Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (90 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৬-০৮-২০১৮

জন্ম ও মৃত্যুর দর্শন : ডোম

মাসুদ চয়ন


জন্ম ও মৃত্যুর দর্শন : ডোম

তরুণ কবি গিরীশ গৈরিকের ‘ডোম' কবিতাগ্রন্থ বহুবার পাঠ করেছি। পাঠ করে এমন গভীর বোধ অনুভব অনুধ্যান পেয়েছি যা অন্য কোনো সিরিজ কাবিতাগ্রন্থে কখনো খুঁজে পাইনি। কখনো অতীত স্মৃতিচারণায় ভারাক্রান্ত করে দিয়েছে, কখনো বা ভবিষ্যৎ কল্পনার প্রতিচ্ছবি এঁকে দিয়েছে। প্রত্যেক মানুষই জীবন্ত লাশের মতো বেঁচে আছেন ‘ডোম’ কবিতাগ্রন্থে সেই কথায় গভীর থেকে গভীরে গিয়ে অনুধাবন করে নিপুণ শৈলিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমন :

‘তাই মৃতদেহ সম্মুখে রেখে প্রশ্ন করি--আমি কে?’

কী গভীর বোধ তাই না? মুগ্ধ না হয়ে কি পারা যায়! আপনি একবার মৃতদেহ সামনে রেখে নিজেকে প্রশ্ন করে দেখবেন কী উত্তর মেলে? কোনো উত্তর খুঁজে পাবেন না। কেবল গভীর বোধের অতলে হারিয়ে যেতে থাকবেন। এক সময় নিজেকে ডোম হিসেবে আবিস্কার করবেন। হৃদয় ক্ষরণে দগ্ধ হবেন। সব স্বপ্ন অভিলাষ ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে শুরু করবে। কেবল আপনার ভেতরের মানবিক সত্তাটাই খুঁজে পাবেন। সে আপনাকে প্রশ্ন করবে আবারো, তুমি কতটা মানবিক? তুমি কি সত্যিই মানুষ হতে পেরেছো! তোমার বিবেক তোমাকে দংশন করবে, তোমার শরীর থর থর করে কাঁপবে। মস্তক বেয়ে অবিরাম ঘাম ঝরবে। শিরা উপশিরা দিয়ে প্রবাহিত রক্তে ওম ছড়িয়ে পরবে, আর তুমি চিৎকার করে বলবে, আমি কি মানুষ হতে পেরেছি? কোন এক গোত্রের অধীন্যস্থ কৃতদাস/দাসী হয়েছে মাত্র। কেবল তারই অনুসারী, তারই জিকির করি, আর তার অনুসারীদের জন্য নিজেকে নিবেদন করি। ভিন্ন গোত্রদের ধার-ধারিনা আমি। আমি কেবল নিজের পরিবার আর রক্তের সম্পর্কজাতদের জন্য নিজেকে সপে দিয়ে যাচ্ছি। এর বাহিরে আমারা কি করতে পারি। আমি মুসলিম হয়ে হিন্দুকে কটাক্ষ করি, হিন্দু হয়ে মুসলিমকে, খ্রিষ্টীয় হয়ে বৌদ্ধকে। আমি তাহলে কেমন মানুষ! আমার মনুষ্যত্ব কোথায়! কবির কবিতা থেকে :

‘সময় হারিয়ে গেছে-গভীর কোনো বীজের অন্ধকারে,

তুমি হারিয়েছ শিকড়ে কিংবা তীরবিদ্ধ আলোর জঠরে’

কি গভীরবোধ! এই বোধের আড়ালে লুকিয়ে আছে কতশত নির্মম বাস্তবিক সত্যসিদ্ধ চিত্রনাট্য!

আমরা কতোটা পারি সময়ের আলোর দিশারী হয়ে পথ চলতে? আমরা তো স্বেচ্ছায় সময়কে প্রবাহিত করি অন্ধকারের দিকে। তাই অজান্তেই একদিন জীবন আলোহীন হয়ে যায়, জীবনের জৌলুস হারিয়ে যায়, প্রিয়জন প্রেয়সীর কাছে উপেক্ষিত হতে হয়। এক সময় সত্যি সত্যি তারাও হারিয়ে যায়।

কোনো এক অন্ধকারের বীজে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখি। আর খুঁজি তোমারে সকল প্রিয় কিংবা প্রেয়সীরে তীরবিদ্ধ আলোর জঠরে দিশাহীন উন্মাদ নীরব পথিক হয়ে। কবিতায় :

‘অশ্রু চোখে যেদিকে তাকাই সেদিকে দেখি নদী,

নদীর কাছেই শ্মশানঘাট, তারপরে ডোমের বসতি,

আমি যাব শ্মশানঘাটে, জীবন তুমি আসো যদি।’

কবিতার এই চরণগুলি যতবার পড়ি ততবারই ভেতরে গভীরবোধ জাগ্রত হয়। চলে যাই অসীমের বহুদূরের সীমান্তে। কারণ এই ছোট্ট চরণের বিস্তৃত রেখা সেই অসীমের মতই। প্রতিটা পঙক্তি দিয়ে যেন রচনা করে ফেলি একেকটা সংকল্প কিংবা প্রবন্ধ। কেউ কি আর আসে সেই সময়ে? কেবল নদীর প্রবাহিত ধারার পানে চেয়ে থেকে অশ্রুসিক্ত হতে হয়। ভুলে যায় সবাই, এমন কি নিয়তিও। আমি অসহায় হয়ে কেবল চেয়ে থাকি। নিজের শূন্যতায় জ্বলে পুড়ে দগ্ধ হই। নদীর ছলাত ছলাত স্রোতের মতো হৃদয় অন্তরকোণে জোয়ার আসে। সেই জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে আমার শেষ সম্বলটুকু, আমি কেবল নিমগ্ন কল্পনার নয়নের প্রতিচ্ছবিতে দেখে যাই। আর বেদনার অশ্রুসিক্ত শীতল নদীর মতন নিথর হয়ে কেঁদে যাই। অতীতের সহুস্র স্বপ্নহারা দিনগুলির কথা ভেবে যাই :

‘মৃত্যু এক আশ্চর্য শীতলতা। সে এলে নীরব হয়ে যায় জীবনের সব রন্ধনশালা’

অথবা

‘প্রাণ-সে কি বাতাসের দেবতা-অনন্ত আকাশ? যে আকাশে পাখি হয়ে বিচরণ করে মানুষের মন।’

অথবা

‘আমি দাঁড়িয়ে থাকা ভালুকজ্বর-তুমি ডোম সৎকার।’

মরনের পরে কি করে উপলব্ধি থাকতে পারে! না থাকে ইচ্ছের চাওয়া পাওয়া, অবসাদের নিষ্ঠুর সময়ক্রম, স্মৃতি খুড়ে বিদগ্ধ হওয়ার আবহ, সব কিছুতেই নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া অস্তিত্ব, আর বেঁচে থাকাকালীন সময়ে চলে মৃত্যুর দিনলিপি গণনা, কবে আসছে সে ধেয়ে? বাতাসের স্পন্দন এই বুঝি থেমে যায়, প্রাণপাখি এই বুঝি যায় যায়। আকাশ কি জানে তাহা? মানুষ যে বলতে পারে না।

কবির গভীরবোধের সীমা কেবলই অদূর দিগন্তেই টেনে নিয়ে যায় অহর্নিশ। আমি এখন একজন ডোমের মতো ভাবছি। কি পেলাম এ জগতে! কত যে হতাশায় পেয়ে বসেছিল আমায়! ওরা পিছু ধেয়ে আসছে এখনো। জীবন্ত লাশকে কুড়ে কুড়ে ছিড়ে খাওয়ার জন্য সে আপ্রাণ ছুটে আসছে। সে হচ্ছে মৃত্যু। তাবৎ বেদনা আর হতাশার সম্মিলিত রূপ মৃত্যু। আর তাতেই নেমে আসবে সুনশান শীতলতা, এ দেহের মননের এ মানবিক অস্তিত্বের। আমি মানবিক হয়ে ভেবেছি বলে বুঝেছি—একজন কবি কোন কারণে ডোম হতে পারেন। তিনি ডোম না হয়ে কখনই পারতেন না, ডোমের ভিতরের অজানার বোধকে এমন নিবিড় নিমগ্ন অনুভবে বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে। না জানি তিনি কতো সহস্রবার নিজেকে ডোম রূপে আবিষ্কার করেছেন। আমার মন বলে তিনি মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত জীবন্ত লাশের অনুভূতি ডোম হয়ে হৃদয়ে গেথে নিয়েছেন। দেখা যাক কবিতার অনুভবে :

‘হায় মানুষের মন—ভেবে দেখেছো কি?

তোমার মৃত্যু হলে—মৃতদেহের কী পরিণতি হয়!’

একে একে তুমি কতজনের মৃত্যুর সাক্ষী হলে? কিন্তু জানতে চাইলে না একবারো সে এখন কেমন আছে? সে কতোটা পঁচে গেছে! সে কি আদৌ ভালো আছে! তুমিও একদিন সে হয়ে যাবে। তোমাকে কেউ কি মনে রাখবে? সেভাবে মনে রাখবে না। ধীরে ধীরে সকলের স্মৃতিতে তুমি বিস্মৃত হয়ে যাবে। তোমার ঝাঁপসা তৈলচিত্র ভেবে কেউ আর অশ্রুসিক্ত হবে না সময়ের সেই অদূরতম পরিক্রমায়। প্রিয় ডোমকবির গ্রন্থ পঠে আজ বুঝে গেছি—জীবনের মানে। জ্বলতে জ্বলতে জেনে গেলাম জীবনের মানে জীবন দমকা ঝড়। আর এই ঝড়ও থেমে যাবে শিগগিরই। আমি তুমি কিংবা আমরা সবাই মৃত লাশ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি মাত্র। যেমন :

‘গভীর অন্ধকারে মোমবাতি হাতে ঘোলা নদীর অস্পষ্ট জীবন নিয়ে বয়ে চলি—চোখের জলে’

অথবা

‘আমার এ মৃতদেহ আমিই আবার ডোম হয়ে কাটি’

প্রতিটা মানুষই জীবনের বেশির ভাগ সময়েই নিজেকে অগ্নি দহনে দাউ দাউ করে জ্বালায়। বেশিরভাগ জ্বালাতনের কোনো সাক্ষী থাকে না, নতুবা কেউ সাক্ষী হতে চায় না। সকলে মনে করে সে জ্বলছে তাতে আমার কি! অথচ নিজে যখন জ্বলে পাগলের মতো ঠিক তার কাছেই ছুটে যায়, খানিক সান্ত্বনা খানিক আলিঙ্গনে সিক্ত শীতল হতে চায়। জগতের অধিকাংশ মানুষই নীরবে জ্বলে পুড়ে দগ্ধ হচ্ছে অহর্নিশ। আমরা কখনো তার খোঁজ রাখিনি। কেবল নিজে জ্বলার সময় বুঝেছি এই জ্বলা কতোটা ক্ষত-বিক্ষত করে হৃদয়কে :

‘আপনারা কেউ কি আমাকে বলবেন?

কোনো মৃতশিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে তার মা মনে মনে কী কী ভাবে?’

জগতের মানুষগুলো তো সভ্যতা সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। জাতিগত, গোত্রগত, বিশ্বাসগতসহ আরো কতো বিচ্ছিন্নতা। এই বিচ্ছিন্নতার কারণেই মানুষ হয়ে মানুষের রক্ত দিয়ে হলি খেলেছে এবং খেলেও যাচ্ছে অহর্নিশ। মহাপ্রকৃতি, কেন তুমি মানুষকে এক জাতি এক গোত্রে এক বিশ্বাসে একত্রিত করলে না? কেন মানুষ হয়ে মানুষ রক্তের নদীতে মাংসল স্তুপে ভস্মীভূত করে দিচ্ছে একে অপরকে? অবুঝ শিশুও নিস্তার পাচ্ছে না যেই নির্মম পাশবিকতা থেকে। আবার কোনো যুদ্ধে ধেয়ে আসছে হয়তো। মানুষ হত্যা করবে মানুষকে। এর চেয়ে জঘন্য অমানবিকতা আর কি-ই-বা হতে পারে। যতদিন চলবে এই বিচ্ছিন্নতা ততোদিন চলবে এই নির্মম নিপীড়ন। মনুষ্যত্ব বাহক মানবের কাছে সভ্যতা ইহা কামনা করে না। সভ্যতা চায় সব মানবের একত্রিত মেলবন্ধন। এর নামই শান্তি। কেবল নিজেরে, নিজের জাত, নিজের গোত্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে শান্তি বলে না।

এমএ/ ০২:০০/ ০৮ জুন

বইপত্র

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে