Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.9/5 (64 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০২-২৫-২০১৪

গতির ডানায় দেশে বিদেশে

আকতার হোসেন


টরেন্টোর বাংলাদেশি কমিউনিটির বয়স খুব বেশি নয়। তবুও কিছুদিন পর যখন বাংলাদেশীদের ফার্স্ট জেনারেশন সেকেন্ড জেনারেশনের গোড়াপত্তন নিয়ে কথা উঠবে তখন খুঁজতে হবে আদি অস্তিত্বের কিছু চিহ্ন। যেভাবে পুরানো স্থাপত্য বা শিলালিপি দেখে বলে দেয়া যায় একটি জনপদের কাহিনী, তেমনি বাংলাদেশী-কানাডিয়ানরা একদিন পূর্বপুরুষদের খোঁজ নিতে গিয়ে হয়তো বলবে বাংলাদেশী-কানাডিয়ানদের গোড়া পত্তনে ‘দেশে বিদেশে’ বাতিঘরের মত আলো দিয়ে গেছে। 

গতির ডানায় দেশে বিদেশে

দৈনিক যুগান্তরের ১৫ বর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বিখ্যাত সাংবাদিক আব্দুল গাফফার চৌধুরী বলেছিলেন ‘বয়স না -  সময়ই মানুষকে অভিজ্ঞ করে তোলে’। আজ আমরা উপস্থিত হয়েছি ‘দেশে বিদেশের’ ২৪ বছর পূর্তি উদযাপন করতে। গাফফার চৌধুরীর কথার আলোকে বলতে চাই এখানে উপস্থিত গুণীজনের বিজ্ঞ আলোচনার মধ্য দিয়ে বয়স এবং অভিজ্ঞার মাপকাঠিতে ‘দেশে বিদেশে’র অবস্থান সম্পর্কে আমারা হয়তো একটি সঠিক চিত্র খুঁজে পাবো। 
টরেন্টোর বাংলাদেশি কমিউনিটির বয়স খুব বেশি নয়। তবুও কিছুদিন পর যখন বাংলাদেশীদের ফার্স্ট জেনারেশন সেকেন্ড জেনারেশনের গোড়াপত্তন নিয়ে কথা উঠবে তখন খুঁজতে হবে আদি অস্তিত্বের কিছু চিহ্ন। যেভাবে পুরানো স্থাপত্য বা শিলালিপি দেখে বলে দেয়া যায় একটি জনপদের কাহিনী, তেমনি বাংলাদেশী-কানাডিয়ানরা একদিন পূর্বপুরুষদের খোঁজ নিতে গিয়ে হয়তো বলবে বাংলাদেশী-কানাডিয়ানদের গোড়া পত্তনে ‘দেশে বিদেশে’ বাতিঘরের মত আলো দিয়ে গেছে। 
টরেন্টোর প্রবাস জীবনে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় সফল হয়ে অনেকেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছেন কিন্তু কমিউনিটিকে জোটভুক্ত করতে সম্ভবত বাংলা ভাষার এই পত্রিকাটি সবার আগে এগিয়ে এসেছিল। শ্রেণীকক্ষ নয়, খেলার মাঠ নয়, মেলা কিংবা হাট বাজার নয়, পড়বার মত একটি পত্রিকা গোড়াতে সঙ্ঘবদ্ধ করে রেখেছিল বাংলাদেশী কমিউনিটিকে। এই সুন্দর রুচি বোধ এবং পরিচ্ছন্ন চিন্তা নিয়ে যারা ২৪ বছর আগে এগিয়ে এসেছিলেন এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন বা আজো আছেন তাঁদের সকলকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। আগামী বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে খুব বড় করে এই পত্রিকার সিলভার জুবিলি পালন করা হবে। যেমন করে বারো বছর উদযাপন করা হয়েছিল ওয়েস্টিন হার্বার ক্যাসেল হোটেলে ঠিক সে রকম একটা অনুষ্ঠান হবে। ফোবানা বা বঙ্গ সম্মেলন ছাড়া টরেন্টোতে এতো লোক অন্য কোন অনুষ্ঠানে একত্রে দেখেছি কিনা সন্দেহ। 
কানাডা থেকে প্রকাশিত অন্যান্য সব পত্রিকা এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষকদের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলছি ‘দেশে বিদেশে’ টরেন্টোর বাংলাদেশীদের জন্য একটি আইকন বা মাইল ফলক। কেন বলছি সে কথা?  কিছু তথ্য দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে।  
বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে আভাস দিয়েছেন একটি নিউজ পেপার বা খবরের কাগজ কি করে সমমনাদের ঐক্যবদ্ধ হতে সাহায্য করে। এ প্রসঙ্গে তিনি দৈনিক আজাদ এবং মৌলানা আকরাম খান এর কথা বলেছেন। বলেছেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ঢাকার ইত্তেফাক এবং মানিক মিয়ার কথা। আরো কিছু খবরের কাগজের নামও তিনি উল্লেখ করেছেন যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা এবং পাকিস্তানের দুঃশাসন থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ গড়তে সাহায্য করেছিল। বর্তমান যুগে অনেকাংশেই খবরের কাগজের ‘খবর’ টিকে থাকলেও ‘কাগজ’ হারিয়ে যাচ্ছে। এই যুগটা পেপার-লেস এর যুগ। গ্রিন হাউজ প্রেমিকদের মতে গাছ কেটে কাগজ বানিয়ে চলতে থাকলে ভারসাম্যহীন প্রকৃতির কারণে পৃথিবী আপনা আপনিই একদিন শেষ হয়ে যাবে। ‘দেশে বিদেশে’ এখন সেই গ্রিন হাউসের বন্ধুত্ব বরণ করে নিয়েছে। টরেন্টোর বহুল জনপ্রিয় AM 680 রেডিও’র শ্লোগান হল, ‘If you are reading it - it is history, if you are hearing it  - it is news. অর্থাৎ ছাপাখানার সেই পুরানো নিয়ম ভেঙ্গে সপ্তাহের সাতদিনের চব্বিশ ঘণ্টা ক্রমাগত খবর পরিবেশনের দিকেই এখন অনেক লক্ষ্য, ইংরেজিতে যাকে বলে  24 X 7 । আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘দেশে বিদেশে’ এই দৃষ্টিকোণ নিয়ে পাঠক সেবা করে যাচ্ছে। পদ্ধতিটা সেই পুরানো, হকার এসে টোকা দেবার মতই। তবে এই টোকা ঘরের দরজায় দিনে একবার মানব হকারের টোকা নয়, বরং আমাদের পকেটে থাকা সেলফোন, ফেসবুক বা অন্যান্য ডিজিটাল এপসগুলোতে এসে জানান দেয় যে নতুন খরব এসেছে, এসেছে নতুন লেখা। এই টোকা বিরামহীন, যত খুশি ততবার হতে পারে। ইচ্ছে করলে আপনি যন্ত্রটি খুলে রেখে সব তাজা খবর পড়ে নিতে পারেন এবং সেই খবর অন্যের সাথে চোখের পলকে বিলি করতেও পারেন। বগল দাবা করে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে পত্রিকা নিয়ে ছুটাছুটির আর প্রয়োজন নেই, এটাই অনলাইনের সুবিধা। 
আপনার সকলেই জানেন যে পৃথিবীর প্রায় সব বড় বড় শহর গড়ে উঠেছিল নদীকে কেন্দ্র করে। যেমন টেমস নদীর তীরে লন্ডন শহর, হুগলী নদীর তীরে কোলকাতা কিংবা বুড়িগঙ্গার পারে ঢাকা শহর। নদীকে কেন্দ্র করে কেন শহর গড়ে উঠত? তার সহজ উত্তর হল যাতায়াতের সুবিধা ছিল বলে। বন্দর, ঘাঁট, বাজার যাই বলেন না কেন সব কিছুই নদীর পারে গড়ে উঠত। তারপর সেখান থেকে ধীরেধীরে প্রসারিত হত জনপদ। স্থায়ী বাসস্থান তুলতে তুলতে একদিন সেটা শহরে রূপ নিত। নতুন জায়গাতে নতুন পরিবেশে একটি খবরের কাগজ অনেকটা সেই নদীর মতই কাজ করে। নদী যেমন অনেক লোককে এক যায়গাতে নিয়ে আসতে পারে একটা পত্রিকাও অনেককে এক করে দেবার শক্তি রাখে। আজ থেকে ২৪ বছর আগে টরেন্টোর বাঙালি কমিউনিটি যখন খুব ছোট ছিল তখন আমাদের মধ্যে নদী হয়ে বয়ে গিয়েছিল ‘দেশে বিদেশে’।
১৯৮৮ সালে আমি থাকতাম টরেন্টোর পশ্চিম উত্তর দিকের একটি শহরে। টরেন্টো শহরে তখন বাংলায় লেখা একটি সাইনবোর্ডও ছিল না। কয়েক বছর যেতেই একদিন শুনতে পেলাম জেরার্ড স্ট্রীটে বাঙালি মালিকানায় একটি দোকান উদ্বোধন করা হয়েছে। বাঙালিদের দোকান! ভাবতেই গা শিউরে উঠেছিল। সেখানে গেলে কাউন্টারের উল্টোদিকে দাঁড়ানো দোকানদারের মুখে বাংলা কথা শোনা যাবে। হয়তো ক্যাসেট প্লেয়ারে বাংলা গান বাজবে, বাংলাদেশী কিছু পণ্যও পাওয়া যেতে পারে, এসব কল্পনা করতেই খুশিতে মন ভরে উঠল। বন্ধু ফারুক ভাইকে নিয়ে চলে এলাম সেই দোকান দেখতে। ‘স্বদেশে’র ভেতরে ঢুকে পেলাম আর এক স্বদেশ। একটি বাংলা পত্রিকা। সৈয়দ মুজতাবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’ কে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ভ্রমণ কাহিনী হিসেবে গণ্য করা হয়। সেই ‘দেশে বিদেশে’ নাম নিয়ে একটি পত্রিকা আমার দিকে চেয়ে আছে। ঐ যে হাতে তুলে নিলাম এখনো হাতের চাপেই আছে ‘দেশে বিদেশে’। যত্ন করে রেখে দিলে যাদুঘরে দেবার মত জিনিষ হতে পারত। বড় সাদা কাগজে বাংলাদেশী মূলধারার বিভিন্ন পত্রিকার অংশ কেটে আঠা দিয়ে লাগান, এর সাথে টাইপ রাইটারে লেখা কিছু লাইন। সব কিছু ফটোকপি করে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থার নাম ছিল ‘দেশে বিদেশে’ পত্রিকা। কিছুদিন পর সত্যিকার অর্থে ছাপানো পত্রিকা বের হতে শুরু করল। এক ডলার দিয়ে কিনতে হত সেই পত্রিকা। গ্রাহক হলে ডাকযোগেও ঘরে চলে আসতো। ডেনফোর্থে গেলে দেখা যেত সবার হাতে একটি করে ‘দেশে বিদেশে’। নদীকে কেন্দ্র করে হাট বসার মত অবস্থাই মনে হত। প্রথম দিকে অনেকেই বলত মিন্টুর (সম্পাদকের নাম) পত্রিকা। প্রিয় সাইদুল হোসেন ভাই তো ‘মিন্টুর পত্রিকা’ নাম দিয়ে একটি নিবন্ধ লিখে ফেললেন। জনপ্রিয়তা ও দাবী মেটাতে মাসিক পত্রিকা থেকে ১৯৯৬ সালের জুন মাস থেকে ‘দেশে বিদেশে’ হয়ে গেল সাপ্তাহিক। অটোয়া মন্ট্রিয়লেও চলে যেত এর কপি। ভেঙ্কুবার থেকে রফিক সাহেব জানালেন তাঁদের ওখানেও ‘দেশে বিদেশে’ পাওয়া যায়। কিছু দিন যেতে না যেতেই দেখা গেল একযোগে টরেন্টো এবং নিউ ইয়র্ক থেকে অর্থাৎ কানাডা আমেরিকা থেকে প্রকাশিত হল ‘দেশে বিদেশে’। গড়ে উঠল ‘দেশে বিদেশে’র নিজস্ব লেখক গোষ্ঠী। ডঃ মীজান রহমান, ডঃ মোজাম্মেল খান, হাসান মাহমুদ, সাইফুল আলম চৌধুরী, মহসীন বখত, সাইদুল হোসেন, নিতাই দেব, তাজুল মোহাম্মদ, ফকির ইলিয়াস, এলবার্ট সুকুমার মণ্ডল, রুমানা চৌধুরী, মোল্লা বাহাউদ্দিন, আজিজুল মালিক, সালমা বানি, আকবর হোসেনের মত গুণী লেখকদের লেখা পড়ার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে থাকতো তখনকার পাঠক সমাজ। ‘দেশে বিদেশে’র লেখক গোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা আসলে অনেক বড়, আমি দুঃখিত সকলের নাম মনে করতে পারছিনা বলে। তবে যে কথা বলছিলাম, পাঠক চাহিদা মেটাতে ‘দেশে বিদেশের’ পৃষ্ঠার সংখ্যা উন্নত করা হল ৬৪ তে। রঙিন পাতাও ছাপা হতে লাগল। যোগ হল নিউ জেনারেশন নামে ইংরেজি এডিশন। গর্ব করার মত যে কাজটি করা হল সেটি হল কানাডিয়ান মেইন স্ট্রিম পত্রিকার পাশাপাশি ‘দেশে বিদেশে’ও যায়গা করে নিলো। সাবওয়ের পত্রিকা স্ট্যান্ড কিংবা লাইব্রেরিতেও ‘দেশে বিদেশে’ পাওয়া যেত। বার কোডও সংযোজক করা হয়েছিল। আগামী দিনগুলোর কথা চিন্তা করে মাত্র সাত বছরেরে মাথায় ‘দেশে বিদেশে’ অনলাইনে চলে এলো। এত সাফল্যের পরও কোন এক কারণে ১৭ বছর প্রকাশনার ইতি টেনে প্রিন্ট মিডিয়া থেকে অবসর নিলো ‘দেশে বিদেশে’। এরপর কিছুটা মন্থর গতি নিয়ে কিংবা কখনো ধুকে ধুকে অনলাইনে টিকে থাকল ‘দেশে বিদেশে’। তারপর, ২০০৮ থেকে ডেইলি অনলাইন পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। গেল দুই বছর অক্লান্ত পরিশ্রম আর মেধা শক্তি লাগিয়ে বিশ্ব বাঙালির চাহিদা মেটাতে সম্পূর্ণ তৈরি হয়েছে উঠেছে আপনাদের প্রিয় ‘দেশে বিদেশে’। শুধু তাই নয় পৃথিবীর সব অনলাইন বাংলা পত্রিকার মধ্য রেঙ্কিং এ ‘দেশে বিদেশে’ এখন অগ্রবর্তী স্থান দখল করে নিয়েছে। এক কালে ফটোকপি মেশিনে যার জন্ম সেই  ‘দেশে বিদেশে’ এখন Interactive Digital Media হয়ে অনলাইনে নান্দনিক প্রকাশনায় আস্থা অর্জনে ব্যস্ত ।  
যারা নিয়মিত সাংবাদিকতা কিংবা সাহিত্য চর্চা করেন প্রবাসে এসে তাঁরা যদি মত প্রকাশের কোন প্লাটফর্ম না পেতেন তাহলে লেখালেখি ছেড়ে অনেকেই হয়তো পর্দার আড়ালে চলে যেতেন। আজ যেমন অনেকগুলো খবরের কাগজ এবং অনলাইন সংবাদপত্র রয়েছে এবং তাঁদের সহযোগিতায় নতুন পুরাতন লেখকরা সানন্দে হাত খুলে লিখেতে পারছে, তেমনটা ২৪ বছর আগে ছিল না। আজ যারা ক্ষেত্র খুলে রেখেছেন সেটার শুরু হয়েছিল ‘দেশে বিদেশে’র হাত ধরে। সে কারণেই ‘দেশে বিদেশে’ বাতিঘর। ‘দেশে বিদেশে’ আমার মত অনেককে লেখালেখিতে শুধু উৎসাহ দিয়ে ক্ষান্ত হয়ে বসে থাকে নি আমাদের একটি লেখক গোষ্ঠীর অংশ হতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল। আজ সেই কৃতজ্ঞতা এবং তৃপ্তিটুকু জানাতে পেরে বড় আনন্দ পাচ্ছি। নানা ভাবে যারা দেশে বিদেশের অগ্রগতির সাথে জড়িত তাঁদের সকলকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। ‘দেশে বিদেশে’র জন্য রইল শুভ কামনা। আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ। 

 

মুক্তমঞ্চ

  •  1 2 > 
Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে