Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১২-০৩-২০১৮

সঠিক সময়ের অপেক্ষা

ইফফাত আরেফীন তন্বী


সঠিক সময়ের অপেক্ষা

জমে থাকা কথার প্রবাহে অবশ্যই স্মরণীয় যা, তা হলো- 'শিল্প শিল্পীর কাছে কেবলমাত্র যন্ত্রণার আস্বাদন, অথচ এই শিল্প সৃষ্টির মধ্য দিয়েই শিল্পী নিজেকে উন্মোচিত করে অধিকতর যন্ত্রণার জন্য।' কথাটি একজন নৈরাশ্যবাদী মহান লেখকের- ফ্রানৎস কাফকার। একটা কথা বলা প্রয়োজন, সেটা হচ্ছে- বিশ্বভূমিতে অগণিত লেখার পাশাপাশি কাফকা শিল্পকর্মের গহিনে বিস্ম্ফোরণ ঘটান। তাই এর থেকে পালানো যায় না। তিনি নির্লিপ্ত, নিঃশব্দ। সে জন্যই হয়তো তার ভেতরে জমে থাকা ভাবনাগুলো পুঞ্জীভূত হয়ে শিল্পের দিগন্তরেখার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। যেখানে আকাশ আর মাটির মিলন ঘটে। 

সত্য যুগ থেকে যদি ধরি, তবে জমে থাকা কথার জন্য সত্য যুগের বেদবতী ত্রেতা যুগে সীতা দ্বাপর যুগে দ্রৌপদী হয়ে জন্মেছেন। এদের গল্পটা এমন- বৃহস্পতির পুত্র ব্রহ্মর্ষি কুশধ্বজের কন্য বেদবতী। কুশধ্বজ লক্ষ্মীকে কন্যারূপে পাওয়ার জন্য কঠোর তপস্যা করলে তার স্ত্রী মাল্যবতী কালক্রমে লক্ষ্মীর অংশরূপিণী এক কন্যা প্রসব করেন। এই কন্যা ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্র বেদ ধ্বনি করতে থাকেন। সেই জন্য নাম হয় বেদবতী। জন্মের পরেই বেদবতী পুস্করতীর্থে গিয়ে এক মন্বন্তরকাল কঠোর তপস্যা করেন। এ সময়ে তিনি দৈববাণী শুনতে পান- 'তুমি জন্মান্তরে বিষ্ণুকে স্বামীরূপে পাবে।' এই দৈববাণীর পর বেদবতী গন্ধমাদন-পর্বতে আবার তপস্যা করতে থাকেন। এই সময় হঠাৎ রাবণ তার সম্মুখে উপস্থিত হলে তিনি অতিথি জ্ঞানে সেবা করেন। রাবণ তার রূপযৌবনে মুগ্ধ ও কামাতুর হয়ে বলপূর্বক অত্যাচার করতে উদ্যত হলেন। তখন বেদবতী ক্রুদ্ধ হয়ে রাবণকে স্তম্ভিত করে তার হাত, পা, মুখ প্রভৃতি জড়ীভূত করে দিলেন। কিন্তু রাবণের হাতে তার অপমান হেতু তিনি প্রজ্বলিত অগ্নিতে প্রবেশ করেন এবং মৃত্যুর আগে রাবণকে বলে যান, এই রূপে ধর্ষিত হওয়ার জন্য তিনি আবার অযোনিজা কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করে রাবণ বধের কারণ হবেন। বহুকাল পরে ত্রেতা যুগে বেদবতী জনক রাজার কন্যা 'সীতা' নামে জন্মগ্রহণ করেন। রাবণ এরই জন্য সবংশে ধ্বংস হন। দেবগণের ইচ্ছায় প্রকৃত সীতা অগ্নির কাছে থাকেন এবং রাবণ ছায়া সীতাকে হরণ করে লংকায় নিয়ে যান। রাবণ বধের পর অগ্নিপরীক্ষাকালে অগ্নি প্রকুত সীতাকে অর্পণ করেন। রাম ও অগ্নির উপদেশে এই ছায়া সীতাও পুস্কর তীর্থে তিন লাখ বছর তপস্যা করেন। এই তপোবল-প্রভাবে যজ্ঞ হতে উত্থিতা হয়ে ইনি দ্রূপদের কন্যা দ্রৌপদী নামে খ্যাত হন। এই দ্রোপদীও নানা সময়ে নিগৃহিত হন এবং প্রতিশোধ নেন যার ফল দুর্যোধনের ঊরু ভঙ্গ। বেদবতী, সীতা বা দ্রৌপদী লক্ষ্মীর অংশ হওয়া সত্ত্বেও শেষজন্ম অর্থাৎ দ্রৌপদী জন্মে মহাপ্রস্থানের কালে যোগভ্রষ্টা হয়ে পতিত হন, কারণ জানা যায় অর্জুনের প্রতি পক্ষপাতের জন্য। এই বিষয়টি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় মহাভারতের লেখক একজন পুরুষ। এ তো গেল মহাকাব্যের কথা। 

এবার কাব্য ও গানের কথায় আসি, রবীন্দ্রনাথ আসেন অবধারিতভাবে; কেননা রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন বলেই আজও বাঙালি জমে থাকার কথার প্রকাশ ঘটায় তার গান ও কবিতায়। কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুশোক যেভাবে গানের ছত্রে সুরে সুরে ছড়িয়ে গেছে আকাশে-বাতাসে, তেমনি পুত্রশোকও সামলেছেন একইভাবে গানে। কাদম্বরী দেবীকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়েছেন এক অপার্থিব গানে-

আমার প্রাণের 'পরে চলে গেল কে
বসন্তের বাতাসটুকুর মতো। 
সে যে ছুঁয়ে গেল, নুয়ে গেল রে-
ফুল ফুটিয়ে গেল শত শত।
সে চলে গেল, বলে গেল না-
সে কোথায় গেল ফিরে এল না 
সে যেতে যেতে চেয়ে গেল কী যেন গেয়ে গেল-

শুধু সাহিত্য কেন, রবিঠাকুরের জমা কথার প্রকাশ দেখা যায় তার চিঠিতেও, মৃত্যু নিয়ে তার। আশ্চর্য ভাবনা দেখতে পায় স্নেহভাজন মৃণালিনী দত্তর সমবেদনাময় চিঠির জবাবে 'ঈশ্বর আমাকে বেদনা দিয়েছেন, কিন্তু তিনি আমাকে পরিত্যাগ করেন নাই। তিনি হরণও করিয়াছেন পূরণও করিবেন। শোক করিবে না। আমার জন্যও শোক করো না'- এখানেই রবীন্দ্রনাথ আলাদা। একজন দার্শনিক যেন। 

কবি জীবনানন্দ দাস। তার আপত নিঃশব্দতা মূলত মগজে জমতে থাকা কথা। 'ধূসর পাণ্ডুলিপি'তে জীবনানন্দের প্রেম ছিল একান্ত ব্যক্তিগত, বনলতা সেন, মহাপৃথিবী, সাতটি তারার তিমির পরবর্তী এই তিনটি কাব্যগ্রন্থে প্রেম বোধ পরিব্যাপ্ত হলো স্থানে কালে।' 

'হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে'- এই এক লাইনেই মহাসময়ে বিলীন হয়েছে পৃথিবী। আবার 'গোধূলী সন্ধির নৃত্য' কবিতায় সত্যিকার অর্থে বাণিজ্যিক পুঁজিবাদী পৃথিবীর নিরাভরণ চেহারা উঠে আসে, যা হয়তো নিজের ভেতরে থাকা মানুষটির জমে থাকা কথার বাষ্পগুলো এভাবে বেরিয়েছে- প্রগাঢ় চুম্বন ক্রমে টানিতেছে তাহাদের/তুলোর বালিশে মাথা রেখে আর মানবীর ঘুমে/স্বাদ নেই;- এই নিচু পৃথিবীর মাঠের তরঙ্গ দিয়ে/ওই চূর্ণ ভূখণ্ডের বাতাসে- বরুণে/ত্রূক্রর পথ নিয়ে যায় হরীতকী বনে-জ্যোৎস্নায়।/যুদ্ধ আর বাণিজ্যের বেলোয়ারি রৌদ্রের দিন/শেষ হয়ে গেছে সব;- বিনুনিতে নরকের নির্বচান মেঘ/পায়ের ভঙ্গির নিচে বৃশ্চিক-কর্কট-তুলা-মীন।' জীবনানন্দের ভেতরে জমে থাকা কথাগুলো শব্দময় হয়ে আজ মানুষের মুখে মুখে নিকস্ফণ হয়ে বাজে। 

ভিনসেন্ট ভ্যান গগ পৃথিবীর মহান শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম। শিল্পী-জীবন বেছে নেওয়ার আগে অনেক কিছু করেছেন। ধর্মতত্ত্বের শান্তির বাণী প্রচার, শিক্ষকতা, বইয়ের দোকানে কাজ করেছেন। কিন্তু কোনো কাজই তাকে পরিতৃপ্তি দিতে পারেনি। তার ভাইকে এক চিঠিতে লিখলেন- 'ছবি এঁকে কিছু বলতে চাই আমি, আর তাতেই সঙ্গীত যেমন সান্ত্বনা দেয়, তেমনই সান্ত্বনা পাবো।' তাই তিনি ছবির মধ্যেই থিতু হয়েছিলেন। ভ্যান গগের জমানো কথাগুলো চিঠির মধ্যেও পাওয়া যায়, ঠিক যেভাবে তার ছবির মধ্যে তাকিয়ে দর্শক নিজের দর্শন আর বোধটাকে নিংড়ে নেন তেমনি চিঠিগুলো পড়লে কেবল ভিনসেন্টের নিজস্ব বোধ দর্শন কথাগুলোই বেরিয়ে আসে। 

৩ এপ্রিল ১৮৭৮-এ লিখছেন- 'আমরা যদি কেবল সততার সঙ্গে বাঁচতে চেষ্টা করি, তাহলেই এই বিশ্বাসটা মানিয়ে নিতে পারব, যদিও সত্যিকার দুঃখ যে পাবো তাতে কোনো সন্দেহ নেই এবং দারুণ হতাশাও থাকবে; আর হয়তো অনেক বড় ভুল, বড় অন্যায় কাজও করা হয়ে যাবে কিন্তু তবু এ কথা সত্যি যে, সংকীর্ণমনা এবং বেশি বিচক্ষণ হওয়ার চেয়ে ভুল করলেও মনটা বড় রাখা ভালো। বহুকিছুর মধ্যে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে পারলে ভালো কারণ সত্যিকার শক্তিটা বাস্তবিকই এর মধ্যেই থাকে। যারা ভালোবাসতে পেরেছে, তারা বেশি কাজ করতে পেরেছে এবং ভালোবেসে করা কাজ ভালো হয় ...।

মানুষ যদি তার ভালোবাসাকে তুচ্ছ, অযোগ্য, অর্থহীন জিনিসে নষ্ট না করে সত্যিই ভালোবাসার যোগ্য কিছুকে বিশ্বস্তভাবে ভালোবাসে তবে ধীরে ধীরে সে আলোকিত এবং শক্তিশালী হবে।'

ভ্যান গগের লেখা এই লাইনগুলো কি একজন শিল্পী বা লেখক বা একজন দার্শনিকের জন্য অপরিহার্য নয়?

আবার সুয়েসমিস বেলজিয়াম থেকে ১৮৮০ সালে ভাই থিওকে লেখা আরেকটি চিঠির মধ্যে লিখেছেন- 'কোনো কোনো মুহূর্তে আমরা হয়তো অন্যমনস্ক বা স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে যাই। এটা কোনো দোষের ব্যাপার নয়। আমি নিজে এ রকম হই এবং এর অনেক কারণ রয়েছে। কিন্তু আমাকে কেউ বোঝে না, আমার প্রতি অন্যের মমতার অভাবেই হয়তো এটা হয়। বহু লোক আছে বহুদিন তারা হয়তো কিছু করতে পারেনি। অবশেষে একদিন ঠিকই সে নিজের যোগ্যতার পরিচয় দেয়। সে যে এককালে ভেসে বেড়াচ্ছিল বা নিষ্ফ্ক্রিয়তায় ডুবে ছিল, তা যেন ভাবাই যায় না।'

পোস্ট ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পী ভ্যান গগের পরের কথাগুলো সুরিয়ালিস্টিক যেন ভবিষ্যতে গিয়ে ভবিষ্যতের মানুষ হয়ে তার সময়ের মানুষদের কটাক্ষ করছেন এবং যেন তিনি নিজেই নিজের ভাগ্যকে লিখলেন। এই হচ্ছে মনের গভীরে জমে থাকা কথার শক্তি।

শিল্প সৃষ্টির তাড়না শিল্পীর কাছে আসে তার চিন্তাশক্তি থেকে যা নতুন চিন্তার অভিনবত্ব নিয়েই শিল্পী বাস করেন শিল্পের বাহুপাশে। শিল্পীর চিন্তার সঙ্গে জমতে থাকে কথামালা কোনো কথা সুর তাল লয়ে গান হয়। কোনো কথা ছন্দে ভাবনায় কবিতা হয়, কোনোটি উপন্যাস, নাটক আবার কোনোটি রঙে, ঢঙে চিত্রকলা বা ভাস্কর্য হয়।

শিল্পের সঙ্গে ঘরকন্না মানে বুকের গহিনে জমানো কথামালার সঙ্গে গোল্লাছুট। এসব কথামালা নানা সময়ে নানা দৃষ্টিভঙ্গিতে নানা মতবাদে রূপ নিয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে শিল্প দর্শন। শিল্প দর্শন শুধু বলি কেন, সকল দর্শনই কোনো না কোনো চিন্তাজাত কথামালা থেকেই তো আগত। 

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, তার সব শিল্পকর্মকে বলা যেতে পারে এক একটি মাস্টারপিস এবং অবধারিতভাবে এসে পড়ে 'নিঃসঙ্গতার একশ বছর'-এর কথা। সেই সূত্রে বলা দরকার, মার্কেজ শৈশবে নানা-নানির কাছে মানুষ হয়েছেন। তার নানি ছিলেন একজন অসাধারণ গল্প-বলিয়ে। অদ্ভুত জিনিসকে এমন সুনিপুণ ভঙ্গিমায় বর্ণনা করতেন, যেন তিনি চাক্ষুষ অবলোকন করেছেন। নানা রকম অতিলৌলিক বিষয় বইয়ে ভর্তি ছিল তাদের বাড়ি। মার্কেজের জাদুবাস্তবতা বা ম্যাজিক রিয়েলিজমের যে প্রভাব ও প্রকাশ তার বীজটি রোপিত হয় এখানেই নানির হাতে। নানির গল্প বলার ধরনটিই 'নিঃসঙ্গতার একশ বছর' বইকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল বলে মনে করতেন মার্কেজ। তার এই অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনার জন্যই সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ পান ১৯৮২ সালে। আঠারো বছর বয়সে মার্কেজের ইচ্ছা হয়- নানাবাড়ির মানুষ, আশপাশের অনুষঙ্গ ও ঘটনা নিয়ে তিনি একটি লেখা লিখবেন।

কিন্তু লেখাগুলো ঠিক হয়ে উঠছিল না, হয়তো লেখাগুলো তার ভেতরে সেভাবে জমে ওঠেনি। তাই তিনি অপেক্ষা করছিলেন সঠিক সময়ের। অনেক বছর পর যখন পরিবার নিয়ে আকাপুলকো যাচ্ছিলেন বেড়াতে, তখন হঠাৎই তার মনে হলো তিনি সঠিক সময়ে এসে গেছেন। মনের গহিনের কথামালাগুলো এবার কোন আঙ্গিকে সাজাবেন সেই পথটিও মিলেছে হয়তো। তিনি গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা বাড়ি ফিরে আসেন এবং লিখতে বসেন এবং প্রায় দেড় বছর লেখার পর প্রকাশ পায় লেখাটি। মনে ও মগজে দীর্ঘদিনের যে কথামালার সঙ্গে বসবাস, তার নাম হয় 'নিঃসঙ্গতার একশ বছর'।

আমরা যারা কবি অথবা লেখক অথবা অভিনেতা অথবা আঁকিয়ে, তারা সবাই শিল্পের ঘরে নিজের জমানো কথাগুলোকেই সাজাতে চাই। সে কবিতায় কি গল্পে, কি গানে- কি ছবিতে কি অভিনয়ে। একজন নাট্যকারের হয়তো অসংখ্য নাটক থাকে। অসংখ্য ঘটনা, অসংখ্য সম্পর্ক, অসংখ্য সংঘর্ষ থাকে সেসব নাটকে তার সবটা কি নিজের জীবনের সঙ্গে মিলে যায়? নিশ্চয়ই না। তবুও ওই সব নাটকে কোথাও না কোথাও লেখক তার ব্যক্তিগত কোনো একটি ভাষা বা কোনো একটি মতামতকে রেখে যান। হয়তো সেটি তার দর্শন না। তবুও ওই নাটকে বা উপন্যাসে বা গল্পে ওই ঘটনা সম্পর্কে স্বীয় অভিমত কোনো না কোনোভাবে তিনি দর্শক বা পাঠককে জানিয়ে দেন এবং দেখা যায় কোনো কোনো অভিনেত্রী কোনো কোনো স্ট্ক্রিপ্টের সঙ্গে মানসিকভাবে জড়িয়ে যান। কারণ ওই লেখাটি কোনো না কোনো জায়গায় তার মনের গহিনে যে জমা কথাগুলো আছে সেগুলোকে স্পর্শ করে যায়। 

যদি ফিরে যায় শিল্পের আদিতে গুহার দেয়ালে দেয়ালে আঁকা যে চিত্র, তার তাড়না এসেছিল কোথা থেকে?

মানুষের মনের গভীরে জমে থাকা কথা থেকে। অথবা নৃত্যের মুদ্রা সেও জমে থাকা কথার প্রকাশ। 

ইউরিপিডিসের মিডিয়া সর্বদা স্বামীর সব সফল কাজে সহযোগিতা করার পর যখন জেসন দ্বিতীয় বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয় প্রেমে মগ্ন হয়ে, তখন মিডিয়ার ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ আস্তে আস্তে প্রতিহিংসার জন্ম দেয় এবং একে একে হত্যা করে সবাইকে এমনকি নিজের সন্তানকেও। জমে থাকা কষ্ট, ক্ষোভ, কথা থেকে জন্ম নিয়েছে রাষ্ট্র, মহৎ শিল্প, যুদ্ধ ও কল্যাণ। মানুষের মনোজাগতিক মানচিত্র বড়ই জটিল। অথবা ভীষণ সোজা। 

আজকাল মনুষ্য চর্চা হয়তো-বা সহজ জিনিসটিকে ঘোরালো করে দেখা কে বলতে পারে! কালিদাসের শকুন্তলায় দেখা যায়, অনেক চড়াই-উতরাই সহ্য করার পর দুষ্ফ্মন্তের সঙ্গে দেখা হলে যখন শকুন্তলাকে চিনতে পারেননি, তিনি তখন শকুন্তলার দুঃখ এবং জমানো ক্ষোভ শুধু একটি কথার মধ্য দিয়েই প্রকাশ পেয়েছিল- 'অনার্য'।

মির্চা এলিয়াদ রচনা করেন 'লা নুই বেঙ্গলি', যে গ্রন্থে মৈত্রেয়ী দেবীর সঙ্গে এলিয়াদের প্রণয়ের অলিগলির বর্ণনা। মৈত্রেয়ী দেবী নিশ্চয় ভালোবেসেছিলেন প্রেমিককে, যে কথা তিনিও এতকাল জমিয়ে রেখেছিলেন বুকের ভেতর। এসব প্রেম এবং আরও কিছু সম্পর্কের ভার নিয়ে যাপন করছিলেন জীবন। কিন্তু এই বইটি হয়তো তাকে সাহস দিল জমে থাকা তার জীবনের গল্পগুলো প্রকাশের। তাই তখন পেলাম 'ন হন্যতে'র মতো একটি লেখা। একটি যাপিত জীবনের গল্প। যেখানে আরও উঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তার সম্পর্কের গল্প। 

জমা কথার বিপুল বিস্ম্ফোরণ ঘটেছিল- 'কথা' নিয়েই পৃথিবীর ইতিহাসে একবারই। ১৯৫২ সাল ভাষা আন্দোলন। সেও ভাষার ওপর আঘাত হানার ফলস্বরূপ অগ্ন্যুৎপাত। ১৯৭১ সাল মহান মুক্তিযুদ্ধ সেও তো দিনের পর দিন নীরবে সহ্য করে যাওয়া মানুষের মনের ভেতর জমতে থাকা কথার প্রবল বিস্ম্ফোরণ বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ থেকে। এক বঙ্গবন্ধু সেদিন কথা বলেছিলেন কোটি বাঙালির কণ্ঠস্বর হয়ে। মাত্র ১২ মিনিট দুই সেকেন্ড ব্যাপ্তির এই ভাষণ আজ সমকালীন মহাকাব্য। 

বস্তুত জমে থাকা কথা থেকেই শুরু হয় গল্প, কবিতা, আন্দোলন এবং নানা ইতিহাস। সমকালে জমা থাকা কথা থেকে শুরু হয়েছে এক নব আন্দোলন, যা খুব জরুরি ছিল। এসব জমে থাকা কথা কোনো মনগড়া বিষয় নয়। এ নিপীড়নের ক্ষত যা দিনের পর দিন বহন করে চলেছে নারী। হয়তো এখান থেকেই শুরু হবে এক নতুন শিল্প অধ্যায় আর শেষ হবে নিপীড়ন কাল।

এমএ/ ১০:০০/ ০৩ ডিসেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে