Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৮-০৬-২০১৮

চীন সফরে ‘বিতর্কিত অতিথি’ রবীন্দ্রনাথ

আহমদ রফিক


চীন সফরে ‘বিতর্কিত অতিথি’ রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথের চীনপ্রীতির ইতিহাস বেশ দীর্ঘ, আর এ বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাও কম নয়। সেই কবে প্রাচীন সভ্যতার দেশ হিসেবে চীন ও ভারতবর্ষের সঙ্গে তুলনা টেনে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—চিরদিন চীন দেশে ও ভারতবর্ষে সমাজতন্ত্র প্রবল। এ সমাজতন্ত্র অবশ্য মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্র নয়, সমাজপ্রধান সামাজিক শক্তিপ্রধান ব্যবস্থা।

চীনকে জোর করে আফিম খাইয়ে শোষণ করা নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশবাদীদের উদ্দেশে রবীন্দ্রনাথের ধিক্কারও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তেমনি তীব্র প্রতিবাদ প্রকাশ পেয়েছিল জাপানের মাঞ্চুরিয়া দখলের মতো একাধিক আগ্রাসী ঘটনা নিয়ে। এসব ঘটনা এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্তর্গত।

কিঞ্চিৎ বা অধিক সাম্রাজ্যবাদী চেতনায় সিক্ত বিদেশি লেখক দু-একজন এ বিষয়ে তির্যক মন্তব্যও করেছেন। যেমন—অ্যান্ড্রু রবিনসন ও কৃষ্ণা দত্তের লেখা বিশালায়তন রবীন্দ্রজীবন বিষয়ক গ্রন্থে  (‘Rabindranath Tagore : The Myriad-minded man’)| তাঁদের মূল অভিযোগ, রবীন্দ্রনাথ যুক্তিহীনভাবে পশ্চিমা গণতন্ত্রের সমালোচনা করেছেন এবং একই সঙ্গে দেখা গেছে তাঁর সোভিয়েত রাশিয়া ও চীনপ্রীতি। বিষয়টি যুক্তি ও তথ্য দিয়ে দীর্ঘ আলোচনার।

যাই হোক, এহেন রবীন্দ্রনাথ, যিনি বিশ্বপথিক হিসেবে পরিচিত, যিনি উপলক্ষ বা বিনা উপলক্ষেও বিদেশ ভ্রমণে সদাপ্রস্তুত, তিনি চীন সফরে যাবেন না, তা তো হতে পারে না। কাজেই তিনি চীন সফরে যাবেন বলে মনস্থির করলেন। এর আগে ১৯১৬ সালে জাপানে ঘুরে এসেছেন; কিন্তু পুরোপুরি চীন দেশ ঘুরে দেখা হয়নি।

তাই এবার ১৯২৪ সালে চীন থেকে আমন্ত্রণ পেয়ে তিনি চীন যাত্রার প্রস্তুতি নেন। কেন তিনি চীন যাচ্ছেন এ সম্পর্কে রোমা রোলাকে লেখা চিঠিতে ইঙ্গিতার্থক বক্তব্য, ‘আমি চীনে যাচ্ছি, কী হিসেবে তা জানি না; একজন কবি, নাকি যুক্তিসিদ্ধ সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন একজন সুপরামর্শদাতা হিসেবে?’

আসলে দ্বিতীয়টিই ছিল তাঁর চিত্তের নেপথ্য বাসনা। তাঁর মনের গভীরে বাসনা প্রাচীন চীন ও ভারতের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্ম ও বৌদ্ধ সংস্কৃতি ভিত্তিতে চীনের সঙ্গে ভারতের যে গভীর সংযোগ সূত্র তৈরি হয়েছিল, তা চীনবাসীকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং তা পুনঃস্থাপনের চেষ্টা।

এখানেই ছিল রবীন্দ্রনাথের ভুল। কারণ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দ্বারা পীড়িত যে চীন মেরুদণ্ড সোজা করে আপন শক্তিতে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে, তার অন্তরে তখন জাতীয়তাবাদী চেতনা, ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমে আধুনিক বিশ্বে প্রবেশের চিন্তা এবং চেষ্টা—সে ক্ষেত্রে সে পেছন ফিরে তাকাবে কেন? কেন প্রাচীন ধর্মীয় মৌতাতে আচ্ছন্ন হবে?

এই জাতীয়তাবাদী চেতনাকে ভিত্তি করে ১৯১১ সালে সান-ইয়াত সেনের নেতৃত্বে প্রথম চীনে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত, যদিও সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র ও চাতুর্যে চীন এখনো রাজনৈতিকভাবে বহুধাবিভক্ত। বিদেশি প্রভাবিত সামরিকপ্রধানরা বিশালায়তন চীনের কোনো কোনো প্রদেশে ক্ষমতায় আসীন।

অন্যদিকে ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব ও মার্ক্সবাদী মতাদর্শ চীনা তরুণদের একাংশে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছে। তাদের চিন্তায় একই সঙ্গে নব্য ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চার দিকে ঝোঁক। উদ্দেশ্য আধুনিক শিক্ষার আলোকে নতুন চীনা রাষ্ট্র গড়ে তোলা। তাদের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে। পৃথিবীর সব দেশে তরুণসমাজই তো আলোর দিশারি, নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্নের যাত্রী।

অন্যদিকে প্রাচীন চৈনিক সভ্যতা ও বহুধাবিভক্ত ধর্মীয় সংস্কৃতির ধারক-বাহক শিক্ষিত শ্রেণির সংখ্যাও কম ছিল না তৎকালীন চীনে; যেমন—শিক্ষক, অধ্যাপক ও সমাজের প্রভাবশালী বিশিষ্ট বিত্তবান শ্রেণি। তাদের কেউ কনফুসীয়, কেউ ভিন্নমতবাদী, আর বেশির ভাগ বৌদ্ধ বা ভিন্ন ধর্মীয় ধারায় বিশ্বাসী। তারাই রবীন্দ্রনাথকে চীন সফরে আমন্ত্রণ জানায়। বড় সমস্যা হলো রবীন্দ্রনাথ চীনা সমাজের উল্লিখিত বহু বিভাজনের কথা যথাযথ জানতেন না। এল্মহার্স্টের অগ্রিম সংক্ষিপ্ত সফরও কবিকে চীনা সমাজের সার্বিক সঠিক চিত্রটি তুলে ধরেনি বা ধরতে পারেনি।

দুই.

চীনা সমাজ সম্পর্কে এমন এক অসম্পূর্ণ জ্ঞান নিয়ে রবীন্দ্রনাথের চীন সফর। স্বভাবতই তিনি তাঁর পূর্ব চিন্তামাফিক চীনে তাঁর বক্তব্যসংবলিত প্রবন্ধগুলো রচনা করেন, যেখানে একদিকে নৈতিক ও অধ্যাত্মবাদী দর্শন; অন্যদিকে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের পরধন ও পররাজ্য গ্রাসের লিপ্সার বিরুদ্ধে ছিল শাণিত প্রতিক্রিয়া। দ্বিতীয় বিষয়টির বাস্তবতা ও সত্যতা অনস্বীকার্য। কিন্তু তাঁর বক্তৃতায় প্রথম বিষয়টি প্রাধান্য পায় এবং কেন তিনি বর্তমান আগ্রাসী পাশ্চাত্যের বিরোধী তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা সত্ত্বেও সে বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা ছিল না তাঁর লিখিত প্রবন্ধে ও মৌখিক বক্তৃতায়। চীনা তরুণদেরও একাংশে তাঁকে ভুল বোঝার সুযোগ এভাবে তৈরি হয়। চীনা তরুণদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘বিতর্কিত অতিথি’।

দিনটি ছিল ২১ মার্চ ১৯২৪। বড়সড় আয়োজনে কবির চীন যাত্রা শুরু; সফরসঙ্গীদের সংখ্যাও কম নয় এবং বিচিত্র তার চরিত্র। এ যাত্রায় বরীন্দ্রনাথের সঙ্গী তাঁর সেক্রেটারি হিসেবে তাঁর গ্রাম উন্নয়নের নায়ক লেনার্ড এল্মহার্স্ট, শান্তিনিকেতনের পণ্ডিতপ্রবর ক্ষিতিমোহন সেনশাস্ত্রী, চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসু, প্রিয় শিষ্য কালিদাস নাগ, শান্তিনিকেতনে কর্মরত মার্কিন সমাজ সেবিকা গ্রেচেন গ্রিন ও দেশীয় রাজ্য লিমডির রাজকুমার ঘনশ্যাম সিংজি। এ সফর পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় লেকচার অ্যাসোসিয়েশনের আমন্ত্রণে এবং আর্থিক আনুকূল্যে।

সেকালে বিমানভ্রমণের সুযোগ তেমন ছিল না। ভরসা প্রধানত জলপথে ধীরগামী জাহাজ, ধীরে-সুস্থে অনেক সময় ব্যয় করে অকুস্থলে পৌঁছানো—বন্দর থেকে বন্দর ছুঁয়ে ছুঁয়ে। এবার রবীন্দ্রনাথদের যাত্রা ইথিওপিয়া নামের বিলেতি জাহাজে। এ লেখায় বিশদ বিবরণের সুযোগ নেই। এটুকুই বলা যথেষ্ট যে পথে পথে বিপুল অভ্যর্থনা ও সংবর্ধনায় সিক্ত রবীন্দ্রনাথ রেঙ্গুন, পেনাং, কুয়ালালামপুর ও সিঙ্গাপুর হয়ে জাহাজ বদল করে হংকং থেকে চীনের অন্যতম প্রধান নগরী সাংহাইতে পৌঁছেন ১১ এপ্রিল।

এ যাত্রায় তাঁর দোভাষী একজন চীনা কবি সু-সিমো। অতীব ভদ্র, বিনয়ী, সজ্জন বলা চলে। তিনি গভীর রবীন্দ্রানুরাগী। রবীন্দ্রনাথও তাঁর নানা গুণের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, যে কারণে দেশে ফিরে তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে তিনি সু-সিমো চা-চক্র সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন ‘চা-স্পৃহা চঞ্চল’ শীর্ষক কবিতা সহযোগে। এখানে চীনা ঐতিহ্যমাফিক বিপুল সংবর্ধনা। চীনা পণ্ডিত ও দার্শনিকদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ তাত্ত্বিক আলোচনা ও চিন্তাবিনিময় শুরু।

সাংহাই থেকে ইয়াংশি নদীপথে পিকিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা রবীন্দ্রনাথের। কবির এ যাত্রায় ডায়েরিতে তথ্য লিখেছেন গ্রেচেন, কালিদাস নাগ ও নন্দলাল, যা সফর-ঘটনাদির নির্ভরযোগ্য উৎস। পথে যেতে যেতে হ্যাংচৌ, নানকিং প্রভৃতি শহরে কবির বক্তৃতা, মূলকথা হলো, ‘চীন স্বাধীন, স্বতন্ত্র ও নিজ সভ্যতায় সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াক।’ তাঁর প্রত্যাশা, ‘শান্তিমন্ত্রের সাধক চীন পৃথিবীকে নতুন আদর্শ দেখাবে। সাময়িক গৃহবিবাদ দূর হোক চীন থেকে।’

প্রসঙ্গত, একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—হংকংয়ে রবীন্দ্রনাথ সান-ইয়াত সেনের কাছ থেকে আমন্ত্রণ বার্তা পেয়েছিলেন ক্যান্টন সফরের জন্য। কিন্তু সময়মতো পিকিং পৌঁছানোর চিন্তার কারণে রবীন্দ্রনাথ সে আমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারেননি। এটা ছিল রাজনৈতিক বিচারে তাঁর ভুল সিদ্ধান্ত। কারণ সান-ইয়াত সেন ছিলেন প্রগতিচিন্তার জাতীয়তাবাদী—তাঁর সঙ্গে মতবিনিময়ে রবীন্দ্রনাথ উপকৃতই হতেন এবং চীন সম্পর্কে অনেক সঠিক তথ্যও পেতেন। তাঁদের কখনো দেখা হয়নি।

নানকিংয়ের ছাত্রসভায় তাদের বিপুল সংখ্যায় উপস্থিতি সবটাই তাঁর অনুরাগী ছিল না, সচেতন সতর্কতায় লক্ষ করলে রবীন্দ্রনাথ তার কিছুটা আভাস-ইঙ্গিত পেতেন। তবে তা খুব একটা প্রকাশ্য ছিল না। তবু তিনি বস্তুবাদ বনাম অধ্যাত্মবাদ বিষয়ে বক্তৃতা করেন তাঁর নিজস্ব মতামত প্রকাশ করে। রবীন্দ্রনাথ এরপর পিকিংয়ে পৌঁছেন ২৩ এপ্রিল। স্টেশনে চীনা রীতিমাফিক মহাসংবর্ধনা। এখানেই তাঁর মূল কর্মব্যস্ততা, একাধিক বক্তৃতা।

দুর্ভাগ্যক্রমে এখানেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভাষণে, বক্তৃতায় ও প্রবন্ধ পাঠে পশ্চিমা যন্ত্রসভ্যতাকে দানবশক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রাচীন সভ্যতা-সংস্কৃতি, নৈতিক ও আত্মিক শক্তির প্রকাশ ঘটানোর আহ্বান জানান তরুণসমাজের প্রতি। এসবের নেপথ্যে তাঁর বহু কথিত অধ্যাত্মবাদ। চীনা যুবসমাজ তখন পেছন ফিরে তাকাতে অনিচ্ছুক।

বিশদ বিবরণে না গিয়ে এটুকু বলাই যথেষ্ট যে কবির একাধিক বক্তৃতা ও প্রবন্ধ পাঠ শুনে চীনা তরুণ, ছাত্র ও যুব সমাজের একাংশের প্রতিক্রিয়া হয়ে ওঠে নেতিবাচক। তাঁকে তারা অভিহিত করে ‘পরাজিত জাতির প্রতিনিধি’ রূপে, যারা এখনো বিদেশি শাসনের নিগড়ে আবদ্ধ। এবার রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পারেন চীনা যুবাদের বিরোধিতার বিষয়টি। তিনি তাঁর বক্তৃতায় তা প্রত্যাখ্যান করে নিজ মতে অটল থাকেন।

এবার পূর্বনির্ধারিত বক্তৃতামালার শুরুতেই বিপত্তি। পিংকিংয়ের সবচেয়ে বড়, সর্বাধুনিক প্রেক্ষাগৃহে রবীন্দ্রনাথের প্রথম বক্তৃতা। এখানে তিনি নিজ রাজনৈতিক ভূমিকা ব্যাখ্যার পাশাপাশি পশ্চিমা আধুনিকতার মূল বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেন তিনটি শব্দে—‘ভালগারিটি, ব্রুটালিটি এবং ওয়র’ উল্লেখে এবং বলেন যে ‘এতে প্রগ্রেস (প্রগতি) মূলে আঘাত করা হচ্ছে।’ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সম্পর্কে কথাগুলো ভুল ছিল না। কিন্তু তাঁর অধ্যাত্মবাদই সম্ভবত সব কিছু ভণ্ডুল করে দিয়েছিল।

চীনা তরুণরা তাই সংঘবদ্ধভবে রবীন্দ্রবিরোধিতায় এগিয়ে আসে। তারা তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা করে তীক্ষ ভাষায় লিখিত প্রতিবাদী ইশতেহার বিলি করতে থাকে কবির বক্তৃতাসভায়। এবার কবির মূল বক্তব্য ছিল, ‘দ্য রুল অব জায়ান্ট’ (দানবের শাসন) প্রবন্ধনির্ভর। (প্রবন্ধটি রবীন্দ্রনাথ ১৯২৬ সালে তাঁর ঢাকা সফরের সময় কার্জন হলে পাঠ করেছিলেন)।

সম্মানীয় অতিথির অবমাননার আশঙ্কায় সভাপতি অধ্যাপক হু-শি সভায় আগত ছাত্রদের উদ্দেশে এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে অতিথির অমর্যাদামূলক তৎপরতায় থেকে বিরত থাকতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কঠোর ভাষায় আহ্বান জানান। কিন্তু এতে কাজ হয়নি। রবীন্দ্রনাথের এই বক্তৃতার মূলকথা ছিল—দৈত্যের শাসন তথা পশ্চিমা শিল্প-বাণিজ্যের আগ্রাসন গণতন্ত্রকে শক্তিবলে ধনতন্ত্রী লোভ-লালসা ও আগ্রাসনে পরিণত করছে। কাজেই চীনা যুবসমাজ যেন তাদের অনুসরণ না করে।

বিতরণ করা ইশতেহারগুলোর মূলকথা হলো, ‘প্রাচীন চীনা সভ্যতা জনগণকে শোষণ করে রাজরাজড়াদের সমৃদ্ধ ও শক্তিমান করেছে, মেয়েদের পদানত করে পুরুষদের হাতে সব কর্তৃত্ব তুলে দিয়েছে, আর তোষণ করেছে অভিজাত ও সামন্ত প্রভুদের। রবীন্দ্রনাথ সেই সভ্যতা ফিরিয়ে আনতে চান বলে আমরা তাঁর বিরোধী।’

তাদের আরো বক্তব্য, ‘রবীন্দ্রনাথ-কথিত আত্মিক সভ্যতার ভয়াবহ রূপ প্রাচীন চীনে দেখা গেছে। আমাদের কৃষি-কুটির শিল্প, পরিবহনব্যবস্থা—সব কিছুই চাষি ও সাধারণ মানুষের চাহিদা পূরণে অক্ষম। সেখানে পরিবর্তন ঘটাতে হবে আধুনিক পদ্ধতিতে। এ ক্ষেত্রে চীনের শাসকরা উদাসীন। দেশ জঙ্গি শাসক ও বিদেশি শক্তির ষড়যন্ত্রে ছিন্নভিন্ন। তাই দরকার নতুন জাতীয়তাবাদী সরকার। আত্মার সন্ধানের কোনো প্রয়োজন নেই। চীনে রয়েছে কনফুসীয়, তাও এবং একাধিক ধর্মীয় মতবাদ। এখানে এসেছে অধ্যাত্মবাদ, খ্রিস্টতত্ত্ব। আর রবীন্দ্রনাথ বলছেন ব্রহ্ম ও আত্মার মুক্তির কথা। এসব ফাঁপা তত্ত্বের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ। প্রতিবাদ রবীন্দ্রনাথকে আমন্ত্রণকারীদের বিরুদ্ধে।’

সব কিছু দেখেশুনে রবীন্দ্রনাথ সঠিকভাবেই চীনা ভাষায় প্রচারিত ইশতেহারের বক্তব্য জানতে চান। কিন্তু তাঁর আমন্ত্রকরা বিষয়টি এড়িয়ে যান। রবীন্দ্রনাথ এক জাপানির সাহায্যে ওই বক্তব্য বুঝতে পেরে বিদ্রোহী তরুণদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি চান মুখোমুখি তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু তাঁর ইচ্ছা পূরণ করা হয়নি। ছাত্র ও যুবাদের কাছে তিনি তাই অবাঞ্ছিত, বিতর্কিত অতিথিই থেকে গেলেন। আত্মপক্ষ সমর্থনে বিচার-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সুযোগ পেলেন না তিনি।

ক্ষুব্ধ রবীন্দ্রনাথ নির্ধারিত বাকি বক্তৃতাগুলো বাতিল করে দিয়ে পাহাড়ি এলাকায় বিশ্রামে চলে গেলেন। সেখানে অবশ্য অনেক ছাত্রের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে। তারা তাঁর কথা শুনতে চেয়েছে এবং শুনেছেও। কেউ কেউ তাঁর সঙ্গে সহমত পোষণ করেছে। এরই মধ্যে কবি সেখানকার এক রুশ দূতের সঙ্গে সাক্ষাতে রাশিয়া সফরের ইচ্ছা প্রকাশ করেন; উদ্দেশ্য চীনা যুবকদের বলশেভিক মতবাদে আকৃষ্ট হওয়ার কারণ সন্ধান।

বিষয়টি দীর্ঘ আলোচনার। অতি সংক্ষিপ্ত এ নিবন্ধের শেষ কথা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ ক্ষুব্ধ মন নিয়ে ২০ মে পিকিং ত্যাগ করেন। ফিরতি পথে একাধিক শহরে তিনি ‘গ্রাম নগর’ প্রবন্ধটি পাঠ করেন বিপুলসংখ্যক দর্শক-শ্রোতার সামনে। এবারও তিনি যেমন উষ্ণ আন্তরিক শ্রদ্ধা ও সম্মাননা পেলেন, তেমনি মিলেছে যুবকদের বিরোধিতা আরো কঠোর ভাষায়। এবার ইশতেহারেই নয়, মুখোমুখি বক্তব্যে প্রতিবাদ।

শেষ পর্যন্ত চীন থেকে রবীন্দ্রনাথের সংক্ষিপ্ত জাপান সফরে যাত্রা। কবির প্রিয় চীন (অবশ্য চীনা যুবা শ্রেণি) এভাবে তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। তবে চীনা সমাজের বৃহৎ অংশ থেকে পান অভ্যর্থনা, সংবর্ধনা ও সমাদর এবং বিশ্বভারতীর জন্য উপহার। এ সবই তাঁর চীন সফরে সান্ত্বনা হয়ে রইল। অবশ্য জাপানে পাল্টা উষ্ণ সংবর্ধনা হয়তো বা তাঁর মনে কিছুটা শান্তির পরশ বুলিয়ে থাকবে। বিশেষ করে জাপানি ছাত্রী ও মহিলাদের আন্তরিক অনুরাগ। চীনে প্রদত্ত কবির বক্তৃতাগুলো ‘টক্স ইন চায়না’ গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট, আগ্রহী পাঠক দেখে নিতে পারেন।

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

তথ্যসূত্র: কালেরকণ্ঠ
আরএস/০৮:০০/ ০৬ আগস্ট

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে