Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.8/5 (63 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১১-২৬-২০১১

ইরানে ইসরায়েলি হামলা বুমেরাং হতে পারে

আহমদ রফিক


ইরানে ইসরায়েলি হামলা বুমেরাং হতে পারে
কয়েক দিন ধরে সংবাদপত্রে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের একটি খবর দুর্যোগের মতো পাঠকদের মনে ছায়া ফেলছে। তা হলো_ইসরায়েলের হুমকি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার এবং তাতে ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির নীরব সমর্থন। চীন-রাশিয়া এর বিরুদ্ধে হলেও খুব জোরেশোরে প্রতিবাদ করছে না। আর সাম্রাজ্যবাদের সমর্থক মধ্যপ্রাচ্য তো চাইছেই_রাজতন্ত্রবিরোধী ইরান ধ্বংস না হোক, অন্তত দুর্বল হয়ে যাক। আরব লীগের প্রভাবশালী দেশগুলো তাই এ ব্যাপারে চুপচাপ।
এ ঘটনার প্রেক্ষাপট গত কয়েক বছরের, যখন ইরান বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদনের লক্ষ্যে পারমাণবিক স্থাপনার কাজ শুরু করে। অর্থাৎ শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার। বিষয়টা নিয়ে বরাবর ইসরায়েল ও পশ্চিমা শক্তি সন্দেহ পোষণ করে এসেছে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের জন্য চাপ দিয়েছে। ইরান প্রথমে রাজি না হলেও পরে পরিদর্শনের কাজ কিছুটা চলেছেও, কিন্তু সন্দেহমুক্ত হয়নি ইসরায়েল-পশ্চিমা লবি।

এর পেছনে সামান্য হলেও তরুণ ইরানি প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ। ইসরায়েলকে বিশ্ব মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেব_তাঁর এ-জাতীয় অর্বাচীন হুমকি নিঃসন্দেহে প্রাজ্ঞ রাজনৈতিক চেতনা ও বিচক্ষণতার পরিচায়ক নয়। এ মন্তব্য গ্রহণযোগ্যও নয়, যা নিয়ে বেশ কিছুদিন বিশ্বরাজনীতিতে তোলপাড় চলেছিল। মাঝেমধ্যে ভাবি, মধ্যপ্রাচ্য ও আরব বিশ্বের নেতাদের মধ্যে বিচক্ষণ রাজনৈতিক চেতনার অভাব কেন? যে কথা গণতন্ত্রমনা বিশ্ববাসীর পক্ষে গ্রহণযোগ্য হবে না, সে কথা প্রকাশ্যে বলার প্রয়োজন কী?

তবে এ কথাও সত্য যে বিশ্বের বহু শক্তিশালী দেশ, এমনকি ভারত ও পাকিস্তান যদি পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হতে পারে এবং বিশ্বের সব পারমাণবিক অস্ত্র যতক্ষণ পর্যন্ত পুরোপুরি ধ্বংস করা না হয়, ততক্ষণ বিশ্বের যেকোনো দেশের পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হওয়ার নৈতিক অধিকার অবশ্যই রয়েছে। এটা যুক্তির কথা হলেও বিশ্বমোড়লদের তা মানার কথা নয়। ছোট্ট ইসরায়েল রাষ্ট্র যদি পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হতে পারে, তাহলে ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ তা পারবে না কেন? আপত্তিটা কোথায় এবং কেন?

ইরান অবশ্য বরাবরই দাবি করে আসছে যে সে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে আগ্রহী, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে নয়। কিন্তু ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্ব সে কথায় বিশ্বাস রাখতে পারছে না। আর পারছে না বলেই যত সমস্যা। কিন্তু এটা সমস্যার কোনো কারণ নয়। কেন নয়, সে যুক্তির কথা আমরা একটু আগেই বলেছি।

তবু প্রশ্ন, এত দিন পর আবার হঠাৎ করে ইসরায়েলের এ হুমকির কারণ কী? আর পশ্চিমা বিশ্বই বা কেন তাতে মদদ দিচ্ছে? এমনকি কথিত শান্তিরক্ষক জাতিসংঘও তাদের পক্ষেই সমর্থন জোগাচ্ছে, যা এ সংস্থাটি জন্মলগ্ন থেকেই করে আসছে। অর্থাৎ চোখ বন্ধ করে পশ্চিমা পরাশক্তির ন্যায়-অন্যায় কার্যক্রম সমর্থন করে যাওয়া। যে জন্য মাঝেমধ্যে কথা উঠেছে তৃতীয় বিশ্বের স্বার্থরক্ষায় নতুন জাতিসংঘ গঠনের। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অনৈক্য এবং পশ্চিমা শক্তির কলকাঠি নাড়ার কারণে তেমন প্রচেষ্টা দানা বাঁধতে পারেনি, ভিত তৈরি তো দূরের কথা।

পূর্বোক্ত প্রশ্নের জবাব নিয়ে নানা মুনির নানা মত। হঠাৎ ইসরায়েল যেন ঘুম ভেঙে উঠে বসতে শুরু করেছে, 'ইরানের পাখা ছেঁটে ফেলতে হবে।' কিন্তু কেন? হঠাৎ এমন তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত কেন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা ফেলে সব ধ্বংস করার? এটা কোন গণতান্ত্রিক নিয়মে সিদ্ধ? ইরান তো ইসরায়েলের ওপর কোনো ধরনের হামলা চালায়নি। বরং ইদানীং ইসরায়েল প্রসঙ্গে তার কণ্ঠস্বর কিছুটা নরমই শোনা যাচ্ছিল।

এসবের মূল কারণ অবশ্য একটাই। ইরান কট্টর ধর্মবাদী রাষ্ট্র, কিন্তু প্রবলভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী ভূমিকার বিরোধী_আয়াতুল্লাহ খোমেনির আমল থেকেই। তারা একই সঙ্গে সমাজতন্ত্রবিরোধী। আবার সেই সঙ্গে রাজতন্ত্রবিরোধীও। যে কারণে মধ্যপ্রাচ্য ও আবর বিশ্বের মাত্র কয়েকটি রাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের রাজনৈতিক সুসম্পর্ক। যেমন_লিবিয়া ও সিরিয়া। এ ক্ষেত্রেও সহমর্মিতার সূত্র একটাই, আর তা হলো আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা।

আরেকটি সূত্রও এ ক্ষেত্রে বিবেচ্য। যেমন_ফিলিস্তিনি আরব জনগোষ্ঠীর ওপর ইসরায়েলের ধারাবাহিক আগ্রাসন, তাদের ভূখণ্ডভিত্তিক ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। বিষয়টা আরব স্বার্থের সঙ্গে জড়িত হলেও আরব বিশ্ব এ সমস্যা সমাধানের কোনো আন্তরিক প্রচেষ্টা কখনো নেয়নি। এ বিষয়ে তারা ইসরায়েল-মার্কিন লবিকে পরোক্ষ সমর্থন জুগিয়েছে এবং এ কথা জানা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইসরায়েলের অন্যায্য দাবির প্রতিই বরাবর সমর্থন দিয়ে এসেছে।

এমন এক অন্যায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পূর্বোক্ত প্রশ্নের সদুত্তর অন্বেষায় আমাদের মনে হয়, বর্তমান আরব বিশ্বের পরিবর্তিত পরিস্থিতি তাদের শক্তিমান শত্রুর ওপর আঘাত হানতে উৎসাহ জোগাচ্ছে। এ অঞ্চলে তাদের গুরুত্বপূর্ণ শত্রু গাদ্দাফি নিহত, লিবিয়ার তেল সম্পদ তাদের নিয়ন্ত্রণে যেতে চলেছে। তাদের পরবর্তী টার্গেট সিরিয়া অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। বাশারের পতন এখন সময়ের ব্যাপার। ইরাক আগেই দখলে চলে এসেছে। থাকল বাকি একমাত্র ইরান।
সন্দেহ নেই, ইরান সাম্রাজ্যবাদীদের হিসাবেও শক্তিমান প্রতিপক্ষ। ইরানকে কবজায় না এনেও তাকে দুর্বল করে ফেলতে পারলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় মধ্যপ্রাচ্যে ও আরব বিশ্বে। কারণ বাধা দেওয়ার মতো কোনো রাষ্ট্রীয় শক্তি আর থাকবে না। নির্বিবাদে চালানো যাবে শাসন, শোষণ, লুটপাট। এতে কিছুটা হলেও সম্ভব হবে মার্কিন অর্থনীতির নিম্নমুখী গতি ঠেকানো।

একেকটা যুদ্ধের খরচ হিসাব করতে গেলে তার অভ্যন্তরীণ প্রভাবও বিবেচনায় রাখতে হয়। এমনকি ন্যাটো বাহিনীর মাধ্যমে যুদ্ধ চালাতে গেলেও তার সিংহভাগ খরচের চাপ পড়ে প্রধান শরিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। ইরাক যুদ্ধের লাভ-ক্ষতির খতিয়ানে করপোরেট পুঁজি লাভবান হলেও সরকারি কোষাগার কতটা ভরেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। জাতীয় অর্থনৈতিক মন্দা তার প্রমাণ।
হয়তো তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ছোট-বড় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এখন একজোট হয়ে আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের নীতি গ্রহণ করেছে। ন্যাটোর মাধ্যমে লিবিয়া আক্রমণ এর সাম্প্রতিক উদাহরণ। ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সম্ভবত তাদের নয়া নীতিনির্ধারণে সাহায্য করেছে। এভাবেই কি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি-পরাশক্তি বিশ্ব দখলের পরিকল্পনা করছে?

কিন্তু এ উদ্দেশ্য কতটা ফলপ্রসূ হবে, কতটা লাভবান হতে পারবে সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি? অর্থনৈতিক ক্ষতি কতটা কাটানো সম্ভব হবে? আরো একটি বিষয় তাদের বিবেচনায় রাখা দরকার। আরব বিশ্বের নয়া জাগরণ কতটা মার্কিন অর্থনীতির রণনীতির সহায়ক হবে, সে হিসাব কি তারা করেছে? আফগানিস্তান নিয়ে যে খেলা শুরু যুক্তরাষ্ট্রের, তা কি সফল পরিণতিতে পেঁৗছেছে? মনে হয়, এক অন্তহীন খেলায় জড়িয়ে পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পরিস্থিতি এমনই যে বশংবদ পাকিস্তান পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে। আর আফগানিস্তান? এত ড্রোন হামলার হত্যাকাণ্ড, ওসামা হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনার পরও তালেবানদের সঙ্গে সমঝোতা-আলোচনার দিকে হাত বাড়াতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে। রুশ বাহিনী খেদানোর তাগিদে আফগানদের সর্বনাশ করে ছেড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

নতুন নতুন লড়াইয়ের ফ্রন্ট খুলে কি সামাল দেওয়া যাবে? মেরামত করা যাবে বিপর্যস্ত অর্থনীতি? তালেবানদের প্রসঙ্গ আসছে এ জন্য যে আরব জাগরণের ফলাফল বিবেচনায় যা দেখা যাচ্ছে, তাতে বিপরীত চরিত্রের লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে সবাইকে অবাক করে দিয়ে পশ্চিমা গণতন্ত্রের বদলে ইসলামী তথা ধর্মীয় ধারার যে শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে যেমন তিউনিসিয়া বা লিবিয়ায়, তার সুফল যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে যাবে বলে তো মনে হচ্ছে না।

তিউনিসিয়া যদি আরেক ইরান হয়ে ওঠে, বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতায়, তাহলে? লিবিয়াকে কি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র? ইয়েমেন শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি পাল্টাতে পারলে তা যেমন ওয়াশিংটনের পক্ষে যাবে না, তেমনি তাদের বশংবদ আরব রাজতন্ত্রের জন্য তা হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর মিসর? শেষ দানে কে জয়ী হবে এ মুহূর্তে বলা কঠিন হলেও তা মার্কিন-ইসরায়েল জোটের পক্ষে যাবে বলে মনে হয় না।

মোটকথা, আরব বিশ্বে এই যে পরিবর্তনের সূচনা, তার পরিণত পর্যায়ে আরব জাতীয়তাবাদ বা গোঁড়া ইসলামী শাসনতন্ত্র যে গন্তব্যেই যাক, তার অবশেষ ফলাফল সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধেই যাবে, আশপাশের উদাহরণ বা লক্ষণ তা-ই বলে। আর সে কারণেই উলি্লখিত সম্ভাবনার হিসাব-নিকাশ সঠিকভাবে করতে পারলে ইরান আক্রমণ নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক হবে বলে মনে হয়। কারণ ইরান কোনো হিসাবেই লিবিয়া বা সিরিয়া নয়। মতাদর্শগত দিক থেকে যেমনই হোক, ইরানি জনগণ প্রবলভাবে, একচেটিয়াভাবে মার্কিনবিরোধী, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, ইরাকের মতো শিয়া-সুনি্ন বিভেদের সুযোগও এখানে নেই। সর্বাত্মক আক্রমণ ঘটাতে চাইলে ভিন্ন মতাদর্শেই ইরান ওয়াশিংটন-তেলআবিবের জন্য আরেক ভিয়েতনাম হয়ে দাঁড়াতে পারে কিংবা তার চেয়েও বেশি। কারণ ধর্মের জোরটা ক্ষেত্রবিশেষে আধুনিক মতাদর্শের চেয়ে অনেক বেশি।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে