Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.7/5 (47 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৭-১৩-২০১৫

ছিটমহলে বিভ্রান্তি : দুভাগ হওয়া থেকে বেঁচে গেল বর্মণ পরিবার

ছিটমহলে বিভ্রান্তি : দুভাগ হওয়া থেকে বেঁচে গেল বর্মণ পরিবার

পঞ্চগড়, ১৩ জুলাই- বাংলাদেশে ভারতীয় ছিটমহলবাসীদের একাংশ এখন রয়েছেন দোটানায়। তারা ভারতের নাগরিকত্ব নিয়ে সেখানে চলে যাবেন, না বাংলাদেশেই থাকবেন, সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। কেউ কেউ  ভারতে যাওয়ার জন্য ফরম পূরণ করেও এখন প্রত্যাহার করছেন। সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কিছু নেতিবাচক প্রচারণা অনেককে বিভ্রান্ত করছে। তারা বুঝে উঠতে পারছেন না কী করবেন। বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি, স্থানীয় প্রশাসন ও ছিটমহলবাসীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

পঞ্চগড় সদরের ৭৮ নম্বর গাড়াতি ছিটমহল। আর এই ছিটমহলের বাসিন্দা বিজয় কুমার বর্মণ (৬৫)। তার তিন ছেলে এক মেয়ে। ছেলেরা হলেন পলাশ বর্মণ, আপন বর্মণ ও দুলাল বর্মণ। পলাশ ও  আপন বিয়ে করেছেন। তাদের দুজনেরই দুই ছেলেমেয়ে। আর দুলাল এখনও বিয়ে করেননি। তারা তিন ভাই যৌথ জরিপ শুরুর পরদিন মঙ্গলবারই ক্যাম্পে গিয়ে নাম লিখিয়েছেন ভারতের নাগরিকত্ব নিয়ে সেখানে চলে যাওয়ার জন্য।

কিন্তু তাদের বাবা বিজয় কুমার বর্মণ প্রথম থেকেই ছিলেন ভারতে যাওয়ার ঘোর বিরোধী। তিনি তার স্ত্রী সারদা বর্মণকে (৫০) নিয়ে বাংলাদেশেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ছেলেরা বাবা-মাকে চাপ দিচ্ছিলেন অনবরত। তাতেও রাজি হননি তারা। এরপর তাদের রীতিমতো অবরুদ্ধ করে রাখেন তিন ছেলে। কারও সঙ্গেই কথাও বলতে দেননি। এমনকী মোবাইলেও নয়। কিন্তু শুক্রবার পরিস্থিতি পাল্টে যায়। তার ছেলেরা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। তারা বাংলাদেশেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন। আর অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্তি পান বাবা বিজয় কুমার বর্মণ।

শনিবার বিজয় কুমার বর্মণ জানান, ‘আমি এখন চিন্তামুক্ত। আমার ছেলেরা ভারতে যাচ্ছে না। আমাদের আর দুই দেশে ভাগ হয়ে থাকতে হবে না। আমার পরিবার দুদেশে দুভাগ  হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। ভগবান মুখ তুলে তাকিয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বংশ পরম্পরায় এখানে বসবাস করছি। কেন ভারতে যাব। আমার মেয়েকেও এখানে তেঁতুলিয়ায় বিয়ে দিয়েছি। আমার বাবা মৃত ফলিত চন্দ্র বর্মণ এখানেই ছিলেন। তার বাবাও। এখানে আমাদের ভিটেমাটি আছে। জমিজমা আছে। আমরা কেন ভারতে গিয়ে উদ্বাস্তু হব। সেখানে আমাদের কী আছে?’

তাহলে আপনার ছেলেরা কেন ভারতে যেতে চেয়েছিলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে বিজয় কুমার বর্মণ বলেন, ‘কিছু লোক ভুল বুঝিয়েছিল। তারা বলেছিল, ভারতে গেলে অনেক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাবে। পাওয়া যাবে চাকরি, কাজ আর নগদ টাকা। আর সেই ফাঁদে পা দিয়েছিল তারা। কিন্তু এখন তাদের ভুল ভেঙেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেরা আমাকে এবং তাদের মাকে এই কয়দিন ঘরের বাইরেও বের হতে দেয়নি। এখন আমি অনেক খুশি।’

বিজয় কুমার আরও বলেন, ‘এরইমধ্যে আমার তিন ছেলেই পঞ্চগড় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন দিয়েছে। আবেদনে তারা বলেছে, তারা বাংলাদেশেই থাকতে চায়। ভারতের নাগরিকত্ব নিতে চায় না।’

বিজয় কুমার বর্মণের ছেলে পলাশ বর্মণ বলেন, ‘আমাদের ভুল বোঝানো হয়েছিল। বলা হয়েছিল, ভারতে গেলে সুযোগ-সুবিধা বেশি। কিন্তু এখন আমরা বুঝতে পেরেছি।’

শুধু বর্মণ পরিবারের এই তিন ছেলে নয়। এখন গাড়াতি ছিটমহলের আরও অনেকেই ভারতে যেতে চান না। যদিও জরিপের শুরুতে তারা ভারতের নাগরিকত্ব নেওয়ার জন্য ছবিসহ ফরম পূরণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন দ্বিজেন, আনন্দ ও মুকুলসহ আরও অনেকে। এই ছিটমহলের ১৮ জন ভারতে যাওয়ার জন্য প্রথমে ইচ্ছে প্রকাশ করলেও এখন পর্যন্ত যেতে রাজি আছেন মাত্র চারজন।

পঞ্চগড়ের গাড়াতি ছিটমহলের চেয়ারম্যান মফিদার রহমান জানান, ‘এখন ১৪ জন তাদের মনোভাব পরিবর্তন করেছে। তারা বাংলাদেশেই থাকতে চান।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে থাকা অথবা ভারতে যাওয়ার ব্যাপারে ছিটমহলবাসী তাদের আত্মীয়-স্বজন কোথায় আছেন এবং ভবিষ্যতের সুযোগ-সুবিধাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। ’

বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের প্রধান মাইনুল হক জানান, ‘শুধু পঞ্চগড়েই নয়, এ পর্যন্ত বাংলাদেশের চারটি জেলা পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট আর নিলফামারীর ছিটমহলের প্রায় তিনশ’ বাসিন্দা ভারতে যাওয়ার জন্য ফরম পূরণ করলেও তাদের একাংশ এখন আর ভারতে যেতে চান না। তারা বাংলাদেশেই থাকতে চান।’ তিনি বলেন, ‘একটি গ্রুপ কৌশলে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানোয় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘জরিপের শুরুতেই প্রচারণা চালান হয় যে, ভারতে গেলে নানা সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে নগদ পাঁচ লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। আর যারা প্রচারণা চালায়, তাদের উদ্দেশ্য ছিল যারা যাবেন, তাদের কাছ থেকে কম দামে জমি কেনা। কিন্তু শুক্রবার ভারতীয় প্রতিনিধি দল ছিটমহল পরিদর্শন করে জানান, সেখানে খেলে নাগরিকত্ব আর রেশন কার্ড ছাড়া বাড়তি কোনও সুবিধা-পাওয়া যাবে না। এরপর থেকেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। অনেকেই ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।’

পঞ্চগড় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা মুনতাজেরি দীনা বলেন, ‘পঞ্চগড়ের ৫০টির মতো পরিবার ভারতের নগরিকত্ব নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু গত দুদিনে তাদের বড় একটি অংশ বাংলাদেশেই থেকে যাওয়া এবং বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নেওয়ার জন্য নতুন করে আবেদন জমা দিয়েছেন।’  তিনি জানান, ‘এই আবেদনপত্রে আমরা বাংলাদেশ ও ভারত দুপক্ষেরই একজন করে জরিপকারীর স্বাক্ষর এবং বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সভাপতির স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক করেছি। কারণ, আমরা নিশ্চিত হতে চাইছি, কোনও চাপের কারণে তারা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছেন কি না।’ আবেদন সঠিক হলে তাদের আবেদন বিবেচনায় নেওয়া হবে বলেও জানান এই  নির্বাহী কর্মকর্তা।

পঞ্চগড় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরও জানান, ‘আমরা যেকোনও ধরনের গুজব বা মিথ্যা প্রচারণার ব্যাপারে সতর্ক আছি। কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা বা গুজব ছড়ানোর প্রমাণ পওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বাংলাদেশ ও ভারতে ১৬২টি ছিটমহলে একযোগে ক্যাম্প করে এই যৌথ জরিপ শুরু হয়েছে গত সোমবার থেকে। চলবে ১৬ জুলাই পর্যন্ত। ২০১১ সালের যৌথ হেড কাউন্টিং-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি ছিটমহলে ৩৭ হাজার মানুষের বসবাস। অন্যদিকে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের বাসিন্দা ১৪ হাজার।

স্থল সীমান্ত চুক্তি ও প্রটোকল অনুযায়ী, ৩১ জুলাই মধ্যরাতে ভারতের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অংশ হয়ে যাবে, বাংলাদেশের ৫১টি চলে যাবে ভারতের সঙ্গে। ছিটমহলবাসীকে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী নাগরিকত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ১৯৭৪ সালের চুক্তি অনুযায়ী এ সমীক্ষার মাধ্যমে নাগরকিত্ব নির্ধারণ চূড়ান্ত হবে। ১৬ জুলাই ক্যাম্প জরিপ শেষ হলেও আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এ নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ পাবে ছিটমহলবাসী।

নাগরিকত্ব নির্ধারণ ও লোক গণনা হালনাগাদ ও জটিলতা এড়াতে গত ২২ জুন থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ছিটমহলের জমি ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ রাখাসহ সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলো বিজ্ঞপ্তি আকারে ছিটমহলবাসীকে জানানো হয়েছে।

পঞ্চগড়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে