Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (2 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০১-০১-২০১৬

২০১৫: অলস অর্থের বোঝা ব্যাংকগুলোতে

২০১৫: অলস অর্থের বোঝা ব্যাংকগুলোতে

ঢাকা, ০১ জানুয়ারী- অতিরিক্ত তারল্যের বোঝা নিয়ে ২০১৫ সাল পার করল বাংলাদেশের ব্যাংক খাত।

ব্যাংকাররা বলছেন, ঋণ চাহিদা কম থাকায় বছরজুড়েই বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের উদ্বৃত্ত ছিল। কিন্তু বিনিয়োগে খরার কারণে তাদের কাছে এই অর্থের বোঝা রয়ে গেছে।

ঋণ চাহিদা কম থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে তারা মনে করছেন বছরের শুরুর দিকের রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিল্প কারখানায় গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য কমে যাওয়া এবং উদ্যোক্তাদের বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগকে।

ব্যাংকারদের এমন যুক্তির প্রমাণ মিলেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো ও রিভার্স রেপো কার্যক্রম এবং আন্তঃব্যাংক কলমানি রেট দেখে।

ব্যাংকগুলোতে ঋণের চাহিদা কেমন যাচ্ছে- তা বোঝা যায় রেপো ও কলমানি রেট থেকে। কারণ কোনো ব্যাংকের কাছে যখন গ্রাহকের চাহিদার তুলনায় কম অর্থ থাকে তখন ওই ব্যাংক অন্য ব্যাংক থেকে কলমানির মাধ্যমে ধার করে অথবা রেপোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার করে।

ব্যাংকগুলোতে ঋণ চাহিদা না থাকায় ২০১৫ সালে এক দশকের রেকর্ড ভেঙেছে কলমানি রেট। আন্তঃব্যাংক লেনদেনের এই ব্যবস্থায় সুদ হার কমতে কমতে দুই শতাংশের নিচেও নেমেছে।

আর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ধার নেওয়ার পদ্ধতি- রেপো বন্ধ রয়েছে গত ছয় মাস।

ব্যাংকারদের দাবি, ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে এক লাখ কোটি টাকার বেশি উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে।

এই হিসাব করার ক্ষেত্রে ব্যাংকাররা তাদের স্ট্যাটুটরি লিকুইডিটি রেশিও বা এসএলআর এবং সরকারের ট্রেজারি বিল-বন্ডের প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিনিয়োগ হিসাবে নিচ্ছেন।

ব্যাংকাররা বলছেন, ঋণ দেওয়ার সুযোগ থাকলে কেউ ট্রেজারি বন্ড-বিলে বিনিয়োগ করবে না। কারণ ব্যাংকের প্রধান কাজ হচ্ছে আমানত সংগ্রহ করে তা শিল্প-বাণিজ্য খাতে ঋণ হিসেবে বিতরণ করা।

রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম ফরিদউদ্দিন মনে করেন, বাজারে ঋণের চাহিদা না থাকায় বাধ্য হয়েই ব্যাংকগুলো সরকারের বিভিন্ন মেয়াদি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করেছেন।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ৩ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও বা সিআরআর খাতে ব্যাংকগুলোর রাখা উদ্বৃত্ত অর্থকে উদ্বৃত্ত তারল্য হিসাবে বিবেচনা করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল বলেন, “কোন অর্থকে উদ্বৃত্ত বলবেন। যেখান থেকে ব্যাংকের আয় হচ্ছে (সে কম বা বেশি) তাকে উদ্বৃত্ত বলা যৌক্তিক কিনা- তা পর্যালোচনা করতে হবে। তবে সিআরআর এ প্রয়োজনের তুলনায় যে টাকা থাকছে, তাকে উদ্বৃত্ত বলা যায়।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল সাত লাখ ২৫ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। এসময়ে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ পাঁচ লাখ ৭০ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে বৈদেশিক মুদ্রার ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার।

তাই বাজারে ঋণ চাহিদা নেই- মানতে নারাজ কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির দাবি, ব্যাংকগুলো বিনিয়োগে সতর্ক; ভালো ঋণ গ্রহীতা ছাড়া বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে না তারা।

এজন্য ব্যাংকগুলোকে বিনিয়োগে আনতে চাপ হিসেবে বছরের শেষ দিকে রিভার্স রেপো নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।


অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখত বলেন, “এ বছর বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ আসেনি। ব্যাংকগুলোতে বেশকিছু অলস অর্থ রয়ে গেছে। তবে সম্প্রতি পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাচ্ছে। সরকারের মেগা প্রকল্প বাস্তাবায়নের সাথে সাথে বেসরকারি খাতের ঋণের চাহিদা বাড়ছে। আশা করছি, আগামীতে বেসরকারি খাতের ঋণ চাহিদা বাড়বে।”

এ বিষয়ে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম ফরিদউদ্দিন বলেন, “২০১৫ সালে নতুন ঋণের বিশেষ চাহিদা ছিল না। যেকারণে ব্যাংকের বিনিয়োগ হয়নি; বিশেষকরে শিল্প খাতে বিনিয়োগ হয়নি। তবে বাণিজ্য খাতে মোটামুটি বিনিয়োগ হয়েছে।”

মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান  নূরূল আমিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২০১৫ সালে আমানতের চাপে থাকতে হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। মানি মার্কেট বা কলমানি মার্কেট খুবই স্বাভাবিক ছিল।

“অতিরিক্ত তারল্য থাকলে যা হয়, বলা যায় আমরা টাকার ওপর ভাসছি। কোর ব্যাংকিং ক্রেডিট ডিমান্ড অর্থাৎ বেসরকারি খাতের ঋণের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় ব্যাংকের আয় কম হবে।”

সরকারের ঋণ চাহিদাও কম জানিয়ে তিনি বলেন, “গ্যাস বিদ্যুতের ঘাটতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিদেশ থেকে বেসরকারি খাতের ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কারণে মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি যা প্রক্ষেপন করা হয় কখনও তা অর্জন সম্ভব হয়নি।”

ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “বছরের শুরুতে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। যার নেতিবাচক প্রভাব ছিল বছরজুড়ে ব্যাংকিং খাতের বিনিয়োগে। বছরের শেষে এসে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব কাটলেও গ্যাস, বিদ্যুতের ঘাটতি ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য কমে যাওয়ায় ব্যাংকের বিনিয়োগে তেজিভাব আসেনি।”

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়ায় আগের সমন পণ্যই আসছে এক তৃতীয়াংশ মূল্যে। ফলে ব্যাংকের আমদানি অর্থায়নের সুযোগ কমে গেছে।

ব্যাংকারদের এমন বক্তব্যের প্রমাণ মিলেছে একজন শিল্পোদ্যোক্তার কথায়ও।

বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বলেন, “বেশ কিছুদিন হচ্ছে কয়েকটি ব্যাংক ঋণ দেওয়ার জন্য বারবার ফোন করছে। তারা বলছে, স্যার আমাদের কাছে ভালো লোন প্রপোজাল আছে, ইন্টারেস্ট লো, রিপেমেন্ট ডিউরেশন বেশি, গ্রেস পিরিয়ড আছে ইত্যাদি। সবশেষে আমি স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক থেকে একটা লোন নিয়েছি।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল বলেন, “ঋণ বিতরণ কিছুটা কম হয়েছে- একথা সত্য। তবে যেসব ঋণ বিতরণ হচ্ছে সেগুলোর মান ভালো। বলতে হবে এবছর কোয়ালিটি ক্রেডিটের দিকে গেছে ব্যাংকগুলো।”

কিছু ‘খারাপ ঘটনার’ কারণে ব্যাংকগুলো সতর্ক হয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকও নজরদারি বাড়িয়েছে- একথা জানিয়ে তিনি বলেন, “যে কারণে এর আগে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২৫ শতাংশ হলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ। আবার এখন বেসরকারি খাতে ১৩ শতাংশ ঋণ বিতরণ হচ্ছে তাতেও অর্থনেতিক প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ আশা করা হচ্ছে।”

খেলাপি ঋণ
বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের বিভিন্ন সুবিধা দিলেও ২০১৫ সালে তা বেড়েছে। চলতি বছরের ৯ মাসে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪ হাজার ৫৫২ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৪ হাজার ৭০৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা; যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ৮৯ ভাগ। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫০ হাজার ১৫৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এবার ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা ব্যাংকারদের।

চলতি বছরের শুরুতে ৫০০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণ আছে এমন খেলাপি ঋণ গ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধের সুবিধার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালা চালু করে। এর অধীনে দেশের ১১টি বাণিজ্যিক গ্রুপ ১৫ হাজার ২০০ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করেছে। এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন কোম্পানির প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে।

এজেন্ট ব্যাংকিং
২০১৫ সালে ব্যাংকিং খাতের নতুন সংযোজন এজেন্ট ব্যাংকিং।

ব্যাংকিং সেবা প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬ জানুয়ারি এজেন্ট ব্যাংকিং নীতিমালা জারি করে। ইতোমধ্যে ছয়টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করেছে। এসব ব্যাংক সারা দেশে ৫০টির বেশি এজেন্ট কার্যক্রম শুরু করেছে। আরও ১২টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং করার জন্য কেন্দ্র্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিয়েছে।

আরটিজিএস
আন্তঃব্যাংক লেনদেনে এ বছর যুক্ত হয়েছে রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) ব্যবস্থা।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহযোগিতায় লেনদেনের নতুন এই ব্যবস্থা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ব্যবস্থায় আন্তঃব্যাংক লেনদেন নিমিষেই নিষ্পত্তি হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ৫৫টি ব্যাংকের পাঁচ হাজার শাখা এই ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে।

মোবাইল ব্যাংকিং
বর্তমানে দেশের লেনদেন সবচেয়ে আলোচিত ব্যবস্থা মোবাইল ব্যাংকিং। পাঁচ বছর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ব্যবস্থা চালু করলেও বর্তমানে ব্যাপক সমাদৃত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বর্তমানে সারা দেশে তিন কোটির বেশি মানুষের মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্ট রয়েছে। দৈনিক প্রায় ৫০০ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে এই ব্যবস্থায়। ২৮টি ব্যাংক মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস চালুর অনুমোদন নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। বর্তমানে ১৬টি ব্যাংক সাড়ে পাঁচ লাখ এজেন্টের মাধ্যমে এ সেবা দিচ্ছে।

পর্যবেক্ষক নিয়োগ
২০১৫ সালে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকিং কার্যক্রমে নজরদারি বাড়ানো এবং পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে আরও জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক, কৃষি ও বাংলাদেশ কমার্শিয়াল ব্যাংকের পর্ষদে পর্ষবেক্ষক দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বেসরকারি খাতের মার্কেন্টাইল ব্যাংকেও একজন পর্যবেক্ষক দেওয়া হয়েছে এ বছর।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে