Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (95 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৬-০৬-২০১৮

প্লাস্টিক বর্জ্যে ডুবে যাচ্ছে এ ধরণী

মাকসুদা আজীজ


প্লাস্টিক বর্জ্যে ডুবে যাচ্ছে এ ধরণী

গেল শুক্রবারের (১ জুন) ঘটনা। মালেয়শিয়া সীমান্তের কাছে থাইল্যান্ডের একটি খাড়িতে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করা হয় একটি তিমি। স্থানীয় ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের একটি দল সেটিকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাদের প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যায় তিমিটি।

ভেটেরিনারি দলটি মৃত তিমিটিকে নিয়ে এসে বোঝার চেষ্টা করেন, কেন তার মৃত্যু হলো। তারা এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পান। তিমিটির পাকস্থলীতে ৮০টি প্লাস্টিকের ব্যাগ আটকে ছিল। তিমিটিকে নিয়ে কাজ করার সময় আরো পাঁচটি প্লাস্টিকের ব্যাগ বেরিয়ে আসে এর পেট থেকে।

সমুদ্রবিজ্ঞানী থন থমরনগনাসাওয়াত বলেন, তিমিটি প্লাস্টিকের ব্যাগ গিলে ফেলায় তার পাকস্থলী কর্মক্ষমতা হারায়। শুধু তিমি নয়, প্রতিবছর থাইল্যান্ড-মালেয়শিয়া সীমান্ত উপকূলে কেবল প্লাস্টিকের ব্যাগের কারণে প্রাণ হারানো প্রায় তিনশ মৃত প্রাণী দেখতে পাওয়া যায়।

প্লাস্টিকের আগ্রাসনের এই ভয়াবহতা গোটা বিশ্বজুড়ে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্লাস্টিকের সাগরে ডুবতে বসেছে পৃথিবী। এই প্রেক্ষাপটেই আজ ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য রাখা হয়েছে— ‘আসুন প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করি, প্লাস্টিক পুনঃব্যাবহার করি। না পারলে বর্জন করি।’

কীভাবে প্লাস্টিকের সাগরে ডুবে যাচ্ছি আমরা?

প্রতিদিনের কাজে আমরা যে প্লাস্টিকের পণ্য (পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, বিভিন্ন পণ্যের মোড়ক ইত্যাদি) ব্যবহার করে থাকি, তার পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। জাতিসংঘের পরিবেশ সংস্থার মতে, বিশ্বে বর্তমানে ৩০ কোটি টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। আর এর ৯০ শতাংশ বর্জ্য বাহিত হয় নদীর মাধ্যমে সাগরে। শীর্ষ বর্জ্যবাহী নদীগুলোর মধ্যে ষষ্ঠ আমাদের ভূখণ্ডের নদী মেঘনা, ব্রক্ষ্মপুত্র ও গঙ্গা। এর পরিমাণ প্রতিবছর ৭২ হাজার ৮৪৫ টন।

সমুদ্রের প্লাস্টিক যে শুধু প্রাণীদের প্রাণ নেয়, তা নয়। প্লাস্টিকের ছোট টুকরো জলজ প্রাণীরা খেয়ে ফেললে তা ঘুরে-ফিরে মানুষের দেহেই ফিরে আসে। এর কারণে ক্যান্সারসহ অনেক দুরারোগ্য অসুখ হয়।

এ তো গেল পানি দূষণের কথা। পলিথিন ও প্লাস্টিক পণ্যের বর্জ্য, যার ১০ শতাংশ মাটিতে থেকে যায়, তার প্রভাবও কম নয়। একটা প্লাস্টিকের পণ্য ৫শ বছর পর্যন্ত পরিবেশে অবিকৃত থাকে। এর কারণে মাটিতে আলো-বাতাস ও পানি প্রবেশ করতে পারে না। মাটির উপকারী ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্ষমতা কমে যায়, উর্বরতাও কমে যায় মাটির। শুধু তাই না, যে মাটিতে প্লাস্টিক জমা হতে থাকে, সে মাটি ধসের সম্ভাবনা থাকে।

পৃথিবীজুড়ে মিনিটে ১০ লাখ প্লাস্টিকের পানির বোতল কেনা হয়। প্রতি বছর ৫ লাখ কোটি প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়। জাতিসংঘের পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, এভাবে চলতে থাকলে প্লাস্টিকের তলায় চাপা পড়েই ধ্বংস হয়ে যাবে এই পৃথিবী।

জাতিসংঘ কী করছে?

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিশ্বের পরিবেশ রক্ষায় এটাই উপযুক্ত সময়। এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত জাতিসংঘও। ২০১৮ সালের পরিবেশ দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ দ্য স্টেট অব প্লাস্টিক নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

সারাবিশ্বে প্লাস্টিক পণ্য বন্ধে জাতিসংঘ কাজ করে যাচ্ছে। ৫০টি দেশ প্লাস্টিকের পণ্য ব্যাবহার কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চেষ্টা করছে। কিন্তু বিষয়টি এত সহজ নয়। প্লাস্টিক পণ্যের ওপর মানব সভ্যতা এত বেশি নির্ভরশীল যে প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার নিষিদ্ধ করেও খুব কাজে আসছে না। যেসব দেশে প্লাস্টিক পণ্য নিষিদ্ধ সেখানে চোরাই পথে প্লাস্টিক ঢুকে যাচ্ছে।

জাতিসংঘের পরিবেশ সংস্থার প্রধান এরিখ সোলহাইম একটি প্রতিবেদনে জানান, যদি প্লাস্টিক পণ্য বন্ধ করতে হয় তবে তা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। এটাকে সবার মানতে হবে। না হলে এই বিপদ থেকে আমাদের কেউ বাঁচাতে পারবে না।

প্লাস্টিক বন্ধে বাংলাদেশ কী করছে?

২০০২ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন সংশোধন করে পলিথিনের উৎপাদন ও বাজারজাত নিষিদ্ধ করা হয়। সে আইনে বলা হয়, সরকার নির্ধারিত পলিথিন সামগ্রী উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণে প্রথম অপরাধের দায়ে অনধিক ২ (দুই) বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২ (দুই) লাখ টাকা অর্থদণ্ড (জরিমানা) বা উভয় দণ্ড এবং পরবর্তী প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রে অন্যূন ২ (দুই) বছর, অনধিক ১০ (দশ) বছরের কারাদণ্ড বা অন্যূন ২ (দুই) লাখ টাকা, অনধিক ১০ (দশ) লাখ টাকা অর্থদণ্ড (জরিমানা) বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন অপরাধীরা।

আইনে বিক্রি, বিক্রির জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের দায়ে অনধিক ১ (এক) বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড (জরিমানা) বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রতিটি অপরাধের দায়ে অন্যূন ২ (দুই) বছর, অনধিক ১০ (দশ) বছরের কারাদণ্ড বা অন্যূন ২ (দুই) লাখ টাকা, অনধিক ১০ (দশ) লাখ টাকা অর্থদণ্ড (জরিমানা) বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন অপরাধীরা।

এ আইন তৈরির ১৬ বছর পরও আইন মানার কোনো সদিচ্ছা দেখা যায় না। যেকোনো কাঁচাবাজারে গেলেই দেখা যাবে প্লাস্টিকের ব্যাগের দোকান। প্লাস্টিকের একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্যের বাজার বাড়ছে প্রতিদিনই। প্রতিবছর দুই হাজার কোটি টাকার প্লাস্টিক কাঁচামাল আমদানি করে বাংলাদেশ। আর প্রতি বছর ১৭শ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়।

খোলা বাজারের বিক্রেতারাও জানেন এটা বিক্রি অবৈধ। তারপরও তারা এ কাজ করে যাচ্ছেন। কারণ বাজারে প্লাস্টিকের পণ্যের চাহিদা রয়েছে।

সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বেআইনি উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করে। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ এরই মধ্যে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক কারণগুলোর পাশাপাশি দেশের ভেতরে অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ২০০২ সালে পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে আইন করা হলেও কার্যকর প্রয়োগের অভাবে এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনেই যত্রতত্র নির্বিচারে পলিথিন ব্যবহার করা হচ্ছে এবং প্রতিবছর প্রায় ৩ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য নদী-নালা, খাল-বিল ও উন্মুক্ত জায়গায় ফেলা হচ্ছে। এ ধরনের দূষণ বন্ধ করতে হলে প্লাস্টিকের বেআইনি উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে।’

‘আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হলে প্লাস্টিকের অবৈধ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি, দূষণ কর ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে।’, বলেন ড. জামান।

বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক, কাজী সারওয়ার ইমতিয়াজ হাশেমী জানান, অবৈধ পলিথিন বন্ধে কঠোর অবস্থানে আছে পরিবেশ অধিদপ্তর। ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে মোবাইল কোর্ট ও টাস্কফোর্স মিলে মোট ১৬০ টনের বেশি পলিথিন জব্দ করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোট ১২ লাখ টাকা আর্থিক দণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

পলিথিনের বিকল্প আছে বাংলাদেশের কাছে

বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ড. মোবারক আহমদ খানের তত্ত্বাবধানে পাট থেকে তৈরি হচ্ছে বিকল্প পলিথিন। বলা হচ্ছে এই পলিথিন তৈরিতে সেলুলোজ ব্যবহার করা হবে। এর ফলে মাত্র চার মাসের মধ্যেই তা মাটির সঙ্গে সম্পূর্ণ মিশে যাবে।

ড. মোবারক আহমদ খান জানান, এটা এখনও একটি পাইলট প্রজেক্ট। প্রতিদিন মাত্র তিন হাজার ব্যাগ তৈরি করা হচ্ছে যেখানে চাহিদা ১০০টন। এই বিশাল চাহিদা পূরণ করতে সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত এটাকে পূর্ণাঙ্গ প্রকল্পে রূপান্তরিত করা হবে এবং প্লাস্টিক ব্যাগ তৈরি বন্ধ করা হবে।

সূত্র: সারাবাংলা
এমএ/ ০১:০০/ ০৬ জুন

পরিবেশ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে