Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (30 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৮-৩০-২০১৮

অন্ধ বিশ্বাস খুব ভয়ানক জিনিস

তসলিমা নাসরিন


অন্ধ বিশ্বাস খুব ভয়ানক জিনিস

কেরালায় ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। ৮৮৫ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে, প্রায় কুড়ি হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত। লক্ষ মানুষ গৃহহারা। এমন অবস্থায় রীতিমতো মান্যগণ্য এক লোক বলে বসলেন, কেরালার শবরীমালা মন্দিরে মহিলারা ঢোকার অধিকার চাইছেন বলেই দেবতা আয়াপ্পা চটে গিয়ে কেরালায় বন্যা দিয়েছেন। শুধু অশিক্ষিত নন, বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা শিক্ষিতরাও এভাবে ভাবেন। শবরীমালা মন্দিরে দশ থেকে পঞ্চাশ বছর বয়সী মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। সেই নিষেধাজ্ঞা তোলার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে মামলা চলছে। এ দিকে কেরালার বন্যায় বিস্তৃত এলাকা যেমন জলমগ্ন, শবরীমালা মন্দির চত্বরও জলমগ্ন। শবরীমালার প্রাচীন রীতিনীতি বদলানোর কথা উঠতেই নাকি দেবতা আয়াপ্পা ক্ষুব্ধ হয়েছেন! শবরীমালায় মেয়েদের প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন ওঠা মাত্র আয়াপ্পা সবারই প্রবেশের পথ বন্ধ করে দিয়েছেন! ডানপন্থি রাজনীতিক এস গুরুমূর্তি লিখেছেন, ‘কেরালার অতি বৃষ্টির সঙ্গে শবরীমালা মামলার যোগ রয়েছে কি না, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা ভেবে দেখতে পারেন। বন্যার দশ লক্ষ সম্ভাব্য কারণের মধ্যে একটা কারণও যদি এটা হয়, মানুষ কিন্তু চাইবে না শবরীমালা মামলার রায় আয়াপ্পার বিরুদ্ধে যাক।’ কেরালার একজন ধর্মগুরু আরও একটি কারণ দেখালেন বন্যার, বললেন, কেরালায় লোকেরা গরুর মাংস খায়, সে কারণে বন্যা হয়েছে।

গোটা ভারতবর্ষে আমরা জানি একমাত্র কেরালাতেই একশভাগ লোক শিক্ষিত, একশভাগ লোক সই করতে জানেন। কেরালা নিয়ে গর্ব করার লোক অনেক। কিন্তু এই রাজ্যেও তাহলে অন্য রাজ্যের মতো কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ প্রচুর! পৃথিবীতে এমন কোনও দেশ, রাজ্য বা শহর বা গ্রাম আছে, যেখানে কুসংস্কার নেই? ক্রিশ্চান যাজকরাও পাশ্চাত্যের দেশগুলোয় বলে বেড়ান, সমকামিতা আর গর্ভপাতকে বৈধ করা হয়েছে, সে কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে ঈশ্বর বন্যা দিয়েছেন। প্রগতির চাকাকে চিরকালই পেছন থেকে টেনে ধরেছেন ধর্ম বিশ্বাসীরা। প্রযুক্তিকে গ্রহণ করেছেন, কিন্তু বিজ্ঞানকে অস্বীকার করেছেন।

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে অতিলৌকিক যোগ খোঁজার এই প্রবণতা নতুন নয়। ১৯৩৪-এ বিহার-নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পরে মহাত্মা গান্ধী বিবৃতি দিয়েছিলেন, হরিজনদের প্রতি অস্পৃশ্যতার পাপই ওই ভূমিকম্পের কারণ। মালয়েশিয়ার সাবায় প্রচুর ভূমিকম্প হওয়ার কারণ হিসেবে কিনাবালু পাহাড়ে উঠে কিছু লোক যে উলঙ্গ হয়ে ছবি তুলেছিল, সেটিকেই দেখা হয়!

বছর তিনেক আগে পাকিস্তানের জামিয়াত উলেমা-ই-ইসলামি ফজল-এর প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমান বলেছেন, মেয়েরা পাজামা ছেড়ে জিন্স পরছে বলেই নাকি পৃথিবীতে ইদানীং এত বেশি ভূমিকম্প হচ্ছে! তাঁর মতে, মেয়েদের ‘অশোভন’ আচরণ শুধু ভূমিকম্প নয়, মুদ্রাস্ফীতিরও কারণ। যে মেয়েরা নিজেদের ‘ময়দার বস্তা’র মতো ঢেকে রাখে না তারা আসলে মানবসভ্যতা ধ্বংসের অস্ত্র বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাকিস্তানের বিদ্যুতের সংকট, নিরাপত্তা ধ্বংস এমনকি বালুচিস্তানের সমস্যার পেছনেও মেয়েদের ‘অশোভন আচরণ’কে দায়ী করেন। বলেছেন, মেয়েদের বস্তায় পুরে বাড়ির মধ্যে রেখে দিয়ে দেশে শরিয়া আইন চালু করলেই তালেবান সদস্যরা আর পাকিস্তানে আক্রমণ চালাবে না। বারবার প্রমাণ হয়েছে যে ধর্মান্ধ লোকগুলোর নারী বিদ্বেষ প্রচ্ল। তারপরও এদের নারী বিদ্বেষ ছড়ানোর অধিকারে কেউ হস্তক্ষেপ করছে না।

ভারতবর্ষের কুসংস্কারের কোনও সীমা নেই। কিছুদিন আগে বিজেপি সাংসদ সাক্ষী মহারাজ আবার উত্তরাখণ্ডের বন্যার জন্য রাহুল গান্ধীর কেদারনাথ মন্দিরে দর্শনকে দায়ী করেছিলেন। কাঠমান্ডুর ভূমিকম্পের পরে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সাধ্বী প্রাচী রাহুলেরই নেপাল সফরের দিকে আঙ্গুল তুলেছিলেন। এক সময় কাঞ্চীর শঙ্করাচার্য জয়েন্দ্র সরস্বতীর বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ তোলার ফলে সুনামি হয়েছিল বলেও গুজব ছড়ানো হয়েছিল।

ভারতের ঘরে ঘরে কুসংস্কার। ভারতের দক্ষিণ কর্ণাটক কুক্কে সুভ্রামান্যয়া মন্দিরে প্রতিবছর নভেম্বর ডিসেম্বরে তিন দিনব্যাপী ‘মাদেস্নান’ নামক এক উৎসব পালন হয়। হিন্দু ব্রাহ্মণেরা কলাপাতায় খাবার খেয়ে উঠে গেলে, নিম্নবর্ণের হিন্দুরা সেই উচ্ছিষ্ট খাবারে গড়াগড়ি খায়। তারা বিশ্বাস করে যে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের এঁটো খাবারে গড়াগড়ি খেলে তাদের চর্মরোগ ভালো হয়, নিঃসন্তানদের সন্তান লাভসহ আরো অনেক পুণ্যলাভ হয়ে থাকে। প্রতি বছর প্রায় ৩৫,০০০ নিম্নবর্ণের হিন্দু এই স্নানোৎসবে অংশগ্রহণ করে। ১৯৭৯ সালে হাই কোর্টের রায়ে ‘মাদেস্নান’ বিলোপ করা হয়েছিল, কিন্তু ভক্তদের অনুরোধে ফের বহাল করা হয়।

ঈশ্বরের আশীর্বাদ পেতে শিশুকে ছুঁড়ে ফেলা হবে একটা উচ্চতা থেকে আর সেই শিশুকে লুফে নিয়ে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। যে শিশু বেঁচে ফিরবে সেই ঈশ্বরের আশীর্বাদ ধন্য। আর যে শিশু প্রাণ ফিরবে না, সে হবে ‘বলি’। বীজাপুরের মানুষ এই প্রাচীন রীতি মেনে আসছেন বহুকাল থেকেই, এখনও মানেন। কর্ণাটকের রাইচুরের শ্রী সন্তেশ্বর মন্দিরে প্রতি বছরই এই ‘ধর্মীয় উৎসবে’ শামিল হন গ্রামের মানুষ। ২ বছরের নিচে যে শিশুর বয়স, তাঁদের ওপরই চলে এই ভয়ঙ্কর প্র্যাকটিস। এই রীতি পালন করা মানুষের কাছে সুস্বাস্থ্য ও ভাগ্যের প্রতীক। ৭০০ বছর আগে থেকেই এই রীতি চলে আসছে, তাই প্রশাসনও বাধা দেয় না। গৌহাটির কামাখ্যা মন্দিরেও চলে অদ্ভুত সব কুসংস্কার।

কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়তে হলে আমাদের বিজ্ঞান ছাড়া গতি নেই। মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক করার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। কুসংস্কার বিরোধী যুক্তিবাদী মানুষ ভারতে এখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস করেন। যুক্তিবাদী নরেন্দ্র দাভলকারকে মেরে ফেলা হয়েছে, গোবিন্দ পান্সারেকেও মারা হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে আজও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কথা বলার মূল্য দিতে হয় জীবন দিয়ে। দাভলকর মহারাষ্ট্র সরকারকে কুসংস্কার-বিরোধী যে-বিলটা পাস করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন, তাতে মানুষকে ঠকানোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ছিল। ডাকিনীবিদ্যার চর্চা, কাউকে ডাইনি সাব্যস্ত করা, অঘোরীবিদ্যা, ওঝাতন্ত্র অর্থাৎ মন্ত্র পড়ে কুকুর বা সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা করা— এসব বিষয়ের কথা ওই বিলে উল্লেখ করা ছিল। বিধানসভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংস্থার বিরোধিতায় শেষ পর্যন্ত বিলটা পাস হয়নি।

জ্ঞান ও বুদ্ধির সঙ্গে অজ্ঞতার লড়াই দীর্ঘকালের। অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করা সহজ কাজ নয়। কিন্তু যুগে যুগে কিছু যুক্তিবাদী মানুষ সেই চেষ্টাই করেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নিজের বিশ্বাস ও ধর্মাচরণের স্বাধীনতা যেমন মৌলিক অধিকার, তেমনই বিজ্ঞানচেতনা গড়ে তোলা, মানবিকতা ও জ্ঞানের চর্চাকে উৎসাহিত করা আর হিংসাকে প্রতিরোধ করাও প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

বিজ্ঞান দিয়ে কুসংস্কারকে দূর করতে হবে, আমরা জানি। কিন্তু এও জানি অনেক বিজ্ঞানীই কুসংস্কারমুক্ত নন। ভারতের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের মহাপরিচালক উপগ্রহ ক্ষেপণের আগে পাঁজিতে শুভক্ষণ বিচার করেছেন, ভগবানের আশীর্বাদ চেয়ে মন্দিরে পুজো দিয়েছেন, নারকেল ফাটিয়েছেন। বিজ্ঞান শিখলেই যে মানুষ যুক্তিবাদী হয়ে ওঠে না, এ কথার প্রমাণ মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের মহাপরিচালক নিজেই চমৎকার দিয়েছেন।

নোংরা আর দূষিত গঙ্গার জলকে পবিত্র মনে করে মানুষ প্রতিদিনই স্নান করছে সে জলে। বাংলাদেশেও ব্রহ্মপুত্রের বিষাক্ত জলে স্নান করেন পুণ্যার্থীরা। ‘হে লৌহিত্য তুমি আমার পাপ হরণ কর’-এই মন্ত্র উচ্চারণ করে নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দের রাসায়নিক বর্জ্যে দূষিত দুর্গন্ধময় ব্রহ্মপুত্রের জলে স্নান করে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী।

বিশ্বাস খুব ভয়ানক জিনিস। বিশেষ করে অন্ধ বিশ্বাস। এই অন্ধ বিশ্বাস থেকে জন্ম হয় কুসংস্কারের। এই কুসংস্কার থেকে মানব সমাজকে বাঁচাতে হলে যুক্তিবাদী সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে কুসংস্কারবিরোধী আন্দোলনে। সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন ।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা

এমএ/ ০৮:০০/ ৩০ আগস্ট

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে