Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (47 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৭-২২-২০১৮

নিয়ান্ডার্থাল জুলেখা, সখিনা সোফিয়া

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ


নিয়ান্ডার্থাল জুলেখা, সখিনা সোফিয়া
প্লেনে চড়িয়া ঢাকার আকাশে ঘুরিলে বাংলাদেশ নিয়া কখনোই বোধ হয় না ইহা একটি গরিব দেশ। মানে অর্থনীতির ভাষায় উন্নয়নশীল দেশ। উপর হইতে দালানকোঠার যে জৌলুস দৃষ্টিগোচর হয়, তাহাতে ইহাকে একটি ধনী দেশ বলিয়াই বিবেচনা করিতে হয়। এই দেশের রাজধানীর চামড়ায় উজ্জ্বলতা দেখিয়া মনে হইবে নিশ্চয় এইখানে আচরণেও উজ্জ্বল মানুষের বাস। কিন্তু উপর হইতে যে অপরূপ মসৃণ রূপটি দেখা যায়, তাহাই এই শহরের অলিগলি, সুবিশাল বিল্ডিংয়ের কিনার ঘেঁষিয়া এবড়ো-খেবড়ো কঙ্কাল হইয়া ধরা পড়ে। এই কঙ্কালের ফাঁক-ফোকরে যে সকল প্রাণীর বাস তাহাদের বিবর্ণ রূপ ঢাকা দেওয়া ঘাসের মতো অনুজ্জ্বল, ফ্যাকাসে। দূর হইতে দেখিলে সচল মনে হইলেও, তাহাদের নিকটে গেলেই স্পন্দনহীনতা প্রকট মনে হয়। স্বভাবতই এই ধারার কথা বিস্তর বিতর্কের জন্ম দিবে। কিন্তু তর্কের মধ্যে না গিয়া যে কাহিনী এইখানে বলিতে চাই, তাহা হইল- আমাদের এই রকম অনুভবের ভাবমূর্তি সম্পন্ন ঢাকা শহরের বুকে যে ধরনেরই মানুষ বাস করুক না কেন; গুটিকতক মানুষকে লইয়াই এই কাহিনী শিকড়-বাকড় ছড়াইয়াছে।
 
এই সকল মানুষের একটি অংশ নিজেদের তুচ্ছ সুখকে ব্যাংকে গচ্ছিত আমানত বলিয়া মনে করে। তাহাদের অনেক ধরনের আচরণে মনে হইবে, তাহারাই সারা বিশ্বে একমাত্র শান্তি বিতরণকারী কর্মী। তাহারা এমনভাবে তাহাদের খুশি প্রদর্শন করে যে দন্ত বিকশিত করিয়া নিজের ভিতরের সবখানি আবেগ উৎক্ষিপ্ত করিয়া দেয়। দেশ ও জনগণের সুখ চিন্তার কথা যখন কোনো নেতা ঘোষণা করেন, তখন এই সকল মানুষ তাহাদের পুরোটাই বিশ্বাস করিয়া করতল ফাটাইয়া হাততালি মারে। এই ধারার কিছু মানুষের কেহ কেহ এই কাহিনীতে আবর্তিত। 
 
তাহাদের বেশিরভাগই বস্তিতে বসবাস করে এবং তাহাতে তাহাদের আত্মঅহমিকায় কোনো পরিবর্তন হয় না। বিশাল দালানের পাশে অতি নোংরা আবর্জনার মতো তাহাদের ঘরবাড়ি। কিন্তু তাহাদের মাঝে পাশের দালানের উচ্চতা লইয়াই তর্ক-বিতর্ক চলে। কিংবা দালানটিতে কী কী মহামূল্যবান সীসা লাগানো রহিয়াছে, তাহাই অহঙ্কারের বিষয় হইয়া দাঁড়ায়। এমন কি একবার সেই দালানে প্রবেশ করিয়া মানুষ উঠানামা করিবার চকচকে লোহার বাক্সটি দেখিয়া তাহাদের সারা জীবন ধন্য হইয়াছে বলিয়া অনুমান করে। 
 
তাহাদের মাঝে কিছু নাম হইল জুলেখা, সখিনা এবং সোফিয়া। সোফিয়া শুনিয়া পাঠক বিতর্কেও লিপ্ত হইতে পারেন- ইহা তো একেবারেই উচ্চ শ্রেণির, মানে ধনিক শ্রেণির নাম। এই নাম এইখানে এইসব তুচ্ছ রমণীর নামের সঙ্গে সঠিক নহে। ইহা একটি অপযোগ। হইতে পারে। তবে বাস্তব হইল, এইসব রমণীও অনেক সময় শখবশত এই রূপ নামও এস্তেমাল করে। 
 
আবার এইসব নামধারীর পাশাপাশি ভিন্ন সারিতে গফুর, বাদশাহ, জাফর নামক একাধিক নামের করিৎকর্মা পুরুষও আছে। যাহারা মূলতই ধনিক শ্রেণির গৌরবমণ্ডিত ফসল। পরের সারির এই সকল মানুষ পরস্পর একটি নিজস্ব গোত্র সৃষ্টি করিয়াছে। যেমন শুরুতেই বলি, তাহারা মানুষ। আবার বলা যায় মানুষ্য গোত্রভুক্ত বটে, তবে একেবারেই মানুষপদবাচ্য বলিতেও দ্বিধা কাজ করে। তাহাদের জীবন যাপন পদ্ধতি আদিম। ভাবনাচিন্তায় নাই কোনো সুকোমল বৃত্তি। ফলে সমাজ বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে তাহার কোনো দায়বদ্ধতা বোধ করে না। আইন মানিবার বা সভ্যতার পরিশীলিত জীবনাচারের কোনো ধারই তাহারা ধারে না। অনেকেই ভাবিতে পারে, ইহা আমাদের ভ্রম। কিন্তু আমি বলি, ইহা হইল এখনকার বাস্তবতা। 
 
তাহা যদি নাই হইবে তবে কেন এই মধ্যরাতে বিশাল গাড়ি লইয়া রাজধানীর কারওয়ান বাজারের এই চিপাচাপার মধ্যে এইসব রাজকীয় বিলাসবহুল গাড়ি দাঁড়াইয়া? এবং তাহাদের আরোহী জীব-জানোয়ারতুল্য তুচ্ছ জীবন যাপনকারী অবলা নারীর সঙ্গে তর্কে লিপ্ত?
 
গোত্রবিন্যাস ছাড়িয়া আমরা কাহিনীতেই প্রবেশ করি। কাহিনীটি কখন ঘটিতেছে তাহা জানিবার একটা উদগ্র ইচ্ছা পাঠকের ভিতর হামাগুড়ি দিবেই। কিন্তু আমরা বলি কি, সভ্যতা যেখানে হোঁচট খাইয়া রহিয়াছে, সেখানে সময়ও পঙ্গু। ইহাও মূলত চার চাকার ভাঙ্গা ঠেলায় ভিক্ষুকের বেশে পথের ধারে পড়িয়া রহিয়াছে। 
 
আর ঋতু? এই দেশে এখন তো আর ঋতু আবর্তনের ঠিক-ঠিকানা নাই। ইহারাও সঠিক নিয়মে চলে না। এখানকার অধিবাসীদের মতো ইহারও আপন কক্ষপথ বিচ্যুতি ঘটিয়াছে এবং ক্যালেন্ডার মানিয়া আমরা যে ঋতুর উল্লেখ করিব, তাহা কার্যত এখন বর্তমান নহে। ফলে, বলা ভালো, এই কাহিনীর ঘটনাপ্রবাহ সকল ঋতুতেই অবলীলায় বহমান। 
 
তবে আমরা হলফ করিয়া বলিতে পারি, এখানে রাত ঘনাইয়া আসিলেও এখানকার আকাশে চন্দ্রিমার উপস্থিতি ঘটে না। ফলে এখানকার ঘন আঁধারেরও অপসৃয়মাণ হইবার কোনো অবকাশ নাই। এমনকি সরকারি বাতিও আঁধার দূর করিবার দায়িত্বে নিয়োজিত নহে।
 
তবে এখন যে দৃশ্যটি প্রত্যক্ষ করিতেছি তাহা সন্ধ্যা আগত হইবার পূর্বেই। বেশ বেলা রহিয়াছে। নোংরা আবর্জনার স্তূুপটার পাশে নীল রঙ প্লাস্টিকে মোড়ানো ছোট বাটি আকৃতির ঝুপড়ির সম্মুখে জুলেখা ভারি উদর নিয়া অলসভাবে বসিয়া এবং তাহার পাশেই আরেক সখি তাহার মাথার উকুন বাছিয়া দিতেছে। জুলেখার সখি দুই নখের মাঝে একটি করিয়া বড় উকুন ধরিয়া বিস্ময়ে হতবাক বনিতেছে। অতঃপর উকুনটিকে হাতের চেটোয় লইয়া জুলেখাকে প্রদর্শন করিতেছে। জুলেখা ক্ষুদ্র প্রাণীটিকে তাহার চুলে আবার ফিরিবার সুযোগ না দিয়া নিবিষ্ট চিত্তে পিষিয়া দিল। 
 
এই দৃশ্যের মাঝে পারিপার্শ্বিক দৃশ্য বা ঘটনাবলি তেমন আহামরি কোনো আকর্ষণীয় নহে। বরাবরের মতো পথচারীরা চলিতে চলিতে কেহ কেহ জুলেখার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতেছে। সাইকেলের বল-বিয়ারিং দিয়া বানানো চার চাকার ঠেলায় বসা স্টম্ফীত উদর মেয়েটিকে দেখিয়া কাহারও বিস্ময় বোধও হইতেছে! এক একটা লোকের দৃষ্টি এক একটা সার্চলাইটের মতো কার্যকর। 
 
এই মাইয়াডাও প্যাড বানাইসে। হায় আল্লাহ! এগো কি কাম-কাইজ নাই! নিজেই খাইতে পায় না। আবার বাচ্চা পয়দা করে!
 
কাহারো কাহারো মনের ভিতর আবার অন্য কথাও উঁকি দেয়- কে এরে বিয়া করলো? নাকি এইডা আবার বিয়া ছাড়াই ঘটনা! 
 
ঝুপড়ির পাশে পায়ে হোঁচট খাইবার মতো করিয়া একটা হ্যাংলা দেহের মানুষ থামে। মাটির দিকে মাথাটা নিচু করিয়া খুব নিকট হইতে জুলেখার সখির বুকটাতে চোখ রাখে। সখিনার বয়স অনুমান করি সতেরো। কালোই বলিতে হইবে। কালো না বলিয়াই বা কী উপায়! ইহারা এমনিতেই রোদে ভাজা হইয়া শরীর গড়িয়াছে। চাহিয়া অথবা পথের ধার কিংবা ডাস্টবিন হইতে কুড়াইয়া খাইয়া দেহে লাবণ্য সঞ্চার করিয়াছে। সমস্ত দিন যেহেতু সিনেমার খোলা পর্দার মতো লোকচক্ষুর সামনেই পড়িয়া থাকে, তাই ইহাদের আচরণে লাজ-শরমের বালাই থাকে না। ফলে হামেশাই টগবগে। 
 
পথচারী হ্যাংলা লোকটা ঘামে ভেজা লাবণ্য প্রত্যক্ষ করিতেছে। অতি নিকট হইতে এমন উন্মুক্ত লাবণ্য তাহার ভিতর একটা উলটপালট ভাব জাগাইতেছে। তাহার ক্ষণিকে অনুভব হইল- দশ টাকায় কি যাইবো আমার লগে? আবার ভ্রু কুঁচকায়। ভাবে- এই ভর দুপুরে কই নিয়া যাওন যায়? 
 
কোনো সঠিক স্থান তাহার মাথায় আসে না। ফলে দ্বিধাগ্রস্ততার কারণে সখিনার দিকে অগ্রসর হইবার চিন্তাও থমকাইয়া আছে। স্থির হইয়া থাকা ভাবনাটিকে সময় দিতে স্যান্ডেলের ফিতা টানাটানি করিল। তারের সহযোগিতায় টিকিয়া থাকা স্যান্ডেলটাকে আবারও পথের উপর দুই ঘা দিয়া প্রায় ঠিক করিয়াছে বলিয়া ভান করিল। ভাবখানা এমন, পথের উপর তাহার মোটরগাড়ি খারাপ হইয়া পড়িয়াছে। ইহা ঠিক করিতে সে গলদঘর্ম। স্যান্ডেল ঠিক করিতে করিতেই মনের ভিতর থমকাইয়া থাকা আহদ্মাদকে চোখেই আটকাইয়া নেয় এবং দৃষ্টিকে সাপের মতো লকলকে জিহ্বা বানাইয়া কসরতের সঙ্গে সখিনার তাবৎ কিছুর উপর ঘুরাইয়া আনিতে থাকে।
 
সখিনা এতক্ষণে লোকটির কাণ্ড বুঝিয়া ফেলিয়াছে। তাহার ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসি। লোকটির তাকানো যে তাহার নারী-সৌন্দর্যের প্রতি প্রশংসাসূচক, তাহা সখিনা বুঝিয়াছে। সে ইহাকে তাহার রূপের প্রতি স্বীকৃতিস্বরূপ বিবেচনায় লইয়াছে। ফলে এদিক ওদিক তাকাইয়া আহদ্মাদমাখা উঁচু স্বরেই বলিয়া উঠিল, সই, আমারেও যুদি কুনো মরদ হাজার টেকা দেয়, তো আমিও তুমার মতো কামে রাজি।
 
টাকার অঙ্ক শুনিয়া চাবুক খাইলো লোকটি। তাহার শরীর জুড়িয়া যাহা কিছু উত্তেজিত হইয়াছিল, তাহার সকলই বরফ শীতল হইবার সঙ্গে সঙ্গে সপ্তম মেজাজে মুখ ফসকাইলো। খানকি কয় কী! পাঁচ টেকা অইলেই অয়...
 
লোকটির মুখ হইতে লাবণ্যময়ী রমণীর জন্য মূল্যনির্ধারণী বাক্য শেষ হইতেই সখিনা খেঁকাইয়া উঠিল- অই বেডা হারামজাদা, গেলি?
 
অই মাগি, আমি তরে কিছু কইসি? লোকটির দাঁত খিঁচানো প্রত্যুত্তর। 
 
হারামজাদা, ডাকুম আমার মাইনষেরে ?
 
এই কথায় লোকটি ভয় পায়। এই সব মেয়ের ষণ্ডাপাণ্ডা থাকে তো বটেই। এক সেকেন্ডেই গাড়ির ব্রেক ছাড়িয়া লোকটি অ্যাক্‌সিলারেটরে দিল চাপ। পায়ের সঙ্গে কোনোমতে লাগিয়া থাকা স্যান্ডেল ফটর-ফটর শব্দে দূরে মিলাইয়া গেল। লোকটির দ্রুতভাবে পলায়নকাণ্ড দেখিয়া জুলেখা এবং সখিনা দুইজনেই মিলিয়া হি-হি করিয়া গড়াইতে শুরু করিল। 
 
এখানকার আবহে এইসব ঘটনা বা দৃশ্যের প্রায়শ অবতারণা ঘটে। কারওয়ান বাজারের বস্তি ঘেঁষিয়া ফুটপাতে আদিম দিন হইতে উঠিয়া আসা এমন ধরনের সময়, এমন করিয়া আজবভাবে এখানে পড়িয়া থাকে। এইভাবেই জুলেখা এবং তাহার সই সখিনা বসিয়া দিনের আলো পার করিবার সময় কাটায়। আর এইভাবেই পথের মাঝ হইতে কখনও কোনো একজন কিছু সময়ের জন্য এইখানে থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়ে। 
 
আচ্ছা, সখিনার রূপ বিবরণ দিয়াছি, কিন্তু জুলেখা দেখিতে কেমন তাহা তো বলি নাই ! জুলেখা ঠেলায় বসিয়া থাকে, তাহা বলিয়াছি, তবে তাহার সারাটা দেহই পঙ্গু নয়। তাহার পা দুইখানি এক আজব রোগে হাঁটুতে দুর্বল। সে একেবারেই হাঁটিতে পারে না। বলা উচিত দুই পায়ের উপর ভর দিয়া দাঁড়াইতেই পারে না। বগলে ক্রাচ নিলে পুরো দেহটা লটপট করিতে থাকে। কিন্তু রূপে খুব কুৎসিত কিছু নয়। চোখ দুইটা তো ভালোই দেখিতে। এমন শরীর লইয়াই যদি ধনীর দুলালী হইত, তাহা হইলে কে জানে, একটি সুদর্শন বরও জুটিতে পারিত! 
 
সেই জুলেখাই এইবার তাহার সখির গাল টানিয়া দেয়। তাহাকে অবলীলায় জিজ্ঞাসা করে- হাজার টেকা নিবি? তুই রাজি হইলে কিন্তুক আমি তাগো কইতে পারি। 
 
মানা করসি? দেহ সই, টুকায়-টাকায় কয় টেকা পাই। তাও আবার পার্কের হারামজাদা পাহারাদাররা এমনিই শুয়ায়। খালি কি হেইডাই? এরপর আবার আমার কাছ থিকা ত্রিশ-চল্লিশ টেকাও নিয়া নেয়। 
 
তুই দিস ক্যান? আর শুইলে টেকা নিস না ক্যান?
 
তর যেমুন কতা! অন্য বেডিরাও দেয়। আমি না দিলে পার্কে তো ডুকতে দিব না। সখিনা একটু থামিয়া দম নেয়। জুলেখা স্টম্ফীত উদরের উপর হাত চালায়। অই দ্যাক দ্যাক, বান্দরডা পা দিয়া গুতা দিতাসে। জুলেখার চোখ চকচক করিয়া ওঠে। আবার বলিয়া ওঠে, আমার জান, সুনা-ময়না পাকি।
 
সখিনাও অবাক! জুলেখার পেটের উপর কান পাতে। ও বাবারে সই, তর বেডা আমারে লাত্তি দিসে। এই বলিয়াই হি-হি করিয়া হাসিয়া গড়াইতে থাকে। 
 
সখিনার কথায় জুলেখা ওর দিকে খড়খড়ে চোখে তাকায়। 
 
বেডা হইবো- বুজলি ক্যামনে?
 
লাত্তিডা খুব জোর মাইরা দিসে সই। 
 
জুলেখা হাসিয়া ওঠে। তাহার মুখের উপর স্বর্গের রহস্যময়তা ছড়াইয়া পড়ে। আমার বেডা না রে, মাইনষের বেডা। 
 
মাইনষের ক্যান ! তরডা তর।
 
না রে সই। হেরা আমারে টেকা দিসে। বেলা বেলা খাওন দিসে। কিন্তু কইসে- বস্তিতেই থাকতে হইবো। আর কইসে, পোলা তাগো। আমি ত পরথমে রাজি হই নাই। তারপর ক্ষিদা বড় কতারে। আর আমিনা মামী বুজাইলো। আমিনা মামীর তো অনেক মাইনষের লগে পরিচয়। হে-ই আনসিলো বেডাগো। 
 
সখিনা জুলেখার মুখের দিকে তাকাইয়া রহিয়াছে। আর জুলেখা আলিফ লায়লার গল্পের সুতা খুলিয়া তেপান্তরের মাঠ দিয়া হাঁটিয়া যাইতেছে। মামী একদিন আইসা এই কতা সেই কতার পর কইল, হুন জুলেখা, এক বেডা তরে পসন্দ করসে। আমি কইলাম, আমারে? মামী কয়, হ, তরে। আমি বোকার মতো চাইয়া থাকলাম। মামী কয়, তুই আমার লগে যাবি? টেকা তো পাবিই- আমি গিরান্টি। আমি কইলাম, আঁর ডর করে। আমিনা মামী কয়, কইলাম না- আমি গিরান্টি। আর না যুদি যাইস, ত আমার কী! অবাগি, এইহানে পইরা না খাইয়া মরবি। তুই অচল মানুষ। ঠেলায় কইরা ঘুরলেও ত তরে কেউ না কেউ জোর কইরা বিছানায় নিব। থামাইবার পারবি? আমি আমিনা মামীর দিকে তাকাইয়া থাকি। মামী হাসে। হুন, আমি যে হাঁটবার পারি। আমিই এই রাস্তায় ক্ষিদায় মরসি। আমিই কি কুনো মরদ রে থামাইতে পারসি? বুজলি সই, দেহি কী, আমিনা মামীর চোখ দিয়া টপটপ কইরা পানি পড়তাসে।
 
সখিনা ফিস ফিস করিয়া ওঠে। তারপর?
 
তারপর রাইতের বেলা আমার ঠেলা ঠেইলা বড় রাস্তার ধারে নিল। গাড়িতে কইরা কইরা কই কই ঘুরাইয়া হেসে একটা বাড়িত ডুকাইল। কী বাড়িরে বাবা! হেই গোলশানে দেহিস নাই বড় বড় বাড়ি? হেই রহম। আর ভিতরে ত আমারে চাকা লাগাইন্যা একডা চিয়ারে কইরা নিল। এরপর দুই বেডা আইসা আমারে গোসলখানায় নিল। আমি চিক্কর দেই। কই, আমি নিজের গতর নিজেই ধুমু। হেই বেডারা হুনে হেই কতা।
 
সখিনা আবারো ফিসফিস করিয়া ওঠে। তারপর?
 
জুলেখার উত্তর আসিবার পূর্বেই একটা কথা বলি। এখানে এই লোকগুলি তাহাদের মনিব বাদশার কথামতো কাজ করে- এই বিষয়টা জুলেখার জানিবার কথা নহে। তাই তাহার বারবারই মনে হইতেছিল, এই লোকগুলি বোধহয় তাহার শরীর ধোয়াইতে ধোয়াইতেই সমস্যা করিয়া বসিবে। কিন্তু ক্রমান্বয়ে জুলেখার অপ্রয়োজনীয় ভীতিও সরিয়া যাইতে শুরু করিল। বরং সেই শূন্যস্থান পূরণ করিতে তাহার পঙ্গু জীবনে তন্বী দেহের অলিন্দে অলিন্দে ভিন্ন এক আবহ জাগিয়া উঠিতে লাগিল। 
 
যাহা হউক, আমরা বরং এইখানটা জুলেখার মুখেই শুনি। জুলেখা তাহার সইয়ের নিকট কণ্ঠের বিচিত্র উঠানামার মধ্য দিয়া আবার বলিতে শুরু করিল। সই, সেই গরে কত রকমের সাবান! এইখানে আসিয়া জুলেখা খিকখিক করিয়া হাসিল। সখিনাও মুখ টিপিয়া হাসিতে লাগিল। 
 
সখিনার মুখের উপর ফুটিয়া ওঠা হাসির মাঝে তাহার চোখের তারায় এক প্রকারের আলো মনে হইল জ্বলিয়া উঠিতেছে। প্রথমে মনে হইল, নিশ্চিতভাবে এইসব দৃশ্যপট সখিনার ভিতরেও উথাল-পাথাল তুলিতেছে। কিন্তু তাহার চোখের ভাষা নিগূঢ়ভাবে পড়িলে আরেকটি কাহিনীবিন্যাস ধরা পড়ে। সখিনা তাহার পাশের গ্রামের এক যুবককে ভালোবাসিয়াছিল। অনেক ওয়াদার পর যুবকটি তাহাকে সিনেমা দেখাইতে লইয়া গিয়া সখিনার যাহা কিছু গর্বের তাহার সবটুকুই কাড়িয়া নেয়। এই গল্পটি সাদামাটা। কিন্তু এই ঘটনার ভিতরে নিহিত বেদনা সখিনাকে অজগরের মতো গিলিয়া খায়। অকূল সমুদ্রে হাবুডুবু খাইয়া কবিরাজের কাছে যন্ত্রণার ভার খসাইতে গিয়া মৃতপ্রায়। অতঃপর গ্রাম্য সালিশ। বেত্রাঘাত, এইসব বেদনার্ত সবই তাহার কপালে জোটে। পরিশেষে কপালে কুলটার ছাপ লইয়া এক নিঃসঙ্গ রাত্রিতে সে গ্রাম ছাড়িয়া নিরুদ্দেশ হয়। 
 
জুলেখার গল্প আর তাহার বাণিজ্য কার্যক্রম শুনিতে শুনিতে সখিনা এক গভীর দীর্ঘশ্বাস বুকের ভিতর সিলগালা করিয়া নেয়। তাহার মনে হয়, কী হইত আমিরুল যদি তাহাকে প্রতারণা না করিয়া বিবাহ করিত? তবে সেও তো আজ সুখী হইতে পারিত। এক্কাদোক্কার ঘরে লাফানোর মতো আজ পথে পথে পুরুষ হইতে পুরুষে জীবন কাটাইত না। সখিনার মুখের হাসি ক্রমান্বয়ে ম্লান হইয়া মেঘের আড়ালে চলিয়া যাওয়া চাঁদের মতো হইয়া গেল। সে ম্লান কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কী করলা?
 
জুলেখা তাহার কাহিনী বলিয়া চলিয়াছে। একটি রেলগাড়ি নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘর্ঘর শব্দ তুলিয়া মাঠ-ঘাট পার হইয়া কু-ঝিক-ঝিক শব্দ তুলিয়া ছুটিতেছে। না দেখিতেছে বৃক্ষ, না দেখিতেছে মানুষ। সখিনার চোখের পরিবর্তন তাহার নজরে ধরা দেয় না। সখিনার প্রশ্নও তাহাকে অন্য জগৎ হইতে টানিয়া বাহির করে না। জুলেখা বলিয়া চলিয়াছে- দেহি গরে আমিনা মামী বইসা। আর চেয়ারে একডা সোন্দর সাহেব বসা। হেই সাহেবডা মামীরে কইল, আমিনা, তুমি এরে বুঝাইস ত? এই বইলাই সাহেব আমার দিকে ফিরিল। 
 
শোনো জুলেখা, আমি তোমাকে টাকা দেব, খাবার দেব। কাপড় দেব। তুমি শুধু বাচ্চা পেটে ধরবে। বাচ্চা হলে তুমি আরও টাকা পাবে। রাজি? কিন্তু বাচ্চার উপর কোনো দাবি করতে পারবে না? রাজি? 
 
আমি কইলাম, সাহেব, আমারে বাচ্চা দ্যাকতে দিবেন না?
 
মেরুন রঙের পুরু কার্পেটের উপর জুতার ডগা দিয়া বাড়ি মারিতে মারিতে বাদশা বলিয়া উঠিল, বাচ্চা জন্মালে তো দেখবেই। কিন্তু বাচ্চা আমার। রাজি? 
 
হায় খুদা! কয় কী! আমার পেডের বাচ্চা, আর আমি পামু না! মালিক হইব হেই বেডা!
 
তুমি চাইলে এমুন কইরা আরও বাচ্চা পয়দা করতে পার। আমি তোমাকে বারবার বেশি টাকা দেব।
 
আমি খালি তাকাইয়া আসি। খালি অবাক হইয়া কইলাম, সাহেব, এত বাচ্চার মায়া আপনের! আপনে অনেকগুলান বিয়া বইলেই ত পারেন। আমার কতা হুইনা বেডা হাসে। তারপর বেডা কী করল জানোস? আমার দুই হাত ভইরা এক হাজার টেকা দিল। সব দশ টেকার কড়কড়া নোট। সই, কী কমু তরে, আমার শরীলডা কাঁডা দিয়া উঠলো! 
 
এরপর দেহি থালা ভইরা পোলাও আনল। কী খোশবু! আমার ত লগে লগেই খাইতে মন চাইল। কিন্তুক সাহেব কইল, কাম হওনের পর খাইও। 
 
সত্যি বিষয়টা হইল, জুলেখা সঙ্গে সঙ্গেই খাবারের অনুমতি লাভ করে নাই। কিন্তু পোলাওয়ের ঘ্রাণ তাহার চিন্তা-চেতনাতে এক বিরাট পরিবর্তন আনিল। ক্ষুধার্ত জুলেখার মাথার শিরার ভিতর দিয়া দ্রুত সময়ে পিছনে চলিয়া যাইতেছে। হাজার মানুষ। লক্ষ মানুষ। কোটি মানুষ। মানুষের পর মানুষ পার হইয়া জুলেখা বন-জঙ্গল আর পাথুরে পাহাড় ঘেরা এক নিরিবিলি স্থানে উপস্থিত। গোটা দশেক রোমশ সঙ্গীদের সহিত লম্বা কাঠের মাথায় ধারালো পাথর বাঁধিয়া পশু শিকার করিতেছে। 
 
সবাই মিলিয়া ছুটিয়া একটা বিশালাকৃতি পশু ধরাশায়ী করিল। পশুটিকে ধরাশায়ী করিয়া সবাই আনন্দে আত্মহারা। বিকট শব্দে আকাশ-বাতাস ফাড়িয়া চিৎকার করিতেছে। এর পর ধীর স্থির হইয়া পুরুষ সঙ্গীরা পশুটিকে ঘিরিয়া ভোজন পর্ব শুরু করিল। আর দলের সকল নারী একপাশে লোলুপ দৃষ্টিতে তাহা দেখিতে লাগিল। পুরুষদের ভোজন পর্ব সমাপ্ত হইলে তাহারা আবারও বিকট শব্দে চিৎকার করিতে লাগিল। সুখী পুরুষেরা এবার তাহাদের রমণীদের ভোজনে অনুমতি দিবার পূর্বে ঋতুমতী নারীদের কাছে টানিয়া লইল। জুলেখার মনে হইতেছে, তাহার দলের নারীরা এখন খাদ্য লাভ করিবার উপায় হিসেবে পুরুষদের আহ্বন সাড়া দিতে উদগ্রীব। 
 
পোলাওয়ের কথা বলিতে বলিতে জুলেখা একটু থামে। দম নেয়। স্টম্ফীত উদরের উপর হাত বুলায়। আবার বলতে শুরু করে- সই, আমি আর তরে কইতে পারুম না। খালি একটা কতা কই। পরথমে ত গতর ধুয়াইন্যা একটা লোকই সাহেবের দিকে তাকাইল। তারপর সবাই গর হইতে বাহির হইয়া যাইতাসে। হটাত কইরা সাহেব কইল কি, এই জাফর মিয়া, থাম। তুই সবাইকে নিয়ে বাইরে যা। এর পর সাহেব আমিনা মামীরে কইল, আমিনা, জুলেখাকে আমার খুব পসন্দ। তুমি এর জন্য আরও পাঁচশ' টাকা পাবে। তাগো অনেক টেকা রে সই। হুন, পারলে তুইও নে। আমি একলা টেকা খাইয়া কী করুম? হেরা ত কইসেই আরও বাচ্চা পয়দা করতে। 
 
আমি পুরুষ মাইনষেরে বিশ্বাস করি না। হেরা জানোয়ারের থিকাও অধম।
 
জুলেখা থমকায়। উকুন সমৃদ্ধ মাথায় খুবই ধারালো মন্তব্য উপস্থিত। আমরাও তো তাগো সাথেই কাম করতাসি। ক', করতাসি না? আমরাই কি ভালা?
 
জুলেখা চকচকে চোখে সখিনার দিকে তাকাইয়া থাকে। সখিনার চোখে রাজ্যের বিস্ময় খেলা করে। সে বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছে না, জুলেখাকে সে কী উত্তর দিবে। সখিনার হাতের তালুতে শুধু জুলেখার পেটের ভিতরের মানব শিশুটির পায়ের আওয়াজ লাগিয়া রহিয়াছে। 
 
ল্যাম্পপোস্টের বগল ঘেঁষিয়া জুলেখা যে ঘরে বাস করে তাহা দেখিতে এস্কিমোদের ইগলুর মতো। তবে ইহা ছেঁড়া-টুটা প্লাস্টিক, ভাঙ্গা পাইপ, পুরনো বাঁশের বাতা দিয়া নির্মিত। এখানে বৃক্ষ নাই। ল্যাম্পপোস্টের গতর বাহিয়া যে সকল বিদ্যুৎ এবং টিভি দেখিবার তারের জঞ্জাল ঝুলিয়া রহিয়াছে, তাহাই গনগনে সূর্যের তলে এই ইগলু আকৃতির গৃহটির উপর ছায়া বিন্যাস করে। এই গৃহের ভিতরে, সোফা সেট বা বক্স খাটের স্থলে স্যাঁতসেঁতে মাটিতে কুড়াইয়া আনা কাঠের টুকরার পর টুকরা একত্রিত করিয়া তাহার উপর মোটা শত তালিযুক্ত কাঁথা বিছানো। এই রাজকীয় ঘরটির ছাদ জুড়িয়াই জুলেখা এবং সখিনার প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় ছিন্ন মলিন কাপড়ের টুকরা ঝালরের মতো ঝুলিয়া ভিতরটাকে বর্ণিল করিয়া তুলিয়াছে। সেই সকল ঝালরের দিকে তাকাইয়া জুলেখা তাহার সন্তানের কথা ভাবিতেছে। 
 
কেমুন দেকতে? খুব ফর্সা হইব। সাহেব তো খুবই ফর্সা। কিন্তুক, আমি যে কালা। তাইলে কালা হইব? নাহ, ফর্সাই হইব। তাহার উদরে খেলা করা সন্তানের দেহের রঙ চিন্তা করিয়া বাদশাহর কথা মনে করে। 
 
তৎক্ষণাৎ লজ্জার লালিমা জুলেখার মুখমণ্ডল মাখিয়া দেয়। একটা মাসের আবেগমথিত জীবনটা রূপকথার মতো লাগে। জুলেখার মানসপটে বাদশার জন্য একটা মায়া। ও দৌড়াইয়া রান্নাঘর হইতে বাদশার জন্য পোলাওয়ের থালা লইয়া শোবার ঘরে যাইতেছে। মোটা গদির বিছানায় বাদশাহ খাইতেছে। জুলেখা তৃৃপ্ত লইয়া তাকাইয়া আছে। ওর চোখ পানিতে ভরিয়া ওঠে। তাহার মনে হয়, ইস, আমি পঙ্গু মানুষ। কিন্তুক সাহেব আমারে বিবির মতন খুব আদর দিসে। আমার বুকের জ্বালা জুড়াইয়া গেসে। হে ছাড়া কে আমারে ছুঁইত? 
 
ভাবনাটা সখিনাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়াইয়া ধরে। ঘুমাইয়া থাকা সখিনাকে আড়াল করিয়া রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন জুলেখা তাহার স্টম্ফীত উদরে হাত বুলায়। উত্তপ্ত কাতরতা হইতে ক্রমান্বয়ে তাহার মন সন্তানের দিকে ধাবিত হইতে থাকে। 
 
ইস! যুদি আমার টেকা থাকত, আমি আমার বাচ্চারে কাউরে দিতাম না। এই কথা ভাবিতেই বুকের ভিতর হইতে ভোঁশ করিয়া বাতাসের পিণ্ড বাহির হইল। 
 
এমন সময় তাহার মোবাইল বাজিয়া উঠিল। জুলেখার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করিতে বাদশার নিকট হইতে মোবাইল ফোনটা জুলেখার কাছে আমিনা দিয়া গিয়াছে। জুলেখার নিজের কেহ নাই যে ফোন করে। ফোনটা বাজিয়া উঠিতেই সাড়া দিল- কে, আমিনা মামী?
 
হ। ঘুমাইছস? 
 
তয় কতা কই কেমনে? তুমি না মামী আমারে সব সুময় এমনি যে ক্যান কও! 
 
তরে তো কইসি, আইজ ডাক্তারের কাসে যাওন লাগব। বাদশা সাহেব কইসে, আজই যাওন দরকার।
 
মুহূর্তে জুলেখার ভিতর একটা আর্তি জাগিয়া ওঠে। তাহার উদরের ভিতর খেলা করা বাচ্চাটারে কাউকে দিতে মন চায় না। মনের ভিতর একটা প্রকাণ্ড ভীতি আসিয়া তাহার বুকের ভিতর হাতুড়ির বাড়ি মারিতে থাকে। ডাক্তারের কাছে যাওয়ামাত্র তো ডাক্তার হেরা আমার বাচ্চাডারে পেট ফাইড়া বাহির কইরা নিবে। হে আর আমার পেডের বিতর লাফাইব? হেরা হগলেই মিইল্লা এরে কাইড়া নিব। জুলেখার মনের ভিতর এভাবে ঝড় বহিতে থাকে। জুলেখার মনে হয়, ইস যতক্ষণ পারে ততক্ষণ সে তাহার সন্তানকে তাহার পেটের ভিতর আগলাইয়া রাখিবে। এই দুনিয়ায় তাহার বাহির হইবার দরকার নাই। 
 
আমিনা মামী, আইজ না গেলে হয় না ? আমার শরীলডা ভালা ঠেকতেসে না।
 
আমিনা মামী আঁৎকে ওঠে। কস কী! যাইতেই হইব। জুলেখা হুন, আর শরীল যুদি ভালা না লাগে আরও যাইতে হইব। যুদি না যাইতে চাস ত, হুন জুলেকা হেরা মানুষ ভালা না। তারা বড় মানুষ। আমগোরে কাইটা নদীতে ভাসাই দিব।
 
মামী, আমি ত অবাগী। আমি ত এমনিতেই গাঙ্গে ভাসা।
 
এই জুলেখা, আমারে তুই কিন্তুক জামেলায় ফালাইস না। হেরা আরও অনেক মাইয়ার পেট বানাইসে। হেগো অনেক বাচ্চা লাগে। পত্তি মাসেই হেরা ডাক্তার দিয়া বাচ্চা বাইর করে। হেরা অইন্য রকম মানুষ। তুই আমার কতা হুন, জুলেখা বইন আমার, আমারে মারোনের বেবুস্তা করিস না। 
 
মুখ ফসকাইয়া একটানা এত গোপন কথা আমিনা মামীর মুখ দিয়া বাহির হইতেই সে প্রচণ্ড রাগিয়া ওঠে জুলেখার প্রতি। তুই যুদি আমার কতা না মানিস, ত তর শরীল হেরা কুত্তা দিয়া খাওয়াইব।
 
কুকুর দিয়া নিজের দেহের মাংস খাওয়াইবার হুমকি জুলেখার কানে প্রবেশ করিলেও তাহকে ভীত করে না। বরং প্রতি মাসেই অনেক বাচ্চা লাগে শুনিয়া নিজের সন্তানের জন্য দরদে জুলেখার অন্তর কাঁপিয়া ওঠে। কী করে এত সব বাচ্চা দিয়া? বাচ্চা নিতে এত টাকাই বা তাহারা দেয় ক্যান? একটা প্রবল অস্থিরতা তাহাকে পিষিতে থাকে। নিজের উদরে বেড়ে ওঠা সন্তানের জন্য মায়ায় তাহার চোখ দিয়া পানি পড়িতে শুরু করে। জুলেখার মনে হয়, সিংহের মতো গর্জন করিয়া সবার গলা ছিঁড়িয়া ফেলে। যন্ত্রণায় সে তাহার অচল পা দুইখানা বিছানায় ঘষিতে থাকে। 
 
আমিনা মামী, এত বাচ্চা দিয়া কী করে হেরা? হেরা পালে, না কি মাইরা ফালায়?
 
আমিনা মামী ক্ষিপ্ত হইয়া ওঠে। তর অত কতায় কাম কী? তুই টেকা নিস নাই? টেকা নিয়া তুই ত হেগো বাচ্চা বিক্রি দিসোস। এখন কস, বাচ্চা পেট থিকা বাইর রবি না। আরে, তুই পঙ্গু মানুষ। তুই বাচ্চা দিয়া কী করবি? হুন, কতা বাড়াইস না কইলাম কিন্তুক। আমি আইতাসি। সাহেবের লোক গাড়ি খাড়াইয়া রাকসে। 
 
জুলেখা হিংস্র দানবের মতো চিৎকার করিয়া ওঠে। না, আমি তমগো লগে যামু না। আমারে কুত্তা দিয়া খাওয়াইলেও না। তুমরা আমার পেডের বাচ্চারে মাইরা ফালাইবা। আমি বুজসি। আমি মা হইয়া তুমগোরে বাচ্চা দিমু না। তুমরা অরে মাইরা ফালাইবা। 
 
দানবের মতো চিৎকার জুলেখার মগজে এক অভিনব ছবির অবতারণা করে। জুলেখা শূন্যের ভিতর দিয়া দৌড়াইতেছে। অতঃপর বরফের স্তর। আরও পরে অচেনা মাটি। পাথুরে পাহাড়। সেই রকম এক অঞ্চলে পৌঁছাইয়া দেখিল চারিদিকে রোমশ দেহের মানুষ। জুলেখার নিজের শরীরও তাহাদের মতো। সবাই না খাইয়া নির্জীবপ্রায়। যে আহার আছে, তাহাই ভাগাভাগি করিয়া খাইতেছে। এমন সময় দলনেতা তাহাদের মাঝে দুর্বলপ্রায় শিশুদের একখানে জড় করিতে শুরু করিল এবং শিশুগুলিকে পাহাড়ের এক প্রান্তে হেঁচড়াইয়া লইতে লাগিল। সে চিৎকার করিয়া বুঝাইল, তাহাদের এইসব খাবার বাঁচাইতে হইবে। তাহার চিৎকারে বড়রা পাথরের মতো স্থির। শিশুরা কাঁদিতেছে। তাহাদের প্রবল কান্নায় জুলেখার অন্তর ছিন্নভিন্ন। জুলেখা অস্থির। তাহার চোখ দুটি উদীয়মান সূর্যের মতো লাল টকটকে। জুলেখা বিকট দানবের মতো চিৎকার দিয়া উঠিল। সে ছুটিয়া দলনেতার হাত হইতে শিশুদের কাড়িয়া উন্মত্ত ক্রোধে তাহাকে পাহাড় হইতে ধাক্কা মারিয়া ফেলিতে লাগিল। প্রকাণ্ড দেহের রোমশ লোকটিকে ধাক্কা দিতে দিতে পাহাড়ের কিনারে আনিয়া ফেলিয়াছে। দলনেতাকে শেষ বেমক্কা ধাক্কা দিবার সময় খেয়াল করিল, সখিনাও তাহার সঙ্গের লোকটিকে একইভাবে প্রবল ধাক্কা মারিয়াছে। 
 
জুলেখার মোবাইল বিছানায় চিৎপাত হইয়া একটানা বাজিয়া চলিয়াছে। সখিনা ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে ফোনটার দিকে তাকাইয়া। তাহার চোখ দিয়া আগুনের তরল শলাকা নির্গত হইতেছে। আর ঘর্মাক্ত জুলেখা কঠিন মুখ করিয়া তাহার ঠেলাগাড়িটা দেখিতেছে এবং একই শক্তিতে ভোঁশ ভোঁশ করিয়া নিঃশ্ব্বাস ছাড়িতেছে। জুলেখা আফ্রিকার ক্ষেপা বাইসনের মতো শিং বাগাইয়া মাটিতে পা দিয়া প্রচণ্ড জোরে মুহুর্মুহু ঘর্ষণ করিতেছে।
 
সূত্র: সমকাল
এমএ/ ১০:১১/ ২২ জুলাই

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে