Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১০-১০-২০১৮

'সফলতার ভার বহন করা সবার পক্ষে সম্ভব না'

'সফলতার ভার বহন করা সবার পক্ষে সম্ভব না'

বাংলা কবিতার আধুনিক কালপর্বে তুমুল জনপ্রিয় কবি হেলাল হাফিজ। একটিমাত্র কাব্যগ্রন্থ 'যে জলে আগুন জ্বলে'র মাধ্যমে যিনি কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন। মুখে মুখে ফিরেছে তার পঙ্‌ক্তিমালা। মানুষকে প্রেরণা জুগিয়েছে বিপ্লবে বিরহে ভালোবাসায়। ৭ অক্টোবর কবির ৭১তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে একান্ত আলাপে উঠে এসেছে তার জীবন ও কবিতার জানা-অজানা নিবিড় অনুভব। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সঞ্জয় ঘোষ

-জীবনের সত্তরটা বছর শেষ, একাত্তরতম জন্মদিনের দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে - বাকি জীবনটা নিয়ে কী পরিকল্পনা?
 
--ঊনসত্তরে আমি যখন ওই কবিতাটা লেখলাম- 'এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়'- আমি তো রাতারাতি একটা তারকা হয়ে গেলাম! একদম একরাতে। তারপরে আবার হলো কী, ছফা ভাই আর কবি হুমায়ুন কবির এই দুইজন উদ্যোগ নিয়ে রাতারাতি সারা ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে দিল এই কবিতাটা। সঙ্গে আমাকেও। সমস্ত দেয়ালে পঙ্‌ক্তিগুলো চিকা মেরে দেওয়া হলো। ঊনসত্তরের একুশে ফেব্রুয়ারির একটা লিটলম্যাগে কবিতাটা প্রথম ছাপা হয়। এর আগে ছফা ভাই এবং হুমায়ুন কবিরই এই কবিতাটাসহ আমাকে নিয়ে দৈনিক পাকিস্তানে আহসান হাবীবের কাছে গেছেন। আহসান হাবীব তখন দৈনিক পাকিস্তানের সাহিত্য সম্পাদক। হাবীব ভাইয়ের সঙ্গে ছফা ভাই আমার আলাপ-পরিচয় করিয়ে কবিতাটা তার হাতে দিলেন। হাবীব ভাই সিগারেট টানতে টানতে বারবার কবিতাটা দেখেন আর আমার দিকে তাকান। আমার মনে আছে, কবিতাটা হাতে নিয়ে কয়েক মিনিট উনি প্রায় তব্দা হয়ে রইলেন। উনি তো বুঝতে পারছেন ব্যাপারটা। তারপর ছফা ভাইকে বললেন- ছফা, ওতো বাচ্চা মানুষ; কষ্ট পাবে-

আমি তখন অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। কিন্তু দেখলে মনে হবে এইটে পড়ি। একেবারে কচি, দুধে আলতা গায়ের রঙ, বাবরি চুল, চোখ বড় বড়। মানে অদ্ভুত আর কি। যাই হোক, তখন হাবীব ভাই বললেন, ওতো বুঝবে না, আসলে এ কবিতা তো আমি ছাপতে পারলাম না। এটা ছাপলে আগামীকালকে সকালে প্রথম আমার চাকরিটা চলে যাবে। এমনও হতে পারে কাগজও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে ছফা, হেলালকে বলে দিও, ওর আর বাকি জীবনে কবিতা না লিখলেও অমরত্ব তার নিশ্চিত। তবে উনি জানিয়েছিলেন, এ কবিতাটা ছাপতে না পেরে উনার খুব কষ্ট হয়েছে। পরে আমি নিজে যখন সাহিত্য পাতা দেখেছি, তখন বুঝেছি ব্যাপারটা। 
 
-আপনি কখন সাহিত্য পাতায় কাজ করেছেন?
 
--বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর পূর্বদেশে। বাহাত্তরের তেরই জুন পূর্বদেশে জয়েন করলাম। তিন মাস ডেস্কে কাজ করেছি। তিন মাসের মধ্যে মেকআপ-টেকআপ কিছুটা শিখে নিয়েছি- যিনি সাহিত্য পাতাটা দেখতেন, তাকে তো একাত্তর সনে রাজাকাররা ধরে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলেছে। দেশ স্বাধীনের পর কয়েক মাস একজন সাহিত্য পাতাটা চালিয়ে নিচ্ছিল, পরে আমি সেখানে জয়েন করি। আমার চাকরিও হয়েছে আসলে সেই কবিতাটা- 'নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়'র জন্যই। নাহলে, আমি তো তখনও ছাত্র; ছাত্রর তো চাকরি হবার কথা না। তারপর পঁচাত্তরে চারটা প্রধান পত্রিকা রেখে বাকি সব পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেল। পূর্বদেশও বন্ধ হয়ে গেল।
 
-এরপর কী করলেন?
 
--তখনই আমি গেমব্লিঙে ঢুকলাম। জুয়া খেলা শুরু করলাম। সে সময় পত্রিকাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যারা বেকার হয়ে পড়েছিল- তাদের প্রায় সবাইকে তখন চাকরি দিয়েছে সরকার। আমি বা আমার মতো কেউ কেউ সরকারি চাকরি করতে চাইলাম না, আমরা বেকার হয়ে গেলাম। এই তখনই আমি কার্ডরুমে ঢুকলাম। এই প্রেস ক্লাবেই। 
 
-জুয়াভাগ্য কেমন ছিল আপনার?
 
--জুয়ায় আমি অসম্ভব সফল ছিলাম। আর সে কারণেই আরও বেশি করে তাতে ডুবে গিয়েছি। পত্রিকা আফিসে যা বেতন পেতাম, তার চার-পাঁচগুণ বেশি আয় ছিল জুয়ার টেবিলে। একরকম রাজকীয় হালে জীবন কাটানো শুরু হলো তখন। 
 
-আর কবিতা? তখনও তো প্রকাশ হয়নি 'যে জলে আগুন জ্বলে'।
 
--আমি তো এমনিতেও সব সময় কম লিখি। আর তখনও বইয়ের চিন্তা মাথায় আসেনি। আটাত্তর, ঊনআশি, বিরাশি, তিরাশি- আমি লক্ষ্য করলাম প্রতি বছর বইমেলায় কয়েকশ' বই বের হয় কবিতার! যেদিন মেলা শেষ হলো- কোনো বইয়ের নামগন্ধই আর কারও মনে নেই, কারও মুখেই আর কোনো কবিতার কথা নেই। কোনো বই নিয়ে কোথাও আলোচনা দেখি না। এ বিষয়টা আমাকে খুব নাড়া দিত। এসব দেখে এবং নিজের ভেতরে আমি মনে মনে ভাবলাম- যত দেরিই হোক, আমি এমন একটা বই করতে চাই, যে বইটা মেলা শেষ হলেই মানুষ ভুলে যাবে না। আমার বইটা মানুষকে মনে রাখতে হবে। যে জন্য আমি সতের বছর লেখালেখি করার পর বের করলাম 'যে জলে আগুন জ্বলে'। তখন আমি কাজ করি দৈনিক দেশ-এ। দৈনিক দেশ-এ কাজ শুরু করেছিলাম ঊনআশি সালে। তখন জুয়াটা একটু কমে গেছে, চাকরির চাপে। কম হলেও তাশের টেবিলে নিয়মিতই বসতাম। পরে তো নব্বইয়ে আবার দৈনিক দেশ বন্ধ হয়ে গেল। আবার ফুলটাইম জুয়াড়ি। বইটা বেরুলো ১৯৮৬ সালে। বই নিয়ে তখন থেকেই বিশাল হইচই। এতটা আমিও আশা করিনি। মিডিয়াও ব্যাপক সাড়া দিল তখন। আসলে কবিতা মানুষের পছন্দ না হলে মিডিয়ায় যতই তুমি লেখ, লাভ হবে না। 
 
-হইচই, সফলতা- সে সবের কথা আরও কিছু বলুন
 
--এই সফলতা আবার এক ধরনের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার জন্য। ভেতরে এক ধরনের ভীতি, আর তো পারি না, তখন লিখতে বসলে হাত কাঁপে। আবার বই বের করব ভাবতে গেলেই গা শিউরে ওঠে। এই করতে করতেই আজকে বত্রিশ বছর। শিল্পে সফলতার ভার বহন করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। যেমন আমি পারিনি। এ ছিল আরেক জুয়া। আমার নিজের সঙ্গে নিজের জুয়া। আমি প্রায় ছাব্বিশ বছর অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গিয়েছিলাম। এটা হয়েছিল আসলে কী- যেখানেই যাই 'যে জলে আগুন জ্বলে'র কথা। প্রচণ্ড সুনাম। এসবে পড়ে আমার মনে হলো- এই যে মানুষের এত ভালোবাসা কবিতার প্রতি- শারীরিকভাবে একদিন তো আমি থাকব না, প্রকৃতির নিয়মেই আমাকে চলে যেতে হবে। তখন সবাই রাতারাতি কী আমাকে ভুলে যাবে? নাকি কিছুদিন মনে রাখবে? এটা একটু যাচাই করার জন্য, এই যে আমি নিজেকে আড়ালে নিয়ে গেলাম। সমস্ত কিছু থেকে নিজেকে উইথড্র করে নিলাম। একটা সময় এমন একটা অবস্থা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যে, অনেকে মনে করত আমি বোধহয় বেঁচে নেই। কিছু লোক মনে করত উনি হয়তো জীবিত থাকলেও, বিদেশে থাকে। কোথাও যেতাম না, কেবল এই প্রেস ক্লাবে কিছুটা আসতাম। আর তখন তো সাংবাদিকও এত ছিল না, যোগাযোগ ব্যবস্থাও এমন অবস্থায় ছিল না। বত্রিশ বছর চলে গেছে। বাকি জীবনে হয়তো আর একটা বই করব। সেটার জন্যই আমি কাজ করছি। কথাটা এভাবে বলাই ভালো, আমি অর্ধেক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। বাকিটা চেষ্টা করছি। কয়েক বছর ধরে শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। এটাও একটা কারণ। আর এই পড়ন্ত বয়সে একার জীবন তেমন ভালো না। 
 
-বাকি জীবন নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
 
--বড় দুটি পরিকল্পনা হলো- আমার দ্বিতীয় কবিতার বই 'বেদনাকে বলেছি কেঁদো না' সম্পন্ন করা। এরপরেও যদি পরমায়ু কুলায় এবং শরীর যদি সক্ষম থাকে, তাহলে আত্মজীবনী লেখা। 
 
-আত্মজীবনীর জন্য ফাঁকে ফাঁকে এখনই হাত দিচ্ছেন না কেন? মন টানছে না?
 
--হ্যাঁ, এখন সেটার জন্য মন টানছে না। কবিতার বইটা শেষ হলে হয়তো শুরু করব। এই দুটি কাজ যদি করতে পারি, তাহলে আর কোনো চাওয়া নেই। এমনিতেও জীবনে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। অনুশোচনা নেই- এই যে এত সময় অপচয় করলাম! বরং অপরাধবোধ আছে। গিল্টি ফিল করি। এত সময় নষ্ট করাটা মোটেও উচিত হয়নি। সময়তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না। শুধু উচিত হয়নি তা নয়, অন্যায় হয়েছে। 
 
-আবার এ সময় ব্যয় করার কারণেই হয়তো আপনার কাজের প্রতি মানুষের এমন ভালোবাসা
 
--হতে পারে। আসলে আমি চেষ্টা করছি দ্বিতীয় কবিতার বইটি যেন 'যে জ্বলে আগুন জ্বলে'কে অতিক্রম করতে না পারলেও, পেছনে যেন না পড়ে। আসলে উচিত তো অতিক্রম করা। আবার না হলেও কিছু করার নেই। এখন আমি যদি পরের বইয়ে কিছু কবিতায় মানুষের মনে দাগ কাটতে পারি, গাঁথাতে পারি- এক ধরনের তৃপ্তি নিয়ে বিদায় নিতে পারব। সেটা যদি নাও হয়, মেনে নেওয়ার অভ্যাস তো আছেই। 
 
-আপনার হোটেল জীবন কেমন কাটছে এখন?
 
--হ্যাঁ, এই তো সাত-আট বছর চলে গেল কর্ণফুলী হোটেলে। সারাদিন তো বাইরেই থাকি, মানে প্রেসক্লাবেই থাকি। রাতে একটু অসুবিধা হয় এখন। মনে হয় যেন পাশে একজন থাকলে ভালো হতো। এক ধরনের নির্ভরতার একটা জায়গা। যেহেতু ক্রমশ বয়স বাড়ছে। শরীর দুর্বল হচ্ছে। এবং রোগবালাইয়েও ধরে ফেলছে। এসব মিলেই একটু অসুবিধ তো হয়ই। শারীরিক চাহিদা হয়তো নেই, কিন্তু পাশে তাকালে একজন নির্ভরতার মানুষের অভাববোধ হয় সত্যি। তবে আমার মৃত্যুভয় নেই, ভয় হয় আমি অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে গেলে আমাকে তো কেউ দেখার নেই। এটি এখন একটি বেশ দুশ্চিন্তার বিষয়। 
 
-চোখের সমস্যাটা এখন কেমন?
 
--গ্লুকোমাতো পুরোপুরি সেরে যায় না। যত দিন যাবে চোখ দুর্বল হতে থাকবে। কিছু করার নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানও সম্ভবত এ পর্যন্তই।
 
-বাকি জীবনের দুটো চাওয়ার কথা বললেন। এ ছাড়া কারও কাছে কোনো পাওনা আছে?
 
--আমি বরং মানুষের কাছে অসম্ভবরকম ঋণী। ঋণের একটা হচ্ছে, আমার এই সমস্ত কবিতা লেখার পেছনে সবচেয়ে বড় উপাদান তো মানুষই। তাদের অবদানই বেশি। নানাভাবেই সেটা। যদি কেউ কষ্ট দিয়ে থাকে সেটাও আমার প্রেরণা, জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে। সেই কষ্ট যদি ওই মানুষটা না দিত তাহলে হয়তো নির্দিষ্ট একটা কবিতা হয়তো লেখাই হতো না। এখানেও আমি ঋণী। ওই যে আমি বলেছি, 'আজন্ম মানুষ আমাকে পোড়াতে পোড়াতে কবি করে তুলেছে/ মানুষের কাছে এওতো আমার এক ধরনের ঋণ'। আবার কবিতায় ধরো, যে ভালোবাসা পেয়েছি মানুষের- সেই ঋণের তো আর অন্ত নেই। এত ভালোবাসা আমার মনে হয় না কোনো একটি বই লিখে কোনো লেখক পেয়েছে। সংখ্যাও হয়তো বিষয় না- লেখালেখি করে এত ভালোবাসা পাওয়া, তাও আবার এত অল্প লিখে- সত্যি সে জন্য মানুষের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এই ঋণ পরিশোধ করার একটাই উপায় আছে আরও কিছু ভালো কবিতা লেখা। এটা এক ধরনের প্রতিদান। সেটার জন্যই আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি। সেটাই আমার একমাত্র স্বপ্ন এখন। তাছাড়া আমার তো কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। চাওয়া-পাওয়ার সময়ও নেই। 
 
-যৌবনে দাড়ি-গোঁফে ঢাকা উচ্ছন্ন দুঃখী চেহারার সেই হেলাল হাফিজ আরও পরিপাটি, সাজসজ্জা ও সামাজিকতা সচেতন বর্তমান হেলাল হাফিজের মধ্যে পার্থক্য কতটুকু? আজকের দিনে এসে আপনি নিজে কীভাবে দেখেন?
 
--তখনকার দিনগুলোকে আজ স্বপ্নের মতো মনে হয়। আজকের দিনে এসে আমার যে পরিবর্তনটা দেখা যাচ্ছে এটাও তো বেদনারই বিষয়। আমার সমস্ত কবিতার পেছনেই মূল উপাদান হলো বিচ্ছেদ বিরহ বেদনা। এই বেদনাকেও আমি শিল্পে রূপান্তরিত করতে চাই। কিছু কিছু সামাজিকতার কথা যেটা বলছো, সেটা না করলেও কিন্তু আমার চলতো। আমি আমন্ত্রিত সব জায়গায়ই। সব জায়গায়ই ডাকে। ইচ্ছা করেই এখনও কিছুটা আড়াল তৈরি করে রেখেছি। আমার জন্য আসলে একা থাকতে পারলেই ভালো। অনেক কিছুই মেলে না; রুচিতে মেলে না, আদর্শে মেলে না, কথায় মেলে না। তাছাড়া আমার তো কাজ হলো কবিতা- সেই কবিতাটা নিভৃতে বসে যদি করতে পারি তাহলে দরকার কী কোলাহলে গিয়ে আমার। তবুও কিছু জায়গাতে যেতেই হয়। 
 
-আপনি বলেছিলেন, কবিতা দিয়ে বিত্ত নয় মানুষ কামাতে চেয়েছি। কতটা মানুষ কামালেন?
 
--সবাইতো টাকাই কামাতে চায়, আমি চেয়েছিলাম মানুষ কামাতে। সেটা তোমরা জানো, আমি কতটা তা পেরেছি কিংবা পারিনি। 
 
-আপনি পেরেছেন হেলাল ভাই। অসাধারণভাবেই মানুষকে অর্জন করতে পেরেছেন আপনার কবিতা দিয়ে। শুধু কবিতায়-শিল্পে নয়, যে কোনো ক্ষেত্রেই এ মানুষ অর্জন করতে আসলে কী লাগে?
 
--মানুষের জন্য মমতা। নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে ভালোবাসতে পারলে মানুষও তোমাকে ভালোবাসবে। আরেকটা বড় বিষয় হলো নিষ্ঠা। আমার তো কবিতা ছাড়া আর কিছু নেই- নিষ্ঠার সঙ্গে সেটাই করতে চেয়েছি। আমি পারছি না লিখতে- তো লিখলাম না, কী আসে যায়? এই যে ধর, ত্রিশ বছরে আমি যদি বিশটা কবিতার বই বের করতে চাইতাম- একটা কিছু লিখে বই বের করে ফেলতাম। সেটা করলে কিন্তু আজকের যে খ্যাতি-ভালোবাসা কিছুই থাকত না। ওই পথে আমি কখনও চিন্তাই করিনি। চিন্তা করেছি যে আমি এমন একটি পঙ্‌ক্তি লিখতে চাই, বা এমন একটা কবিতা আমি লিখবো, যা মানুষের মনে এবং মগজে জায়গা পাবে। 
 
-মানুষকে মিছিলে যাবার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন কবিতায়। সময়ের স্বতঃস্ম্ফূর্ততাই নিশ্চয়ই ছিল সেটা- কিন্তু সমাজ-রাজনীতি-পরবর্তী নানান বাস্তবতায় আর তেমন আহ্বান করলেন না কেন?
 
--হ্যাঁ, আমি তো কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলাম না। ছাত্রজীবনেও না, কর্মজীবনেও না। এর অর্থ এই নয় যে আমি রাজনীতিবহির্ভূত কোনো মানুষ, আই অ্যাম ভেরি মাচ পলিটিক্যাল। আমার বক্তব্য হলো, আমার কবিতাই আমার রাজনীতির কথা বলবে। তুমি আমার কবিতাতে ঢোকো, সেখানে যদি আমাকে শনাক্ত করতে না পারো- তাহলে আমার কবিতাও ব্যর্থ, রাজনীতিও ব্যর্থ। আর আমার কবিতা পড়ে তুমি শনাক্ত করতে পারবেই, যে এই লোকটা কে, কী, কী সে চায়? আমার 'যে জলে আগুন জ্বলে'তে তো শুধু প্রেম আর বিরহের কবিতা নেই। অনেক রাজনৈতিক কবিতা আছে। এমনকি অনেক রাজনৈতিক কবিতা আমি প্রেমের মোড়কে আবৃত করে প্রকাশ করেছি। সেগুলো আরও বেশি সংখ্যক মানুষকে স্পর্শ করেছে। আর পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে লিখতে ইচ্ছে করেছে, কিন্তু কবিতা-হয়কি গদ্য অনেক সময় পরিকল্পনা করে বিষয়ভিত্তিক বা রুটিন করে লেখা যায়, কবিতা তা নয়, আমার মনে হয়। হ্যাঁ, যারা সেইভাবে কবিতা লিখছে বা লিখবে, কিন্তু সেগুলো যে মানুষকে মুগ্ধ করছে তাও না। মানুষ সেগুলো খুব যে মনে রাখছে তাও না। আমার ধারণা কোনো কবির কবিতা টিকবে কি টিকবে না, বা এটা শিল্পমানোত্তীর্ণ হলো কী হলো না- এটা সবচেয়ে আগে টের পায় কবি নিজে। যদি সে সৎ কবি হয়। যদি তার ভেতরে কোনো চালাকি-চতুরতা না থাকে।
 
-তাছাড়া মানুষকে বোঝার ব্যাপারও তো আছে-
 
--হ্যাঁ, অবশ্যই। তুমি কিন্তু দূর থেকেও আমাকে পর্যবেক্ষণে রাখো। রাখো না? নিশ্চয়ই রাখো। যখনই একজন মানুষ যেকোনো ক্ষেত্রে সার্থকতার মুখ দেখে- আরেকটা মানুষ যে শুধু তাকে ভালোবাসে তা না, ভালোবাসার পাশাপাশি সে তাকে পর্যবেক্ষণেও রাখে। মানুষের কথার বাইরেও আরেকটা কথা থাকে। তেমনি লেখক-শিল্পীদের বেলায়ও। অনেকেই খোঁজ রাখছেন, যে এই লোকটা যা লিখছে, এবং যা সে বিশ্বাস করে সেগুলো এক কি-না। এই জন্যে বিশেষ করে কবি- কোনো কবি যদি কখনও কারও বা কোনো চিন্তার পোষা পাখি হয়ে যায় সে আর কবি থাকে না। কবি একটি সার্বভৌম সত্তা। তাই কবিরা যদি কারও পোষা পাখি হয়ে যায়- তাহলে সে সমাজ অধপতনের চূড়ান্ত পর্যায়ে অবস্থান করে। 
 
-হেলেন কোথায় এখন?
 
--শোনো আমার প্রথম এবং খুব বড় প্রেম কিন্তু সবিতা সেন। সবিতা মিস্ট্রেস। সেটা একটা অসম প্রেম। উনি তো আমার থেকে বারো-তেরো বছরের বড়। তার সঙ্গে আমার প্রথম সম্পর্কটা হলো মা-ছেলের মতন। আমি যেহেতু ছেলেবেলাতে মাতৃহীন। সবিতা মিস্ট্রেস আমাকে আদর করতেন খুব। আর আমার সমবয়সী বা দু-তিন বছরের ছোট যার সঙ্গে প্রেম- সে হলো হেলেন। আমার কবি জীবনকে বেশি প্রভাবিত করেছে হেলেন নয়, সবিতা সেন। শুধু কবি জীবন নয়, ব্যক্তি জীবনকেও। 
 
-সর্বশেষ কবে দেখা হয়েছে তার সঙ্গে?
 
--বহু আগে। তারও জীবন আসলে কষ্টেরই জীবন। সে যাকে ভালোবাসতো, তার সঙ্গে তার তো আর সংসার হয়নি। যে জন্যে সে সারা জীবন একাই থেকেছে। ছয়-সাত বছর আগে মারা গেছেন। হেলেনের সঙ্গেও পরবর্তী সময়ে আমার আর যোগাযোগ হয়নি। আমিও দূরে থেকেছি। আর কবিতার জন্যে যে বেদনাটা দরকার, সেটাতো আমার ভেতরে আছেই। তাই পরে সামাজিকভাবেই আমি আর এগোইনি। গত আট-দশ বছরে হেলেনের কোনো খবর জানি না। কিছুই জানি না।

- জীবনের এ পর্যায়ে এসে দুঃখগুলো এখন কেমন আছে?
 
--এসব বিষয় যতটুকু আমার সামর্থ্যে কুলিয়েছে, 'যে জলে আগুন জ্বলে'তে আমি বের করে দিয়েছি। এবং আমি খুব সচেতনভাবে চেষ্টা করেছি, যে আমার কোনো প্রেমের কথা, আমার কোনো বিরহের কথা, আমার কোনো দুঃখের কথা, আমার কোনো রাজনীতির কথা- এগুলো যখন আমি কবিতায় রূপান্তর করব, সেটা পড়ে প্রত্যেক মানুষ যেন মনে করে, আরে এটা তো আমারই কথা। সেই কাজটা মোটামুটি সফলভাবে করতে পেরেছি বলেই হয়তো একটি বই এত মানুষকে স্পর্শ করেছে। যিনি রাজনীতির মানুষ তিনিও তার কাছে গিয়ে আশ্রয় পেয়েছে। যে প্রেমিক সেও আশ্রয় পেয়েছে। যিনি বিচ্ছেদে আক্রান্ত, জর্জরিত সেও আমার কাছে গিয়ে আশ্রয় পেয়েছে। এ এক অদ্ভুত ব্যাপার। 

ধরো 'প্রস্থান' কবিতাটা- এমন কোনো ছেলে বা মেয়ে নেই যে একে নিজের কবিতা বলে ভাবেনি। পরবর্তী সময়ে যে কারণে 'ফেরিওয়ালা' কবিতাটি 'নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়'র চেয়েও বেশি আলোচিত হয়ে উঠেছে। হয়তো এর আবৃত্তিযোগ্যতার জন্যে, হয়তো মানুষের ভেতরকার ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্টের জন্য। 
 
-এই যে মাঝখানে এত সময়ের ব্যবধান- 'যে জলে আগুন জ্বলে'তে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, মানুষ তা দারুণভাবে নিজের বলে গ্রহণ করেছে। তবে এতদিন পর, ভাষার যে সময়যাত্রা আছে, পরবর্তী কবিতার বইয়ে আপনি কি সেই একই ভাষায় থাকবেন? নিজের কবিতার পরিবর্তিত ভাষার বিষয়ে আপনার কী চিন্তা?
 
--আমি চেষ্টা করব মানুষের মুখের যে ভাষা, সেটাকে ধারণ করতে। তুমি কি মনে কর- আমি যে লিখেছি 'তোমার বুকের ওড়না আমার প্রেমের জায়নামাজ', এটা আমাকে ফেসবুক বাধ্য করেছে লিখতে। এবং এক পঙ্‌ক্তিতে লিখতে আমাকে বাধ্য করেছে। আমি ভাষা বিষয়ে এখনও সচেতন। 
 
-শুনেছি 'যে জলে আগুন জ্বলে'র সর্বশেষ একটি সংস্করণ বেরিয়েছে কলকাতা থেকে-
 
--হ্যাঁ, কলকাতা থেকে সম্প্রতি একটি সংস্করণ প্রকাশ হয়েছে। বইটি বের করেছে উল্লাস চট্টোপাধ্যায়। প্রকাশনীর নাম 'উতল হাওয়া পাবলিশার্স'। উল্লাস চট্টোপাধ্যায় আমাকে নিয়ে একটা বইও লিখেছেন। 

সূত্র: সমকাল
এমএ/ ০৫:২২/ ১০ অক্টোবর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে