Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.8/5 (44 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৪-১২-২০১৫

ফুল ভাসিয়ে বৈসাবির আনন্দে মেতেছে পাহাড়িরা

ফুল ভাসিয়ে বৈসাবির আনন্দে মেতেছে পাহাড়িরা

রাঙামাটি, ১২ এপ্রিল- পানিতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে তিন পার্বত্য জেলায় আজ রোববার সকালে শুরু হয়েছে বৈসাবির মূল আনুষ্ঠানিকতা। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বৃহত্তম এই সামাজিক আয়োজনে ব্যস্ত এখন শহর, নগর আর পাহাড়ি পল্লীগুলো। চারিদিকে আনন্দের সুর-লহরী আর বৈসাবি আয়োজন।

২৯ চৈত্র রোববার চাকমা জনগোষ্ঠীর ‘ফুল বিজু’, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ‘হাঁড়িবসু’ আর মারমা সম্প্রদায়ে সূচিকাজ। ঠিক ফুলবিজু নামে অভিহিত না হলেও এইদিন প্রায় সকল পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠী পানিতে ফুল ভাসিয়ে দেয়।

উৎসব প্রিয় পাহাড়িরা সারা বছর মেতে থাকেন নানা অনুষ্ঠানে। তবে তার সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় বর্ষবিদায়ের এই উৎসব। চাকমারা বিজু, ত্রিপুরা বৈসুক, মারমারা সংগ্রাই, তঞ্চঙ্গরা বিষু, অহমিয়ারা বিহু এভাবে তারা ভিন্ন ভিন্ন নামে আলাদা ভাবে পালন করে এই উৎসব।

উৎসবের প্রথম দিনে চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমারা বন থেকে ফুল আর নিমপাতা সংগ্রহ করে সেই ফুল দিয়ে ঘর সাজায়। পবিত্র এই ফুল ভাসিয়ে দেয় পানিতে, তাই একে বলা হয় ফুলবিজু।ঐতিহ্যবাহী পোশাকে তাদের গঙ্গাদেবীর উদ্দেশে ফুল ভাসানোর মধ্যে দিয়ে এদিন শুরু হয় বৈসাবি উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা।

ফুলবিজুর দিন সকালে রাঙামাটি শহরের রাজবনবিহারের পূর্ব ঘাটে ফুলবিজু উৎসবে কর্ণফুলী নদীতে ফুল ভাসায় চাকমা তরুণীরা।

পানিতে ফুল ভাসিয়ে পুরনো বছরের দুঃখ বেদনাই যেনো ভাসিয়ে দিয়ে নতুন দিনের সম্ভাবনার আলো জ্বালায় পাহাড়ের মানুষ। পানিতে ফুল ভাসিয়ে পুরনো দিনের বেদনা ভুলে নতুন দিনের প্রত্যয়ের কথা জানায় ফুল ভাসাতে আসা পাহাড়ি তরুণ-তরুণীরা। পানিতে ফুল ভাসানোর মাধ্যমে তারা গঙ্গা মাকে শ্রদ্ধা জানায়। পাহাড়িদের সংস্কৃতির ঐতিহ্য হিসেবে ফুল হচ্ছে একটা পবিত্র জিনিস।

এদিকে সকাল সাতটায় ত্রিপুরা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শহরের গর্জনতলী ঘাটে ও কেল্যামুড়া পাহাড়ে ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে পানিতে ফুল ভাসানোর আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমাসহ স্থানীয়রা উপস্থিত ছিলেন।

‘ফুল বিজু’র পরপরই তরুণীরা নিজেদের ঘরে ফিরে যায়। মুরুব্বিদের প্রণাম করে আশীর্বাদ গ্রহণ করে। ফুল ভাসানো শেষে বয়স্কদের স্নান করানো হয়। পাড়ার বয়স্কদের শরীরে পানি ঢেলে তাদের আশীর্বাদ কামনা করেন তরুণ-তরুণীরা। দেয়া হয় নতুন পোশাক।

পরদিন চৈত্রের শেষ দিনে শুরু হবে মূলবিজু। এদিন সারাদিন হৈ-হুল্লোড় করে কাটায় তরুণ তরুণীরা, ঘরে ঘরে নিমন্ত্রণ আর আতিথিয়তা গ্রহণের সে এক অনাবিল আনন্দ। এদিন ঘরে ঘরে ঐতিহ্যাবাহী খাবার পাঁচন রান্না করা হবে। অতিথিদের মাঝে ঐহিত্যবাহী খাবার ‘পাঁচন’ পরিবেশন আর একে অন্যের বাড়িতে যাওয়া আসার মধ্য দিয়ে বৈসাবি উৎসব তার চিরায়ত ব্যঞ্জনায় রূপ লাভ করে। বহু প্রকার সবজি দিয়ে ঐতিহ্যবাহী এই পাঁচন তৈরি করা হয়। পাহাড়িদের বিশ্বাস, এই পাঁচন খেলে বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এছাড়া একদিনে সাত পরিবারে এই পাঁচন খেলে সর্বরোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। বিজুর দিনে পাহাড়িদের বাসায় পাহাড়ি-বাঙালি সবাই যায়। এদিন ফুটে ওঠে অসাম্প্রদায়িক মনোভাব।

সাংগ্রাইয়ে একে-অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে পুরনো বছরের সকল দুঃখ, অবসাদ দূর করে নতুন বছরে শুদ্ধ মননে জীবন শুরুর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন পার্বত্যাঞ্চলের মারমা জনগোষ্ঠী। প্রতিবছরই বাংলাদেশ মারমা সাংস্কৃতিক সংস্থার (মাসাস) এর আয়োজনে কেন্দ্রীয়ভাবে পানি খেলা বা ওয়াটার ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করা হয়। এবছরও রাজস্থলীর বাঙ্গালহালিয়ায় ও কাপ্তাইয়ের চিৎমরমে পানি খেলার আয়োজন করা হয়েছে।

এছাড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর তাদের ঐতিহ্যগতভাবে বৈসাবির আনুষ্ঠানিকতা পালন করে আসছে। বৈসাবিতে গ্রামীণ বাংলার বিভিন্ন খেলাসহ পাহাড়ি ঐতিহ্যগত বিভিন্ন খেলা যেমন-ঘিলা খেলা, তম্ব্রু খেলা প্রভৃতির খেলার আয়োজন করা হয়।

এ ছাড়া ফুলবিজুতে রাতের আকাশে ফানুস বাতির ঝলক দেখা যায়। পাশাপাশি পাহাড়ির ঐতিহ্যবাহি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকে। বিজুর পক্ষকাল আগে থেকেই রাঙামাটিতে বিজুর আগমনীর সুর চলছে। বৈসাবিকে সামনে রেখে আদিবাসী মেলা, পার্বত্য মেলা, পাঁচন তৈরি প্রতিযোগিতাসহ আরো বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ১২টি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলা বর্ষকে বিদায় জানানোর এ অনুষ্ঠান তাদের প্রধান সামাজিক উৎসব হিসেবে বিবেচিত। এই উৎসব চাকমা জনগোষ্ঠী বিজু নামে, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী মানুষ সাংগ্রাই, মারমা জনগোষ্ঠী মানুষ বৈসুক, তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী বিষু, কোনো কোনো জনগোষ্ঠী বিহু নামে পালন করে থাকে। বৈসুকের ‘বৈ’ সাংগ্রাইয়ের ‘সা’ ও বিজু, বিষু ও বিহুর ‘বি’ নিয়ে উৎসবটিকে সংক্ষেপে ‘বৈসাবি’ নামে পালন করা হয়। পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদনের পর থেকে পাহাড়ের সকল জনগোষ্ঠীকে সম্মিলিতভাবে উৎসবে একীভূত করার জন্য এই সংক্ষেপে নামটি প্রচলন করা হয়।

১২ এপ্রিল ২০১৫/০৬:০৫পিএম/স্নিগ্ধা/

রাঙ্গামাটি

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে