Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (1 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০১-০৩-২০১৬

দুদকের ১২ মাস, দায়মুক্তিতে সর্বনাশ

কাশেম কাব্য


দুদকের ১২ মাস, দায়মুক্তিতে সর্বনাশ

ঢাকা, ০৩ জানুয়ারি- সদ্য শেষ হয়েছে ২০১৫ সাল। নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে কেটেছে দুদকের বারো মাস। গত বছর স্বাধীন এই সংস্থাটির দায়মুক্তি তথা অব্যাহতির সংখ্যা ছিল উল্লেখ করার মতো। গত কয়েক বছরের তুলনায় অভিযোগ নথিভুক্ত (দায়মুক্তি) করে পুঙ্খানুপঙ্খ তদন্ত ছাড়াই অভিযুক্তদের ছেড়ে দেওয়ার হার বেড়েছে।

এসবের মধ্যে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনায় ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়ার ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেয়া হলেও, দুদকের করা ৫৬টি মামলার একটিতেও আবদুল হাই বাচ্চুকে আসামি না করায় ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি পড়তে সংস্থাটিকে। আর এই বিষয়টি নিয়ে খোদ মন্ত্রিপরিষদ ও জাতীয় সংসদেও আলোচনার ঝড় ওঠে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দুদকে আসা অভিযোগ প্রাথমিক যাচাই–বাছাই করে অনুসন্ধানের জন্য সিদ্ধান্ত হয় ১ হাজার ৫৮০টি। যার মধ্যে অনুসন্ধান শেষেই ‘অভিযোগর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি’ মর্মে নথিভুক্ত (দায়মুক্তি) করা হয়েছে ১ হাজার ১৬০টি।  অপরদিকে তার  আগের বছর মিলে অভিযোগ অনুসন্ধান শেষে মামলা করা হয়েছে মাত্র ৪৭৮টি। 

এ ছাড়া গত কয়েক বছরের মামলার তদন্ত শেষে ৫৩৬টি চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেয়া হয় ২০১৫ সালে। একইসাথে মামলার তদন্ত শেষে ৫৪২টি মামলার ফাইনাল রিপোর্ট (এফআর বা অব্যাহতি) বা মামলা থেকে খালাস দেয়া হয়।

২০০৭ সালে অনুসন্ধান শেষে অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়েছে ৭৩টি, ২০০৮ সালে ২৫৫টি, ২০০৯ সালে ৩৫৬টি, ২০১০ সালে ৪১২টি, ২০১১ সালে ৪০৬টি, ২০১২ সালে ১ হাজার ৪৭টি, ২০১৩ সালে ১ হাজার ২১৫টি, ২০১৪ সালে ১ হাজার ৪৮০টি এবং ২০১৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ১৬০টি।

অপরদিকে মামলা তদন্ত শেষে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি মর্মে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, ২০০৭ সালে ৮০টি, ২০০৮ সালে ১৯৭টি, ২০০৯ সালে ২৬২ টি, ২০১০ সালে ২৮৫টি, ২০১১ সালে ২৯৯টি, ২০১২ সালে ৩৮২টি, ২০১৩ সালে ৪০৯টি, ২০১৪ সালে ৪৯৯টি এবং ২০১৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৫৪২টি। গত ৯ বছরের তুলনায় বিদায়ী বছরে অভিযোগ থেকে দায়মুক্তির সংখ্যা বেড়েছে।

তবে এ বিষয়ে দুদক কমিশনার (তদন্ত) মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেন, ‘কারো দায় থাকলে তো আমরা মুক্তি দেব! যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে, অনুসন্ধানে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া না গেলেই কেবল অব্যাহতি দেয়া হয়।’

গত বছর কমিশনের উল্লেখযোগ্য সাফল্যের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেক সাফল্য আছে। কিন্তু মিডিয়াতে এসব হাইলাইটস হয় না, যতটা সমালোচনা হয়। এ বছর বেশ কয়েকটি বড় বড় জালিয়াতির অভিযোগে মামলা করেছি, অনেকগুলোর চার্জশিটও দিয়েছি। এমনকি ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাধরদেরও আমরা ছাড় দিইনি।’  

আলোচিত কিছু দায়মুক্তি
২০১৫ সালে দায়মুক্তির চাইতেও উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো হাজি সেলিমের বিরুদ্ধে করা দুর্নীতির মামলার বিচারিক কার্যক্রম নিয়ে। তার বিরুদ্ধে করা দুর্নীতি মামলার কার্যক্রমের শেষ মুহূর্তে এসে গত ১২ জানুয়ারি কমিশনের মামলা না চালানোর সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেন খোদ প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চ। 

প্রধান বিচারপতি এক আদেশে বলেছিলেন, শুনানিকালে এভাবে খারিজের আবেদন করা বা মামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নিলে আদালত বিভ্রান্ত হন। হাজি সেলিমের এই মামলায় ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি হাইকোর্ট রায় দিয়েছিলেন। রায়ে নিম্ন আদালতের দেয়া ১৩ বছরের দণ্ড বাতিল হয়।

এ ছাড়া পেট্রোবাংলায় নিয়োগ-দুর্নীতির অভিযোগে সংস্থার সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক হোসেন মনসুরের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করে দুইবার প্রতিবেদন দেয়া হলেও মামলায় তাকে আসামি করা হয়নি। এমনকি এই অনুসন্ধানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর ‘খড়গ’ পড়েছে, কয়েক দফা বদলি করা হয়েছে অনুসন্ধানে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের। 

আওয়ামী লীগ সরকারের আগের মেয়াদে ৪০৩টি হজ এজেন্সিকে লাইসেন্স দেয়ার ঘটনায় দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শাহজাহান মিয়ার বিরুদ্ধে কোনো অনুসন্ধান চালায়নি দুদক। অথচ প্রতিমন্ত্রীর এপিএস সৌমেন্দ্র লাল চন্দর বিরুদ্ধে মামলা হয়।

এরকম বিভিন্ন ঘটনায় চলতি বছরে দায়মুক্তি পেয়েছেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন, ঢাকা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান, আনন্দ শিপইয়ার্ডের মালিক আবদুল্লাহিল বারী, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুছ ছালাম, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল হুদা, ইউসিবিএলের এমডি মুহাম্মদ আলী, সোনালী ব্যাংকের সিবিএর সাধারণ সম্পাদক হাসান খসরু, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান ইউনুছুর রহমান, পুলিশের ডিআইজি (এসবি) মো. রফিকুল ইসলাম, এসপি মিজানুর রহমান প্রমুখ।

অপরদিকে ২০১২ সালের ৯ এপ্রিল বিজিবি সদর দপ্তরের সামনে ৭৮ লাখ টাকার বস্তাসহ আটক হন রেলওয়ে (পূর্বাঞ্চল) জিএম ইউসুফ আলী মৃধা। অভিযোগ ওঠে নিয়োগে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত এ অর্থ তৎকালীন রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বাসায় নেয়া হচ্ছিল। এ ঘটনায় দুদক সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে। কিন্তু ঘুষের তথ্য ফাঁসকারী ইউসুফ আলী মৃধার ড্রাইভার মো. আলী আযম প্রকাশ্যে সাক্ষ্য দিতে না আসায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ নথিভুক্ত করে তাকে দায়মুক্তি দেয়া হয়। তবে রেলওয়েতে নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগে ১৩টি মামলা করে দুদক। সব শেষে এসব মামলার প্রধান আসামি জিএম ইউসুফ আলী মৃধাকেও চলতি বছর ফাইনাল রিপোর্টের মাধ্যমে অব্যাহতি দেয়া হয়।

একইভাবে বহুল আলোচিত  ও  দেশের আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর সাবেক স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠলেও মামলায় তাকে আসামি করেনি দুদক। তাকেও দায়মুক্তি দেয়া হয় অনুসন্ধান পর্যায়েই। সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকেও এসব মামলায় আনা হয়নি। ফলে তারাও এই বড় কেলেঙ্কারির ঘটনা থেকে দায়মুক্তি পেয়ে যায়।

এ ছাড়া সম্প্রতি সরকারদলীয় সাংসদ এনামুল হকের বিরুদ্ধে ২১৩ কোটি টাকারও বেশি সম্পদ গোপন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে অনুসন্ধান কর্মকর্তা মামলার সুপারিশ করলেও তাকে অব্যাহতি দেয় কমিশন। এসব নিয়ে সেই অনুসন্ধানী কর্মকর্তাকে মেরে ফেলার হুমকি সমস্ত মিডিয়াতে আলোচিত হলেও সে বিষয়ে কান দেয়নি কমিশন। একই সময়ে নবম জাতীয় সংসদের হলফনামা নিয়ে দুদকের অনুসন্ধান শেষে হলফনামায় তথ্য দিতে ‘ভুল হয়েছে’ যুক্তি গ্রহণ করে আ ফ ম রুহুল হক ও আসলামুল হককে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয় দুদক।

অভিযোগ থেকে দায়মুক্তির ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখা গেছে, অনেক ঘটনায় দৃশ্যমান প্রমাণ থাকলেও দুদকের কর্মকর্তারা এর কোনো প্রমাণ পাননি। নির্বাচন কমিশনে নিজেদের দেওয়া হলফনামায় আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ থাকলেও ‘ভুল হয়েছে’ অজুহাতে অনেককে দায়মুক্তি দিয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বেশ জোরালো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আলোচিত অনেক ব্যক্তিত্ব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দায়মুক্তি পেয়েছেন।

এসব ব্যাপারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সঙ্গে যোগাযোগ করা সংগঠনটির পক্ষ থেকে পরিচালক (আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন) রিজওয়ান-উল-আলম  বলেন, ‘গত বছরের ২৫ মে দুদক ও টিআইবি’র মধ্যে সম্পাদিত এক সমঝোতা স্মারকের আলোকে টিআইবি ও দুদক একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যে যৌথভাবে তথ্য কর্মকর্তার অংশগ্রহণে একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালা ও ঢাকা জেলার সাভার উপজেলায় গত ১৬ সেপ্টেম্বর একটি গণশুনানির অনুষ্ঠানও সফলভাবে সম্পন্ন করেছি।’

উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম
দুদকের উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে, জনগণকে কাঙ্ক্ষিত সরকারি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ‘গণশুনানি’ আয়োজন করা। আলোচ্য বছরে সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)-এর প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দুটি বৈঠক রয়েছে। মুদ্রা পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ ব্যবস্থা মূল্যায়নে বাংলাদেশের জন্য করণীয় ৪০টি সুপারিশের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে এপিজি প্রতিনিধি দল দেশে আসে। এটি ছিল বাংলাদেশের ওপর করা তৃতীয় মূল্যায়ন। যার ওপর বাংলাদেশের কিছুটা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণ করছে। 

প্রায় পৌনে দুই বছর পর হলমার্ক কেলেঙ্কারির ‘নন-ফান্ডেড’ অংশের (দ্বিতীয় অংশ) প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ অভিযোগের অনুসন্ধান কাজ পুনরায় শুরু হয়। অগ্রণী ব্যাংকের পর্ষদসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ অনুসন্ধানও ছিল উল্লেখযোগ্য।

এসব ছাড়াও অনুসন্ধানে আলোচিত ব্যবসায়ী ও ড্যাটকো গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুসা বিন শমসের (প্রিন্স মুসা) সম্পদের রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। দুদকে যেসব তথ্য দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান নিজেই। প্রায় দেড় বছর পর নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সাত হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি নূর হোসেনের দাখিলকৃত সম্পদের তদন্ত শুরু হয়। 

অপরদিকে বছরের অধিকাংশ সময় কমিশন-সচিবের দ্বন্দ্বে আলোচনায় ছিল দুদক। পরিচালকসহ বিভিন্ন পদে পদোন্নতির বিষয়ে দুদক সচিব মাকসুদুল হাসান খানের সঙ্গে কমিশনের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। পরে ওই সচিবকে প্রত্যাহার করে নতুন সচিব নিয়োগের পর গত বছরের ১০ নভেম্বর পাঁচ পরিচালকসহ ৫৮ কর্মকর্তার পদোন্নতি নিশ্চিত করে কমিশন।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে