Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.5/5 (24 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৮-২৩-২০১৫

হুকুমের আসামি

আসিফ নজরুল


হুকুমের আসামি

এম কে আনোয়ার একজন কৃতী আমলা ছিলেন। সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর বিএনপিতে যোগ দিয়ে তিনি কয়েকবার সাংসদ ও মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
এম কে আনোয়ারের এখন বয়স ৮৪ বছর। তাঁকে একটি পেট্রলবোমার মামলায় আসামি করা হলে তিনি জামিনের জন্য কুমিল্লার আদালতে হাজির হন। বিচারকের কাছে তাঁর কর্মজীবনের ফিরিস্তি দিয়ে বলেন, ‘৮৪ বছর বয়সে ঢাকায় বসে চৌদ্দগ্রামে পেট্রলবোমা হামলার ইন্ধন দেব, এটা আপনার বিশ্বাস হয়?’ এম কে আনোয়ারের নাম ওই মামলার এজাহারে ছিল না। তবু তাঁর জামিনের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। বৃদ্ধ এই রাজনীতিককে কুমিল্লা কারাগারে পাঠানো হয়।
পুলিশ বলেছে, এম কে আনোয়ার নাকি হুকুমের আসামি! হুকুমের আসামি বলে কোনো শব্দযুগল বাংলাদেশের অপরাধ আইনে পাওয়া যাবে না। তবে প্ররোচনার যে অপরাধসমূহের বর্ণনা পেনাল কোডের ১০৭ থেকে ১২০ ধারায় আছে, তাতে কোনো অপরাধের নির্দেশ বা হুকুমদানকেও অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করা আছে। পেনাল কোডের ধারাগুলোতে প্ররোচনা (এবেটমেন্ট) অপরাধের যে উদাহরণগুলো আছে, তাতে অবশ্য রাজনৈতিক প্ররোচনার ঘটনা খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু তাই বলে কি রাজনৈতিক সহিংসতায় কোনো প্ররোচনা থাকে না? থাকে।

২০১৫ সালের শুরু থেকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের হরতাল-অবরোধ চলাকালে পেট্রলবোমার নারকীয় ঘটনায় বহু সাধারণ মানুষের করুণ মৃত্যু ঘটে। এসব ঘটনায় যাঁরা গ্রেপ্তার হন, তাঁদের বেশির ভাগ ছিলেন বিএনপি-জামায়াতের কর্মী। আবার কয়েকটি ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা ছিলেন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের কর্মী। বিএনপি দাবি করেছিল যে পেট্রলবোমার ঘটনা আওয়ামী লীগই ঘটিয়েছে বিএনপির আন্দোলনকে কালিমালিপ্ত করতে। আওয়ামী লীগ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বিএনপিকে সব নাশকতার জন্য দায়ী করে। সত্যি কোনটা এবং কতটুকু, তা সুষ্ঠু বিচার হলে আমরা জানতে পারব। তবে এটি ঠিক, বিএনপির ডাকা কর্মসূচিগুলোতে এসব ঘটেছে বলে পেট্রলবোমার দায়দায়িত্ব অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদেরই—বহু মহলের অভিমত ছিল এমনই।

অভিযোগ বা অভিমত এক জিনিস, বিচার অন্য জিনিস। পেট্রলবোমা যারাই মারুক, যে উদ্দেশ্যেই মারুক, এর বিচার করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তবে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন মহলগুলো নিজের বিচার নিজেরা করেছে এর নজির নেই। পেট্রলবোমা মারার অভিযোগে তাই বিচার চলছে শুধু বিএনপি-জামায়াতের যাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছেন বা পুলিশ যাঁদের গ্রেপ্তার করে এজাহারে নাম বসিয়েছে তাঁদেরই। এই বিচারেও কারও আপত্তি থাকা উচিত নয়, যদি তা সঠিকভাবে হয়। কিন্তু এসব মামলায় ‘হুকুমের আসামি’ হিসেবে যেভাবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের ঢালাওভাবে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে ও কারাগারে পাঠানো হচ্ছে, তাতে এসবের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। অবকাশ রয়েছে হুকুমের আসামি বানানোর প্রবণতা নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণেরও।

২.
এ বছরের শুরুর দিকের বিভিন্ন নাশকতার ঘটনায় হুকুমের আসামি হয়েছেন বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়াসহ দলের প্রায় সব নেতা। যেকোনো সাধারণ বিচার-বুদ্ধিতে বোঝা যায়, হুকুমের আসামি তিনিই হবেন, যাঁর হুকুমে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়। বিএনপির স্থানীয় নেতারা কখন কী বলেছেন, স্থানীয় পত্রিকাসমূহে কী এসেছে, তা আমরা সবিস্তারে জানি না। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতারা জাতীয় গণমাধ্যমে কখন কী বলেছেন, তা আমরা জানি। আমরা এটিও জানি যে গুলশান কার্যালয়ে সম্পূর্ণভাবে অন্তরিণ থাকা অবস্থায়, বিশেষ করে টেলিফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকাকালীন, খালেদা জিয়ার কাউকে হুকুম দেওয়ার মতো সক্ষমতাই ছিল না। তবু এ সময়ে সংঘটিত নাশকতার ঘটনায়ও তাঁকে হুকুমের আসামি করা হয়।

প্রশ্ন উঠতে পারে, খালেদা জিয়া ও বিএনপির নেতারা যে অবরোধ ও হরতালের আহ্বান জানাতেন, তাতে কি সহিংসতার ইন্ধন ছিল না? তিনি বা বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের যেসব বক্তব্য জাতীয় গণমাধ্যমে আসত, তাতে কোথাও জানমালের ওপর হামলার

নির্দেশ ছিল না। তারপরও তাঁরা যেহেতু সর্বাত্মক, লাগাতার ও কঠোরভাবে আন্দোলনের ঘোষণা দিতেন, তাঁদের বক্তব্যে পরোক্ষভাবে প্ররোচিত হয়ে কেউ নাশকতার ঘটনা ঘটাতে পারে। কতটুকু পরোক্ষ প্রভাব ছিল, কতটুকু পরোক্ষ প্রভাব অপরাধের শামিল, তা আদালতের বিচার্য বিষয়।

তবে সাধারণ বিচার-বুদ্ধি বলে, পরোক্ষ প্ররোচনার জন্যও অন্তত কিছু প্রমাণ বা গ্রেপ্তারকৃত কোনো ব্যক্তির জবানবন্দির প্রয়োজন হয়। আমাদের সাক্ষ্য আইনে হুকুমের আসামি বা প্ররোচনাকারী হিসেবে প্রমাণ করতে হলে বরং সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্যের প্রয়োজন হয় (কাজী আজম বনাম রাষ্ট্র-২০০৪, অমর কুমার ঠাকুর বনাম রাষ্ট্র-১৯৮৮)। ভারতে সাম্প্রতিক কালে একাধিক মামলায় এমনও সিদ্ধান্ত হয়েছে যে অবিরাম ও প্রত্যক্ষ প্ররোচনা না থাকলে এমনকি কেউ আত্মহত্যার নোটে অন্য কারও নাম লিখে গেলেও সে দোষী হবে না। আমাদের দেশেও একজন মুক্তিযোদ্ধা আত্মহত্যা করার আগে একজন সচিবের অপমানকে কারণ হিসেবে লিখে গিয়েছিলেন। আমরা কি সচিবকে প্ররোচক হিসেবে গ্রেপ্তার হতে দেখেছিলাম?

রাজনৈতিক প্ররোচনার প্রসঙ্গে আসি। সহিংসতার সময়কালে সরকারকে উৎখাতের সংকল্প প্রকাশ বা এ জন্য লাগাতার কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার বহু নজির বাংলাদেশে রয়েছে। অতীতে বিএনপিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেনে নিতে বাধ্য করার আন্দোলনে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির সময় বা লগি-বইঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ মারা বা গানপাউডার দিয়ে মানুষকে জ্বালিয়ে মারার মতো সুনির্দিষ্ট ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতাদের জ্বালাময়ী ভাষণের নজির রয়েছে। নিরপেক্ষভাবে হুকুমের আসামির বিচারের কালচার শুরু হলে বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনীতিবিদদের তাই কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর কথা। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি শুধু ‘একটি’ আমলের হুকুমের আসামির বিচারের জন্য আগ্রহী হব, নাকি ‘সকল’ আমলের?

আমি মনে করি, হুকুমের আসামির অবশ্যই বিচার হওয়া উচিত। তবে হুকুম আর অপরাধকর্মের মধ্যে যৌক্তিক ও বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক না থাকলে হয়রানিমূলক মামলা করা উচিত নয়। যেমন কোনো আমলে ক্রসফায়ার বা গুমের ঘটনায় হুকুমের আসামি হিসেবে বাহিনীর প্রধানের দায়দায়িত্ব থাকতে পারে। বিশেষ করে কেউ যদি দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেন বা মানুষের ওপর গুলি করার দায়িত্ব প্রকাশ্যভাবে নেন, তিনি অবশ্যই হুকুমের আসামি হতে পারেন।

কিন্তু বিএনপি আমলের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ আমলের এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের জন্য আমরা কি শেখ হাসিনাকে হুকুমের আসামি করার কথা ভাবতে পারি? তাঁদের কেউ সরাসরি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন এমন প্রমাণ না পেলে আমরা তা করতে পারি না। তাহলে তাঁরা কেউ বিরোধী দলে থাকলে শুধু হরতাল বা অবরোধের নির্দেশ দিলে এবং তখন নাশকতা ঘটলে আমরা কি তাঁদের হুকুমের আসামি করতে পারি?

৩.
হুকুমের আসামির বিচারে সবচেয়ে আপত্তিকর দিক হচ্ছে জামিনের ক্ষেত্রে কঠোরতা। বাংলাদেশের আইনে জামিনযোগ্য অপরাধে জামিন পাওয়া অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার। অন্যদিকে জামিন অযোগ্য অপরাধে জামিন দেওয়া আদালতের বিবেচনার বিষয়। ফৌজদারি কার্যবিধিতে জামিন অযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রেও অল্পবয়স্ক, অসুস্থ ও নারীদের জামিন দেওয়া যাবে বলা হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন মামলার পর্যবেক্ষণে অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিন পাওয়ার পর পালিয়ে যাওয়ার বা তাঁর কর্তৃক পুনরায় অপরাধটি করার বা বিচারকার্যে বিঘ্ন ঘটানোর আশঙ্কা না থাকলে তাঁকে জামিন দেওয়া যাবে বলা হয়েছে।

আমাদের নিম্ন আদালত তারপরও দাগি অপরাধীদের বিভিন্ন সময়ে জামিন দিয়ে দেন এমন উদাহরণ রয়েছে। মাত্র কিছুদিন আগে প্রথম আলোর শেষ পৃষ্ঠায় ছাত্রলীগের একজন মাদক ব্যবসায়ীকে জামিন দেওয়ার খবর ছাপা হয়েছিল। জামিন পেয়ে তিনি অভিযোগকারীর বাবাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেন। কয়েক বছর আগে জামিন নিয়ে একটি বিষদ গবেষণাকাজে আমি দেখেছিলাম যে তালিকাভুক্ত কুখ্যাত অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়ে বহুবার জামিন পেয়ে বের হয়ে গিয়েছিল।

এমন এক বিচারিক সংস্কৃতির দেশে এম কে আনোয়ারের মতো বয়োবৃদ্ধ বা রুহুল কবির রিজভীর মতো অসুস্থ ব্যক্তি জামিন পান না কোন বিবেচনায়? গত বছর একটি মামলায় বিরোধী দলের নেতা খালাস পাওয়ার পরপরই সংশ্লিষ্ট বিচারকের বিরুদ্ধে দুদকে মামলা দেওয়া হয়েছিল। অন্য একটি ঘটনায় র্যাবের সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়ার কারণে নিম্ন আদালতের বিচারকের মামলা আমলে নেওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।

জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রেও যদি বিচারকদের ওপর সরকারের এমন খড়্গহস্ত থাকে, তাহলে হুকুমের আসামি হিসেবে বিএনপির কোনো নেতারই জামিন পাওয়ার কথা নয়। বিচারের নামে এমন দমননীতি হলে হরতাল, অবরোধ, এমনকি বিরোধী দলের আন্দোলন থেকে হয়তো সাময়িকভাবে রক্ষা পাওয়া যাবে, কিন্তু তাতে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন মুখ থুবড়ে পড়বে। শুধু এক আমলে শুধু এক পক্ষকে হুকুমের আসামি হিসেবে কারাবন্দী করলে দেশ স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঝুঁকতে পারে।

আমার কথা হচ্ছে, দমননীতি বাদ দিয়ে বরং বিরোধী দল কর্তৃক শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ, প্রচারণা ও হরতালের দিন শান্তিপূর্ণভাবে পিকেটিং করতে দেওয়া হোক। আর পেট্রলবোমা, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ সব অপকর্মের সুষ্ঠু ও কঠোর বিচার করা হোক। এজাহারে নাম নেই, টেলিফোন বা অন্য কোনো মাধ্যমে হুকুম দেওয়ার সুযোগ নেই, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির ১৬৪ জবানবন্দিতে নাম নেই এমন ব্যক্তিদের হুকুমের আসামি করার প্রবণতা বিশেষ করে জামিন নাকচ করার প্রবণতা বন্ধ হোক।
বাংলাদেশের টলটলায়মান গণতন্ত্র তাতে কিছুটা হলেও প্রাণশক্তি ফিরে পেতে পারে।

আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে