Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (35 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৭-০৯-২০১৮

ইলিশগন্ধে সন্ধ্যা  

মোহাম্মদ আযাদ


ইলিশগন্ধে সন্ধ্যা
 

মেয়েটিকে দেখেই মেজাজ বিগড়ে গেল। দুপাশের বাড়িগুলো কেমন যেন স্বপ্নভঙ্গের আশ্চর্য গোলকধাঁধা, প্রাণ থাকলেও প্রাণস্পর্শী নয়, সময়কে সময়ের মানদণ্ড দিয়ে না বোঝার অন্ধ স্বার্থপরতা। তবু দাঁড়িয়ে থাকে মেয়েটি। একটি মেয়ে যেন প্রতিদিনের বিষফোঁড়া, কোত্থেকে এসে আবার মিলিয়ে যায়। গতিবিধি সুস্পষ্ট, মাঝবয়সী একজন লোকের সঙ্গে চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলছে। লোকটি খ্যাকখ্যাক করে হাসে, মাথা চুলকায়, লাইটপোস্টে হেলান দিয়ে অতি আপনজনকে কাছে পাওয়ার মতো বায়না করে বলে, হাত খালি একশ টেকা দিবা?

কী করবি?

ভাজা ইলিশ দিয়া ভাত খামু, মন টানতাছে।

পরে দিমুনি।

পরে তো হোটেল বন্ধ অয়া যাইব।

লোকটি ঢলঢলে প্যান্টের পকেট হাতড়ে একশ টাকা বের করে।

গা জ্বলে যায় নিলয়ের। দ্রুত কাছে গিয়ে এক ঝটকায় টাকাটা নিয়ে বলে, এক চড়ে মুখ ভোঁতা করে দেব হারামজাদি। লোকটা দ্রুত কেটে পড়ে। নিলয় গলা চড়িয়ে ফের বলে, যা ভাগ। মেয়েটি ক্ষণিক হতভম্ব, তীক্ষন চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বলে, আমার টেকাটা?

কুত্তারে দিমু, যা এখান থেকে।

মেয়েটির বিস্ময় কাটে না, ভ্রু কুঁচকে, পেছনে পা ফেলে ফেলে পাশের গলিতে মিশে গেল।

এরপর থেকে মেয়েটিকে আর দেখতে পায় না। একশ টাকা ফেরত না দেওয়ার অপরাধবোধ থেকে মাঝেমধ্যে তাকায় – নেই। কিছুদিন পর টাকাটা ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়। চলে যায় অনেকদিন, অনেক বছর। বয়স বাড়ছে, মানুষের ক্ষয়-লয় কিংবা বহুমাত্রিক টানাপড়েনের চিত্রগুলো নিয়ে কারোর যেমন মাথাব্যথা নেই, তেমনি ওরও থাকার কথা নয়। নিলয় এখন ডাকসাইটে ব্যবসায়ী। কখনো গাড়ি ড্রাইভ করতে গিয়ে নির্জনে থেমে দাঁড়িয়ে থাকে। মনের ভেতর রেখাপাত করে বুদ্ধিবৃত্তিক তর্ক। কিছুই মিলতে পারে না, স্ত্রীর সঙ্গে বারবার শেয়ার করে, একই কথা শুনে, বাদ দাও তো, কবে কী ঘটেছিল –

আজ আবিরের বাসায় পার্টি। লিখনও বউ নিয়ে আসবে।

রাতের চারটি ঘণ্টা বেশ হই-হুল্লোড় করে কাটে। টেবিলে সব আনকমন খাবার, সঙ্গে স্কচ; পালা করে শুরু হয় অভিজ্ঞতার কথা। ব্যবসাবৃত্তিক আলোচনার বাইরেও রোমান্টিক হাসি। স্কচ পান করতে করতে কেউবা টাল, কেউবা হেল্পলেস, জগৎসুদ্ধ পৃথিবীর হিসাব যেন মিলতে পারে না, ভেউ ভেউ করতে থাকে। নিলয় স্ত্রীকে বলেছিল যাওয়ার কথা, ও রাজি হয়নি। অগত্যা নিজেই পা ফেলে, তবে গাড়ি না নিয়ে, বয়স বাড়লেও বাচ্চাসুলভ চঞ্চলতায় এখনো নিজেকে মনে হয় ছেলেমানুষের মতো। আবার কখনো নিঃসঙ্গতা চড়া রোদের বাউলকণ্ঠের মতো ওকে ঘুম থেকে জাগায়, চুপি চুপি, অর্থবিত্তের নৈতিক কিংবা অনৈতিকতায় এই নিঃসঙ্গ মনন যেন নিজেরই উপলব্ধি, কাউকে দেওয়া যায় না।

রাস্তার মোড়ে আসতেই অকস্মাৎ চমকে যায় নিলয়। কোনাকুনি পানের দোকানটার পাশে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেয়েটি। দেহের স্বাস্থ্য কমে কঙ্কালের মতো শীর্ণ হাত-পা। কম-দামি একটা কাপড় প্যাঁচানো, চোখদুটি কোটরে বসা, নোংরা অবয়ব, তাকাতে ভয় করছে, তবু তাকায় নিলয়। মেয়েটি হাত নেড়ে ইশারায় ঘনঘন কিছু বলছে, হাতের সঙ্গে দৃষ্টির দুটি গাঢ় অন্ধকার পিণ্ড ওঠানামা করছে যেন, নিলয় বলল, কোথায় ছিলি এতদিন?

নড়াচড়া থেমে যায়। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিলয়কে দেখে। ভয় করে একটু, মানুষ কদর্য হলে চোখের সামনে আপাত ভয়ের চমক নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে।

কি রে, কিছু বলবি?

হাতের নড়াচড়া ফের বেড়ে গেল।মনের আকুতি প্রশ্রয় পেল এবার অন্যরকম, অর্থাৎ হুন মিঞা, হুন না –

কী বলছিস?

নড়াচড়া থামিয়ে কুঞ্চিত মুখে খ্যাকখ্যাক করে হাসি দেয়। প্রতিটি শব্দ যেন বুকে আছড়ে পড়ে নিলয়ের। দ্রুত সামনের দিকে হাঁটা দেয়। কিছু মুহূর্তের দুর্ভেদ্য আঁচড় বুকে স্থায়ী দাগ কাটার আগেই নিশ্বাসে নিশ্বাসে আনন্দ খুঁজতে থাকে। তবু থেকে থেকে মনে হচ্ছে, এতদিন পর এরকম পাগলিবেশে কোত্থেকে এলো মেয়েটি?

বাঁয়ে ডিএন চক্রবর্তী রোড, আলোছায়া গলি, পুরো আবাসিক এলাকা। ডা. নিশিবাবুর পুরনো স্যাঁতসেঁতে বাড়ির পাশ দিয়ে বাঁক নিয়ে গলিটি চলে গেছে আমপট্টির দিকে। কোনো বাতাস নেই, কেমন একটা ভ্যাপসা গরম অনুভূতি। ঘরে ঘরে সংসারজীবনের ক্রমব্যস্ত নিশ্বাসের সঙ্গে একটু-বা গুঞ্জন।

দরজা খুলে বাঁয়ের বারান্দায় বেতের চেয়ারে এসে বসে জনৈক গৃহিণী, একটু যেন হাঁপাচ্ছে। ভেতর থেকে ভাজা ইলিশের গন্ধ নাকে এলো। দরজার পর্দা নড়ে উঠতেই একঝলক আলোয় মহিলার নির্বিকার মুখে ইলিশ-গন্ধের প্রোটিন যেন টলমল করছে। বিপরীতে বারান্দার পাশে থমকে দাঁড়িয়ে সান্ধ্য-নীরবতায় ভাবছিল মেয়েটির কথা। কোত্থেকে এলো এতদিন পর? এমনই-বা হাড়ভাঙা করুণ রূপ কেন? নিলয় ধ্যানমগ্ন স্বপ্নের সিঁড়িপথ ভাঙতে থাকে, কেবলই নিঃসাড় পটভূমি, ধরিত্রীর আলোকপিণ্ড হতে সব বৈচিত্র্য যেন একে একে খসে যাচ্ছে –

– কাউকে চাচ্ছেন?

– জি!

– কাকে চান, অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন।

– কাউকে না।

– তো?

– আপনার ইলিশভাজার গন্ধে ভয় পাচ্ছি খুব।

– কী!

– হ্যাঁ, ইলিশের গন্ধে একটি মেয়ের কথা মনে পড়ছে। গা শিউরে উঠছে। মহিলা কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে ভেতরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। ফের হাঁটা দেয় নিলয়। নিজেকে মনে হচ্ছে উদ্দেশ্যহীন ভ্রমণবিলাসী, কোন পথে হাঁটলে হবে পথভাঙার শেষ খেলা? নদী, সি-বিচ, পাহাড়, নাকি আবিরের বাসার পার্টি? সংসারের খুঁটিনাটিও চকিতে মনকে ভারাক্রান্ত করে, তবু কোথায় যেন অর্থনৈতিক জীবনের যুগল হাত, চিন্তার জগতে আত্মবিশ্বাস জেগে উঠলেও নিজেকে মনে হয় আমূল পরবাসী। কেউ যদি এখন প্রশ্ন করে, এভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন? উত্তর নেই, উত্তর হয় না অনেক কিছুর। তবে নিজের অনুভূতি কুণ্ডলিত ধূম্রের মতো একটি জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে, সেটি হলো নিম্নির সংসার। মোবাইলে কল করে নিলয়। ওপাশ থেকে এক নিশ্বাসে বলে, হ্যাঁ তুমি কোথায়, কী করছ?

– দাঁড়িয়ে আছি।

– কোথায়?

– একটি গলিতে।

– গলিতে মানে, বউকে নিয়ে তো পার্টিতে যাওয়ার কথা।

– ভাবছি যাব না।

– কেন?

– ইচ্ছা করছে না, বউও যাবে না, তুমি কি ফ্রি আছো?

– কেন?


– চলে এসো, বিপিনে বসি, একটু বন্ধনহীন কোমলতা খুঁজি, আমার কেন যেন নিশ্বাস গড়াচ্ছে ঘনঘন।

– তুমি নিশ্চয়ই কোনো কারণে ডিপ্রেসড, বউ না যাক, তুমি পার্টিতে যাও, মন হালকা করে এসো। রাখছি।

কেটে দেয়। একটু পেছনে সরে আসে নিলয়। সত্যিই কেমন যে ডিপ্রেসড হওয়ার মতো বন্ধনহীন এলোমেলো জীবন। আবিরের বাসায় আজ পার্টি। কোনোরকম আদর্শিক প্রশ্নে না গিয়ে বরং বলা যায়, বহুদর্শী জীবনের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে খেলা করে সতেজ মন। জীবনকে যুগ-যুগান্তের বাঁকে আছড়ে ফেলে পার্টির ক্ষণিক আনন্দের রেশ দূরগামী ট্রেনের বিকট হুইসেল যদি দিয়ে বসে – মন্দ কী!

দূরাগত ট্রেনের একটি বগিতে না-হয় উঠেই পড়ল নিলয়। দুপাশের মানুষ আর ঘরবসতির সঙ্গে চলন্ত ট্রেনের বাতাস, আহা প্রাণতরঙ্গে কী অদ্ভুত উচ্ছ্বাস! মনে পড়ে, ভ্রমণবিলাসী মন একদিন বাধা পড়েছিল পদ্মার পাড়ে। নদীর জলজ হাওয়ার সঙ্গে প্রকৃতির বিমূঢ়তায় ওপারটাকে মনে হচ্ছিল আঁকাবাঁকা সবুজ কংক্রিট, স্তব্ধতা মন্থন করে হয়তো উঠে আসছিল অপার রহস্যময়তা।

এরই মধ্যে আবিরের মোবাইল এলো।

– কোথায় তুই, সবাই অপেক্ষা করছে।

– আসছি।

– ভাবিও আসছে?

– না। নিম্নি।

আবির খিকখিক করে হেসে বলে, চালে আও মেরা ডিয়ার।

নিলয় বরাবরই পার্টিতে যায়। মন খুলে আনন্দ করে। কিন্তু আজ ও চরকির মতো ঘুরছে এ কোন অতৃপ্তি নিয়ে। উজবুকের মতো সান্ধ্য-নীরবতায় আবৃত্তি করছে নিজের আমূলবোধ। সেখানেও ছন্দপতন। তার চেয়ে সেই অতীত সেই সংগ্রামী জীবনের একটু করে ভ্রমণের কথাই ভাবা যেতে পারে। পদ্মার পাড়ে তখন বিস্তর জ্যাম। সবার জোড়া জোড়া চোখ ফেরির দিকে। ফেরি কি আসবে, নাকি চরে আটকে গেল, বিতৃষ্ণার কোনো যুক্তি থাকে না। মনের বিপরীতে কেবলই মনের হিসাব, এরপর? সবই হচ্ছে আবার কিছুই হয় না।

ঘুপচি ঘরের কড়াইয়ে পদ্মার তাজা টুকরো টুকরো ইলিশের তেলেভাজা ছনছন শব্দের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েছিল ভ্রমণবিলাসী একজন বয়স্ক লোক। দোকানি ভাজা কাঠি নিয়ে উলটেপালটে ঝলসে নিচ্ছিল কড়াইসুদ্ধ ইলিশের টুকরো। ফেরিঘাটে অপেক্ষমাণ সারিসারি বাস-ট্রাকের সঙ্গে চলমান অস্থির গুঞ্জন। তবু লোকটি ছিল নির্বিকার। গন্ধের রেশে এমনই বিভোর ছিল যে, পিঠের ব্যাগটি বারবার একপাশে গিয়ে নেমে পড়ছিল। সঙ্গের মহিলা একটু ঠেলা দিয়ে বলল, এই ফেরি এসেছে, গাড়িতে ওঠো। ঘোর কাটল। হাতের মিনারেল বোতলটি খুলে এক নিশ্বাসে গলগল করে সব পানি খেয়ে ফেলল। এরপর আর কিছু মনে পড়ে না নিলয়ের। কেবল সময়ের কাছে সময়ের সূত্র ধরে জীবনের যে-বোঝাপড়া, তার খণ্ড খণ্ড স্মৃতি, সেইসঙ্গে ভরদুপুরের নিমগ্নতায় পদ্মার খোলা হাওয়ার সঙ্গে ঢেউ থেকে ঢেউয়ের বিস্মৃতি, এসব উপলব্ধির সঙ্গে আজকে জীবন কোথায় যেন এলোমেলোভাবে মিলে যাচ্ছে। মোবাইল বাজছে। মনিটরে নিম্নির নাম।

– বলো।

– কী করছ?

– সেই যে দাঁড়িয়ে আছি।

– এখনো! পার্টিতে যাওনি।

– না, বলেছি তোমাকে নিয়ে আসছি।

– সত্যি বলেছ?

– হ্যাঁ।

– কেন বলেছ?

– তা তো জানি না।

– বিপিনের গেটে অপেক্ষা করো, আমি আসছি।

কেটে দেয় নিম্নি। নিলয় আমূল গলিপথ সামনে নিয়ে তাকাল। আধো আলো আধো ছায়ায় এখন নিঃসঙ্গতা বলে যেন কিছু নেই। পুরোটাই ধুমধাড়াক্কা। একপলকে মনে হলো বাসার কথা। স্ত্রী হয়তো কান পেতে আছে, কখন প্রাণের পতিধন কল দিয়ে বলে, জানো, খুব একা ফিল করছি। নিলয় পার্টিতে গেলে স্ত্রী কখনো নিজে থেকে মোবাইল করে না।

এই ভার্চুয়াল জগতে সংসারটা ক্রমশ হয়ে উঠছে পরগাছা। গার্লফ্রেন্ডরা যদি বলে বিয়ে করেছ, ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে উত্তর দিতে ইচ্ছা করে, জানো, আমি নিঃসঙ্গ বন্ধনমুক্ত। আহা সত্য গোপনের কী অদ্ভুত লীলা, বাতাসেই রমণ কিংবা রতিক্রিয়ার নিছক মায়াময় গন্ধ!

দু-পা পেছনে সরে আসে নিলয়। চমকে তাকায়।

সেই মেয়েটি কানের ঠিক সামনে কঙ্কালের মতো খটখটে মুখটা নিয়ে তাকিয়ে আছে। নিলয় ভ্যাবলার মতো ধমকে ওঠে, সর!

মেয়েটি এক-পা কাছে আসতে চায়। নিলয় ফের গলা চড়িয়ে বলে, এ্যাই এ্যাই যা বলছি!

যেন কিছুই শুনতে পায়নি, এমনভাবে মুখটা ম্লান করে সোজা চলে গেল মেয়েটি।

সামনে আমপট্টির দিকে বাঁক নিয়েছে রাস্তাটি। নিজের ভেতরটা এখনো থরথর, কেমন যেন চাকভাঙা মৌমাছির গুঞ্জরন, এলোমেলো ভীতিপ্রদ সময়ের সকরুণ খেলা। কোত্থেকেই-বা মেয়েটি এতদিন পর এসে ওর নির্মল আনন্দকে সুতোর মতো টেনে ধরছে। একশ টাকা কেড়ে নেওয়ার ফালতু নীতিবোধ যদি স্নায়বিক সমস্যার কাছে ক্ষণে ক্ষণে চমকই দেবে, তবে কোটি কোটি টাকা লুণ্ঠনের দায় কার হতে পারে? ভাবতে চায় না নিলয়। নিজের জগতে বিনম্র উদাসীনতায় যতটুকু পা ফেলা যায় মন্দ কী।

নিম্নিকে নিয়ে আবিরের বাসায় গেল রাত নটার দিকে। ওরা কী এক কথায় সবাই হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। নিলয়ের পাশে নিম্নিকে দেখে লিখনের বউ সবার উদ্দেশে চোখ মটকে দেয়। আবিরের বউ বলল, এতো দেরি তোমাদের, ওদের তো এক রাউন্ড শেষ। তুমি কেমন আছ নিম্নি?

– ভালো।

– এসো, বসে যাও।

কায়সার একা এসেছে। ও বরাবরই একা আসে। বিজনেস মডারেটর।

নিম্নিকে দেখেই বলল, হাই নিম্নি, ডান্স চলবে নাকি?

– অবশ্যই, আগে দু-পেগ খেতে দেবে তো–

– শিউর শিউর!

টেবিলে অনেকরকম খাবার সাজানো। মাটন কাবাব, চেরি ফল, নান, সবজি, চিংড়ির মালাই, পনির। নিলয় বলল, ভাবি ইলিশভাজা নেই?

আবিরের বউ বলল, ফ্রিজে আছে, ভেজে দেবো?

– দিন।

লিখন খুনসুটি করে, আরে বাহ্, এ দেখছি মস্ত ইলিশপ্রেমিক।

নিম্নি অবাক হয়ে তাকাল। মদের শেষ অংশটুকু একটু একটু করে খেয়ে বলল, কী দরকার ছিল এখন?

আবির বলল, থাক না, ওর যখন ইচ্ছা করছে।

একটু পরই গরম তেলে ছ্যাঁতছ্যাঁত শব্দ হলো। গোটা ঘরে ছড়িয়ে পড়ল ইলিশ-গন্ধের আমেজ। কায়সার আর নিম্নি মিউজিকের তালে নেচে যাচ্ছে। একটু শান্তভাবে, নিজেকে উদারহস্তে বিকিয়ে দেওয়ার মতো মৃদু সঞ্চরণশীল ঢং, যেন একই বৃত্তে আবর্তিত ঘূর্ণিবায়ু জলের মোহনাকে ঠেলে দিচ্ছে পাড়ে। আবির বলল, আরেক পেগ খাবি নাকি?

– খাব।

– এই তো ইলিশভাজা এসেছে, খেয়ে নে ইচ্ছামতো।

– পরে, আগে ভাবির সঙ্গে নাচব।

– বিলকুল।

আবির বউকে ইশারায় নাচতে বলে, শুরু হলো নাচের পিঠে নাচের লীলা। জাগতিক নেশায় সবই যেন স্পর্শকাতর, একজন আরেকজনের কাছে নিত্য অসহায়। অস্তিত্বের ক্রমপ্রসারে, আত্মার নির্যাস থেকে হিমশীতল কিংবা গরমকাতর অনুভূতির খেলা –

আবিরের বউয়ের হাত ধরে নরম পিঠে হাত চেপে ঘনঘন নিশ্বাস নিচ্ছে নিলয়। সেটা কি ইলিশের গন্ধে নাকি কামগন্ধের আদিম ক্রীতদাস হয়ে? সময়ের মোক্ষম হিসাব-নিকাশের রঙিন মুহূর্ত অতিক্রান্ত হচ্ছে সীমাহীন ঢেউয়ের মতো। ঢেউয়ের পরে ঢেউ, আরো ঢেউ। আবির নেশায় চূর হয়ে একের পর এক সিগারেট টেনে যাচ্ছে। ওর ধূম্রকুণ্ডলীর দিকে চেয়ে মনে হচ্ছে, সুদূরে লাল আলোকবাতির দৃশ্যপটে দেখা যাচ্ছে কোনো ইটখোলার চিমনি। পোড়ামাটির বুক থেকে লালচে কালো ধোঁয়া গলগল করে নির্গত হচ্ছে, এরপর আবাদি জমি থেকে জমির মাঝে কোনো পুকুরপাড়ের সতেজ দূর্বায় একটি ফিঙে পাখি কী অতৃপ্ত আত্মা নিয়ে লাফাচ্ছে।

আবিরের বউ বলল, সংযত করো, তুমি কিন্তু বেসামাল।

– আমি গরম ইলিশ খাব।

ফিসফিস করে বলে, আর কিছু খাবে না?

চোখ বড় করে তাকায় নিলয়। নিম্নি সোফায় গা ছেড়ে হাঁপাচ্ছে। চকিতে মনে পড়ে সেই ফেরিঘাট। সেই ভ্রমণবিলাসী জীবনের বাস্তব উন্মেষ। পদ্মার বুকে যেন লেগেছে সুনামির ধাক্কা। ছলছলিয়ে পানির উচ্চতায় ভিজে যাচ্ছে ওরা পার্টির সবাই। একটা জলজ অ্যাকুয়ারিয়ামের মতো রঙিন মাছ হয়ে ওরা ডানে-বাঁয়ে ছুটছে। বিপরীতে সেই কঙ্কালসার মেয়েটি অ্যাকুয়ারিয়ামের দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসছে।

ওয়াও! চিৎকার করে আবিরের বউয়ের বুকে মাথা ছেড়ে দেয় নিলয়। আবির নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। অন্যেরা মুচকি হাসে। আবিরের বউ নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, ননসেন্স!

পার্টি শেষ করে নিচে নেমে নিম্নি বলল, ক-টুকরা ইলিশ খেলে নিলয়?

সূত্র: কালিও কলাম
এমএ/ ০৪:১১/ ০৯ জুলাই

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে