Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (38 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৬-০৭-২০১৮

সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা বনাম নজরুল

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী


সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা বনাম নজরুল

সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের প্রধান দুর্বলতার আকর ছিল হিন্দু-মুসলিম বিরোধ। নজরুলের মতো পরিস্কারভাবে সেটা কম লোকেই বুঝেছেন এবং বলেছেন। বিশেষভাবে তিনি বলেছেন ব্রাহ্মণ্যবাদী ছুৎমার্গের বিষয়। নবযুগে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে তিনি একটি কাল্পনিক নয়, সত্য ঘটনার উল্লেখ করেছেন। রেলগাড়ির কামরায় কয়েকজন ব্রাহ্মণ ধর্মগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করছেন, এমন সময়ে সেখানে কয়েকজন মুসলমানের প্রবেশ; সঙ্গে সঙ্গে সন্ত্রস্ত হয়ে ধর্মপ্রাণ ভদ্রলোকেরা উঠে এক কোণে গিয়ে দাঁড়ালেন, পাছে স্পর্শ দোষ ঘটে যায়। নজরুলের বক্তব্য, হিন্দু হিন্দু থাকুক, মুসলমান মুসলমান থাকুক, কিন্তু তারা পরস্পরের অস্পৃশ্য হয়ে থাকলে তো সুবিধা হবে শাসক ব্রিটিশের। নবযুগের ওই প্রবন্ধটিতে নজরুল লিখছেন, 'যে স্থানে মুসলমান গিয়া পা দিবে সে স্থান গোবর দিয়া (!) পবিত্র করিতে হইবে।' লিখে, গোবর দেওয়ার পরে এতটি বিস্ময়বোধক চিহ্ন এমনভাবে বসিয়ে দিয়েছেন যার অপ্রত্যাশিত ঘটনাকে অত্যন্ত হাস্যকর বিষয়ে পরিণত করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু নজরুল যে তার বন্ধু আবুল মনসুর আহমদের 'আয়না'র ভূমিকাতে লিখেছেন যে এই বইয়ের হাসির পেছনে বেদনার অশ্রু আছে সেটা নজরুলের নিজের সকল ব্যঙ্গ রচনার সম্বন্ধেই সত্য। 

সাম্প্রদায়িক ব্যবধান যে প্যাক্টে দূর হওয়ার নয়, সেটা অন্যরা বোঝার আগেই নজরুলের বোঝা হয়ে গিয়েছিল। চিত্তরঞ্জনের প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধা, কিন্তু তার প্যাক্টের ওপরে নজরুল ভরসা করেননি। 'চন্দ্রবিন্দু' (১৯৩১) বইতে আছে :
আঁট সাঁট করে গাট-ছড়া বাঁধা

হ'ল টিকি আর দাড়িতে,

'বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো?' তা

হয় হোক তাড়াতাড়িতে, 

একজন যেতে চাহিবে সমুখে, 

অন্যে টানিবে পিছনে- 

ফসকা সে গাঁট হয়ে যাবে আঁট

সেই ভীষণ টানা টানিতে

 

আর যা ঘটবে তা হচ্ছে, 

বদনা গাড়ূতে পুন ঠোকাঠুকি 

বোল উঠিল হাঁ হন্ত! 

ঊর্ধ্বে থাকিয়া সিঙ্গী-মাতুল

হাসে চিরকুটি দন্ত। 

মসজিদ পানে ছুটিলেন মিঞা

মন্দির পানে হিন্দু 

আকাশে উঠিল চির জিজ্ঞাসা

করুণ চন্দ্রবিন্দু

 

এই ঠোকাঠুকি রক্তারক্তিতে যত সুবিধা সিঙ্গী মাতুলের, অর্থাৎ ব্রিটিশের। এমন কথা অন্য কারো পক্ষেই লেখা সম্ভব ছিল না, ঈশ্বর গুপ্ত বা শনিবারের চিঠিওয়ালাদের পক্ষে তো নয়ই। 

ঐক্যটা ওপর কাঠামোতে রাজনৈতিকভাবে হতে পারে, কিন্তু ভেতরে যদি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলন না হয় তবে তা টিকবে তো না-ই, বরঞ্চ বিপত্তির কারণ হবে, যেমনটা ঘটেছে। সে বিপদ নজরুল দেখেছেন, অন্যরা দেখেননি। 

ওই ঐক্য ঘটবার পথে অন্তরায় হচ্ছে উচ্চশিক্ষিত মধ্যবিত্ত, যাদের ভেতর আছে সংস্কার এবং তার চেয়ে বেশি করে আছে স্বার্থবুদ্ধি, তারা জানে জনগণের ঐক্য ঘটলে তাদের মহাবিপদ ঘটবে, যে বিপদের কথা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অকপটে স্বীকার করেছেন, যে জন্য চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে কৃষকের চরম দুর্দশা ঘটছে জেনেও তিনি বলেছেন ব্যবস্থাটাকে ভাঙা চলবে না, কারণ তাতে 'আধুনিক' অর্থাৎ বৈষয়িক সুযোগপ্রাপ্ত শ্রেণির বিপদ ঘটবে। 

১৯২৬-এর দাঙ্গার সময়ে লেখা 'হিন্দু মুসলমান' প্রবন্ধে নজরুল বলেছেন যে, হিন্দু-মুসলমানের বিরোধের ব্যাপার নিয়ে আলোচনার সময় রবীন্দ্রনাথ তাকে একদা বলেছিলেন, 'দেখ, যে ল্যাজ বাইরের তাকে কাটা যায়, ভেতরের ল্যাজকে কাটবে কে?' ওই ল্যাজ নিয়ে দুশ্চিন্তা নজরুলেরও। তিনি বলছেন, মারামারিটা হিন্দু-মুসলমানের নয়, এটি হচ্ছে পণ্ডিত ও মোল্লার, অর্থাৎ ধর্মব্যবসায়ীদের। আরও লিখেছেন যে, এই ব্যবসার প্রকোপে ভ্রষ্ট হয়েছে উচ্চশিক্ষিতরা। রাস্তায় যেতে যেতে তিনি দেখেন একটা বলদ যাচ্ছে, তার ল্যাজটা গেছে খসে। কিন্তু পাশেই দেখেন 'আমার অতি বড় উদার বিলেতফেরত বন্ধুর মাথায় য্যাবড় ল্যাজ গজিয়েছে।' নজরুল জানেন, এবং আমাদেরকে জানাচ্ছেন যে, 'অন্তরালে যে কাজ করছে সেটি ভিন্ন এক শক্তি, যাদের নেতার নাম শয়তান।' 

সে নাম ভাঙিয়ে হিন্দু, মুসলমানকে খেপায়, সে-ই আবার গুর্খা সিপাই হইয়া হিন্দু-মুসলমানকে গুলি করিতেছে। উহার ল্যাজ সমুদ্র পারে গিয়ে ঠেকিয়াছে, উহার মুখ সমুদ্রপারের বাঁদরের মতো লাল। 

সমুদ্রপারের লালমুখো বাঁদরটা, যার অপর নাম সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ, সে আবার সিংহ সেজে বসে আছে; আসল কারসাজিটা তারই। এ সত্য বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকেরা দেখেও দেখতে চায় না, কারণ জনগণের ঐক্যে তাদের সমূহ বিপদ। সিংহ মামার সঙ্গে তাদের যতটা খাতির দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রায় ততটাই দূরত্ব। 

ব্রিটিশ, কংগ্রেস ও লীগের সম্মিলিত প্ররোচনায় হিন্দু-মুসলমান যখন নিজ নিজ কায়দায় 'মারো শালা যবনদের', 'মারো শালা কাফেরদের' বলে আল্লাহর এবং মা কালীর প্রেস্টিজ রক্ষার জন্য চিৎকার করতে থাকে তখন তার ফলটি দাঁড়ায় কী? তারা মাটিতে পড়তে শুরু করে এবং দেখা যায় যে, তখন তারা-

 

আল্লা মিয়া বা মা কালী ঠাকুরানীর নাম লইতেছে না। হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি পড়িয়া থাকিয়া এক ভাষায় আর্তনাদ করিতেছে- 'বাবা গো, মা গো'। মাতৃপরিত্যক্ত দুটি বিভিন্ন ধর্মের শিশু যেমন করিয়া এক স্বরে কাঁদিয়া তাহাদের মা'কে ডাকে। 

কবি দেখেছেন এবং শুনেছেন। তার দেখবার চোখ ছিল, শুনবার কান ছিল, অন্যরা দেখেও দেখেনি, শুনেও শোনেনি, কেননা তারা ছিল অন্ধ ও বধির। স্বার্থের কারণে। 

নিজের ধর্মনিরপেক্ষ এবং বিদ্রোহাতিরিক্ত সমাজ বিপ্লবী অবস্থান থেকে যখন নজরুল দেখেন, দুর্দশায় প্রতি বছর বাংলায় দশ লাখ মানুষ মারা যায়। দেখে তার মনে প্রশ্ন জাগে, 'রোগ-শীর্ণ অনাহারক্লিষ্ট বিবস্ত্র বুভুক্ষু সর্বহারা ভিখারিদের লাশ' 'দিনের পর দিন ধরিয়া মন্দির-মসজিদের পাশ দিয়ে চলিয়া যায়' তবুও 'ঐ নিরর্থক' ভজনালয়গুলো কেন 'ধসিয়া পড়ে না'? 

তার প্রবন্ধের বইগুলো ছোট ছোট, চটি আকারের। দুর্দিনের যাত্রী মাত্র ৫৪ পৃষ্ঠার, ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত প্রকাশক না পেয়ে যেটি তিনি নিজেই প্রকাশ করেছেন; রুদ্রমঙ্গল ৭৮ পৃষ্ঠার, যুগবাণী ৯২ পৃষ্ঠার। কিন্তু এদের প্রত্যেকটিই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। চন্দ্রবিন্দু মূলত কমিক গানের বই, নিষেধাজ্ঞার প্রকোপ থেকে সেটিও বাদ পড়েনি, কারণ ওই বইতে হিন্দু-মুসলমানের যে ঐক্যের পক্ষে তিনি লিখছিলেন তাতে বিপদ ছিল সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র তার কবিতার বই বিষের বাঁশী, ভাঙার গান, প্রলয় শিখার ওপর যেমন প্রবন্ধের বইগুলোর ওপরও তেমনি সবেগে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সমাজের সঙ্গে নজরুলের দ্বন্দ্ব ছিল, সেটি অবৈরী দ্বন্দ্ব, তার পেছনে আছে ভালোবাসা, সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব পরিপূর্ণ বৈরিতার, সে জন্য সমাজের বড় অংশ তাকে অত্যন্ত সম্মান করেছে, কিন্তু রাষ্ট্র তাকে কখনোই ক্ষমা করেনি। 

কথাটা এইখানে বলে নেওয়া যায়, নজরুল পরিপূর্ণরূপ বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন, যে জাতীয়তাবাদ ধর্মনিরপেক্ষ ও ভাষাভিত্তিক। কিন্তু ওই সীমায় তিনি আবদ্ধ না থেকে এগিয়ে গেছেন; এটা বুঝতে তার কোনো বিলম্ব ঘটেনি যে সামাজিক বিপ্লব ছাড়া শ্রেণিবিভক্ত বাংলায় মানুষের মুক্তি নেই। 

সাহিত্যজীবনের শুরু থকেই তিনি হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের কথা ভেবেছেন। ১৯২০ সালে লিখিত 'বাঁধনহারা' উপন্যাসে একটি প্রাণবন্ত চরিত্রের নাম সাহসিকা বোস, যিনি মেয়েদের স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। এই মহিলা অনায়াসে মুসলমানদের সঙ্গে মেলামেশা করেন এবং সেই সামাজিক ঐক্যের পূর্বাভাস দেন, যার ওপর নজরুল জোর দিয়েছেন। উপন্যাসে রাবেয়া তার ননদকে বলছে, হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের জন্যে প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। 'ভিতরে এত অসামঞ্জস্য ঘৃণা-বিরক্তি চেপে রেখে বাইরের মুখের মিলন কি কখনো স্থায়ী হয়?' 

স্থায়ী হয় না। প্যাক্ট হতে পারে, ঐক্য হয় না। ঐক্যের প্রশস্ত পথ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন। দাঙ্গার সময়ে লেখা 'হিন্দু মুসলিম যুদ্ধ' কবিতায় নজরুল আশা রাখছেন- 

 

যে-লাঠিতে আজ টুটে গম্বুজ পড়ে মন্দির চূড়া,

সেই লাঠি কালি প্রভাতে করিবে শত্রু-দুর্গ গুঁড়া। 

 

এই সময়েই অন্য একটি কবিতায় তিনি জানাচ্ছেন সাম্রাজ্যবাদের বিপদ দেখা দিয়েছে, 'সিংহ' শঙ্কায় লীন হয়েছে এবং 'ঘরে ঘরে তার লেগেছে কাজিয়া'। এই পরিস্থিতিতে 'বদনা-গাড়ূতে কেন ঠোকাঠুকি, কাঁচা-কোঁচা টেনে শক্তিহীন?' এ টানছে ওর কাছা, ও টান দিচ্ছে এর কোঁচায়, এমনটাই ঘটছিল। অথচ যা করা দরকার ছিল তা হলো- 

 

রথ টেনে আন্‌ আন্‌রে তাজিয়া

পূজা দেরে তোরা দে কোরবান 

 

রথ ও তাজিয়া, পূজা ও কোরবানের এই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের একটি ছবি আছে 'কুহেলিকা' উপন্যাসে। ১৯৩১ সালে লিখিত এই রচনাটিতে নজরুল পেছনের দিকে তাকাচ্ছেন না, তার দৃষ্টি সম্মুখবর্তী। নজরুল তার প্রথম কবিতার বই 'অগ্নিবীণা' উৎসর্গ করেছেন বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে, যাকে তিনি অভিহিত করেছেন 'বাঙা-বাংলার রাঙা-যুগের আদি পুরোহিত' বলে। কিন্তু ওই যুদ্ধের সেনাধ্যক্ষরা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেননি। বিপ্লব তো ভুলেছেনই, বিদ্রোহও ভুলে তারা চলে গেছেন পণ্ডিচেরীর আশ্রমে। স্মরণীয় যে, স্বাধীনতা আন্দোলনের এই সংগ্রামীরা, সরকার যাদের বলত টেররিস্ট, তারা সাম্প্রদায়িক বলয়ের বাইরে যেতে পারেননি। মওলানা আবুল কালাম আজাদ তার আত্মজীবনীতে জানাচ্ছেন যে, কৈশোরে তিনি এদের দলে যোগ দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দেখেছেন যে, সবগুলো দলই মুসলিমবিদ্বেষী। নজরুল কিন্তু হতাশ হননি। 'কুহেলিকা' উপন্যাসের জন্য তিনি নতুন নায়ক খুঁজে পেয়েছেন প্রমত্তের মধ্যে। প্রমত্ত সল্ফ্ভ্রান্তবংশীয় এবং উচ্চশিক্ষিত, হিন্দু-মুসলিম বিভাজনে সে মোটেই বিশ্বাস করে না। বন্ধনীয় ভেতর উল্লেখ করা যায় যে, প্রমত্তের নামটি লক্ষ্য করার মতো, নেপালের গোপন কমিউনিস্ট পার্টির নেতার ছদ্মনাম ছিল প্রচণ্ড; সাদৃশ্যটা কাকতালীয়ই, তবে একেবারে যে তাৎপর্যহীন তা বোধ হয় নয়। নজরুল প্রমত্তদেরকে সন্ত্রাসবাদী বলে মনে করেন না, তার কাছে এরা হচ্ছেন বিপ্লববাদী। প্রমত্ত তার বিপ্লবী দলে অনায়াসে টেনে নিয়েছে মুসলমান জমিদার বংশের সন্তান জাহাঙ্গীরকে, যে কোনো ধর্মমন্ত্রে নয়, দীক্ষিত হয়েছে 'মাতৃমন্ত্রে'। প্রমত্ত মানুষের মুক্তির জন্য লড়ছে। ধর্মকে সে গুরুত্ব দেয় না। সে জানে ফরাসি বিপ্লব সম্ভব হয়েছিল অন্ধবিশ্বাসের পরিসমাপ্তিতেই। সহযোদ্ধাদেরকে সে বলে, ইংরেজের ভারতশাসনের বড় যন্ত্র কি জানিস? ধর্মের ভিত্তিতে ভেক দাঁড় করানো। ১৯৩৭-এ আন্দামানের নির্বাসন থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত বিপ্লবীদের অনেকেই কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছেন; ওই ঘটনার ছয় বছর আগেই নজরুল যেন সেই সম্ভাবনাটাই দেখতে পেয়েছেন তার উপন্যাসে। 

প্রমত্ত সাম্যবাদী বিপ্লবী হবে, এটি ছিল সম্ভাবনা। কিন্তু 'মৃত্যুক্ষুধা'র আনসার যে ইতিমধ্যেই ওই পথের পথিক হয়ে গেছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ রাখার অবকাশ সে দেয়নি, দেয়নি রাষ্ট্রপক্ষও। শুরুতে সে ছিল ঘোরতর গান্ধীবাদী, চরকার বিরুদ্ধে বললে ক্ষেপে যেত। কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছে যে, সুতোয় কাপড় হয়, দেশ স্বাধীন হয় না; এবং অন্যসব দেশ যেখানে মাথা কেটে স্বাধীন হতে পারছে না সেখানে তার দেশ সুতো কেটে স্বাধীন হবে এটা আকাশকুসুম কল্পনা। সে বুঝেছে যে দেশের মুক্তি কংগ্রেস বা লীগ আনবে না, আনবে জনগণ, তাই কৃষ্ণনগরে এসে আনসার কাজে নেমে গেছে শ্রমিক সংঘ গড়ে তুলতে। মফস্বল শহরে কারখানার শ্রমিক আর পাবে কোথায়, গাড়োয়ান, কোচোয়ান, রাজমিস্ত্রি, কুলি, মজুর, মেথর, এদেরকে অধিকার সচেতন করছে। অনতিবিলম্বে খবর রটে গেছে শহরে এক বলশেভিকের বিপ্লবী নেতা এসেছে যে ছেলেদের মধ্যে কমিউনিস্ট মতবাদ প্রচার করছে ও বিপ্লবী তৎপরতা চালাচ্ছে। ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, এমনকি কংগ্রেসওয়ালারা পর্যন্ত তার দিকে বাঁকা চোখে তাকানো শুরু করেছে। ফলে যা হবার তাই হলো, আনসার গ্রেফতার হয়ে গেল। বিভিন্ন বাড়িতে খানাতল্লাশি চলল, বহু ছাত্র ও তরুণকে হাজতে পোরা হলো। 

পুলিশ কিন্তু গ্রেফতার করতে পারেনি মেহনতি মানুষদেরকে। আনসারকে পুলিশ আটক করেছে শুনে দলে দলে তারা ছুটে এসেছে তাকে মুক্ত করার জন্য।

 

পুলিশের মার-গুঁতো-চাবুক-লাথিতে তাদের ভ্রূক্ষেপ নেই। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য ফাঁকা গুলি পর্যন্ত করা হয়েছে। কিন্তু জনতা পিছু হটতে নারাজ। ঔপন্যাসিক লিখছেন-

এরি মধ্যে এক বৃদ্ধ মেথর চিৎকার করে বলে উঠল, 'বাবাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, ওর চেয়ে মার আর কি আছে? আমার বুকে বরং গুলি মার, আমাদের বাবাকে ছেড়ে দাও।'

মুচি মেথরকে ভাই বলে ডাকার রাজনীতি বিষয়ের আমরা অবহিত, মহাত্মা গান্ধী তাদেরকে হরিজন বলেছেন, কিন্তু ওই মানুষদেরই একজন এক মুসলমান যুবককে বাবা বলছে এবং তার মুক্তির জন্য পুলিশের বন্দুকের মুখে নিজের বুক পেতে দিচ্ছে, এ ঘটনা নতুন রাজনীতির সূচক বটে।

শুধু ওই বৃদ্ধ নয়, সবাই বিক্ষুব্ধ। তারা কাঁদছে। কাতর কণ্ঠে আকাশ-ফাটা জয়ধ্বনি দিচ্ছে। সেই ধ্বনি যেন 'বিক্ষুব্ধ গণদেবতার মানবাত্মার হুঙ্কার'। আনসারের চোখ ভিজে ওঠে জলে। সে তার শৃঙ্খলবদ্ধ হাত 'ললাটে ঠেকিয়ে জনসঙ্ঘের উদ্দেশ্যে নমস্কার' করে বলে, 'তোমরা তোমাদের অধিকার আদায় কর... সেই হবে আমারও উদ্ধার। তোমাদের মুক্তির সঙ্গে আমিও মুক্ত হবো।'

নেতার নয়, মুক্তি আসবে জনতার। আনসার যাচ্ছে জেলে-দলের বা তার নিজের জন্য নয়, মেহনতি মানুষের জন্য। যাবার সময় সে বলে যায়, 'তোমরা তোমাদের অধিকারের দাবি কিছুতেই ছেড়ো না।' জনতা মুহুর্মুহু জয়ধ্বনি দেয়। যে বছর মৃত্যুক্ষুধা পত্রিকায় প্রকাশ শুরু হয় সে বছরই, ১৯২৬ সালের শরৎচন্দ্রের পথের দাবী প্রকাশিত হয়েছে। সব্যসাচীও বিপ্লবী, বন্দি অবস্থায় বিপ্লবী আনসারকে পাঠানো হয় বার্মাতে, সব্যসাচীর বিপ্লবী কর্মক্ষেত্রও বার্মা পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু আনসারের সঙ্গে সব্যসাচীর সমুদ্রসম ব্যবধান। সব্যসাচী কবি শশীকে বলেছে যে তার বিপ্লব ভদ্রলোকের, কৃষকের নয়। শশীর সঙ্গে নজরুলের মিল আছে, অনেকে সেটা লক্ষ্য করেছেন। কিন্তু সব্যসাচীর জগতে তো নজরুলের ঠাঁই নেই। একে সে বলশেভিকপন্থি, তার ওপর মুসলমান। সব্যসাচী ব্রিটিশকে তাড়াবে, কিন্তু সমাজে কোনো বিপ্লব ঘটাবে না; তার লক্ষ্য স্বাধীনতা, আপত্তি সাম্যে; আনসার স্বাধীনতা ও সাম্য দুটোই চায়, সে জানে যে সাম্য না এলে স্বাধীনতার অর্থ দাঁড়াবে শুধু ক্ষমতার হস্তান্তর মাত্র।

মনে হতে পারে যে, আনসারের আবির্ভাব এক ধরনের অকালবোধন। কারণ বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে ওই রকমের চরিত্রের সন্ধান পাওয়া সে সময়ে সম্ভব ছিল না। কিন্তু তা-ই বলি কী করে, যখন নজরুল নিজে ছিলেন, ছিলেন কমরেড মুজফ্‌ফর আহমদ। এই দু'জনের সমন্বয়েই যেন আনসার তৈরি। নজরুলের ছিল অসাধারণ আকর্ষণ ক্ষমতা ও প্রাণচাঞ্চল্য, মুজফ্‌ফরের ছিল স্বচ্ছ দৃষ্টি ও অঙ্গীকার, তারা দু'জন একত্র হয়েছিলেন, যেমন কর্মক্ষেত্রে তেমনি আনসারের সৃষ্টিতে। কারাবন্দি অবস্থায় আনসারের যক্ষ্ণা হয়েছে, একই অবস্থায় একই রোগে মুজফ্‌ফরও আক্রান্ত হয়েছিলেন। মুজফ্‌ফর সম্বন্ধে একটি চিঠিতে নজরুল লিখেছেন, 'ও যেন পোকায় কাটা ফুল, পোকায় কাটছে তবু সুগন্ধ দিচ্ছে। আজ তাকে যক্ষ্ণা খেয়ে ফেলছে, আর ক'টা দিন বাঁচবে জানি না।' তার দৃষ্টিতে এই বন্ধুটি ছিলেন সর্বত্যাগী, আত্মভোলা ও মৌন কর্মী, ওঁর ছিল ধ্যানীর দূরদৃষ্টি, উজ্জ্বল প্রতিভা।

নজরুল ওই চিঠিটি লিখেছিলেন ১৯২৬-এ, আত্মশক্তি পত্রিকার সম্পাদককে। আত্মশক্তি চিত্তরঞ্জন দাশ প্রতিষ্ঠিত স্বরাজ দলের মুখপত্র। তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এটি যে, নজরুল ছিলেন চিত্তরঞ্জনের অত্যন্ত গভীর অনুরাগী, কিন্তু সেই পত্রিকায় গণবাণীর সমালোচনা করা হয়েছিল, এই মর্মে যে, গণবাণীর বক্তব্য সাধারণ মানুষ বুঝবে না। নজরুল বলেছেন কার্ল মার্কসের মতবাদও সাধারণ শ্রমিক বুঝতে পারবে না, কিন্তু সে বাণী তারা বুঝবে যারা 'জগৎটাকে উল্টে দিয়ে নতুন করে গড়তে চাচ্ছেন না গড়ছেন'। 'ইঞ্জিন চালাবে ড্রাইভার কিন্তু গাড়িতে চড়বে সর্বসাধারণ, নজরুলের চিন্তাটা ছিল এ রকমের। সন্দেহ নেই, নজরুল চিত্তরঞ্জনের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকেও অতিক্রম করে এগিয়ে গিয়েছিলেন।

নজরুল ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। ১৯৪২-এ, কর্মজীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে পৌঁছে, নবযুগে তিনি লিখেছিলেন, 'বাংলা বাঙালীর হোক। বাঙালীর জয় হোক। বাঙালীর জয় হোক।' কিন্তু তার সেই বাংলা এক থাকেনি, পাঁচ বছর যেতে না যেতেই দু'টুকরো হয়ে গেছে। দেশভাগের ঠিক পরে অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছিলেন, 'ভুল হয়ে গেছে ভুল/সবকিছুই ভাগ হয়ে গেছে/ভাগ হয় নিকো নজরুল/ওই ভুলটুকু বেঁচে থাক/বাঙালী বলতে একজনই আছে/দুর্গতি তার ঘুচে যাক।' এই উপলব্ধি আমাদের সকলেরই।

বাঙালি বলতে নজরুল সম্প্রদায় ও শ্রেণির বাইরে সকল বাঙালিকে বুঝেছেন, যেটা তার আগের কালে তো বটেই, তাঁর নিজের কালেও সকল বাঙালি বোঝেননি। 

'অগ্নিগিরি' নামে নজরুলের একটি ছোটগল্প আছে। তার নায়ক সবুর মাতা-পিতাহীন এক কিশোর। এককালে বিত্তবেসাত ছিল, এখন নেই। এখন সে আশ্রিত হিসেবে থাকে একটি পরিবারে, যারা তার খুবই আদর-যত্ন করে। কিন্তু পাড়ার বখাটে ছেলেরা সুযোগ পেলেই পথেঘাটে সবুরকে উত্ত্যক্ত করে। বেচারা সবুর মুখ বুঁজে সব সহ্য করে। কিন্তু হঠাৎ টের পাওয়া গেল যে তার ভেতরে অগ্নিগিরি আছে। সেদিন জ্বালাতনের মাত্রাটি একটু বেশিই হয়েছিল, এবং তা নিয়ে বাড়ির যে মেয়েটির সে গৃহশিক্ষকতা করত সেই নূরজাহান তাকে ধিক্কার দেওয়ায় সবুর ওই ছেলেদের মুখোমুখি হয়। সে একা, কিন্তু তার হাতে উত্ত্যক্তকারীরা একের পর এক ধরাশায়ী হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তাদের একজন, নাম তার আমীর, ছুরি উঁচিয়ে সবুরকে আঘাত করতে যায়। সবুর সেটি প্রতিহত করে, তাতে উল্টো আমীরের বুকেই ছুরি বসে যায়, এবং তার মৃত্যু ঘটে। সবুরের জেল হয়ে যায় সাত বছরের। সবুরের শাস্তি লাঘব হতো, হয়তো বা সে মুক্তিই পেয়ে যেত যদি উকিল লাগাত, কিংবা উচ্চ আদালতে আপলি করত। গৃহস্বামী পরিবারটি টাকা খরচে উদগ্রীব ছিলেন, সবুরকে তারা আপন সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। কিন্তু সবুর রাজি হয় না। নূরজাহানকে সে জানায়, ইতিমধ্যেই তাদের অনেক ক্ষতি সে করেছে, ঋণের বোঝা আর বাড়াবে না। জেলখানায় দরজাটি বন্ধ হবার আগে নূরজাহানকে সবুর বলে, 'আমায় ক্ষমা করো নূরজাহান। আমি তোমাদেরকে আমার কথা ভুলতে দিতে চাইনে বলেই এই দয়াটুকু চাই।'

সবুরের ভেতর নজরুল আছেন। ওই কিশোর অনেক দুঃখ ও অপমান সহ্য করেছে, কিন্তু তার ভেতরকার অগ্নিগিরি জেগে উঠেছে অন্য কিছুতে নয়, নূরজাহানের ধিক্কারে। নজরুলও বিদ্রোহ করেছেন এবং সমাজ বিপ্লবী হয়ে উঠেছেন, শুধু দুঃখ ও অপমানের জ্বালায় নয়, নীরব ধিক্কারের কারণেও। ওই ধিক্কার শুনেছেন তিনি নিপীড়িত মানুষের কাছে থেকে। তার পক্ষে জেগে ওঠা ভিন্ন উপায় ছিল না।

আনসার পারেনি, আনসার যক্ষ্ণায় আক্রান্ত হয়েছে, তার মৃত্যু আসন্ন; নজরুল নিজেও পারেননি, তিনি শেষ পর্যন্ত স্তব্ধ হয়ে গেছেন। তার অপারগতার দায়িত্ব অনেকটাই যে আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে তিনি যুক্ত রেখেছিলেন সেই আন্দোলনের। তরুণ সবুর সাত বছর জেল খাটবে, সে ভরসা করে ওই সময়ের মধ্যে তার হাতে যে রক্ত লেগেছিল সেটা মুছে যাবে; জেল থেকে বের হয়ে নূরজাহানদের সে খুঁজে নেবে এবং নতুন সমাজে নতুনভাবে জীবন শুরু করবে। যেন নজরুলের প্রত্যাশিত সমাজেরই স্বপ্নছবি। 

এমন একটি সমাজ তিনি চেয়েছিলেন যেখানে মানুষের জীবন হবে সুন্দর ও স্বাভাবিক। তিনি ভাঙতে চেয়েছেন, নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য নয়, নতুন করে গড়বার জন্যই, যে কথা তিনি বার বার বলেছেন। সুন্দরের সাধক ছিলেন বলেই অসুন্দরের বিরুদ্ধে তার লড়াই। লড়াইটা মুক্তির। তার গানে চরণ আছে, 'আমারে দেব না ভুলিতে'। আমরা তাকে ভুলতে পারব না।

তার কাজটা সাংস্কৃতিক। ওই সময়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাহিত্যেরও একটি ধারাপ্রবাহ চলছিল, তরুণ কবিরা তৈরি করেছিলেন, তারা আধুনিকতার দাবিদার ছিলেন। প্রকৃত আধুনিকতা কাকে বলে সে বিষয়ে 'ন্যাশনালিজম' বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি বক্তৃতায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য আছে। তিনি বলেছেন, প্রকৃত স্বাধীনতা হলো মনের মুক্তি, রুচির দাসত্ব নয়। নজরুলের সমসাময়িক 'আধুনিক' কবিরা পশ্চিমের সাহিত্যের অবক্ষয়ধর্মী ও প্রতিক্রিয়াশীল রুচির দাসত্বের আবর্তে পড়ে গিয়েছিলেন, নজরুল ছিলেন ব্যতিক্রম, তার আধুনিকতাই ছিল যথার্থ, কেননা মনের দিক থেকে তিনি ছিলেন মুক্ত এবং রুচির দাসত্বের ব্যাপারে তিনি বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখাননি।

নজরুল থাকবেন। আমাদের জীবনের আনন্দ ও নান্দনিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য থাকবেন, থাকবেন আমাদের স্বপ্ন ও সংগ্রামের সাথী হিসেবে। ব্রিটিশের ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিনেছিল, পাকিস্তানিদের সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র তার কাব্যে অবাঞ্ছিত অংশ খুঁজতে ব্যস্ত হয়েছিল, আমাদের সমাজে যদি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসন্ন হয়ে পড়ে তবে সেদিন রাষ্ট্র এই কবির বাণীকে নিয়ে হয়তো অস্বস্তিতে পড়বে, কিন্তু সমাজ তাকে কাছের মানুষ হিসেবে পাবে। ইতিমধ্যে অন্যায় ও অবিচারকে সহ্য করার দরুন নজরুলের রচনা আমাদেরকে ধিক্কার দেবে, যেমন নূরজাহান দিয়েছিল তার আপনজন সবুরকে, যদি আমরা তার রচনা পাঠ করি।

সূত্র: সমকাল
এমএ/ ০২:৪৪/ ০৭ মে

স্মরণ

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে