Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.7/5 (30 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৮-০২-২০১৫

খাঁচা থেকে মুক্তি

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম


এককালের ছিটমহলের যে ছাত্রছাত্রী বলছে, বাংলাদেশকে কিছু দেওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত হচ্ছে। তারা যখন দেখবে যে বাংলাদেশ তাদের বরণ করে নিচ্ছে, সেই বাংলাদেশ বিশ্বের সমীহ আদায়ের দিকে এগোচ্ছে, তাহলে এই এত বছরের অন্তরীণ থাকার বেদনা তারা ভুলতে পারবে।

খাঁচা থেকে মুক্তি

জুলাইয়ের ৩১ তারিখ মধ্যরাত থেকে বাংলাদেশে থাকা ১১১টি ছিটমহলের অধিবাসীরা যুক্ত হলেন বাংলাদেশের সঙ্গে, পেলেন এ দেশের নাগরিকত্ব এবং মুক্তি লাভ করলেন ৬৮ বছরের বন্দিদশা থেকে। ছিটমহল শব্দটি এখন আশ্রয় নিল ইতিহাসে, কিন্তু যে বিচ্ছিন্নতা এবং বন্দিত্বের বর্ণনা রয়েছে এই শব্দটিতে, তা কি আমাদের বড় অর্থে এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিভাষা এবং চিন্তাচেতনা থেকে উঠে যাবে?

কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল ৩১ জুলাই দুপুর থেকে ছিটমহলগুলোর স্বাধীনতার উৎসব সরাসরি সম্প্রচার করছিল। এক ছিটমহলের অধিবাসী গলায় প্রচুর উচ্ছ্বাস নিয়ে জানালেন, তিনি এখন প্রাণের আনন্দে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে পারবেন; আরেকজন জানালেন, তাঁর মনে হচ্ছে যেন খাঁচার বন্দিজীবন থেকে মুক্তি পেলেন! এক স্কুল শিক্ষয়িত্রী বললেন, এত দিন একটা পরিচিতি সংকটে ছিলেন তাঁরা, সেই সংকট মোচন হয়েছে। আমার আনন্দ হলো যখন কয়েকজন স্কুলছাত্রছাত্রীকে বলতে শুনলাম, এখন তারা পড়াশোনা করে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হতে পারবে। বাংলাদেশের জন্য তারা যে অনেক কিছু করতে পারবে, এই প্রত্যয় তাদের এখন স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
মুক্তি পাওয়া ছিটমহলবাসীর সংখ্যা খুব বেশি নয়, ৫১ হাজারের মতো। এই জনসংখ্যা ঢাকার যেকোনো পাড়ার। কিন্তু সংখ্যা থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, ইতিহাসের একটা নির্মম অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি, এক নতুন সূচনার আয়োজন। এসবের প্রকৃত মূল্য আছে, প্রতীকী মূল্যও আছে। এগুলো মনে রেখে চললে এই ৫১ হাজার মানুষের উল্লাস পাবে স্থায়ী উদ্যাপনের প্রকৃত গন্তব্য।

এই উপমহাদেশের রাজনীতির এক বড় শর্ত হচ্ছে বিভাজন। এটি শুধু ভৌগোলিক নয়, মনস্তাত্ত্বিকও। এর প্রধান তিনটি দেশ একসময়ে এক দেশ ছিল। মানুষ চট্টগ্রাম থেকে পেশোয়ার যেত, মাদ্রাজের লোক ব্যবসা করত করাচিতে, প্রচুর গরম পড়লে সিলেটের লোক শিলং যেত শরীর জুড়াতে। কিন্তু তলে তলে বিভাজনটা ছিল। সেটি ছিল ইতিহাসের, স্মৃতির। বাইরে থেকে আসা শাসকেরা এই উপমহাদেশ শাসন করেছেন প্রায় এক হাজার বছর। তাঁরা ‘ভাগ করো, শাসন করো’ নীতিতে ছিলেন বিশ্বাসী। আকবরের মতো দু-এক দূরদর্শী শাসক চেষ্টা করেছেন ভিন্ন একটা ধারা গড়তে। বাকিরা বিভাজনকে দেখেছেন ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার পথ হিসেবে। ব্রিটিশ শাসন এই বিভাজনকে একেবারে দিনের আলোয় নিয়ে এল। এই প্রকট বিভাজন অনিবার্য করল ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের সময়কার হত্যা-লুণ্ঠন-ধর্ষণ। এই বিভাজন তৈরি করল লাখ লাখ উদ্বাস্তু।এই তিনটি দেশের মানুষের মনে চিরস্থায়ী হয়ে গেল তিক্ততা।

অন্নদাশঙ্কর রায় একটা ছড়া লিখেছিলেন দেশ বিভাগ নিয়ে। সেটি এ রকম—
তেলের শিশি ভাঙল বলে
খুকুর পরে রাগ করো
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা
ভারত ভেঙে ভাগ করো!....

এই বুড়ো খোকারা ভারত ভেঙে হাওয়া হয়ে যায়নি, তারা থেকে গেছে, এই উপমহাদেশ শাসন করেছে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়েছে, নতুন নতুন উদ্বাস্তু বানিয়েছে। মিশেল ফুকো যে Carceral Society বা অন্তরীণ সমাজের কথা বলেছেন, তারা নিজেদের দেশে তা কায়েম করেছে। অন্তরীণ সমাজ তৈরির উদ্দেশ্য, ফুকো জানান, শাসন করা এবং শাস্তি দেওয়া।

১১১ ছিটমহলের মানুষকে খুব তুচ্ছ কারণে ৬৮ বছর অন্তরীণ করে রাখা হয়েছিল। এখন তারা মুক্ত। কিন্তু বুড়ো খোকাদের হাত থেকে তাদের মুক্তি নেই, এই তিন দেশের অন্য সব নাগরিকের মতো। তারা এখন ভেতর থেকে দেখবে বাংলাদেশের অন্তরীণ সমাজকে, যেখানে পুঁজি তৈরি করেছে লোহার খাঁচা, দারিদ্র্য-অপুষ্টি উগ্রপন্থী তৈরি করছে আরও সব খাঁচা। তারা যদি ভাবে, ভারতে থাকা আত্মীয়স্বজনকে একটু শুভেচ্ছা জানিয়ে আসা যাক, তাহলে তাদের অবস্থা ফেলানীর মতো হতে পারে। এই উপমহাদেশে এখন এক দেশের মানুষ আরেক দেশের মানুষকে শুধুই সন্দেহ করে। সংস্কৃতি তাদের একটা বন্ধন তৈরি করে দেয়, কিন্তু রাজনীতি সেই বন্ধন কেটে দেয়।
মানসিক বিভাজনটা এখন যেন স্থায়িত্ব পাচ্ছে।

তবে এই বিভাজনটা উঠতে পারে যদি প্রতিটি দেশ প্রকৃত অর্থে উন্নত হয়—অর্থনীতি-সামাজিক নানা সূচক, শিক্ষা এবং সংস্কৃতিচর্চায়, বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটা উন্নত দেশ হতে পারে, বিশ্বের সমীহ পায়, তাহলে বিভাজনটা কমবে। মানুষ যাকে সমীহ করে, তার কাছাকাছি হলে আনন্দ পায়।

এককালের ছিটমহলের যে ছাত্রছাত্রী বলছে, বাংলাদেশকে কিছু দেওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত হচ্ছে। তারা যখন দেখবে যে বাংলাদেশ তাদের বরণ করে নিচ্ছে, সেই বাংলাদেশ বিশ্বের সমীহ আদায়ের দিকে এগোচ্ছে, তাহলে এই এত বছরের অন্তরীণ থাকার বেদনা তারা ভুলতে পারবে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে