Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (22 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৮-১৩-২০১৮

সাংবাদিক পেটালে কিছু হয় না

প্রভাষ আমিন


সাংবাদিক পেটালে কিছু হয় না
বিশ্বের অন্য দেশের অবস্থা জানি না। কিন্তু বাংলাদেশে সাংবাদিকরা সবচেয়ে সহজ টার্গেট। সাধারণ মানুষ গালি দেয়, ডাক্তাররা অপছন্দ করে, রাজনীতিবিদরা টিপ্পনী কাটে, পুলিশ সুযোগ পেলেই মার দেয়, মাস্তানরা মারে, ছাত্ররা খ্যাপা। সবার যেন অভিন্ন শত্রু সাংবাদিক।
 
সাংবাদিকদের কোনো বন্ধু নেই, আসলে বন্ধু থাকতে নেই। সবার এই সম্মিলিত আক্রমণ দেখে মনে হয়, সাংবাদিকরা ঠিক পথেই আছে। সাংবাদিকরা তো কারো সন্তুষ্টির জন্য লিখবে না। তারা সমাজের, দেশের অন্যায়, অসঙ্গতি তুলে ধরবে। সাংবাদিকরা যাই লিখুক, সেটা কারো না কারো বিপক্ষে যাবে, কেউ না কেউ ক্ষুব্ধ হবেই। সংক্ষুব্ধ পক্ষ সুযোগ পেলেই গালি দেবে, মার দেবে।
 
গোপনে মেরে ফেলার উদাহরণ তো ভূরি ভূরি। প্রকাশ্য রাজপথে সাংবাদিক নির্যাতনের ইতিহাসও বেশ সমৃদ্ধ। কখনো পুলিশ, কখনো হেলমেটবাহিনী, কখনো সরকারি দল, কখনো বিরোধী দল, কখনো চেনা দুর্বৃত্ত, কখনো অচেনা মাস্তানের হাতে মার খেতে হয় সাংবাদিকদের। মার খাওয়ার পর পরই বিক্ষুব্ধ সাংবাদিকরা রাস্তায় নামেন। তখন আশ্বাস মেলে। আসলে আশ্বাস নয়, সান্ত্বনা মেলে। আশ্বাস মিললেও বিচার মেলে না। সবাই জানেন, সাংবাদিক পেটালে কিছু হয় না। অনেকবার পুলিশ মারার সময় সাংবাদিকদের একথা বলেছেনও।
 
বাংলাদেশে বড় কোনো আন্দোলন হলেই সাংবাদিকরা মার খান। বেশি দূর যাওয়ার দরকার নেই, সাম্প্রতিক কোটা আন্দোলন আর শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের আন্দোলনেও বিপদে ছিল সাংবাদিকরা। টুকটাক চড়-থাপ্পর এখন ডালভাত। মার একটু বেশি হলেই একটু-আধটু আলোচনা হয়, সাংবাদিকরা মানববন্ধনের মত নিরীহ কর্মসূচি পালন করেন, হুঙ্কার দেন। কিন্তু সরকারি কর্তারা জানেন এইসব হুঙ্কারে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। অথচ সব আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিটা কিন্তু সাংবাদিকরাই নেন।
 
সত্যিকারের ক্রসফায়ারের পজিশনে থাকেন সাংবাদিকরাই। কোনো ঘটনা ঘটলে সবাই যখন দৌড়ে পালায়, তখন সাংবাদিকরা জীবনের মায়া তুচ্ছ করে ছুটে যান ঘটনাস্থলে। সাম্প্রতিক নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে শুরু থেকেই মাঠে ছিল সাংবাদিকরা। শিক্ষার্থীদের দাবির যৌক্তিকতা গণমাধ্যমে তুলে ঘরেছে সাংবাদিকরাই। অথচ প্রথম দিন থেকে শিক্ষার্থীরা সাংবাদিকদের ওপর ক্ষ্যাপা ছিল।
 
এটিএন নিউজের সিনিয়র রিপোর্টার ইমরান সুমন প্রতিদিনই নিরাপদ সড়কের আন্দোলন কাভার করেছেন। কিন্তু প্রতিদিনই অফিসে ফিরে বলতেন, কাল থেকে আমি আর যাবো না। আমি তাকে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্বের কথা শুনিয়ে শান্ত করেছি। একদিন সে আমাকে এডিট প্যানেলে নিয়ে ফুটেজ দেখালো। ২০/৩০ জন শিক্ষার্থী ঘিরে ধরে তাকে গালাগাল করছে। দেখে আমারই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সুমন কতটা ধৈর্য্য নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে দেখে তার প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেল।
 
শিক্ষার্থীদের দাবি কুর্মিটোলায় ৭ জন মারা গেল, সাংবাদিকরা কেন ২ জন লিখছে। সমস্যাটা হলো, সাংবাদিকরা তো তথ্যের পেছনে ছুটবে, গুজবের পেছনে নয়। কুর্মিটোলায় দুর্ঘটনার পরপর প্রথমে আমি শুনেছি, ৪ জন মারা গেছে। কিন্তু রিপোর্টার গিয়ে জানালো, মারা গেছে ২ জন। এখানে ছাত্রদের দাবি অনুযায়ী ৭ জনের মৃত্যুর খবর কিভাবে দেবে? শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ তো ছিলই, আন্দোলনের সপ্তম দিনে শনিবার ধানমন্ডি-ঝিগাতলা এলাকায় সংঘর্ষের সময় হামলাকারীদের টার্গেট ছিল আন্দোলনকারী ও সাংবাদিকরা।
 
সাংবাদিকদের অপরাধ, তারা ছবি তুললে হামলাকারীদের পরিচয় ফাঁস হয়ে যাবে। তাই হেলমেটবাহিনীর একটা বাড়ি পড়েছে আন্দোলনকারীদের ওপর, আরেকটা বাড়ি পড়েছে সাংবাদিকদের ওপর। শনিবার এটিএন নিউজের ক্যামেরা পারসন জাহিদ আহত হয়েছেন। পরদিন রোববার শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছিনতাই করে কোটা আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে ধানমন্ডি আওয়ামী লীগ কার্যালেয়ের দিকে যায়।
 
নিঃসন্দেহে সেটা উস্কানিমূলক ছিল। কিন্তু পুলিশের সহায়তায় হেলমেট বাহিনীর মিছিলে হামলাটাও নিশ্চয়ই খারাপ হয়েছে। সাংবাদিকরা তাদের দায়িত্ব পালন করছিল। কিন্তু হেলমেট বাহিনী খুঁজে খুঁজে সাংবাদিকদের পিটিয়েছে। সেদিন অন্তত ১২ জন সাংবাদিক মার খেয়েছেন।
 
সাংবাদিকদের বিক্ষোভের ৭ দিন পর তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, আহত সাংবাদিকদের চিকিৎসা খরচ দেবে সরকার। বাহ, গরু মেরে জুতা দান বুঝি একেই বলে। একই দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, ভিডিও ফুটেজ দেখে সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারীদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কী অদ্ভুত দেশ। দিনে দুপুরে পুলিশের সামনে যে হামলা হলো, সে হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে নির্দেশ দিতে হবে কেন?
 
সোমবার চার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২ ছাত্রকে গ্রেপ্তারের সময় কি পুলিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশের অপেক্ষা করেছে। তবে তথ্যমন্ত্রী আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাস যে নিছক বাত কি বাত তা বুঝিয়ে দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিঞা। ঘটনার ঠিক সাতদিন পর মন্ত্রীদের আশ্বাসের পর তিনি বলছেন সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় কেউ মামলা করলে তা গ্রহণ করা হবে।
 
সাতদিন পর মামলা গ্রহণের আশ্বাস, তারপর ভিডিও ফুটেজ দেখে চিহ্নিত, তারপর গ্রেপ্তার। বাহ বাহ। আপনাদের আশ্বাসে আমরা আশ্বস্ত। আপনাদের আর কষ্ট করতে হবে না। আমাদের আর বিচার লাগবে না। পরে আবার সুযোগ পেলে মার দেবেন। তারপর আশ্বাস দেবেন। আমরা সন্তুষ্ট হয়ে আপনাদের নামে জয়ধ্বনি দেবো। সবাই জানে সাংবাদিকদের পেটালে কিছু হয় না।
 
সাংবাদিকদের পেটানোর ছবি দেখে আরেকটা পুরোনো প্রশ্ন মনে এসেছে। একজন ফটোসাংবাদিককে ১০/১২ জন মিলে যখন পেটাচ্ছিল, তখন অন্তত ৩০ জন মিলে তার ছবি তুলছিল। উৎসুক জনতা ছিল আরো অনেক। সবাই মিলে প্রতিরোধ করলে নিশ্চয়ই হামলাকারীদের ঠেকানো যেতো, আটক করা যেতো। একই ঘটনা ঘটেছিল পুরান ঢাকায় বিশ্বজিতের ওপর ছাত্রলীগের হামলার সময়ও।
 
আমি বিশ্বাস করি, সাংবাদিকরা ছবি না তুলে প্রতিরোধ করলে বিশ্বজিতকে বাঁচানো যেতো। এটা অনেক পুরোনো প্রশ্ন, সাংবাদিকদের কাজ কি সন্ত্রাসীদের বাধা দেয়া নাকি ছবি তোলা বা সংবাদ সংগ্রহ। অবশ্যই সাংবাদিকদের প্রথম কাজ সংবাদ সংগ্রহ। কিন্তু সাংবাদিকরাও মানুষ। তাদের সামনে কাউকে মেরে ফেলতে দেখলে সুযোগ থাকলে অবশ্যই তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে। সবার ওপরে মানুষ সত্য। নিজেদের বাঁচাতেও সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। মন্ত্রীদের আশ্বাসে অপেক্ষায় না থেকে রুখে দাঁড়াতে হবে।
 
এই যে সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ বেড়ে গেছে, এই যে মন্ত্রীরা আশ্বাস দিয়েই পার পেয়ে যাচ্ছেন; তার দায় কিন্তু সাংবাদিকদেরই। আমরা এত দল-উপদলে বিভক্ত, সবাই জানে এদের মারলে কিছু হবে না। রাজনৈতিক বিভক্তি ভুলে সাংবাদিকরা যদি নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়তে পারতো, তাহলে বিচারও হতো, হামলাকারীরাও মারার আগে দুবার চিন্তা করতো। যতদিন বিভক্ত থাকবো, ততদিন মার খাওয়ার জন্য পিঠ শক্ত করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। হ্যাঁ, বিচারের আশ্বাস আর চিকিৎসার জন্য দু চার টাকা পাওয়া যাবে।
 
এমএ/ ০৩:১১/ ১৩ আগস্ট

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে