Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (125 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১২-৩০-২০১১

অগ্নিৱান সাদিয়া চৌধূরী পরাগ

অগ্নিৱান
সাদিয়া চৌধূরী পরাগ
দু’তিনটে ঘুমের বড়ি খেয়েও কাজ হয় না। বেশ কিছুদিন যাবৎ এরকমই চলছে। সারারাত বিছানায় এপাশ ওপাশ হয়ে নিদ্রার কসরৎ করা। তবে, নিশি যায় যায় কালে, কিছুটা আচ্ছন্নতা নামে। কিন্তু এও টুটে যায়, কর্কশ শব্দে। সে সময় বুকের ভেতর ধড়পড়ানি শুরু হতে থাকে।
‘আমাদের আবার কী? ডাল-খেসারী খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা, পরের ফ্যাটে বসবাস করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়া, যত্তোসব গোঁজামিলের জিন্দেগী।’
আনিসের কথাগুলো যে তাকে উদ্দেশ্য করেই বলা, সে বুঝতে পারে। তবে নাঈমা টুঁ শব্দটি করে না। বরং বুকের নিচে বালিশটা শক্ত করে আঁকড়ে এমন ভাবে চোখ বুঁজে থাকে যেনো গভীর নিদ্রায় তলিয়ে আছে। সে সময় কণ্ঠস্বরটি আরেক দফা চড়ে ওঠে। আনিস এবার পূর্ব-প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলে, ‘এ্যাই মেয়ে, খাবার কিছু থাকলে দে, ঢংডাং দেখাবি না কইলাম।’
বাসায় আনিস এরকমই আচরণ করে। আর তার এ ধরনের আচার ব্যবহার থেকে অনুভূত হয়, এ যেন কোনো বিগত শতাব্দী বা এর পূর্বকালের জমিদার পরিবারের উগ্র যুবকের নাখোশ মেজাজ। নাঈমা খুবই অবাক হয়। ভাবে, আনিস এ স্বভাবটি পেলো কোত্থেকে!
গভীর ঘুমের ভান করে চোখ বুঁজে পড়ে থাকলেও কান দু’টি সে খাড়া রাখে। তখন বুঝতে পারে বাসায় আশ্রিত কিশোরী মেয়েটি দ্রুত হাতে টেবিল সাজাচ্ছে। আর সেখানে থেকে আনিসের খেঁকিয়ে ওঠার শব্দ আসে, ‘এ্যাই মেয়ে! রোজ দিন একই রকম নাস্তা দিতে কে বলেছে? কয়েদীর খাবার না-কি?’
এরকমই ঘটে। দিনমান ফ্যাটটি ছিমছাম থাকলেও আনিসের উপস্থিতিতে সবকিছু যেনো থরথর করে। নাঈমার খুব ইচ্ছে করে ছেলের মুখোমুখি হয়ে বলে, ‘তুই এমন করে কথা বলিস কেন আনিস? আমরা তো আর খুব হেলাফেলার মাঝে জীবন কাটাচ্ছি না। তোর জন্মের আগে মফঃস্বল শহরে শিকতা করেছি। এখন এনজিওতে ভালো মায়নার চাকরি নিয়ে ঢাকা শহরে আছি। তোকে লেখাপড়া শেখাতেও ত্রুটি করিনি, তবে?’
অথচ নাঈমা নিঃশব্দে নিজের সঙ্গেই বুঝি কথা বলে, ‘এই ফ্যাট নিয়ে তুই কথা তুলিস কেন? আমার বান্ধবী প্রগতি বাইশ ’শ-স্কোয়ার ফিটের পুরো ফ্যাটটিই তো আমাকে ব্যবহার করতে দিয়েছে। আমি ইচ্ছে করেই বাকী অংশগুলোতে তালা ঝুলিয়ে রেখেছি যেনো নোংরা না হয়। তাছাড়া দরকার কী বল? মা-ছেলে দু’জনের জন্যে তিনটে রুম, বারান্দা, স্টোর, দু’টি টয়লেট কি যথেষ্ট নয়?’ মাঝখানে থেমে সে কি যেন ভাবে, একসময় চিড়বিড় করে, ‘এতে যদি সম্মানে লাগে তবে তুই অন্যত্র চলে যেতে পারিস, ভালো চাকরি করছিস, বেতনও ভালো পাচ্ছিস, নাকি?’
আসলে সে কখনো আনিসের সামনে মুখ খোলে না। কি যেন একটা দ্বিধা তাকে এগিয়ে যেতে দেয় না। মনে হয় ছেলে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়ে যদি কোনো সর্বনাশা পথে নেমে পড়ে! আনিসের জন্মের পর থেকে এরকম একটা ভয় তাকে সর্বণ তাড়া দেয়। নাঈমার বুকটা ঢিপঢিপ করে। সে তখন অন্যকথাও ভাবে। তাদের ছাড়া-ছাড়া সম্পর্কের দাম্পত্য জীবনে পেটে বেড়ে-ওঠা সন্তানটি কি সেজন্যে এ-ধরনের স্বভাব পেয়েছে? এটাও হতে পারে, একটা অসুস্থ ঘরসংসারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলাফল। না হলে স্কুল-কলেজ কিংবা কর্মপ্রতিষ্ঠানে ভালো মানুষ রূপে পরিচিত সন্তানটি বাসায় এসে চণ্ডমূর্তি ধারণ করে কিভাবে?
বয়ঃবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেন আনিসের স্বভাবটি প্রকাশ পেতে থাকে। নাঈমা এখন পুরো ঘটনাটির জন্যে নিজেকেই দায়ী করে। তার মনে হয়, জীবনের ভুল-ত্রুটি শুধু সেই ভ্রান্তকারীকে অগ্নিৱান করায় না, এর উত্তাপ কাছাকাছি-থাকা অপরকেও দ্বগ্ধ করে। আনিসকে হয়ত সেই তাপে দহন করে। নাঈমার আরো মনে হতে থাকে, সেই শৈশব বয়সকাল থেকে আনিস কখনো তার জন্মদাতার পাশ ঘেঁষেনি। জন্মদাতা আশেক শত কৌশলেও বশ করতে পারেনি তাকে।
নাঈমা তখন বাস্তব থেকে বেশ দূরে পেছনে হটে। অনেক বছর পেছনে। সে স্পষ্টই দেখতে পায়, মফঃস্বল শহরের এক শিয়িত্রীকে। একটা উন্নততর স্বাধীন জীবন গ্রহণের জন্যে সে রাজধানীতে ছুটে আসে, বেশ ছুটাছুটি ও ঘুরাঘুরি করে একটা এনজিওতে চাকরি পেয়ে যায়। কিন্তু এখানে স্বাধীনভাবে চলাফেরার অবকাশ থাকলেও অবিবাহিত কিংবা সুন্দরী মেয়েদেরকে প্রায়ই চক্রান্তের নোংরা পথে আছাড় খেতে হয়। কেউ স্বেচ্ছায় লোভ-লালসায় আটকা পড়ে, কেউবা অনিচ্ছায়। আর বাদবাকীরা খুব সাবধানে সতর্কে নিজেদের ধরে রাখতে চাইলেও ঘর বাঁধার চিরাচরিত প্রত্যাশার বেশ কিছু ছাড় দিয়ে যেন সীমানা পার হয়। এতেও ঢের ভুল হয়। নাঈমা সেরকম ভুলই করে। না হলে আশেকের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর দুই বৎসরেও কেন সে মানুষটার সম্পর্কে কোনো তথ্য সংগ্রহ করে নি! অথচ আশেক বার বার তাড়া দিয়েছে, ‘বিয়ের সিদ্ধান্ত যখন নিয়েছো, আমাকে একটু উল্টিয়ে পাল্টিয়েও দেখবে না?’
নাঈমা মাথা নেড়ে বলেছে, ‘না না, এসবের কোনো প্রশ্নই আসে না। আমি তোমাকে জানি, চাকরি করছো, শ্রীমঙ্গলের একটি চা-বাগানে এ্যাসিট্যান্ট ম্যানেজার পদে আছো অনেক দিন। আর পদোন্নতি হচ্ছে না বলে ভেতরে ভেতরে চাপা ােভ বাড়ছে, এই তো!’
আশেক হেসে বলেছিল, ‘আমার দুঃখগুলো কুড়িয়ে রেখেছো তাহলে!’
নাঈমা মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিল সেদিন, ‘সে তো রাখবোই।’
কিন্তু বিয়ের মাস তিনেক গড়িয়ে গেলে নাঈমা তার স্বামীর গভীর তটা ধরতে পেরে দুঃখে কঁকিয়ে ওঠে। আর সেই ব্যথার অস্ফুট কান্নাটা ছিল একান্ত তার নিজের। আশেক অপরাধীর মতো নত মাথায় তার পাশে দাঁড়ালে সে তখন বলে, ‘একটা বেঈমান তুমি, শয়তান, আমার কি সর্বনাশ করেছো জানো? সন্তানটি পেটে না এলে এখনি তোমাকে ডির্ভোস দিতাম।’
আশেক ম্রিয়মান হয়ে উত্তর দেয়, ‘সে আমি বুঝি, বিশ্বাস করি, তুমি যা ইচ্ছে তাই করতে পারো বৈকি! দিব্যিকেটে বলছি, জীবনে কিছুটা শান্তির আশায় তোমার দিকে হাত বাড়িয়েছি, তুমিও হাত ধরেছ...।’
তাকে থামিয়ে দিয়ে নাঈমা বলে, ‘থাক্‌ থাক্‌, আর নাটকের ডায়লগ ছেড়ে মন ভেজাতে চেষ্টা করো না, দুই প্রান্তে দুই বউ, দুই সংসার! আমি যা জানার তা জেনে গেছি।’
আশেক এবার জোরালো কণ্ঠে বলে, ‘না, কিছুই জানো নি। তুমি মিলার কথা জানো? আমার সন্তান কমল আর কুঁড়ির মা’র কথা? ঐ মেয়েমানুষটি খুবই ধূর্ত, সে আমাকে বেডরুমে বসিয়ে নিত্য নতুন ছেলে বন্ধুর সঙ্গে ফূর্তি করতে যায়। বিকৃত রুচির নারী!’ কথাগুলো বলে আশেক বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে।
নাঈমা নীরবতা ভঙ্গ করে বলে, ‘হ্যাঁ, ওই মেয়েমানুষটির বিকৃত মোহ আজো তোমাকে আগলে রাখে।’
আশেক মাথা নেড়ে বলে, ‘কথাটা ঠিক নয়। তবে এ ধরনের ঘর-কন্না করতে বাধ্য হতে হয়, দু’টি শিশু সন্তানের জন্যে।’ খানিক চুপচাপ থেকে পুনরায় বলে, ‘বাসায় আসতে দেখলে ছেলেমেয়ে দু’টি খেলার আনন্দ ফেলে ছুটে আসে আমার কাছে, বুকে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে।’
নাঈমা আর কথা বাড়ায় না। কমল-কুঁড়ির জন্যে মনটা ক্রমেই খারাপ হতে থাকে তার। তখন মনে হয়, কারো বিবেকে পচন ধরলে সে আর মানুষের পর্যায়ে থাকে না। প্রবৃত্তির প্রাবল্যে সে ন্বিমানের প্রাণীতে পরিণত হয়ে নষ্ট করতে থাকে সমাজের আচার বিচার এবং সংস্কারগুলোও। তার আরো মনে হলো, এই বিবেকের দৃঢ়তার জন্যে সে আশেকের কাছ থেকে সরে যেতে পারছে না। হয়তো বা অনাগত সন্তানের কথা ভেবেও।
আশেক বরাবরের মতো বাসায় আসে। এ যেন দীর্ঘ বছরের অভ্যাস। আনিসের সঙ্গে নিবিড় হওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। কিন্তু সে তাকায় না। ছেলেটা যেন বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরো দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে। নাঈমা দুঃখ করে। আশেক সান্ত্বনা দেয়। বলে, ‘এখন এ নিয়ে এত ভাবো কেন? মা হিসেবে তোমার যতটুকু দায়িত্ব তাতো করছো। তবে তার কাছ থেকে কোনো প্রাপ্তির আশা করো না।’
কথাগুলো যথাযথ এবং তাৎপর্যপূর্ণ হলেও নাঈমা ভাবলেশহীন অবস্থায় বসে থাকে। তার মনে হলো, মানুষ সম্ভবত আগুনে পোড়াতে পোড়াতে ভালোবাসা আর মনের গহীনে পোষণ-করা ইচ্ছাটার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় এভাবে, যেভাবে ছেলের আচরণে সে জ্বলছে। অথবা তার সতীন মিলা যেভাবে ছারখার করছে তার স্বামী ও সন্তানকে।

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে