Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.8/5 (74 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১০-১৪-২০১৫

বিশ্ব রাজনীতিতে ধর্ম কেন প্রাধান্য পেল

আকতার হোসেন


বিশ্ব রাজনীতিতে ধর্ম কেন প্রাধান্য পেল

সেপ্টেম্বর ২০১৫ আমাদের জন্য রেখে গেল অনেক প্রশ্ন অনেক কৌতূহল। এই মাসের পত্রিকাগুলো হাতে নিলে দেখা যাবে হঠাৎ করেই একটি বিষয় উত্তপ্ত করে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট, যুক্তরাজ্য, কানাডা, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীসহ পূর্ব-পশ্চিমের অনেক সরকার প্রধানদের বক্তব্যে ছিল অভিন্ন একটি সুর, সেটা হল ‘ধর্ম-শক্তি’। এই শক্তির চাপে অনেক সরকার প্রধান ভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের জন্য এ যাবত কি কি করেছেন তার ফিরিস্তি দিচ্ছেন প্রচার মাধ্যমে। অনেকে আবার ধর্ম-শক্তি নিয়ে দিচ্ছেন রক্ষণশীল মতামত। কেউবা প্রকাশ্যে করেছেন কটাক্ষ। বোঝা যাচ্ছে আমাদের পূর্বপুরুষের ধর্মবিশ্বাস এবং তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মবিশ্বাস এখন রাজনীতিতে তুরুপের তাসের মত শক্তি সঞ্চয় করছে। যুগ-পরিক্রমায় ধর্মবিশ্বাস নিয়ে এমন অবস্থায় পড়তে হবে সেটা হয়তো আগে বোঝা যায় নি। বিশ্বের সর্বোচ্চ আকর্ষণীয় রাজনৈতিক ভবন থেকে শুরু করে অপেক্ষাকৃত ছোট বড় সব দেশের রাজনীতিবিদদের একটাই লক্ষ্য তা হল বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসীদের এই বলে আশ্বস্ত করা যাতে তাদের মধ্যে নিশ্চয়তা আসে এবং তারা যেন বুঝতে পারে ধর্ম পালনে কোন বাধা নেই, এমন কি তারা ভিনদেশি হলেও না। সব ধর্মের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠা এখন বড় বড় রাজনীতিবিদদের লক্ষ্য। বিশেষ করে যে সমস্ত দেশে নির্বাচনী হাওয়া বইছে সে সমস্ত দেশে এই কথা অনেক বেশি সত্য। সন্দেহ নেই এই দৃষ্টিভঙ্গি বিভিন্ন দেশের জনপদকে দ্বিধাবিভক্ত করেছে এবং অসংখ্য কটুকথার জন্ম দিচ্ছে। ভোট বাক্সে ধর্ম একটা অদৃশ্য সীলমোহর হয়ে কাজ করছে। সোজা কথায় ধর্ম এখন বড় রাজনীতি।  

আপাত: দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে এতদিন ধর্মকে ঢাল বানিয়ে  যারা এগিয়ে চলছিলেন তাদের খণ্ডকালীন বিজয় হয়েছে। অতীতেও হয়তো ধর্ম এভাবেই কোন কোন স্থানে বিস্তার লাভ করেছিল। কাজেই বর্তমান সময়ের এই অর্জন ধর্মের পতাকা তলে সঙ্ঘবদ্ধদের মনে বাহবা জোগালেও সাধারণ ধর্মানুসারীদের অনেক জ্বালাযন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে। কিছু হৃদয় বিদারক খবর দেখে সাধারণ নাগরিকেরা রীতিমত হতাশ। অনেকে বোঝাবার চেষ্টা করছে ধর্মের নাম নিয়ে করা সমস্ত মন্দ কাজ আসলে মন্দদের কাজ, তাতে ধর্মের কোন নির্দেশ নেই। যে যার মত পারে যুক্তি দিয়ে যাচ্ছে, ধর্মের আলোকিত দিকগুলো তুলে ধরছে কিন্তু অনেক বলাবলি করেও সব সন্দেহ দূর করা যাচ্ছে না।

আমাদের ছোট বেলায় মানে চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগে কিন্তু ধর্ম এভাবে বিশ্ব রাজনৈতিক প্লাটফর্মে উচ্চারিত হত না। ছোট বেলায় ধর্ম বলতে আমরা বুঝতাম ধর্মবিশ্বাসী হিসাবে আমি মহান সৃষ্টিকর্তাকে ডেকে যাব আর তিনি তার পবিত্র আসনে বসে ভাল-মন্দ সিদ্ধান্ত নেবেন। তাঁর এবং আমার মাঝে অন্য কারোর আশ্বাস পাবার প্রয়োজন ছিল না। এই বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছিল যার যার ধর্ম। আমাদের ছোট বেলায় ধর্ম স্কুলে-কলেজে যেত না। শুধুমাত্র পছন্দ মত পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকত। পাড়া-প্রতিবেশী কেউ কাউকে ধর্মের ধমক দিতেন না। মোট কথা আমরা ছোটবেলায় ধর্ম-ভয়ে কাতর থাকতাম না। রাষ্ট্রপতির কাছেও নালিশ জানাতাম না। ধর্ম তখন ছিল উপলব্ধির বিষয়, নিয়মনীতি মেনে পালন করার ব্যাপার। 

ধর্মের সাথে আমাদের সখ্যতা হত পরিবার থেকে। তারপর দিনের শেষে কিংবা সপ্তাহের বিশেষ দিনে একজন সহজ সরল মানুষের কাছ থেকে নিতে হত ধর্ম বিষয়ক অক্ষরজ্ঞান। মহল্লার কেউ সন্দেহ করতেন না যে ছেলেটা কি ধর্মে বিশ্বাস করে নাকি ধর্ম বিষয়ে অজ্ঞ। মুরব্বিরা বলতেন ভাল আছো? বেঁচে থাক বাবা। তখনকার দিনে একজন মানুষ অন্য মানুষকে সরল মনে আশীর্বাদ করতেন এখনকার মত ধর্মকে আশীর্বাদ করতে হত না তখন। ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু বললে জিভ কেটে নেয়া এবং বিবিধ কাটাকাটির কথা শোনা যেত না তখন। তবে তখনও ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীবদ্ধ শক্তি নিয়ে ধর্মের নামে হানাহানি করেছে কিছু মানুষ। সব যুগেই তাদের অনাচার হয়েছে। পার্থক্য হল এখনকার মত সর্বসাধারণের মাঝে ভয়ের কারণ হয়ে উঠেনি ধর্ম-শক্তি। এখন ধর্ম আতঙ্ক যেভাবে বুকের উপর ভারী হয়ে উঠেছে তেমন ছিল না আমাদের ছোটবেলায়। 

কারো কোন মাথাব্যথা থাকতো না যদি ধর্মের নামে বিশ্ব ঐক্য গড়ে উঠত। কিন্তু ঐক্যের বদলে শক্তি প্রকাশ করাটাই সমস্যা তৈরি করেছে। আরো একটি সমস্যা হচ্ছে আধুনিক যুগে ক্ষমতায়নের জীর্ণ ব্যবস্থা। মানে, মাথাপিছু ভোট এবং সেই ভোটের ধাক্কায় রাজনৈতিক ক্ষমতার শিখরে গিয়ে পৌঁছানো। বিদেশে বাড়িতেও দেখছি নির্বাচন মৌসুমে ধর্মের আচ্ছাদন মাথায় বেঁধে অন্যের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে গিয়ে হাজির হচ্ছে ভোট প্রার্থীরা। সেগুলো আবার খবরের শিরোনাম হয়ে জনগণের কাছে পৌঁছে যায় চোখের পলকে। যে সমস্ত ধর্মীয় প্রার্থনাকেন্দ্রে গিয়ে সহমর্মিতার কথা বলে আসেন ভোট প্রার্থীরা সেই সমস্ত কেন্দ্রের কর্তা ব্যক্তিরাও নিজেদের ভোট বাক্স কিভাবে ভরা হবে তা নিয়ে আলোচনায় বসেন। স্বাভাবিক ভাবেই তাই বেড়ে উঠেছে ধর্মকে নিয়ে রাজনীতি করার সুফল। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোন প্রার্থীই ভোটারদের খ্যাপাতে চায় না। সে কারণে ভোটবাক্স বড় করতে তৃতীয় একটি পক্ষ অনেক বেশি তৎপর। সম্ভবত তাদের ইশারাতেই মানুষের মধ্যে আচরণগত পরিবর্তন এসেছে। অচিরেই এই ভোট ভয় থেকে বেরিয়ে আসত না পারলে আবারো রাষ্ট্র ব্যবস্থা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অধীনে চলে যেতে পারে। কেননা ধর্ম এখন ব্যক্তিগত বিষয় নয় এখন সঙ্ঘবদ্ধ শক্তি। 

মনে হচ্ছে পরিকল্পনা করেই ধর্মকে মাঠে নামানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল হয় ধর্মকে পুঁজি করে মুনাফা অর্জন করা নতুবা বিশেষ কোন ধর্মকে তর্ক বিতর্কের ভেতর ফেলে দিয়ে সেই ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে কোণঠাসা করা। অদৃশ্য শক্তিতে বিশ্বাস রাখা যে সমস্ত ধর্মের ভিত সেই সমস্ত ধর্মানুসারীরাও এই বিশেষ পক্ষের ইঙ্গিতে কিছুদিন যাবত দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। অন্তরের অনুভূতি এখন শরীরে ভর করে হেঁটে বেড়ায়। ধর্ম এখন জাগতিক। ধর্ম এখন চোখে দেখা যায়।  

বিশ্বের কথা বাদ দিয়ে নিজেদের কথা বললেও দেখা যাবে ধর্মের জন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে বাংলাদেশেও। ধর্ম সুরক্ষার খাতিরে সেনাপতি, বিচারপতি এবং বিলিয়ে যাওয়া লোকের অভাব নেই। মহান সৃষ্টিকর্তার মহিমা নিয়ে হয়তো কারো কারো মনে সংশয় দেখা দিয়েছে তাই তারা এগিয়ে এসেছে এই ভেবে, সৃষ্টিকর্তার জন্য যদি কিছু করা যায় তাহলে ব্যাপারটা মন্দ হবে না। খোদ সৃষ্টিকর্তাকে সাহায্য করতে পারা মানে পুরস্কারের ভাণ্ডার খুলে যাওয়া। পুরস্কারের লোভে অসীম ক্ষমতাবানকে দুর্বল করে দেখছে কেউ কেউ। ভাবছে তিনি একা একা কত আর করবেন, তাঁর কিছু কাজ নিজ হতে করে দিতে পারলে জীবন ধন্য হয়ে যাবে। এভাবেই এক থেকে একাধিক রক্ষক এগিয়ে এসেছে, গড়ে তোলা হয়েছে রক্ষণশীল মতবাদ। 

ধর্ম প্রচারের বদলে ধর্মকে রক্ষার নামে যারা দলবদ্ধ হয় তাদের প্রাথমিক কাজ হল কলম-দোয়াত থেকে সাধারণ মানুষকে বিরত রাখা। চিন্তাশক্তি অন্ধকারাছন্ন করে রাখা। পরশ লেখক কিংবা আলোকিত মানুষকে বিতর্কে নিয়ে আসা। করনীয় বর্জনীয় তালিকা তৈরি করে সেগুলো ছড়িয়ে দেয়া। এত কিছুর পরও বিপদ থেকে রক্ষা পাবার জন্য সৃষ্টিকর্তার নামের পেছনে লম্বা লাইন তৈরি করা হয়। যে সমস্ত মানুষ লাইনে দাঁড়ায় না তাদেরকে বলা হয় লাইনচ্যুত। ক্ষমতা হারানোর আশংকায় লাইনচ্যুত মানুষদের তালিকা দীর্ঘ হতে দেয়া হয় না।  

বাংলাদেশে ধর্মীয় বিদ্বেষের তাড়া খেয়ে আজ বিভূতিভূষণ হারিয়ে গেছেন। কেটে কুটে রবীন্দ্রনাথ এখনো বেঁচে আছেন তবে তাও কতদিন বলা মুশকিল। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ জব্বর খান, আকরাম খানের নাতি-নাতনিতে ভরা। যদিও মাদ্রাসাগুলো এখনো ইংরেজ যুগের মত অপরিবর্তিত। কিরণচন্দ্রের ছেলে কিংবা হরিনাথের নাতিকে দু’বেলা খেয়ে পরে বাঁচতে এখনো এতিমখানায় পাঠানো হয় না কিংবা তাদের এখনো গ্রহণ করে না এতিমখানার কর্তৃপক্ষ। নামের সাথে চন্দ্র-শশী থাকলে তারা চলে যায় আশ্রমে। বাস্তবতা হল দুপক্ষ থেকেই তারা এতিম। সংখ্যায় কম এই ওজুহাতে এখন অধিকার আদায়ের কথা বলতে অনেকে ভয় পায়। যদিও চিরকাল অধিকারের জন্য গলা ফাটিয়ে এসেছে বঞ্চিতরা। বিদেশের বাড়িতে “দৃশ্যমান সংখ্যালঘুরা” অনেক অধিকার আদায় করে নিচ্ছে অথচ জন্মভূমিতে সে আশা ছেড়ে দিয়েছেন অনেকে। আশা ছিল রাম-রহিমের চিরাচরিত সৌহার্দ্যের গল্প এতদিন পর্যন্ত টেনে বেড়াতে হবে না। এতদিনে সেই গল্প বিলীন হবার কথা ছিল। সংহতি আর সহমর্মিতার কথা আর কত! আশা করা হয়েছিল সহনীয় অবস্থার বদলে আসবে সমঅধিকার। বাংলাদেশে কেউ বড় ভাই আর কেউ ছোট ভাই থাকবে না, সবাই হবে ভাইভাই। প্রত্যাশা ছিল সংখ্যা দিয়ে বিচার করা হবে না কাউকে সে যদি একজনও হয়। এমন বাংলাদেশ হবার সম্ভাবনা এখন ক্ষীণ হয়ে গেছে। 

দুঃখজনক হলেও সত্য যে আজও বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ কিছু না কিছুকে অবলম্বন করে লতার মত বেড়ে উঠছে। অবলম্বন ছাড়া সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই তাদের। সেই অবলম্বনটা যখন হয় ধর্ম, তখন ধর্মে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় সোজা হবার শক্তি। তাইতো ডান কিংবা বাম যেদিকেই বাঁকুক লাইন, সে লাইন এখন বিশ্ব রাষ্ট্রপতিদের দাপ্তরিক ভবনে গিয়ে ঠেকেছে এবং সেখান থেকেই ভেসে আসছে নিত্যনতুন আশ্বাস। মনের গভীরে যে নির্মলতা সেটা পড়ার অনাগ্রহ হলে রাষ্ট্রপতিরা মনের মধ্যে বাসা বাঁধতে শুরু করবে এবং অচিরেই তাদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ সেটা নিয়ে ভীষণ লড়াই হবে। আমরা কি সেই লড়াই দেখার জন্য প্রস্তুত? 

মুক্তমঞ্চ

  •  1 2 > 
Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে