Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.9/5 (70 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৮-১৮-২০১৪

ওরে ভোঁদড় দেখে যা

আকতার হোসেন


একটু চিন্তা করলেই দেখা যাবে ধর্ম নিয়ে বিরোধ কিংবা দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধের কারণে অথবা দুজন মহান ব্যক্তির আদর্শিক দ্বন্দ্বের ফল এমনকি প্রাকৃতিক সম্পদ বা ভূখণ্ড দখলকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ হয় নি। বাংলাদেশ হয়েছে ‘বাঙালি’ মূলধারকে বাধাগ্রস্ত করার পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দিতে গিয়ে। আমাদের ভাষা, জাতি দেশ এর সব কিছুর সাথে যে শব্দটি জড়িত তার নাম হল বঙ্গ বা ‘বাংলা’।

ওরে ভোঁদড় দেখে যা

জানি না মানুষ কতটা সাহসী হলে বঙ্গবন্ধুকে ‘বঙ্গবন্ধু’ না বলে অন্য কোন নামে ডাকতে পারে। বাঙালি জাতির জন্য যখন একজন প্রকৃত বন্ধুর প্রয়োজন ছিল সেদিন তিনি যদি বন্ধুর মত পাশে না দাঁড়িয়ে বাঘ হতেন, যেমন ‘শের-এ বাংলা’, তাতে কি সত্যি সত্যি কোন উপকার হত? অথবা ধরুন তিনি যদি দেশ বন্ধুর মত কোন খেতাব পেতেন! সেটা অবশ্য সম্ভব ছিল না কেননা তখন দেশ বলতে ছিল পাকিস্তান। আর সেই পাকিস্তানের বন্ধু তিনি কি করে হবেন যে পাকিস্তানকে সম্মুখ কাতারে দাঁড়িয়ে একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। অবশ্য বঙ্গবন্ধুর ভাগ্য বেশ ভাল ছিল। প্রতিবাদ বা চ্যালেঞ্জ করতে কিংবা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে  আন্দোলন সংগ্রাম করতে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হয় নি। পাকিস্তান সরকারের অন্যায় ও মন্দ আচরণ সংখ্যায় এতোই বেশি ছিল যে সবগুলো কাজ এমনিতেই বাঙালিদের বিরুদ্ধে চলে যেত। এখানেই সেই বড় প্রশ্ন এসে উঁকি দেয়। পাকিস্তান সরকার যখন শাসন-শোষণ স্থায়ী করার জট পাকাচ্ছিল, একটা জাতিকে দূষণ প্রক্রিয়ায় ফেলে তার স্বরূপ বদলে দেবার ষড়যন্ত্র চলছিল – তখন কি নেতার চেয়ে একজন বন্ধু বেশি প্রয়োজন ছিল না আমাদের? 
একটু চিন্তা করলেই দেখা যাবে ধর্ম নিয়ে বিরোধ কিংবা দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধের কারণে অথবা দুজন মহান ব্যক্তির আদর্শিক দ্বন্দ্বের ফল এমনকি প্রাকৃতিক সম্পদ বা ভূখণ্ড দখলকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ হয় নি। বাংলাদেশ হয়েছে ‘বাঙালি’ মূলধারকে বাধাগ্রস্ত করার পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দিতে গিয়ে। আমাদের ভাষা, জাতি দেশ এর সব কিছুর সাথে যে শব্দটি জড়িত তার নাম হল বঙ্গ বা ‘বাংলা’। এই ‘বাংলা’ই ছিল দ্বন্দ্বের মূল কারণ। রাষ্ট্র নায়কেরা বিপদ এলে রাষ্ট্র রক্ষার কাজে এগিয়ে আসেন, আমাদের সেটার প্রয়োজন ছিল না। বড় বড় নেতারা ঝুট ঝামেলাকে সামলে এগিয়ে যেতে দিক নির্দেশনা দেন, আমাদের অবস্থা সেরকমও ছিল না। সমস্যাটা ছিল চেতনাকে নিয়ে। মোটা মোটা বই পড়া মহা পণ্ডিত দিয়ে কোন লাভ হত না যদি শেকড়ের সন্ধান তার জানা না থাকত। মূল সমস্যা থেকে দূরে অবস্থান করলে সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হওয়াই স্বাভাবিক। এখানেই বঙ্গবন্ধুর সাথে অন্যান্য আইন পড়া, ডক্টরে ডিগ্রীধারী কিংবা সামন্ত প্রভু জাতীয় নেতাদের থেকে ভিন্নতা। তিনি মাটির গন্ধ নিতে পারতেন। নদীর জল চিনতে পারতেন। আরো পারতেন কবি সাহিত্যিক সঙ্গীত স্রষ্টাদের ভাষা বুঝতে। মুখ দেখে দেশের মানুষের মনের কথা বলে দিতে পারতেন তিনি। অন্যের দুঃখে কষ্ট পেতেন, অন্যের হাসি দেখে খুশি হতেন। তিনি নেতা হতে জন্ম নেন নি তাই বন্ধু হয়ে পাশে থেকেছে। এই সামান্য কথা বুঝতে রকেট বিজ্ঞানী হতে হয় না।
শুরুটা হয়েছিল এভাবে। বাঙালিরা দেখতে ছোট, বাঙালিরা কালো-শ্যামলা, তারা কুটীর শিল্প ভিত্তিক স্বনির্ভর অর্থনীতি নির্ভরশীল। তারা ধর্ম নিয়ে মাতামাতি করে না, ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণী-গোষ্ঠী নিয়ে সহ অবস্থানে থাকতে ভালোবাসে। তারা গণতন্ত্রমনা, ওদের মধ্যবিত্ত শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। বাঙালিরা ভাষা ও সংস্কৃতিকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালবাসে। সেই দেশে ভূমিদাস নেই, ঋণদাস নেই, জমিদারি নেই, বিজাতির শাসন তারা মানতে চায় না। সেই দেশটাকে মগের মুল্লুক বানানো সম্ভব হয় নি, পর্তুগীজ, ইংরেজ কারো আধিপত্য স্থায়ী হয় নি সেই দেশে। তাই পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের হাত শক্ত করতে হলে ভেঙ্গে দিতে হবে বাঙ্গালিদের বাঙ্গালি হবার শক্তি। এই ভেঙ্গে দেবার পরিকল্পনাকে সফল করতে পাকিস্তানীরা খুঁজতে লাগল ভোঁদড় জাতীয় কিছু  উভচর। যারা জাতে বাঙালি কিন্তু হুকুমে পাকিস্তানী। মানে, জলে স্থলে সমান ভাবে জেগে থাকবে পিটপিট চোখ নিয়ে। 
তারপরের ইতিহাস তো সকলের জানা। বাংলা লিখতে হবে উর্দু অক্ষরে, উর্দুকে করতে হবে দেশের ভাষা। উন্নত জীবনের আশায় বাঙালিদের পশ্চিমমুখী করতে হবে। শিক্ষাদীক্ষা, চাকুরী ব্যবসা বাণিজ্য সব কিছুর জন্য পশ্চিম পাকিস্তানকে ভাবতে হবে পবিত্র স্থান। ‘বাংলা’ নাম নিয়ে শুরু হয় এমন কিছুকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। নন-বাঙালি খানা দানা, আদব লেহাজ, পোশাক-আষাক এমনকি  রবীন্দ্রসঙ্গীত যদি এতোই প্রিয় হয় সেগুলো অন্য কাউকে দিয়ে লেখাতে হবে নতুন করে। পাকিস্তান: দেশ ও কৃষ্টি পড়তে হবে। কথাবার্তা আদব-কায়দায় এমন কিছু সংযোগ করতে হবে যা বাঙালির নিজস্ব নয়। বাবার ভাইকে কাকা না ডেকে ডাকতে হবে ‘চাচাজান’ বা ‘চাচা’ যেমন হিন্দি কিংবা উর্দু সিনেমাতে শোনা যায়। কবিতায় শ্মশান থাকলে কেটে সেটাকে গোরস্তান করে দিতে হবে। ইতিহাস শুরু করতে হবে খুব কাছাকাছি আধিপত্য দিয়ে। খানদানী আর সাধারণ দুভাগে বিভক্ত করে রাখতে হবে সমাজ। অর্থাৎ যে সমস্ত রেসিপি শাসকদের মাথা থেকে বের হতে লাগল সেগুলোই কিছু কিছু বাঙালি কবি-সাহিত্যিক শিক্ষিত লোকদের হাত দিয়ে প্রচার প্রচলন ও প্রসার পেল। এই যে লেজুড় বৃত্তির বিরুদ্ধে কথা বলা এবং বিজাতিকরনের মহা পরিকল্পনা ভেঙ্গে গুড়িয়ে নিজ জায়গাতে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার যে প্রচেষ্টা, এরই নাম বাঙালিপনা বা বাঙালির চেতনা। 
যুগে যুগে অনেকেই এই বাঙালিপনাকে বাঁচিয়ে রাখতে কাজ করে গেছেন। কেউ শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে থেকেছেন সজাগ, কেউ অর্থনীতিতে, কেউ বিদেশ-নীতি কেউ বা ছিলেন শাসন-তান্ত্রিক প্রহরী। আবার অনেকেই লোক চক্ষুর আড়ালে বীজ বুনে গেছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভেতর। সব চাইতে মূল্যবান যে কাজ অর্থাৎ চেতনার ভিত্তিতে আন্দোলনের জোয়ার তৈরি করা, বাঙালি ভাবধারায় ঐক্য জাগ্রত করা এবং বিপন্ন জাতিকে পশ্চিমাদের হাত থেকে রক্ষা করা, সেটা বঙ্গবন্ধুই করে গেছেন। অতঃপর যখন নিরাপদ অবস্থানে বাঙালিদের জায়গা হল তখন বাঙালিরা অনন্তকালের জন্য পেয়ে গেল বাঙালি হবার অধিকার, ভূখণ্ডসহ জাতীয় পরিচিতি। এই কাজ যিনি সম্পাদন করলেন সেই ব্যক্তি যদি বাংলার বন্ধু না হয় তবে আর কে বন্ধু আছে আমাদের?  
আমি ব্যথিত হই কিন্তু অবাক হই না পনেরো আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনায়। কেননা শত্রু তার প্রতিশোধ নেবে সেটাই স্বাভাবিক। প্রতিশোধ পরায়ণ একটা দেশ বা জাতির পক্ষে যদি বৃহত্তর শক্তি ইন্ধন যোগায় আর তাদের পক্ষে থাকে ধন রত্নে ভরা মুরব্বি জাতিগোষ্ঠী। এরা একত্রিত হলে একটি জাতিকে ধ্বংস করার কিংবা সেই জাতিটাকে বিজাতি করার পরিকল্পনা সফল করা মোটেও অসম্ভব নয়। এমন নির্বিঘ্ন কাজও যদি কোন কারণে কেউ করতে না পারে তবে তো প্রতিশোধ নেবেই। ওদের শক্তি বরাবরই ছিল, সাথে আছে সোনালী মুদ্রা। কাজেই তারা কেন কোন কাজ করতে গিয়ে ব্যর্থতা হবে! অথবা বলা যেতে পারে মুরব্বিদের নিয়ে গড়া সম্মিলিত প্রচেষ্টা কেনই বা সামান্য গরীব দুঃখী মানুষের কাছে পরাজিত হবে। অথচ বাংলাদেশ স্বাধীনতা পাবার ফলে তাই হয়ে গেল। অতএব, পাকিস্তান পন্থিদের মগজে ঠুকে গেল যিনি জাগিয়ে দেবার কাজে নিয়োজিত ছিলেন এবং  আপোষহীন নেতৃত্ব দিয়ে সাফল্য অর্জন করেছেন তাকে আর বাড়তে দিলে সে মুরব্বিদের ডানা কেটে দেবে। তাই স্থায়ী শোষণ পরিকল্পনা ব্যর্থ হবার সাথে সাথেই প্রতিশোধের পরিকল্পনার ছক দাঁড়িয়ে গেল। আবারো এই কাজে ভোঁদড়ের খোঁজ পড়ল।  এই সমস্ত ভোঁদড় এবং তাদের প্রভুরা মনে করে দৈহিক ও আদর্শিক যেকোনো ক্ষতিই আপাতত স্বস্তি। সেহেতু, হত্যা পরিকল্পনা ছাড়া ওরা অন্য কিছু নিয়ে ভাবতে চাইল না।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে যেমন লেজুড়বৃত্তি ছিল, সেই দেশের শাসকদের মন্দ কাজের পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্যও সজাগ ছিল বিশেষ ভোঁদড় গোষ্ঠী। এখন তাদের বংশধরেরা সেই ভয়ানক পরিকল্পনাকারীদের হুক্কাহুয়া সম্প্রদায় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। জাতীয়তা নিয়ে আমাদের গর্ব থাকলেও আমার এতো সভ্য-ভব্য জাতি না যে আমাদের মধ্যে এই দোআঁশলাদের  অভাব কোন দিন কম থাকবে। তবে দুঃখের বিষয় এই যে, এই গোষ্ঠী যখনি জয়ী হবে আমরা তখনই বন্ধু বিয়োগে ভুগবো, ওরা নাচ দেখাবে আমরা হাততালি দেব। ওরা বলবে একটি বিশেষ ছবির নিচে না যেতে আমরা কেউ ভয় পাব, কেউ লজ্জা নিয়ে বসে থাকবে। কেউ বা তাকে বঙ্গবন্ধু না বলে করবো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য। যার যেটা ইচ্ছা করুক, তারা ভোঁদড় দেখুক, আমরা বঙ্গবন্ধুর ছবির দিকে তাকিয়ে থাকবো ঝাপসা চোখে, তার সাথে কথা বলব মনে মনে। নিজে করবো এবং অন্যকে বলে যাব তারাও যেন সেই অবিনশ্বরকে খোঁজেন টুয়েন্টি ফোর সেভেন।

মুক্তমঞ্চ

  •  1 2 > 
Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে