Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (15 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৭-১৯-২০১৮

প্রিয় হুমায়ূন

হাসান আজিজুল হক


প্রিয় হুমায়ূন

চিরকালই আমি মফস্বলবাসী। কাজেই খবর আমার কাছে আসে একটু দেরিতে। হুমায়ূন আহমেদের প্রথম বই 'নন্দিত নরকে' সম্পর্কে প্রথম আমি জানি এমন একজনের কাছ থেকে, যিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক, সাহিত্যের ইতিহাসের পণ্ডিত, তাঁর সাহিত্য বোধও উচ্চস্তরের। তিনি- ড. আহমদ শরীফ। বইটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন তিনি। তাঁর আলোচনা থেকে জানতে পারি, বাংলাদেশে প্রায় একটা নতুন ধরনের সাহিত্যের উদ্ভব ঘটছে। স্বাভাবিকভাবেই এই সাহিত্যিকের প্রতি আমার খুব আগ্রহ তৈরি হয়। বইটি সংগ্রহ করার চেষ্টা করলাম এবং পেয়েও গেলাম। পড়ে দেখলাম, প্রশংসাযোগ্যই বটে।

খুব ধনী একটা সাহিত্য অঞ্চল আমাদের। বিশ্বমানের রচনায় পরিপূর্ণ বাংলা সাহিত্য। যদিও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসটা খুব বেশি পুরনো নয়। তবু এরই মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ বা শরৎচন্দ্র; পরবর্তীকালে- সতীনাথ ভাদুড়ী, মানিক, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্করের মতো সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটেছে। এ সাহিত্য দীন নয়। আমরা পঞ্চকবি পেয়েছি। সব মিলিয়ে গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে বাংলা সাহিত্য একেবারে পূর্ণ-ফসলভারে নুয়ে পড়ছিল। বিশাল বিশাল ধান্য শীষে ধানগাছ যেমন নুয়ে পড়ে, তেমনি বাংলা সাহিত্যও নুয়ে পড়ছিল। সে সময় বাংলা সাহিত্যে যেসব রচনা সৃষ্টি হয়েছে, সে সময়কে সুবর্ণ যুগই বলা চলে।

আমাদের দেশটা ভাগ হয় এর কাছাকাছি সময়ে; ১৯৪৭ সালে। তখন আমাদের মধ্যে নানা ধরনের দুর্বলতা জন্মায়, এক ধরনের হীনমন্যতারও সৃষ্টি হয়। কেন হয়েছিল এসব, তা আমি বলতে পারি না। দেশভাগের পর সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লেখা এখান থেকে বের হয়েছে। অন্য লেখক যারা এসেছেন, পরবর্তীকালে তারাও বা কম কিসে? শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদের মতো কবিদের আবির্ভাবও তো কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

এমন সব মানুষের সৃষ্ট সাহিত্যসম্ভারের পর যখন হুমায়ূন আহমেদের 'নন্দিত নরকে'র প্রশংসা শুনলাম, তখন আমি এই বইটিও পড়লাম। পড়ে আমার মনে হলো, খুব সাহসী এবং সেই সঙ্গে খুব পরিস্কার অথচ সংক্ষিপ্তভাবে লেখার ক্ষমতা এই লেখকের আছে। নন্দিত নরকের মতো ছোট্ট উপন্যাসটি পাঠে আরও মনে হলো, বিন্দুতে কী করে সিন্ধু ধারণ করা গেল! আমার খুব বিস্ময় লেগেছিল।

স্পষ্ট মনে আছে, ওই সময়টাতে আমি ঢাকায় গিয়েছিলাম। তখন আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জন, যার কথায় আমি একমত হতে না পারলেও জানি- তিনি অত্যন্ত তীক্ষষ্ট সাহিত্যবোধ রাখেন, তিনি আহমদ ছফা; আহমদ ছফাই বোধ হয় একটু প্রভাব খাটিয়ে খান ব্রাদার্স থেকে বইটি প্রকাশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। আমার তৃতীয় বই 'জীবন ঘষে আগুন' খান ব্রাদ্রার্স থেকে প্রকাশিত হয়। আজ আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি আহমদ ছফাকে। তিনি আমাকে খুব ভালোবেসেছিলেন, আমিও তাকে অসম্ভব রকমের ভালোবাসতাম। তাঁর সমস্ত কাজ আমি সমর্থন করি বা না করি, তাঁর চিন্তা আমি সমর্থন করি বা না করি, তাঁকে পছন্দ করতাম। তিনি আমার 'জীবন ঘষে আগুন' বইয়ের পাণ্ডুলিপি নিয়ে আমাকে সঙ্গে করে বাংলাবাজারে খান ব্রাদার্সে নিয়ে যান। তিনি মজার মজার কথা বলে আমার পাণ্ডুলিপিটা তাদের গ্রহণ করতে বলেন। এবং সেখান থেকে আমার তৃতীয় বইটি প্রকাশিত হয়। এর কয়েক দিন আগেই প্রকাশিত হয় 'নন্দিত নরকে'। সেখানেও এই বইটি নিয়ে আলোচনা হয়। বইটি তখনকার যুবসমাজকে আকৃষ্ট করে। এবং ধীরে ধীরে আমাদের তরুণ পাঠক সমাজের আইডল হিসেবে দাঁড়িয়ে যান হুমায়ূন আহমেদ।

তখন পর্যন্ত আমার সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের পরিচয় হয়নি। এর কিছুকাল পরে আমাদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী লেখিকা সংঘের আমন্ত্রণে হুমায়ূন আহমেদ ও সেলিনা হোসেন রাজশাহী এসেছিলেন। সেখানেই তাঁর সঙ্গে আমার মুখোমুখি কথা, দেখা ও আলাপ হয়েছিল। হুমায়ূন আহমেদ স্বাভাবিকভাবেই খুব চমৎকার ও বিনীত ব্যবহার করতেন। সেখানে তাঁকে আমার ভালো লেগেছিল।

প্রথম উপন্যাসের পর হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে, লেখক হিসেবেই যে অর্থ উপাজর্ন করতে শুরু করলেন; বাংলা সাহিত্যে এটা ব্যতিক্রমই বলা যায়। কেউই এভাবে পারেন নাই। শরৎচন্দ্র জনপ্রিয় লেখক ছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর আর্থিক অবস্থা বলার মতো ছিল না। হুমায়ূন আহমেদকে তখন উপেক্ষা করা তো দূরের কথা, তার রচনা অবশ্যপাঠ্যই হয়ে যায়; বিশেষ করে তরুণ পাঠকদের কাছে তাঁর লেখা খুব গৃহীত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ছিলেন হুমায়ূন। লেখালিখিতে পূর্ণ মনোনিবেশ করার জন্য চাকরি ছেড়ে দিলেন। তারপর নানান দিকে ছড়িয়ে গেলেন তিনি। নিজের রচনায় ধারাবাহিক নাটক তৈরি করলেন টেলিভিশনের জন্য। তাঁর নাটকগুলো অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।

আমার সঙ্গে হুমায়ূনের তখন খুব অল্পই দেখা হতো। রাজশাহীতে প্রথম দেখার পর নেত্রকোনায় আমরা একসঙ্গে আমন্ত্রিত হই। সেখানেও তাঁর সঙ্গে অনেক কথা হয়েছিল। এটা স্বীকার করতেই হবে- হুমায়ূন অত্যন্ত ভদ্র ও বিনীত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। সেটা আমার সঙ্গে কথা বলার সময় বা সর্বসাধারণের সামনে কথা বলার সময়, এমনটা আমার মনে হয়েছে। তারপর থেকে যেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে বা কথা হয়েছে, সেখানেই তিনি আমাকে প্রায়োরিটি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

দেশের বাইরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও তাঁর সঙ্গে কয়েকবার দেখা হয়েছে। বিমানে করেও আমরা একবার একসঙ্গে ফিরেছিলাম; মনে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে একবার আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি। যার দরুন হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। সেখানে আমার হার্টের আর্টারিতে একটা রিং পরিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাক্রমে হুমায়ূন আহমেদও সে সময় নিউইয়র্কে অবস্থান করছিলেন। খুবই ভালো লেগেছে আমার যে, হুমায়ূন আহমেদ নিয়মিত টেলিফোন করে আমার খোঁজ-খবর নিয়েছেন। আমাকে দেখতে হাসপাতালেও গিয়েছিলেন। তিনি সত্যিকারের হৃদয়বান ও মানবিক মানুষ ছিলেন।

হুমায়ূন আহমেদের লেখা আমি খুব বেশি পড়েছি- এটা দাবি করতে পারি না। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর কী হয়েছে জানি না; ছোট ছোট করে, মিষ্টি ভাষায়, খুব কৌতুক আবহে লিখতে শুরু করলেন। এক কথায়, তখন থেকে আমি হুমায়ূনের লেখা আর পড়ি না। একেবারে পড়ি নাই- এ কথা বলব না। চোখ বুলিয়েছি কিছু কিছু লেখায়। ভাবলে অবাক হই; হুমায়ূন আহমেদ সিরিয়াস লেখা লিখতে পারতেন, যেমন 'জোছনা ও জননীর গল্প', 'মাতাল হাওয়া'র মতো লেখা হুমায়ূন লিখেছেন। ইচ্ছে করলেই দীর্ঘ লেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল। কেন যে দীর্ঘ, সিরিয়াস লেখা তিনি কম লিখেছেন, জানি না। এ ধরনের লেখকের হাতে ছোট গল্প খুব ভালো আসে। হুমায়ূন ছোট গল্পও লিখেছেন প্রচুর। চিরকালের মতো দাগ কেটে যাওয়ার মতো গল্প তিনি লিখেছেন।

আস্তে আস্তে সাহিত্য থেকে তিনি নানান মিডিয়ায় নিজেকে ছড়িয়ে দিলেন। নাটক বানাচ্ছেন, সিনেমা বানাচ্ছেন; নিজে ছবিও আঁকছেন। বলা যায়, অজস্র ধারা প্রবাহিত করে দিলেন তিনি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও তিনি লিখেছেন অনেক। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন করেছেন। শুধু আন্দোলন করেন নাই, তা অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে করেছেন। এসবই ইতিহাসের কথা; আমার কথা নয় মোটেই।

প্রায় অনিরাময়যোগ্য একটা রোগে ভুগে অকালেই চলে গেলেন হুমায়ূন আহমেদ। এভাবে অকালে চলে যাওয়ায় বাংলা সাহিত্যের ক্ষতি হয়েছে, আমি বলব। আজ তাঁর মৃত্যু দিবস। গভীর ভালোবাসায় তাঁকে স্মরণ করি। বাঙালি পাঠকের প্রিয় হয়েই তিনি থাকবেন, আমি জানি।

সূত্র: সমকাল

আর/০৭:১৪/১৯ জুলাই

শ্রদ্ধাঞ্জলি

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে