Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.8/5 (8 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০১-০১-২০১৬

সময় এসেছে বিশ্বের সামনে দাঁড়ানোর

শিবব্রত বর্মন


সময় এসেছে বিশ্বের সামনে দাঁড়ানোর

ঢাকা, ০১ জানুয়ারী- ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট। ছিল বিদ্যুৎ উৎপাদন আর পানি শোধনের একটাই কর্তৃপক্ষ ওয়াপদা—ওয়াটার অ্যান্ড পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট অথোরিটি। এখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার লিমিটেড একাই বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে ১ হাজার ২৬০ মেগাওয়াট। ১৯৭২ সালে গোটা দেশে যে পরিমাণ বিমা ছিল, এখন শুধু বেসরকারি কোম্পানি গ্রিন ডেল্টা তার চেয়ে ১০ গুণ বিমা নিয়ন্ত্রণ করছে। দেশের সক্ষমতা কতটা বেড়েছে, এটা শুধু তারই প্রমাণ নয়। এ থেকে বোঝা যায়, দেশের বেসরকারি খাতের আকার কত বড় হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য আর শিল্পোৎপাদনের অধিকাংশ ক্ষেত্রে এখন বেসরকারি খাতের নেতৃত্ব।

‘এটা তো একটা দীর্ঘ যাত্রার শুরুমাত্র। আমরা সম্ভাবনার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছি। এখন গোটা বিশ্বের সঙ্গে আমাদের প্রতিযোগিতা।’ বলছিলেন মোহাম্মদ আজিজ খান—সামিটের চেয়ারম্যান, বিদ্যুৎ খাতে দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি উদ্যোক্তা। প্রথম আলোর সঙ্গে আড্ডায় তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন বিমা খাতের আরেক উদ্যোক্তা ফারজানা চৌধুরীর সঙ্গে।

আজিজ খানের সঙ্গে একমত ফারজানা চৌধুরীও। বললেন, ‘আমরা এখন বড় করে স্বপ্ন দেখতে পারছি। এখন দেশের গণ্ডির বাইরে আঞ্চলিক গণ্ডিতে ছড়িয়ে পড়ার কথা আমরা ভাবতে পারছি। ভাবতে পারছি বৈশ্বিক পর্যায়ের মাঠে নামার কথা।’

আজিজ খান মনে করেন, এই বিরাট বদলের পেছনে মূল চালিকা শক্তি দুটি। প্রথমত, জনসংখ্যাকে বোঝা হিসেবে না দেখে আশীর্বাদ হিসেবে দেখা। আমরা এখন ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কথাটা বলতে আর বুঝতে শুরু করেছি। দ্বিতীয়ত, চালিকা শক্তিটি হলো ইন্টারনেট। গোটা দুনিয়ার ৭০০ কোটি লোকের অর্ধেকের বেশি এখন একসঙ্গে একই জিনিস চিন্তা করতে পারে, দেখতে পারে। একটা সামাজিক ইন্টিগ্রেশন হয়েছে। এটা অকল্পনীয়।

দেশের প্রথম প্রজন্মের উদ্যোক্তা আজিজ খান বলেন, ‘আমরা যখন শুরু করি, তখন আমাদের অনুপ্রেরণা ছিল দেশের স্বাধীনতা। তখন আমাদের কাছে দেশেরও একটা অন্য রকম দাবি ছিল—অর্থনৈতিক মুক্তি। কিন্তু আমাদের বড় অসুবিধা কী ছিল? বাজার উন্মুক্ত ছিল না। একটা “লাইসেন্সিং রেজিম” বা ছাড়পত্র দেনেওয়ালা রাষ্ট্র ছিল। প্রতিটি জিনিস আমদানি করতে আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের কাছ থেকে ছাড়পত্র লাগত। প্রতিটা ডলার খরচ করতে অনুমতি নিতে হতো। এই বিধিনিষেধের বেড়াজাল চিন্তা করার ক্ষমতাকে, দৃষ্টিকে সংকীর্ণ, খর্ব করে রাখত। আপনি ভাবতেন, আপনার জন্য কেবল ছোট ছোট কাজের ক্ষেত্র খোলা। রাষ্ট্রই সমস্ত কাজ করবে। আমি বিদ্যুৎ খাতে কাজ করি, ফারজানা বিমা খাতে—দুটোই আগে রাষ্ট্রীয় খাতে ছিল। অন্য কারও ঢোকারই অনুমতি ছিল না। ফলে আমরা যখন ফারজানার বয়সে ছিলাম, তখন আমাদের সামর্থ্যই ছিল না খুব বড় কিছু চিন্তা করার। এই যে বড় পরিসরে চিন্তা করতে পারা, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চিন্তা করতে পারা, এটাই নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ, বড় সম্ভাবনা। আমি অপেক্ষা করে আছি, কখন ওদের মতো করে চিন্তা করতে পারব।’

ফারজানা চৌধুরী অবশ্য ব্যাপারটাকে শুধু একতরফা সুযোগ হিসেবে দেখতে চান না। তিনি বলেন, ‘মুক্ত বাজার নতুন নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করার পাশাপাশি প্রতিযোগিতাকেও তীব্র করে তুলেছে। আগে একটা ব্যবসায়িক চুক্তি হতে তিন-চার মাস লেগে যেত। এখন মাত্র এক দিনে একটা বিশাল আকারের চুক্তি করে ফেলা যাচ্ছে। এটা ভীষণ চাপও তো বটে। আমাদের পূর্বসূরিরা যেভাবে ব্যবসা করেছেন, সেভাবে আর ব্যবসা করা যাচ্ছে না। ব্যবসা বহুমুখী করতে হচ্ছে। নতুন নতুন পণ্য তৈরি করতে হচ্ছে অনবরত।’

তাহলে পুরোনো প্রজন্মের কাছ থেকে শেখার কিছুই কি নেই? ফারজানা চৌধুরী মনে করেন, অনেক কিছু শেখার আছে। সবচেয়ে বড় শিক্ষণীয় বিষয় হলো ধৈর্য। আজিজ খানদের প্রজন্ম একটা জিনিসের প্রতি লেগে থাকতে পারত। দ্বিতীয়ত, নীতি-নৈতিকতা। আগের প্রজন্ম ব্যবসায়িক নৈতিকতা মেনে চলত। এখনকার প্রজন্মের মধ্যে এর কিছুটা ঘাটতি লক্ষ করেন ফারজানা চৌধুরী।

দুই প্রজন্মের তফাত খুঁজতে গিয়ে আজিজ খান দেখতে পান, নতুনরা নতুন নতুন চাহিদা তৈরি করতে পারছে। তিনি বলেন, ‘ব্যবসার কাজ তো বাজারে যে চাহিদা আগে থেকেই বিদ্যমান, তার জোগান দেওয়া। কিন্তু এখন ফেসবুক, গুগল বা মাইক্রোসফট নতুন চাহিদা তৈরি করেছে, যেটা পৃথিবীতে আগে ছিল না। তবে এত কিছুর পরেও বনিয়াদটা কিন্তু একই রয়ে গেছে। আর তা হলো: সত্যবাদিতা আর কঠোর শ্রম। আপনাকে দিন-রাত কাজ করতে হবে। সেবা দেওয়ার মানসিকতাও থাকতে হবে। মনে করতে হবে, মানুষকে অবকাঠামো সেবা দেওয়াই সবকিছুর মূল লক্ষ্য।’

সফল উদ্যোগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পাশাপাশি উদ্ভাবনকেও সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন ফারজানা চৌধুরী। নতুন পণ্যই শুধু আনতে হচ্ছে না, তার চেহারাটাও বদলে দিতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো ধ্যানধারণা বদলানোই হয়ে দাঁড়াচ্ছে সবচেয়ে বড় উদ্ভাবনী কৌশল। বিশেষ করে বিমা খাতে এটা আরও বেশি দরকার হচ্ছে। এখানে পুরোটাই মান্ধাতা আমলের ধ্যানধারণায় পরিপূর্ণ। যে কারণে মাত্র ১ শতাংশ লোক বিমার আওতায়।

আজিজ খানও মনে করেন, এখন উদ্ভাবন আর বিনিয়োগ একে অপরের পরিপূরক। তাঁর মতে, তথ্যপ্রযুক্তি এমন একটা নতুন সমাজ তৈরি করেছে, যেখানে এলিটিজম বা আভিজাত্যবাদের আর কোনো স্থান নেই। এখন সবাই কাছাকাছি চলে এসেছে। ফলে এখন ব্যবসা ব্যাপারটাই আর আগের মতো নেই।

আজিজ খান বলেন, ‘আমাদের পরিচিতির ধারণাও বদল হয়েছে। একসময় একটা ট্রাইবাল ফিলিং বা কৌম চেতনা কাজ করত আমাদের মধ্যে। আমরা কে কোন জেলার লোক, তা দিয়ে নিজেদের শনাক্ত করতাম। এখন ফারজানার মতো মেয়েরা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের পরিচয় খুঁজছে। আগে অল্প কিছু লোকের হাতে জ্ঞান কুক্ষিগত ছিল। এখন সেটা উন্মুক্ত হয়ে গেছে। এই পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী ছিল।’

পুরোটাই কি সম্ভাবনার ছবি? কোনো ঝুঁকিই কি কোথাও ওত পেতে নেই?
আজিজ খান আর ফারজানা চৌধুরী দুজনেই মনে করেন, ধর্মীয় মৌলবাদিতার উত্থান একটা ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। কেননা, এর নানামুখী প্রতিক্রিয়া পড়ে। ক্রমই কাছে আসতে থাকা সমাজগুলো পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরে যায়। উন্মুক্ত সীমানা বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। মানুষের মন ছোট হয়ে যায়। তবে বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে বলে তাঁরা বিশ্বাস করেন।

পশ্চিমে, বিশেষ করে আমেরিকায় এক প্রজন্মে তৈরি করা সম্পদ জনসেবায় দান করে দেওয়ার যে উদাহরণ তৈরি হচ্ছে, সেটা আমাদের দেশে অনেক পুরোনো কাল থেকেই বিদ্যমান বলে মনে করেন এই দুই উদ্যোক্তা। আর সামাজিক সুরক্ষা জাল তো আমাদের সামাজিক গঠন কাঠামোর মধ্যেই আছে। কপর্দকশূন্য লোক বিপাকে পড়লে তার সমাজের বিত্তবান লোকটি এমনিতেই এগিয়ে আসে। এ কারণে এ দেশে দান-দক্ষিণার এ রকম আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দরকারই হয় না, যেটা পশ্চিমে দরকার হয়।

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে