Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (20 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১১-২৮-২০১৮

মহাজোটের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই

পীর হাবিবুর রহমান


মহাজোটের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই

ফেনী-১ আসনে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেন আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম। পারিবারিক ঐতিহ্য ও প্রভাব ছাড়াও ছাত্রজীবন থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে অভিষিক্ত এই মানুষটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে পঁচাত্তর উত্তর কঠিন দুঃসময়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। সেই দুঃসময়ে তার সামনে সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াইটাই ছিল না, সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধটাই ছিল না, ডানে-বাঁয়ে অনেক প্রগতিশীল বিপ্লবী ছাত্র সংগঠনের তৈরি প্রতিকূল পরিবেশ কাটিয়ে কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে বঙ্গবন্ধুর মহান আদর্শ নিয়েই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির লড়াই করতে হয়েছে।

বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পাবলিক সার্ভিস কমিশনে যোগ দেওয়া এই মেধাবী মানুষটি ৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রটোকল অফিসার হিসেবে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০১ সালে বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনার একান্ত সচিব হিসেবে সাহসের সঙ্গে দায়িত্ব পালনই করেননি, বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নেমে আসা কঠিন দুঃসময়ে পাশে থেকেছেন। শেখ হাসিনার প্রতি তার আনুগত্যের পরীক্ষায় ওয়ান-ইলেভেনে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তার সহযোগিতায় আওয়ামী লীগ থেকে ২০০৮ সালে দলের অনেক নিবেদিতপ্রাণ কর্মী এমপি হয়েছেন। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন গণমুখী চরিত্রের আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমকে ৯৬ শাসনামল থেকে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, ক্ষমতার অহঙ্কার তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। ক্ষমতার কাছে থাকলেও মানুষের সঙ্গে যে অমায়িক ব্যবহার, না থাকলেও সে একই আচরণ করতে দেখেছি। সমাজের যে কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষের বিপদে-আপদে সাহায্য-সহযোগিতা করা তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। কারও ক্ষতি নয়, সুযোগ থাকলে উপকার করার নীতি তার ব্যক্তি চরিত্রের অনন্য সাধারণ এক উজ্জ্বল দিক। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি অবিচল, শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি অনুগত, কর্মীবান্ধব, গণমুখী চরিত্রের আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম তার জনসংযোগ ও আচরণে ফেনী-১ আসনের মানুষকে আপন করে নিয়েছিলেন। অর্জন করেছিলেন ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা। ফেনী-১ আসনে নৌকার প্রতীক পেলে তার বিজয় যে সুনিশ্চিত ছিল, এটি সবার জানা। তিনি দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। সব শুভাকাঙ্ক্ষীর নিরন্তর অনুরোধ সত্ত্বেও জোট রাজনীতির কারণে মনোনয়ন তিনি পাননি। এ আসনটি মহাজোটের অন্যতম শরিক ১৪ দলভুক্ত জাসদের একাংশের সাধারণ সম্পাদিকা শিরিন আক্তারকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

ছাত্ররাজনীতি থেকে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে শিরিন আক্তার অনবদ্য পথচলা এক সংগ্রামী নারী হলেও এই আসনটিতে যেমন তার সাংগঠনিক শক্তি নেই, তেমন নেই নিজস্ব ভোটব্যাংক। তবুও মহাজোটের ঐক্য রক্ষায় শেখ হাসিনা আসনটি ছেড়ে দিয়ে নাসিমকে মনোনয়ন না দেওয়ায় তিনি মেনে নিয়েছেন। এলাকায় আওয়ামী লীগ কর্মীরা দ্রোহের আগুনে জ্বলে উঠলেও তিনি সবাইকে এই পথ ছেড়ে আনুগত্যের পথে থাকতে বলেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে ভোট দেওয়ার জন্য আকুল আবেদনও জানিয়েছেন।

ফেনীর রাজনীতিতে সংগঠন শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখা বিএনপি-জামায়াত শাসনামল থেকে ওয়ান-ইলেভেনের দুঃসময়ের দিনগুলোতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও দলের নেতা-কর্মীদের পাশে থেকে সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকা রাখা নাসিম সরকারি চাকরিও ছেড়ে দিয়েছিলেন। ওয়ান-ইলেভেনের ক্ষমতাসীনদের অন্যতম দোর্দণ্ড প্রতাপশালী লে. জে. (অব.) মাসুদউদ্দিন চৌধুরী ফেনীর একটি আসনে মহাজোটের প্রার্থী হয়েছেন। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের ক্ষমতাধররা আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকেই জেল খাটাননি, দেশের দুটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর অপমান, নির্যাতনের শাসনই চালাননি, ব্যবসায়ীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে বেইজ্জতি করেছিলেন। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতি ফেনী জেলার নেতা-কর্মীদের আপনজন নাসিম সেই বিষও হজম করেছেন দল ও নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের কারণে। তিন দিন আওয়ামী লীগ করে চার দিনে এমপি হয়ে টেলিভিশন টকশো আর পত্রিকার কলামে বড় বড় নীতিকথা লেখা ও বলা রাজনীতির অর্বাচীন বালকেরা নৌকা না পেয়ে এক রাতে সব বিশ্বাস ও আদর্শ পায়ের নিচে ফেলে যখন প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তি বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লজ্জা-শরমের নেকাব খুলে চোখের পর্দা ফেলে বলছেন, মৃত্যু পর্যন্ত বিএনপি করবেন, এমনকি আজীবন আওয়ামী লীগ করা নেতারাও জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে দল ছেড়ে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচনী ময়দানে চমক সৃষ্টির নামে বিস্ময় সৃষ্টি করেছেন নিজেদের আদর্শিক ও রাজনৈতিক সতীত্ব বিসর্জন দিয়ে, সেখানে আলাউদ্দিন নাসিমের মতো নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে শেখ হাসিনা ও দলের প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বাসে মনোনয়ন না পাওয়ার বেদনা নিয়েও অবিচল থাকাটাই বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের রাজনীতির বড় শক্তি।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানকের জীবনে অনেক ভুলত্রুটি থাকতে পারে। কিন্তু রাজনীতিতে তার বিকাশ এক দিনে হয়নি। জন্ম থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির পথ হেঁটে পঁচাত্তর পরবর্তী দুঃসময়ে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের ছাত্রলীগের রাজনীতির কাণ্ডারি হিসেবে সংগঠনের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। সামরিক জমানায় অসীম সাহসিকতার সঙ্গে ছাত্র আন্দোলনকে বেগবান করতে ভূমিকা রেখেছেন। সামরিক শাসন জমানায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। অনেক দিন দলে তার মূল্যায়ন হয়নি। ধৈর্য ধরেছেন। বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে যুবলীগের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে তার সাধারণ সম্পাদক মির্জা আজমকে নিয়ে সারা দেশে তরুণ মেধাবী যুবশক্তিকে সংগঠিত করে যুবলীগকে শক্তিশালী সংগঠনে দাঁড় করিয়েছিলেন। ওয়ান-ইলেভেনের নির্যাতনে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ঢাকা-১৩ আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়ে প্রতিমন্ত্রীই হননি, এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেন। এবার তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। মনোনয়ন লাভ করেছেন ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান। তিনিও তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে এসেছেন। তিনবার সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ছিলেন। জাহাঙ্গীর কবির নানক সব কর্মীকে নিয়ে বৈঠক করে সাদেক খানকে জয়যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। অঝোরে কেঁদেছেন। সেখানে এক আবেগঘন দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছে। সাদেক খানও তাকে বুকে নিয়ে নানককে স্যালুট জানিয়েছেন। দলের প্রতি, নেতৃত্বের প্রতি নানকের এই আনুগত্য প্রকাশ রাজনৈতিক মহলকে এই বার্তা দিয়েছে যে, একদা সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ একটি অনুভূতির নাম। তিনি সেই অনুভূতি, আবেগ ও বিশ্বাসকে লালন করেন। গুলশানে বারবার মনোনয়ন না পেয়েও শক্তিশালী প্রার্থী ওয়াকিল আহমদ যেভাবে আনুগত্য রেখে যাচ্ছেন, যেভাবে প্রবীণ নেতা মোজাফফর হোসেন পল্টু, ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের মতো দুঃসময়ের নেতারাও মনোনয়ন না পেয়ে দলকে ভালোবেসে যাচ্ছেন তা এই রাজনীতির বড় শক্তি।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান মনোনয়ন পাননি। তিনিও মেনে নিয়েছেন। সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমও মনোনয়ন পাননি। দলের প্রতি, নেত্রীর সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত সিকদার তৃণমূলে জনপ্রিয় হলেও মনোনয়ন না পেয়ে বারবার আনুগত্য দেখিয়েছেন। সুনামগঞ্জ-৩ আসনে আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রাণপুরুষ মরহুম আবদুস সামাদ আজাদের পুত্র আজিজুস সামাদ আজাদ ডন ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও, তার জনসমর্থন দৃশ্যমান করলেও এবারও মনোনয়ন পাননি।

ড. রেজা কিবরিয়া পিতার রক্তের ওপর দিয়ে যেভাবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়েছেন, সামাদ আজাদ পুত্র পিতার সারা জীবনের রেখে যাওয়া আদর্শ ও ত্যাগের রাজনীতিকে উপেক্ষা করে তার কবরের ওপর দিয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিতে পারতেন, নেননি। বুকভরা বেদনা নিয়ে নেত্রীর প্রতি, দলের প্রতি বিশ্বাস দেখিয়েছেন। সেখানে অর্থ প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান আবার মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনিও একজন সৎ, পরিশ্রমী রাজনীতিবিদই নন, এলাকার উন্নয়নের মাইলফলক স্থাপন করেছেন। সিলেট-২ আসনে ২০০৮ সালে বিজয়ী জেলা সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী ১৪ সালের মতো এবারও মনোনয়ন পাননি। কর্মীরা রাজপথ অবরোধ করেছে, তবু তিনি বুকভরা বেদনা নিয়ে মেনে নিয়েছেন। শেরপুরে বেগম মতিয়া চৌধুরীর বিরুদ্ধে সেই ৯১ সাল থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী এককালের তুখোড় ছাত্রলীগ নেতা বদিউজ্জামান বাদশাহকে ঐক্যফ্রন্ট মনোনয়ন দিতে চেয়েছিল। বাদশাহকে তার নেত্রী মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই কান্না নিয়ে আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। ৭৫ উত্তর অন্ধকার সময়ে সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের প্রথমে আহ্বায়ক পরে দুবার জেলা সভাপতি হয়ে আমার অগ্রজ মতিউর হমান পীর ছাত্রলীগের পুনর্জন্মই দেননি, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত করেন। অন্য দল থেকে এমপি হওয়ার সুযোগ প্রত্যাখ্যান করলেও দল তাকে মনোনয়ন দেওয়া দূরে থাক জেলা কমিটি থেকেও বাদ দিয়েছে। তবু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য হারাননি। আর আওয়ামী লীগ ছাড়েননি। আজীবন আওয়ামী লীগার মরহুম দেওয়ান ফরিদ গাজীর পুত্র মিলাদ গাজী বারবার ত্যাগের পরীক্ষা দিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের আসন বণ্টন এবং দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রবল চাপ সহ্য করে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যে সাংগঠনিক ক্যারিশমা দেখিয়েছেন, যেভাবে মিডিয়াকে স্মর্টলি ফেস করে আসছেন, তা নজিরবিহীন। রাজনীতিতে দক্ষ নেতৃত্বের অভাবই ঘটেনি, সব দলে শৃঙ্খলার অভাব ঘটেছে বলে এবার বড় দলগুলোতে ৩০০ আসনের জন্য চার সহস্রাধিক করে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। সব আসনে দুই দলেরই মনোনয়ন লাভে একাধিক যোগ্য প্রার্থী ছিলেন। সেখানে একজনকে নানা জরিপ, সার্বিক বিষয় বিচার-বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করার মতো দুরূহ কাজ শেখ হাসিনা সংসদীয় বোর্ড নিয়ে যেভাবে শেষ করেছেন, সেখানে নানা কৌশলসহ মনোনয়ন দানে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দক্ষতা ও পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।

আসন বণ্টনে এরশাদের জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদই নয়, কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ ও মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার এবং যুক্তফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে অব্যাহত আলোচনার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত আসন সমঝোতার তীরে পৌঁছেছেন।

বর্তমান রাজনীতিতে ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগের সফল সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তার সাংগঠনিক দক্ষতাই দেখাননি, অক্লান্ত পরিশ্রমের নজির স্থাপন করেছেন। যেভাবে বিএনপিতে ক্লিন ইমেজ নিয়ে কঠিন দুঃসময়ে দেখিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপি এই দুঃসময় অতিক্রম করতে গিয়ে সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেনকে সামনে এনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে সর্বোচ্চ ছাড় দিয়েছে। সেখানে রাতারাতি গণফোরামে আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে ধানের শীষ প্রতীক লাভ করতে অনেকেই যোগ দিচ্ছেন।

বিএনপি ২০ দলীয় ঐক্যজোটের মুখপাত্রের দায়িত্বও কর্নেল অলি আহমদের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। আসন বণ্টনেও ব্যাপক ছাড় দিচ্ছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দী, দণ্ডিত ও নির্বাচন করতে পারছেন না। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দণ্ডিত, নির্বাচনে অযোগ্য ও আইনের চোখে পলাতক আসামি হয়েও লন্ডনে নির্বাসিত জীবনে থেকে এই নির্বাচন পরিচালনায় পরোক্ষভাবে শক্তিশালী ভূমিকা রাখছেন।

ড. কামাল হোসেনকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা নির্বাচিত করে তার পাশে একসময় বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি করা ছোট দলের বড় নেতাদের নিয়ে যে ঐক্যফ্রন্ট গড়েছেন, সেখানে কার্যত বিএনপি ও জামায়াতের শক্তি মাঠের মূল উৎস। সরকারবিরোধী জনমতকে কাজে লাগিয়ে সরকারবিরোধী সব অভিযোগ সম্বল করে এই ভোটযুদ্ধের মধ্য দিয়ে মূল টার্গেট নির্ধারণ করেছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে যেভাবেই হোক ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া। বিএনপি মনে করে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে না সরানো পর্যন্ত তাদের রাজনীতির সুদিন ফিরবে না। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ঘটবে না। তারেক রহমানের নির্বিঘ্নে দেশে ফেরা সম্ভব হবে না। নিজেদের ইমেজ সংকট থাকায়, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পতিত হওয়ায় ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় নিজেদের প্রায় নিঃশর্তভাবে সমর্পণ করেছে। মহাজোটের জন্য তাই এবারের ভোটযুদ্ধ বড় চ্যালেঞ্জ।

মহাজোটের মধ্যে আওয়ামী লীগই সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে বড় শক্তি। অংশীদারদের মধ্যে এরশাদের জাতীয় পার্টি দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে পাশে রয়েছে। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতীক হিসেবে রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনুরা পাশে রয়েছেন। আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে অনেকেই বিপরীত মেরুর বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, তেমনি সারা জীবন বিএনপি করে তাদের শাসনামলে অপমানিত হয়ে বের হয়ে আসা অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারাও বিপরীত মেরুর রাজনীতিতে থাকা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে যুক্ত হচ্ছে। দুই শক্তির মনোনয়ন তালিকায় পুরনোরা প্রাধান্য পেলেও আওয়ামী লীগ ক্রিকেটের বরপুত্র মাশরাফি বিন মর্তুজাকে নড়াইল ও বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র শেখ নাসের তন্ময়কে বাগেরহাটে নামিয়ে চমক দিয়েছে। ভোট ময়দানের ক্রেড এই দুই তরুণকে ঢাকায় প্রার্থী করলে লাভবান হতো। ঢাকায় মহাজোটের এমপিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের আলহাজ রহমত উল্লাহ ও মিরপুরের আসলামুল হক আসলাম ছাড়া কারও দুর্গই সুরক্ষিত নয়।

ব্যালটযুদ্ধে মহাজোটের মূল শক্তি হচ্ছে ভোট শিকারে শেখ হাসিনার ইমেজ। যে নেতৃত্বের ইমেজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই লালন করেনি, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিকেই ধারণ করেনি, দেশকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিস্ময়কর উত্থান ঘটিয়ে বিশ্বেও বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। সেখানে এই ব্যালটযুদ্ধ কঠিন চ্যালেঞ্জই নয়, রীতিমতো কঠিন ভোটের লড়াই। এ ভোটের লড়াইয়ে যারা মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন তারাসহ, আওয়ামী লীগের প্রার্থীসহ সব নেতা-কর্মী ও মহাজোটের শরিক দলগুলোর নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে এক মোহনায় মিলিত হয়ে ভোটের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে না পারলে বিপর্যয়ের মুখে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়। যারা মনে করেন, আমার আসনে অপছন্দের প্রার্থীকে বা নিজের প্রতিপক্ষ প্রার্থীকে পরাজিত করে দেব, কিন্তু শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসবেন, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। অতি দম্ভ, উন্নাসিকতা, হিংসা ও অতি আত্মবিশ্বাস ভালো নয়। মহাজোটের সব নেতা-কর্মীর সামনে ৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনী ফলাফল সামনে রয়েছে। তেমনি কেউ যদি মনে করেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো শেখ হাসিনা আবার দলকে ক্ষমতায় এনে দেবেন আর তারা সুখে আরামে থাকবেন, তাহলে সেটি হবে আত্মঘাতী। মহাজোটকে ভোটযুদ্ধের চ্যালেঞ্জ নিয়ে গণরায় লাভ করেই ক্ষমতায় আসতে হবে। মহাজোটের একেকটি আসনে জয়লাভ মানেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই শক্তির ক্ষমতার দিকে এগিয়ে আসা। মহাজোটের একটি আসনে পরাজয় মানে ক্ষমতার সড়কে পিছিয়ে পড়া।

বিএনপি ও জামায়াত শক্তিনির্ভর এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক নেতাদের ইমেজনির্ভর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ঐক্যবদ্ধ ও সুসংসহত হয়ে ভোটযুদ্ধে যেভাবে নেমেছে, যেভাবে মরণ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে, তার বিপরীতে মহাজোটের সব নেতা-কর্মীর সামনে শেখ হাসিনাকে সামনে নিয়ে সব ভেদাভেদ ভুলে, মান-অভিমান ভুলে একাট্টা হয়ে ক্ষমতার লড়াইয়ে নামা ছাড়া বিকল্প আর কোনো পথ নেই।

মনোনয়ন ঘোষণায় দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ যেমন অনেক পুরনোদের রাখতে গিয়ে কিছু বিতর্কিতদের আবার মনোনয়ন দিয়েছে তেমনি বিএনপিও তাদের শাসনামলের পুরনোই নয়, হাওয়া ভবন সংশ্লিষ্টসহ বিতর্কিতদের হাতেও আবার ধানের শীষ তুলে দিয়েছে। এদের ভাগ্যে কী ঘটবে তাও ভোটারদের হাতেই রয়েছে ব্যালটের ক্ষমতা।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

এমএ/ ০৮:১১/ ২৮ নভেম্বর

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে