Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (1 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০১-০১-২০১৬

২০১৫: আলোচিত ১০

সুলাইমান নিলয়


২০১৫: আলোচিত ১০

ঢাকা, ০১ জানুয়ারি- গাড়িতে পেট্রোল বোমা আর আগুনে পোড়ার শঙ্কা নিয়ে শুরু হয়েছিল খ্রিস্টীয় ২০১৫ সাল। কয়েক মাসের মধ্যে তা থেকে মুক্তি মিললেও একের পর এক মুক্তমনা লেখক-ব্লগার হত্যায় এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে পেরোয় সময়, বছরের শেষভাগে এসে বিদেশি হত্যা ও সাম্প্রদায়িক হামলায় তা অন্য মাত্রা নেয়।

সহিংস হরতাল-অবরোধের পর বছরজুড়ে যে সব ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছিল, ২০১৫ সালের বিদায় লগ্নে জেনে নেওয়া যাক সেই ঘটনাগুলো।    

তিন মাসের নাশকতা ও সিটি নির্বাচন
দশম সংসদ নির্বাচনের বর্ষপূর্তির কর্মসূচিতে বাধা পেয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ৫ জানুয়ারি থেকে দেশজুড়ে লাগাতার অবরোধের ডাক দেন। ফেব্রুয়ারিতে এর সঙ্গে হরতালও যুক্ত হয়। অবরোধে গাড়িতে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপসহ নাশকতার নানা ঘটনায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়।

ওই কর্মসূচির আহ্বানের দুই দিন আগে থেকে গুলশানের কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার টানা অবস্থানও আলোচনার জন্ম দেয়। এরই মধ্যে মালয়েশিয়ায় তার ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু হয়। এরপর একুশে ফেব্রুয়ারি ও স্বাধীনতা দিবসেও বের হননি তিনি। আদালতে হাজির না না হওয়ায় ২৫ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়।

এদিকে ক্রমেই কর্মসূচির তাপ স্তিমিত হয়ে আসতে থাকে, মার্চের মাঝামাঝিতে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আলোচনার শুরু হলে তাতে সুর মেলাতে থাকে বিএনপি।

৯১ দিন পর ৫ এপ্রিল খালেদা জিয়া বাসায় ফিরলে আন্দোলন কর্মসূচি কার্যত শেষ হয় কোনো ফল ছাড়াই। তবে স্পষ্ট করে বিএনপির পক্ষে কোনো বিবৃতি বা বক্তব্য আসেনি।

কয়েকমাস পর অক্টোবরে বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের চলাচলে সতর্কবার্তা জারির পর দলের নেতা আসাদুজ্জামান রিপন অবরোধ না থাকার কথা জানান।

এরমধ্যে গত ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন, যেখানে কারচুপির অভিযোগ তুলে ভোটের মাঝপথে সরে দাঁড়ান বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা।


হত্যা-হামলায় উদ্বেগ
বইমেলা উপলক্ষে স্ত্রীকে নিয়ে দেশে এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রকৌশলী বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়। ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বেরোনোর পর টিএসসি হামলার শিকার হন মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ। সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করে তাকে, চাপাতির আঘাতে আহত হন তার স্ত্রী রাহিদা আহমেদ বন্যা।

এরপর একে একে খুন হন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাশ, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়। হামলা হয় অভিজিতের বই প্রকাশকারী দুটি সংস্থার কার্যালয়ে। ধানমণ্ডিতে শুদ্ধস্বরের অফিসে হামলা চালিয়ে প্রকাশকসহ আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলসহ তিনজনকে গুলি করে ও কুপিয়ে আহত করা হয়। একই দিন কাছাকাছি সময়ে আজিজ সুপার মার্কেটে নিজের অফিসে খুন জাগৃতির প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন।

২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় খুন হন ইতালীয় নাগরিক চেজারে তাভেল্লা। এর এক সপ্তাহের মাথায় রংপুরে জাপানের নাগরিক কুনিও হোশি নিহত হন।

২২ অক্টোবর গাবতলীতে নিহত হন পুলিশের এএসআই ইব্রাহিম মোল্লা । এর ১৩ দিন পর আশুলিয়ায় খুন হন শিল্প পুলিশের কনস্টেবল মুকুল হোসেন, আহত হন আরও চারজন।

২৪ অক্টোবর পুরান ঢাকায় শিয়া সমাবেশে বোমা হামলায় একজন নিহত এবং অর্ধশতাধিক আহত হন। এর ৩৪ দিনের মাথায় বগুড়ায় শিয়া মসজিদে গুলিতে একজন প্রাণ হারান।

১৮ নভেম্বর দিনাজপুরে গুলিতে আহত হন ইতালিয়ান ধর্মযাজক  পিয়েরো পারোলারি। ১৮ ডিসেম্বর হামলা হয় চট্টগ্রামের নৌঘাঁটি ঈশা খাঁ’র মসজিদে, যাতে অন্তত ছয়জন আহত হন।

২৫ ডিসেম্বর রাজশাহীতে আহমদিয়া মসজিদে আত্মঘাতী হামলা হয়, যেখানে হামলাকারী নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হন।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস বছরব্যাপী এই সব হামলার অনেকগুলোর দায় স্বীকার করে বলে খবর এলেও সরকারের পক্ষ থেকে তা নাকচ করা হয়।

তিন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে শীর্ষ পর্যায়ের তিন যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর হয়েছে এ বছর। টান টান উত্তেজনার মধ্যে গত ২২ নভেম্বর ফাঁসি কার্যকর হয় একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যায় নেতৃত্ব দেওয়া বদর বাহিনীর কমান্ডার আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর।

একাত্তরের এই দুই ভয়ঙ্কর খু্নির ফাঁসি সর্বোচ্চ আদালতে বহাল থাকার পরও তাদের দণ্ড কার্যকর হওয়া নিয়ে সংশয় ছিল অনেকের মধ্যে।

এর আগে গত এপ্রিলে ফাঁসি কার্যকর হয় জামায়াতের অন্যতম সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল যুদ্ধাপরাধী মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একাত্তরের আরেক শীর্ষ অপরাধী জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর আপিলের রায় হবে আগামী ৬ জানুয়ারি।

এছাড়া সাজাপ্রাপ্ত আরও নয়জন যুদ্ধাপরাধীর আপিল আবেদন রয়েছে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়, যাদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে জামায়াত নেতা মীর কাসেমের মামলা।

২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর সেখান থেকে এ পর্যন্ত ২১টি রায় এসেছে, যার মধ্যে চলতি বছর এসেছে ছয়টি।


ছিটমহলে স্বাধীনতার স্বাদ
১৯৪৭ সালে দেশভাগের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হলেও সীমানাচক্রে বন্দি হয়ে যাওয়া ছিটমহলবাসী স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে ৬৮ বছর পর।

বছরের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফর ঘিরে এগিয়ে যায় ছিটমহল হস্তান্তর প্রক্রিয়া।

সফরের এক মাস আগে বাংলাদেশের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময়ে ভারতের সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব দেশটির সংসদের উভয়কক্ষে পাস হয়। পরে নরেন্দ্র মোদী ঢাকায় এলে সীমান্ত চুক্তি অনুসমর্থনের দলিল বিনিময় করে বাংলাদেশ ও ভারত।

এই পথ ধরে এ বছরের ১ অগাস্ট বিনিময় হয় ছিটমহল, যাতে মুক্তি মিলে নানা জটিলতায় প্রায় ৭ দশক বন্দি জীবন কাটানো অর্ধলক্ষাধিক ছিটমহলবাসীর।

১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি হওয়ার পর ছিটমহল বিনিময়ে বাংলাদেশ সব প্রক্রিয়া শেষ করলেও ভারতের সংবিধান সংশোধনী না হওয়ায় তা আটকে থাকে দীর্ঘদিন।

মোদীর ওই সফরে আঞ্চলিক কানেক্টিভিটির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া। কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা এবং ঢাকা-শিলং-গুয়াহাটি রুটে বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করেন দুই প্রধানমন্ত্রী।

পাশাপাশি উপকূলীয় নৌ চলাচল চুক্তি, বাণিজ্য চুক্তির নবায়ন, অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন প্রটোকল স্বাক্ষর হয়।


সাগরে অনিশ্চিত যাত্রা
এ বছরের একটা বড় সময় বিশ্বজুড়ে আলোচনায় ছিল অবৈধভাবে অভিবাসন প্রত্যাশীদের দুর্ভোগ। সিরিয়াসহ যুদ্ধ কবলিত বিভিন্ন দেশ থেকে ইউরোপের উদ্দেশ্যে যাত্রাকারীদের পাশাপাশি দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় অভিবাসন প্রত্যাশীদের দুঃখচিত্রও উঠে আসে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে।

গত এপ্রিলে প্রথম দক্ষিণ থাইল্যান্ডের জঙ্গলে পাচারকারীদের পরিত্যক্ত এক ক্যাম্পে অভিবাসীদের গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। পরে থাইল্যান্ডের পার্বত্য এলাকায় জীবিত অবস্থায় শতাধিক অভিবাসীর সন্ধান মেলে। গণকবর মেলে মালয়েশিয়ায়ও।

এই দুই দেশের ঘন জঙ্গলের গণকবর থেকে লাশ, কংকাল উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি জীবিত অনেককেও উদ্ধার করে সংশ্লিষ্ট দেশের পুলিশ, যাদের মুক্তিপণের জন্য আটকে রাখা হয়েছিল।

এরপর অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেয় থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া। সাগরে জাহাজভর্তি মানুষ রেখে পালিয়ে যায় পাচারকারীরা। সে সময় তীরে ভিড়তে গেলে  আশ্রয়প্রত্যাশীদের ফিরিয়ে দেওয়ায় আন্দামান সাগরে মানবিক সঙ্কট তৈরি হয়।

মূলত মিয়ানমার থেকে এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশের কক্সবাজার উপকূল থেকে অবৈধ অভিবাসীবাহী এই নৌকাগুলো রওনা হয় বলে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো জানায়।

মিয়ানমারে নির্যাতনে বাঁচার আশায় রোহিঙ্গারা সাগর পাড়ি দিয়ে আশেপাশের দেশ, বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করে আসছেন। আর বাংলাদেশ থেকেও নৌকা বা মাছ ধরার ট্রলারে করে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা ঘটছে নিয়মিত। পাচারকারীরা এ  সুযোগটি কাজে লাগায়।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাসে প্রায় ২৫ হাজারের মতো বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা মানব পাচারের শিকার হন, যা আগের বছরের থেকে দ্বিগুণ।

সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মিয়ানমারের হাতে পড়া বেশ কিছু নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করে কয়েক দফায় তাদের দেশে ফেরত আনে বাংলাদেশ সরকার।

আলোচনা-সমালোচনায় রাজনীতিক
ঠিক রাজনীতির ঘটনা না হলেও বেশ কিছু ইস্যুতে আলোচনা-সমালোচনায় বছরব্যাপী শিরোনাম হয়েছেন রাজনীতিকরা।

বিএনপির অবরোধের মধ্যে ঢাকা থেকে ‘উধাও’ হন দলটির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন, যিনি অজ্ঞাত স্থান থেকে বিবৃতি পাঠিয়ে কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানাচ্ছিলেন।

গত ১০ মার্চ রাতে উত্তরার একটি বাসা থেকে পুলিশ তাকে ‘ধরে নিয়ে যায়’ বলে পরিবার অভিযোগ করলেও তার কোনো খোঁজ মিলছিল না। দুই মাস পর গত ১১ মে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলংয়ে হদিস মেলে এই বিএনপি নেতার, অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে বর্তমানে সেখানে তার বিচার চলছে।

এ বছরের ৯ জুলাই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে। তার স্থলাভিষিক্ত হন প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় খন্দকার মোশাররফ হোসেন। এক সপ্তাহের মধ্যে আশরাফকে জনপ্রশাসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হওয়ার পরের মাসে সাংবাদিক প্রবীর শিকদারের ফেইসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে ফের আলোচনায় আসেন মোশাররফ।

নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করতে না পারায় এই সাংবাদিক যে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন, তাতে অভিযোগের আঙুল মন্ত্রীর দিকেও ছিল। এজন্য মন্ত্রীর মানহানির অভিযোগে প্রবীরের বিরুদ্ধে মামলার পর গ্রেপ্তার সাংবাদিককে রিমান্ডে নেওয়া হয়। ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে তীব্র প্রতিবাদের মধ্যে পরদিনই মুক্তি পান তিনি।

গত ১৩ এপ্রিল রাতে নিউ ইস্কাটনে জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে। মামলা দায়েরের সময় আসামি অজ্ঞাত থাকলেও তদন্তে বেরিয়ে আসে সরকার দলীয় সাংসদ পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনির নাম।

গভীর রাতে মাদকাসক্ত অবস্থায় ‘সামান্য’ যানজটে পড়ে রনি এলোপাতাড়ি গুলি চালালে এক অটোরিকশা ও রিকশাচালকের মৃত্যু হয় বলে পুলিশি তদন্তে বলা হয়।

এরপর ছেলেকে বাঁচানোর চেষ্টার অভিযোগ উঠে সাংসদের বিরুদ্ধে। পরে অবশ্য গ্রেপ্তার হন রনি। তদন্ত শেষে রনির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

গত ২৩ জুলাই মাগুরায় সরকার সমর্থক দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হন অন্তঃস্বত্ত্বা নাজমা, যাতে বিদ্ধ হয় গর্ভস্থ সন্তানও।

সেদিনই মাগুরা হাসপাতালে ভূমিষ্ঠ হয় নাজমার কন্যা, পরে যাকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ২৪ দিন নবজাতক বিভাগের আইসিইউতে রাখার পর শিশুটিকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

গত ২ অক্টোবর গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ সদস্য লিটনের ছোড়া তিন গুলিতে শাহাদাত হোসেন সৌরভ নামে নয় বছরের এক শিশু আহত হয়। এই শিশুর বাবা সাজু মিয়ার মামলায় লিটন গ্রেপ্তার হলেও তিন সপ্তাহ পর জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসেন।

নারায়ণগঞ্জের সাতখুনের আসামি নূর হোসেনকে ১২ নভেম্বর ভারত থেকে দেশে আনা হয়, যিনি ২০১৪ সালে ১৪ জুন কলকাতায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এরআগে ওই সপ্তাহেই ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা অনুপ চেটিয়াকে ফেরত পাঠানো হয়, যিনি ১৮ বছর বাংলাদেশের কারাগারে ছিলেন।

শিশু হত্যায় দ্রুততম বিচার
এক মাসের ব্যবধানে নির্যাতনে শিশু হত্যার দুই ঘটনা আর বাংলা বর্ষবরণে নারীদের যৌন হয়রানির ঘটনা নাড়া দিয়েছিল পুরো দেশকে।

বছর শেষে সিলেটের সেই রাজন এবং খুলনার রাকিব হত্যার ঘটনায় ৭ নভেম্বর ৬ জনের সর্বোচ্চ সাজার রায় এলেও টিএসসিতে যৌন হয়রানির ঘটনায় কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।

গত ৮ জুলাই চুরির অভিযোগ তুলে সিলেটে ১৩ বছরের রাজনকে হত্যা করা হয়, যার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তোলপাড় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ৩ অগাস্ট খুলনায় হাওয়া দেওয়ার কমপ্রেসার মেশিনের মাধ্যমে মলদ্বারে হাওয়া ঢুকিয়ে হত্যা করা হয় রাকিবকে।

হত্যার ঠিক চার ও তিন মাসের মাথায় মামলার রায় আসার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল।

গত ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের উৎসবের মধ্যে সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফটকে ভিড়ের মধ্যে একদল যুবক নারীদের ওপর চড়াও হয়। পরে সার্কিট ক্যামেরার ছবি দেখে আট নিপীড়ককে চিহ্নিত করার কথাও পুলিশ প্রধান এ কে এম শহীদুল হক জানিয়েছিলেন।

তবে ওই ঘটনায় জড়িত কাউকে শনাক্ত করা যায়নি উল্লেখ করে বছরের শেষ দিকে এসে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ।

ছাত্রবিক্ষোভে ভ্যাটছাড়
গত বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে টিউশন ফির ওপর ভ্যাট আরোপ করা হলে এর প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। ৯  সেপ্টেম্বর রামপুরায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পরদিন সারা দেশে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়।

এরপর ভ্যাটের দায় শিক্ষার্থীদের নয় বলে সরকার ব্যাখ্যা দিলেও আন্দোলন থামেনি। আন্দোলনের এক পর্যায়ে ঢাকা কার্যত অচল হয়ে পড়ার মধ্যে ১৪ সেপ্টেম্বর ভ্যাট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় সরকার।

এ বছর নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে নানা কর্মসূচিতে আন্দোলনের মাঠে ছিলেন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। অর্থমন্ত্রীর আশ্বাসে আন্দোলনে বিরতি দেন। প্রজ্ঞাপনের পর অর্থমন্ত্রীর ‘প্রতিশ্রুতির বরখেলাপে’ ফের মাঠে নামেন তারা। সব বিশ্ববিদ্যালয় ‘শাটডাউনের’ হুমকি রয়েছে তাদের।

অসদাচরণ-দুর্নীতির অভিযোগে সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আমিনুল হকের পদত্যাগে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনাও এ বছর বেশ আলোচিত হয়েছিল। ৩০ অগাস্টের এই হামলার পর ওই ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হলেও সেপ্টেম্বরে কোরবানীর ঈদের ছুটির পর তা ম্রিয়মান হয়ে পড়ে।

সরকারি সিদ্ধান্তে বিরতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে
দুই যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মো. মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতির মধ্যে  নিরাপত্তার কথা বলে গত ১৮ নভেম্বর বাংলাদেশে ফেইসবুক, ভাইবার ও হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ করে সরকার।

দুই বিদেশি নাগরিক হত্যা ও পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে হামলার ঘটনার পর জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের যোগাযোগের পথ বন্ধ রাখার কথা বলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

২২ দিন পর গত ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফেইসবুক খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু এর তিন দিনের মাথায় ১৩ ডিসেম্বর রাতে টুইটার, স্কাইপ ও ইমো বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরদিন সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অ্যাপ খুলে দেওয়া হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধের দিন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রায় দেড় ঘণ্টা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বাংলাদেশ।

ফেইসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের অন্য মাধ্যমগুলো দ্রুত খুলে দেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। এই সময়ে বিকল্প পথে অনেকেই ফেইসবুক ব্যবহার করেন।

ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যমে কড়াকড়িতে আউটসোর্সিং, অনলাইন মার্কেটিংসহ বিভিন্ন ব্যবসা বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ে।

চলতি বছরের শুরুতে বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোটের হরতাল-অবরোধের সময়ও ‘ভাইবার’ ও ‘হোয়াটসঅ্যাপ’সহ ইন্টারনেটে যোগাযোগের কয়েকটি মাল্টিমিডিয়া অ্যাপ কয়েক দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়।


ক্রিকেটে বাংলাদেশের বছর
ক্রিকেটে বাংলাদেশের বছর শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপের দিকে তাকিয়ে। ছিল স্বপ্ন, তার চেয়েও বেশি ছিল শঙ্কা। অস্ট্রেলিয়া-নিউ জিল্যান্ডের প্রতিকূল উইকেট-কন্ডিশন ছিল বড় বাধা, সঙ্গে ২০১৪ সালে বছরজুড়ে বাজে পারফরম্যান্সের দুঃসহ স্মৃতি।

কিন্তু ফেব্রুয়ারি-মার্চে ক্রিকেটের বিশ্ব আসরে সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাংলাদেশ আবির্ভূত হয় নতুন রূপে। আফগানিস্তান ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে স্নায়ুচাপের দুই ম্যাচ জয়ের পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে রোমাঞ্চকর জয়ে বাংলাদেশ পা রাখে কোয়ার্টার-ফাইনালের মঞ্চে। এটাই ক্রিকেটের বিশ্ব আসরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

সেমি-ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে অবশ্য অনেক বিতর্কের ম্যাচে বাংলাদেশে হেরে যায় ভারতের কাছে।

বিশ্বকাপে প্রথমবার কোয়ার্টার-ফাইনাল খেলতে পারা অবশ্যই দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কিন্তু সেই সাফল্যের ধারা অব্যাহত ছিল বিশ্বকাপের পরও। বছরজুড়েই ক্রিকেটে ছিল ‘উল্লেখযোগ্য’ ঘটনার ছড়াছড়ি।

বিশ্বকাপের পর বাংলাদেশের প্রথম শিকার পাকিস্তান। যে দলের বিপক্ষে ১৬ বছর ধরে জয়ের খোঁজে হাপিত্যেশ করেছে বাংলাদেশ, নিজেদের আঙিনায় এবার সেই দলকেই মাশরাফি বিন মুর্তজার দল ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করে! বাংলাদেশ জিতেছিল একমাত্র টি-টোয়েন্টিও।

খুলনায় তামিম ইকবাল ও ইমরুল কায়েসের রেকর্ড জুটিতে টেস্ট ড্র হলো বাংলাদেশের দাপটে।

সেই সাফল্যের রেশ থাকতে থাকতেই প্রথমবারের মত ওয়ানডে সিরিজ জয় এল ভারতের বিপক্ষে। আবির্ভাবেই ইতিহাস গড়লেন বাঁহাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমান।

উপমহাদেশের দুই ক্রিকেট পরাশক্তি বধের পর সাফল্যজালে ধরা দিল দক্ষিণ আফ্রিকাও, যাদের মনে করা হয় চূড়ান্ত পেশাদার দল। প্রথম ম্যাচে হেরেও পরে ওয়ানডে সিরিজ জিতে বাংলাদেশ উতরে গিয়েছিল মানসিক শক্তির পরীক্ষায়।

বড় তিন দলের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক সিরিজ জয়ের পর হুট করেই আবার স্লায়ুর পরীক্ষা। অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে না আসায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল জিম্বাবুয়েকে। প্রত্যাশিত হোয়াইটওয়াশ দিয়েই সাফল্যে মোড়ানো বছর শেষ করেছে মাশরাফিরা।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে