Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (35 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১১-২৫-২০১৮

নির্বাচনী ইশতেহারে চাই ‘বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ’

আতিউর রহমান


নির্বাচনী ইশতেহারে চাই ‘বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ’

দেখতে দেখতে জাতীয় নির্বাচন এসেই গেল। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী মহাসড়কে উঠে গেলেও এখনো পর্যন্ত তাদের নির্বাচনী ইশতেহার আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করেনি। তবে জানা যাচ্ছে যে তারা ইশতেহার প্রণয়নের কাজ অনেকটাই সেরে ফেলেছে। শিগগিরই হয়তো তা চূড়ান্ত হবে। আমাদের দেশে নির্বাচনী ইশতেহার সাধারণত খুব গুরুত্ব পায় না। ব্যতিক্রম ছিল ২০০৮ সালের নির্বাচন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘দিনবদলের সনদ’ ইশতেহারে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার ভোটারদের, বিশেষ করে তরুণদের দৃষ্টি কেড়েছিল। এ কথা অনস্বীকার্য যে আমাদের জাতীয় নির্বাচনে প্রধান প্রধান নির্বাচনী এজেন্ডা নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয় না। উন্নত বিশ্বে হয়। আমার মনে আছে, লন্ডনে পড়াশোনার সময় ওই দেশে ‘পোল ট্যাক্স’ বা বাড়িভাড়া নিয়ে কী তুমুল নির্বাচনী বিতর্কই না হয়েছিল। একইভাবে ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্ত হবে কি না সে ইস্যু নিয়েও বেশ কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনী বিতর্ক হতে দেখেছি। আমাদের দেশে সুনির্দিষ্ট ইস্যু নিয়ে সেভাবে নির্বাচনী বিতর্ক খুব একটা হতে দেখি না। তবে উন্নয়ন ও দুর্নীতির বিষয়ে বেশ জোরেশোরেই নির্বাচনী বিতর্ক হয়ে থাকে আমাদের দেশে। এবারেও হচ্ছে।

ক্ষমতাসীনরা বলছেন, সারা দেশে অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। বাস্তবেও তাই হয়েছে। আপনি যদি ঢাকা থেকে মাওয়া রোড ধরে টুঙ্গিপাড়া যান, তাহলেই চোখে পড়বে পদ্মা সেতুসহ কী অভাবনীয় উন্নয়নযজ্ঞ চলছে। অন্যদিকে বিরোধীরা বলছেন, একই সঙ্গে ব্যাপক দুর্নীতিও হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা বলছেন, সামাজিক উন্নয়ন ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে বিরাট ভূমিকা তাঁরা রেখেছেন। বিরোধীরা বলছেন, তা সত্ত্বেও সুশাসনের বিরাট ঘাটতি দেখা দিয়েছে। উভয় পক্ষই বলছে বৈষম্যও বেড়েছে। এমনই এক পরিপ্রেক্ষিতে বছর শেষে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনের আগ দিয়ে সব দল বা ফ্রন্ট তাদের সাধ্যমতো প্রতিশ্রুতির বহর সাজিয়ে জনগণের সামনে তাদের ইশতেহার নিয়ে উপস্থিত হবে। এসব ইশতেহারে অনেকাংশেই প্রায় একই ধরনের জনমুখী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে। বিশেষ করে সুশাসন, গণতন্ত্রায়ণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, দারিদ্র্য নিরসন, বৈষম্য দূরীকরণ, সবুজ অর্থনীতির বিকাশ, তরুণ প্রজন্মের জন্য গুণমানের শিক্ষা, দক্ষতা, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টিসহ নানা ধরনের অঙ্গীকার হয়তো এসব ইশতেহারে থাকবে। তবে আওয়ামী লীগ যেহেতু এক দশক ধরে একটানা দেশ পরিচালনা করেছে, তাই তাদের ইশতেহারে দৃশ্যমান উন্নয়ন অভিযাত্রার কথা বেশি করেই থাকবে। সামাজিক নিরাপত্তা ও তরুণদের কথাও থাকবে। কোন দল কেমন ইশতেহার দেবে সেই অনুমানে না গিয়েও আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে কী ধরনের নীতি উদ্যোগ আমরা নিতে পারি, সে ধরনের কিছু মোটাদাগের প্রস্তাবনা রাখতে চাই। যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, তাঁরা এসব প্রস্তাবনার পক্ষেই থাকবেন বলে আমার বিশ্বাস। নিঃসন্দেহে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ‘সোনার বাংলা’ অর্জনের একবুক স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে নেমেছিলেন। সরকারি দল হয়তো তাদের ইশতেহারে প্রশ্ন তুলবে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, গ্রেনেড হামলা, যুদ্ধাপরাধী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে যারা হাত মিলিয়েছে, সেসব জ্ঞানপাপীর মুখে সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার ভোটাররা বিশ্বাস করবে?

এক. মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ

১. দলমত-নির্বিশেষে আমাদের প্রথমেই স্বীকার করে নিতে হবে যে আমরা সবাই একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের ফসল বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করে ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের’ মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করেছি। স্বাধীনতার এই ঘোষণা দিয়েছিলেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

মুক্তি শব্দটি বারবার উচ্চারণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ এবং অসহযোগের দিনগুলোতে। আর সে কারণেই ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল প্রস্তাবনায় উল্লেখ ছিল যে ‘আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল—জাতীয়বাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।’ সংবিধানের এই মূলনীতির আলোকেই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের কৌশলের প্রতিফলন সব দলের ইশতেহারে ঘটবে বলে প্রত্যাশা করছি। একই সঙ্গে সাম্যভিত্তিক সমাজ ও অর্থনীতির বিকাশে সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে বর্ণিত ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’সমূহ (অনুচ্ছেদ ৯-২৫) মাথায় রেখে মুক্তিযোদ্ধা জনগণের আকাঙ্ক্ষা মতো আগামী দিনের বাংলাদেশ পরিচালনার অঙ্গীকার দলগুলো নিশ্চয় করবে। এই মূলনীতিতেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, খাদ্য, নিরাপত্তাসহ জনগণের মৌলিক মানবাধিকারগুলো পরিচালনের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। আশা করি, সব নির্বাচনী ইশতেহারে এই স্পিরিটের প্রতিফলন ঘটবে।

২. স্বাধীন বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তী (২০২১), জাতির পিতার জন্মের শতবার্ষিকী (২০২০) উদ্‌যাপনের সুস্পষ্ট ঘোষণা দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দেবে বলে প্রত্যাশা করছি। এই দুটি ‘মাইলস্টোন’ই নির্ধারণ করবে আমরা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের পক্ষে রয়েছি কি না। তাই আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো জাতির পিতার জন্মবার্ষিকী ও তাঁর সৃষ্ট বাংলাদেশের ৫০ বছর—এই দুটি উৎসব উদ্‌যাপনের মাধ্যমে জাতীয় মৌল আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে যুক্ত করার এই সুযোগ নিশ্চয় হাতছাড়া করবে না। দেশপ্রেমিক রাজনীতিকরা অবশ্যই এই সুযোগ লুফে নেবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করতেই পারি।

৩. সংবিধানের মূলনীতির আলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক যে উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা এক দশক ধরে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায়, বার্ষিক বাজেটে, ষাণ্মাসিক মুদ্রানীতিতে প্রতিফলিত হতে দেখেছি তার ধারাবাহিকতা নিশ্চয় কাম্য। সে জন্য চাই গতিময় অর্থনীতি এবং সামাজিক পাটাতনের নিচের দিকের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য আরো সুস্পষ্ট নীতি-অঙ্গীকার। আর এসব অঙ্গীকার পূরণ করতে হলে চাই বাড়ন্ত এবং স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। রাষ্ট্র এই প্রবৃদ্ধির জন্য নিজে যেমন বড় বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে, তেমনি আবার ব্যক্তি খাতকেও উপযুক্ত ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ সৃষ্টি করতে সাহায্য করবে। সে জন্য  যেসব মেগা প্রকল্প এরই মধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলোর সময়মতো সফল বাস্তবায়ন অপরিহার্য। বিগত বছরগুলোতে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে (যেমন—পদ্মা সেতু, চার লেনের সড়ক, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, উড়াল সেতু, রেল, পায়রাবন্দর, কক্সবাজার বিমানবন্দর, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর আণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, মেট্রো রেল, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ইত্যাদি)। এসব প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে বাংলাদেশের চেহারাই বদলে যাবে। পুরো দেশের অর্থনীতি এক অভিনব রূপ গ্রহণ করবে। তাই প্রতিটি দলের কাছেই আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, এই বড় বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে যেন কোনো রকম ছেদ না পড়ে। কেননা এসবের বাস্তবায়নের সঙ্গে এ দেশের অর্থনীতি ও সমাজে ব্যাপক রূপান্তর ঘটবে।

দুই. সবুজ অর্থনীতি : সারা বিশ্বই আজ জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট মোকাবেলায় একাট্টা। ২০১৫ সালের শেষ দিকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির পর বিশ্বজুড়েই এই নৈতিক সমঝোতা অর্জিত হয়েছে। তাই আমাদেরও নিম্ন কার্বন তথা সবুজ অর্থনীতি অর্জনের অঙ্গীকার করার প্রয়োজন রয়েছে। আশা করছি, দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সবুজ অর্থনীতির পক্ষে জোরালো অবস্থান নেবে। সে জন্য আমরা কয়েকটি বিষয়ে দলগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি :

১. আগামী দিনের সব পরিকল্পনা, বাজেট, বিনিয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার যেন আমরা দীর্ঘমেয়াদি বদ্বীপ-২১০০ পরিকল্পনার আলোকে করতে পারি, সেই অঙ্গীকার কাম্য। এভাবে কৌশলগত পরিকল্পনা ও বাজেট করতে পারলে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জগুলোর উৎসগুলোকে মোকাবেলা করতে পারব এবং জলবায়ু সহায়ক বিনিয়োগ ও ভোগ নিশ্চিত করতে পারব। জনজীবনে এর ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

২. সবুজ অর্থনীতির জন্য যে সবুজ বিনিয়োগ চাই এর উৎস হতে হবে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোক্তারা। তাঁদের অর্থায়নের জন্য বাজেটে যেমন বরাদ্দ ও নীতি প্রণোদনা থাকতে হবে, তেমনি আর্থিক খাতকেও সবুজ মানসিকতার অধিকারী হতে হবে। রাজস্বনীতিকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে উদ্যোক্তারা সবুজ উদ্যোগে উৎসাহী হন। কার্বন ট্যাক্স চালু করে আমরা সনাতনি উৎপাদনকে নিরুৎসাহী করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমাদের মধ্যে যাঁরা সোলার প্যানেল থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন, তাঁরা ওই গ্রিড থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুতের দেয় দামের চেয়ে অন্তত ২৫ শতাংশ বেশি পাবেন। এমন প্রণোদনা পেলে প্রতিটি বাড়ির ছাদে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বিদ্যুতের প্যানেল উঠে যাবে। সরকারকে সে জন্য নেট-মনিটারিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এ রকম প্রণোদনা বর্জ্য সংগ্রহে, সোলার মিনি গ্রিড স্থাপন, বায়ুগ্যাস উৎপাদন, ভার্মি সার উৎপাদনসহ নানা সবুজ উদ্যোগেই দেওয়া যেতে পারে। জাতীয়ভাবে আমাদের পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে যে আমরা ধীরে ধীরে কয়লা, ডিজেল, গ্যাস থেকে সনাতনি জ্বালানি উৎপাদন থেকে সরে এসে সবুজ জ্বালানি উৎপাদনে মনোনিবেশ করব। সে জন্য আমাদের জাতীয় ‘রোডম্যাপ’ তৈরি করতে হবে। সুইডেন, ডেনমার্ক, জার্মানির মতো দেশ ২০৩০ সাল নাগাদ অর্ধেক জ্বালানি সবুজ করবে। ভারতও অনুরূপ পরিকল্পনা করছে। আমরা কেন পারব না?

৩. সবুজ উদ্যোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে অর্থায়নের জন্য এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু সুদূরপ্রসারী নীতি গ্রহণ করেছে এবং ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করছে। ব্যাংকগুলো এখন পরিবেশ ও সামাজিক ঝুঁকি দেখেই অর্থায়ন করে। সবুজ উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সবুজ পুনরর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ৫০টির মতো সবুজ পণ্য ও সেবা তৈরির জন্য এ অর্থ ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। সবুজ ইট তৈরির জন্য এডিবির সহায়তায় আলাদা সবুজ তহবিল তৈরি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বস্ত্র ও চামড়া খাতের সবুজায়নের জন্য ২০০ মিলিয়ন ডলারের আরেকটি তহবিল সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাই সহজেই সবুজ বিনিয়োগের অঙ্গীকার তাদের ইশতেহারে করতে পারে। এ ছাড়া ইডকল, পিকেএসএফ নানা ধরনের সবুজ অর্থায়নের সৃজনশীল উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। এসব সুযোগ গ্রহণের অঙ্গীকারও দলগুলো করতে পারে।

৪. বিগত কয়েক বছরে পাটশিল্পের বড় ধরনের উজ্জীবনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ‘বায়ো-ডিগ্রেডেবল’ প্যাকেজিং বস্তু ছাড়া তারা কোনো রপ্তানি পণ্য গ্রহণ করবে না। আমাদের বিপুল পরিমাণের বস্ত্র রপ্তানির জন্য এমন প্যাকেজিং পণ্য তৈরি করা সম্ভব পাট থেকে।

৫. আমরা পুরো দেশটাকেই নগরে পরিণত করতে চাই। সবুজ নগরের সুবিধাসংবলিত স্মার্ট নগর ও স্মার্ট গ্রাম নির্মাণের অঙ্গীকার নিশ্চয় আমাদের দলগুলো করতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে বলেছেন যে আমাদের গ্রামগুলোকেও পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তোলা হবে। অন্যান্য রাজনীতিকরাও এমন অঙ্গীকার নিশ্চয় করতে পারেন। তবে তা হতে হবে নিম্ন-কার্বন নগরায়ণ। আমাদের ঢাকা শহরে যানজট লেগেই আছে। যানবাহন থেকে সর্বক্ষণ প্রচুর কার্বন নির্গত হচ্ছে। পাবলিক যাতায়াত ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। মেট্রো রেল একটি উপযুক্ত উদ্যোগ। তবে এতেও পর্যাপ্ত যাতায়াত সুযোগ সৃষ্টি হবে না। নগরের রাস্তা থেকে ছোট গাড়ি উঠিয়ে নেওয়ার জন্য পাতালরেলের কোনো বিকল্প নেই। মাটির নিচে জমিতে কোনো ‘ডিসপিউট’ নেই। আজকাল মাটি খোঁড়ার আধুনিক প্রযুক্তিও পাওয়া যাচ্ছে। তাই এক্ষুনি কার্বন নির্গমন রোধ কল্পে এবং নাগরিক যাতায়াত স্বস্তিদায়ক করতে পাতালরেল নির্মাণের অঙ্গীকার দলগুলোর ইশতেহারে প্রতিফলন ঘটানোর আহ্বান জানাচ্ছি।

৬. ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে যেন সবুজায়ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়, সে প্রত্যাশাই করছি। বিশেষ করে অবকাঠামো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি দক্ষতা, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, আবাসন, মজুরি, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবুজায়ন ও সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রতিফলন দেখতে চাই। কয়েকটি ব্যক্তি খাতের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে এরই মধ্যে সবুজ প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়েছে। আশা করি, সব দল সব অর্থনৈতিক অঞ্চলেই এই সবুজায়নের ধারা চালু করার অঙ্গীকার করবে। সবুজ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়তে পারলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ব্যাপক হারে বাড়বে।

৭. আমাদের উদ্যোক্তাদের সমাজ উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণে তাদের লাভের একটা অংশ স্বেচ্ছায় বিনিয়োগ করা উচিত। কিন্তু শুধু ব্যাংকিং খাত ছাড়া অন্য খাতের উদ্যোক্তারা সেভাবে এখনো পর্যন্ত এগিয়ে আসছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক সিএসআর নীতিমালা জারি করায় সেটা সম্ভব হয়েছে। অন্যান্য খাতের উদ্যোক্তাদের সেভাবে সিএসআর নীতিমালার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকেই আইন করে উদ্যোক্তাদের লাভের একটা অংশ হয় নিজেদের ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অথবা অন্য কোনো বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অথবা সরকারি সুনির্দিষ্ট সামাজিক দায়িত্বশীল তহবিলে জমা করতে নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। ভারতে ২০১৪ সালে এমন একটি আইন করা হয়েছে। করপোরেট অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রণালয় এই সিএসআর আইনের বাস্তবায়ন করছে। আমাদের দেশে সমাজের বঞ্চিতজনদের উন্নতি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য এমন একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ আগামী সরকার গ্রহণ করবে, সে অঙ্গীকার রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে নিশ্চয় আসতে পারে।

তিন. তরুণ প্রজন্মের স্বার্থে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা তৈরি করা : আমাদের শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য উপযুক্ত নীতি-সমর্থনের খুবই প্রয়োজন। যেসব শিক্ষিত তরুণ-তরুণী আমাদের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নামমাত্র সার্টিফিকেট নিয়ে প্রতিবছর বের হচ্ছে, তাঁদের সবাইকে কর্মসংস্থান দেওয়া প্রায় অসম্ভব। সরকারি চাকরির সুযোগ সীমিত। ব্যক্তি খাতে যে ধরনের দক্ষ জনশক্তির দরকার, সে রকম শিক্ষিত কর্মীর সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বিদেশ থেকে ব্যবস্থাপক, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদকে আমদানি করতে হচ্ছে। তাই আমাদের উচ্চশিক্ষালয়ে এমন গুণমানের শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে, যাতে ওই দক্ষতা অর্জন করা ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে সম্ভব হয়। এ জন্য শিল্পের সঙ্গে উচ্চশিক্ষালয়ের সংযোগ গভীরতর করার প্রয়োজন রয়েছে। তা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা অন্তত ৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর জন্য উদ্যোক্তা তৈরি এবং কালবিলম্ব না করে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্ভাবনী কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ সরকার ও ব্যক্তি খাতকে নিতে হবে।

চার. অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন : প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, সামাজিক সুরক্ষা, গার্মেন্টশিল্পের বিকাশ, কৃষির উন্নয়ন, পুষ্টি উন্নয়নের ইতিবাচক প্রভাবে আমাদের মানব উন্নয়নসূচক উন্নত হচ্ছে। আমাদের জীবনের আয়ু (৭৩ বছর) ভারতসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড়ের চেয়ে অন্তত চার বছর বেশি। শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে কমছে। ফলে দারিদ্র্য ও অতিদারিদ্র্যের হার প্রতিবছর কমছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে জাতিসংঘের এসডিজি লক্ষ্যগুলো যথাসময়ে পূরণে বর্তমান সরকার যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখাচ্ছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলও নিশ্চয় এর পক্ষে অঙ্গীকার করতে পারে।

এই লেখাটি শেষ করছি ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এ পি জে আব্দুল কালামের লেখা ‘ইন্ডিয়া ভিশন ২০২০’ বইটির উৎসর্গের কথা উল্লেখ করে। তাঁর বক্তৃতা শেষে ১০ বছরের একটি মেয়ে ড. কালামের কাছে অটোগ্রাফ নিতে এলে তিনি তাকে প্রশ্ন করেন, ‘তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া কী?’ উত্তরে মেয়েটি বলেছিল, ‘আমি উন্নত ভারতে বাস করতে চাই।’ তাই পরবর্তী সময়ে লেখা এই বইটি ওই মেয়েটি এবং তার মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী লাখ লাখ ভারতীয়কে তিনি উৎসর্গ করেছিলেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও সুযোগ পেলেই তাঁর বর্তমানকে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্য উৎসর্গ করে থাকেন। তিনি ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত বাংলাদেশ গড়তে তরুণদের বারবার উৎসাহিত করে যাচ্ছেন। নিঃসন্দেহে এটি আমাদের জাতীয় আকাঙ্ক্ষা। তাই আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, তাঁরা যেন তাঁদের ইশতেহারের মূল ভাবনায় ‘বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ’কে রাখেন।

লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ

এমএ/ ০১:২২/ ২৫ নভেম্বর

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে