প্রথম সুপার মডেলের অজানা কাহিনী

বিশ্বের প্রথম সুপার মডেলের অজানা কাহিনী

সুপার মডেল হতে কী লাগে? অবশ্যই অসাধারণ সৌন্দর্য, এবং সঙ্গে আরও অনেক কিছু- নির্দিষ্ট সহজাত দক্ষতা, নির্ভুল ফ্যাশন প্রবৃত্তি, কঠোর স্থিতিস্থাপকতা, যৌন আবেদনময়ী এবং পাশাপাশি শুধু বিশ্ববিখ্যাত হলেই নয় বরং একজন মডেল যখন পুরো একটি যুগকে তার নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। একজন সুপারমডেল নির্দিষ্ট একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি প্রকাশ করে। কারণ সেই সময়ের ফ্যাশন এবং সংস্কৃতি তার দখলেই ছিল।

এটা ছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের কথা যখন কেউ একজন সুপার মডেল হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তিনি হলেন ইভলিন নেসবিট (১৮৮৪ - ১৯৬৭) যিনি ছিলেন ফিলাডেলফিয়ার একজন চিকন এবং কপার-কেশী এক সুন্দরী মডেল। তিনি ছিলেন অ্যামেরিকার সোনালী যুগের চিত্রশিল্পী এবং ফ্যাশন মডেলদের কাছে চরম চাওয়া পাওয়ার বস্তু। তাঁর জীবন ছিল উত্তাল এবং ঘটনাবহুল। তাঁর খ্যাতি শীর্ষে উঠেছিল যখন তিনি একটি খুনের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন এবং এ নিয়ে সেসময় 'দ্য ট্রায়াল অব দ্য সেঞ্চুরি' রচনা করা হয়।

কিন্তু শুধু এভাবে নয়, নেসবিট আরও অনেক উপায়ে যুগটি তাঁর নিজের করে নেন। উনবিংশ শতাব্দীর শেষাংশ ছিল অ্যামেরিকার অর্থনীতির দ্রুত ঊর্ধ্বগতির জন্য একটি চমৎকার সময়। কিন্তু একই সময়ে অনেক দরিদ্র ইউরোপীয় অভিবাসী এখানে চলে আশায় সে দেশের মানুষ চরম দুর্দশাও পরখ করে দেখেছে। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় উভয়ই পেয়েছেন। স্কটস-আইরিশ বংশোদ্ভূত নেসবিটের ছোটবেলা কেটেছিল পেনসিলভেনিয়ার ট্যারেনটামে। ছোটবেলাতেই তাঁর বাবা মারা যান অনেক ঋণ বাকী রেখেই। সেসময় তাঁর মা তাঁদের পরিবারের হাল ধরেন এবং এজন্য তাঁকে কঠোর পরিশ্রম করতে হতো। নেসবিট যখন কিশরী তখন তিনিও তাঁদের দারিদ্রতা দূর করার জন্য দায়িত্ববান হওয়া শুরু করলেন। ১৪ বছর বয়স থেকে তিনি চিত্রশিল্পীদের জন্য সম্পূর্ণ পোশাকে মডেলিং করতেন। ১৯০০ সালে নিউ ইয়র্ক এসে তিনি অনেক উন্নতি করেন তবে তা ছিল বেশ ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু তারপরও এর মাধ্যমে তাঁর জীবনের সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়।

সেসময়ের একজন শিল্পী জেমস ক্যারল বেকউয়িথ নেসবিটকে তাঁর প্রধান অর্থনৈতিক সাহায্যদাতা জন জ্যাকব অ্যাসটরের কাছে নিয়ে যান। তিনি পরে নেসবিটকে তাঁর সকল চারুশিল্পী এবং অঙ্কন শিল্পীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এবং ক্রমেই তিনি নিউ ইয়র্কের সবচেয়ে চাহিদাপূর্ণ মডেল হয়ে যান। অসংখ্য শিল্পকর্মের জন্য তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণা। এর মধ্যে রয়েছে ভাস্কর জর্জ গ্রে বার্নার্ডের বিখ্যাত ভাস্কর্য ‘ইনোসেন্স’ (বর্তমানে মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অব আর্টে সংরক্ষিত) এবং চার্লস ডানা গিবসনের ‘উইম্যান: দ্য ইটার্নাল কুয়েসশন’ (১৯০৫)। বিভিন্ন জার্নাল এবং ম্যাগাজিনের কভার পেজে তিনি ছিলেন এক জনপ্রিয় মুখ। সেগুলোর মধ্যে ছিল ভ্যানিটি ফেয়ার, হার্পার’স বাজার, দ্য ডেলিনিয়েটর এন্ড লেডিস’ হোম জার্নাল, এবং তাঁকে প্রায়ই বিভিন্ন জিনিসের, যেমন মুখে মাখার ক্রিম থেকে টুথপেস্টসহ নানা রকম বিজ্ঞাপনে খুঁজে পাওয়া যেত।


জনপ্রিয়তা
নেসবিটের কোমল এবং যৌবনদীপ্ত চেহারা ক্রমেই বিশ্ববিখ্যাত হয়ে ওঠে আর তা দেখা যেতে থাকে পোস্টকার্ড, টোবাকো কার্ড, ক্যালেন্ডারের পাতায় এবং ক্রোমোলাইটোগ্রাফে। প্রায়ই তিনি বিভিন্ন পোশাকে পোজ দিতেন। এর মধ্যে ছিল কাঠের জলপরী, জিপসি, গ্রীক দেবতা, জাপানি বাঈজী নারী – সবক্ষেত্রেই তিনি পোশাক পরিহিত থাকতেন এবং এর ফলে অঙ্কিত ছবিগুলোতে স্পষ্ট যৌনতা প্রকাশ পেত না। সেগুলো যদিও বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ ছিল কিন্তু নেসবিটের জনপ্রিয়তা ও সুখ্যাতি নিয়ে কোন সন্দেহ ছিল না।

ফ্যাশন ফটোগ্রাফি সেসময় দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং ফটোগ্রাফিতে সদ্য যোগদান করা জোয়েল ফেডেরের মাধ্যমে তিনি প্রথম এই মিডিয়ামে একজন ‘লাইভ মডেল’ হিসেবে আসেন এবং তৎক্ষণাৎ তা হিট করে। ফটোগ্রাফির ঊর্ধ্বগতির জন্য ধীরে ধীরে তা ছাপানো অঙ্কিত চিত্রকর্মকে পিছনে ফেলে আসতে থাকে এবং একই সঙ্গে নেসবিটের ছবি পত্রিকায় অনেক বেশি বেশি আসতে থাকে যার ফলে জনগণের কাছে তাঁর পরিচিতিও বাড়তে থাকে। ১৯০১ সালের আগে তিনি একজন বালিকা গায়ক হিসেবে কোরাস লাইনে অংশ নিতেন যা ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছিল। অন্যদিকে তিনি ছিলেন শহরের মদ্যপানপূর্বক স্বাস্থ্যকামনাকারী নারী এবং নিয়মিত তিনি মঞ্চে গল্পগুজবেও অংশ নিতেন। বালিকা গায়কের চাকরি থেকে সরে দাঁড়ানোর কিছু দিন পর তিনি ‘দ্য ওয়াইল্ড রোস’ এ কথা বলার একটি রোল নেন।

সুপারমডেল হিসেবে সফল নেসবিট যেন সেই যুগের এক প্রতিমূর্তি এবং ক্রমেই তিনি সেই যুগকে সম্পূর্ণ নিজের আয়ত্তে নিয়ে নেন। পউলা উরুবুরু তাঁর নেসবিটকে নিয়ে লেখা জীবনী ‘অ্যামেরিকান ইভ’ এ উল্লেখ করেন, 'বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে নেসবিট ছিলেন একজন অ্যামেরিকান ড্রিম গার্ল যার মুখমণ্ডল ছিল তাঁর ভাগ্য এবং তাঁর জীবনের প্রতিফলন ঘটেছিল সে যুগের মাতাল, ঊর্ধ্বগামী এবং দু:সাহসিক মনোভাবে... তিনি পরস্পরবিরোধী প্রেরণাসমূহকে [সেই সোনালী যুগের] বাস্তবরূপে উপস্থাপন করেন; সেসময়ে তাঁর মধ্যে ভিক্টোরিয়ান মনোভাব দেখা যায়, কিন্তু তাঁর মনোমুগ্ধকর হাসিতে যেন লুকানো এক প্রতিশ্রুতি রয়েছে।'

খ্যাতি যখন বিপত্তি
ইভলিন নেসবিট যখন ‘ফ্লরোডোরা গার্ল’ নামে খ্যাত তখন নিউ ইয়র্কের আর্কিটেক্ট স্ট্যানফোর্ড হোয়াইটের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। হোয়াইটের উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে দ্বিতীয় ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন, টিফানি’স, ওয়াশিংটন স্কয়ার আর্ক এবং কর্নেলিয়াস ভ্যান্ডারবিল্ট’স ম্যানশন। শুরুতে হোয়াইটের সাথে নেসবিটের সম্পর্ক ছিল মামার মতো কিন্তু ক্রমেই তিনি তাঁর প্রেমিক বনে যান এবং তাঁর উপকারী বন্ধুতে পরিণত হন। তিনি তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে চমৎকার উপহার ও বিলাসবহুল এপার্টমেন্ট উপহার দেন। প্রায় এক বছর সম্পর্কের পর নেসবিট সম্পর্কের ইতি টানেন এবং মিলিয়নিয়ার হ্যারি কে. থউকে বিয়ে করেন। কিন্তু থউ পরে সন্দেহর বশবর্তী হন এবং তাঁর স্ত্রীর মর্যাদা রক্ষার জন্য এক সন্ধ্যায় ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে এক অনুষ্ঠানে তাঁর সাবেক-প্রেমিক হোয়াইটকে গুলি করে হত্যা করেন।

আদালতে থউকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু অ্যামেরিকার ইতিহাসে এমন জনপ্রিয় একজন মডেল হিসেবে নেসবিটকে বিবেচনায় রাখা হয়।

অভিমানি নেসবিট পরবর্তীতে নিজের মধ্যে স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে আসেন এবং ব্যথিত এই ঘটনার পর একজন সন্তানের মা হিসেবে, একজন অভিনেত্রী, একজন বিচিত্র অনুষ্ঠানের অভিনেত্রী ও দুটি স্মৃতির লেখক হিসেবে তিনি তাঁর জীবনটি সম্পূর্ণ নিজের করে নেন। তিনি আজও সকলের মাঝে বেঁচে আছেন নানা চিত্রকর্ম ও ছবির মধ্য দিয়ে। তাঁকে নিয়ে রচিত হয়েছে নানা কবিতা। ১৯৫৫ সালে তাঁকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র 'দ্য গার্ল ইন দ্য রেড ভেলভেট সুয়িং' নির্মাণ করা হয়। ই.এল. ডক্টরউ 'র‍্যাগটাইম' নামে একটি উপন্যাস রচনা করেন যেখানে তাঁর খুনের ঘটনাটি বিশেষভাবে প্রকাশ পায়। এমনকি সম্প্রতি ২০১০ সালে প্রচারিত এইচ.বি.ও. টিভি চ্যানেলে 'ব্রডওয়াক ইম্পায়ার' নামে একটি টিভি সিরিজের গিলিয়ান চরিত্রটি নেসবিটের উপর ভিত্তি করে বানানো। নেসবিটের কৃতিত্ব আজও বেঁচে আছে এবং থাকবে – কে জানে, হয়তো তাঁর পদ অনুসরণকারী আরও অনেক সুপারস্টারকেও তা ছাড়িয়ে যাবে।

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে