Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (25 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৬-০৫-২০১৮

মাদকবিরোধী অভিযানে বিএনপি খুঁত ধরছে কেন?

আবদুল গাফফার চৌধুরী


মাদকবিরোধী অভিযানে বিএনপি খুঁত ধরছে কেন?

বাংলাদেশে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক সন্ত্রাস, উগ্র মৌলবাদীদের সন্ত্রাস, তরুণ বুদ্ধিজীবীদের হত্যায় সন্ত্রাস, জিহাদিস্টদের সন্ত্রাস ইত্যাদি নানা ধরনের সন্ত্রাস অনেকটাই সাফল্যের সঙ্গে মোকাবেলা করার পর হাসিনা সরকার মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশ ও র‌্যাবকে নামিয়ে দিয়েছে। তারা অন্যান্য সন্ত্রাস দমনের মতো মাদকবিরোধী অভিযানেও সাফল্য দেখাচ্ছে। এটা একটা বড় আশার কথা। অন্যান্য সন্ত্রাসের মতো সারা বাংলাদেশে এই মাদকাসক্তি ও মাদক ব্যবসা ভয়ানক সংক্রামক রোগের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। নানা ধরনের সন্ত্রাস একজন-দুজন বা একদল লোকের প্রাণহানি ঘটায়। কিন্তু মাদকাসক্তি ও মাদক ব্যবসা একটা জাতির তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করে এবং জাতীয় চরিত্র সার্বিকভাবে কলুষিত করে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য, বিশেষ করে ফেনসিডিল, হেরোইন ও ইয়াবার ব্যবহার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সংক্রামক রোগের মতো ছড়িয়ে পড়েছে এবং মাদক ব্যবসা সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এই ব্যবসায় সমাজের সব স্তরের মানুষ জড়িয়ে পড়েছে। এই ব্যবসা যে ভয়ংকর মৃত্যুবীজ সমাজজীবনে বপন করছে এবং গোটা জাতিকে ধ্বংসের পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে এই মার্চেন্ট অব ডেথ বা মৃত্যু ব্যবসায়ীদের কোনো লক্ষ্য নেই। এরা অনেকেই এই ব্যবসা রক্ষার জন্য নিজেরা সশস্ত্র হয়েছে এবং সশস্ত্র মাফিয়া বাহিনীও তৈরি করেছে। এই অবৈধ ব্যবসার উচ্ছেদ ঘটাতে গেলে পুলিশ ও র‌্যাবকে বহু ক্ষেত্রেই বন্দুকযুদ্ধে নামতে হয়। তাতে অনেক সময় এই মৃত্যুব্যবসায়ীদের মৃত্যুও ঘটে।

এই মৃত্যু এড়ানো গেলে ভালো হতো। কিন্তু শুধু বাংলাদেশে নয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো উন্নত গণতান্ত্রিক দেশেও জেহাদিস্টদের সন্ত্রাস মোকাবেলায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীদের মৃত্যু ঘটেছে। যেসব সন্ত্রাসীকে জীবিত অবস্থায় ধরে বিচারে সোপর্দ করা যেত, তাদেরও হত্যা করা হয়েছে। সশস্ত্র সন্ত্রাসীকে হত্যা করার ক্ষেত্রে দ্বিধা দেখালে পুলিশেরই সন্ত্রাসীর হাতে মৃত্যু হয়।

লন্ডনে ও প্যারিসে সন্ত্রাসীদের মোকাবেলায় সন্ত্রাসীদের হত্যা করা হলে ব্রিটিশ বা ফরাসি বুদ্ধিজীবীরা, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বা মিডিয়া এগুলোকে মানবতাবিরোধী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে হৈচৈ শুরু করেনি; যা বাংলাদেশে এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া করছে। এই সন্ত্রাস দমনে বিএনপির হৈচৈই বেশি। কিন্তু তারা ভুলে গেছে, সন্ত্রাস দমনের জন্য র‌্যাবের প্রতিষ্ঠা বিএনপি সরকারের আমলে তারাই করেছে এবং ক্রসফায়ারে শুধু দোষী নয়, অভিযুক্ত ব্যক্তিদেরও বিনা বিচারে হত্যার রেওয়াজটি তারাই প্রবর্তন করে। বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ পর্যন্ত এই ক্রসফায়ারে অসংখ্য লোকের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। তখন তিনি ছিলেন আইনমন্ত্রী। বিএনপির সেই শাসনামলে র‌্যাবের হাতে নানা কারণে একজন বা একাধিক নির্দোষ লোকের কি মৃত্যু হয়নি?

লন্ডনে বিএনপির প্রচারণা দ্বারা প্রভাবিত কয়েকজন ব্রিটিশ সাংবাদিককে বলেছি, বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের আমলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বেড়ে চলেছে বলে আপনারা হৈচৈ করছেন। আপনাদের দেশে তো মৃত্যুদণ্ড বেআইনি। তাহলে আইআরএ সন্ত্রাসের সময় এই সন্ত্রাস যখন লন্ডনেও উঠে আসে, এমনকি লর্ড মাউন্টব্যাটেনের মতো ব্যক্তির আইআরএ সন্ত্রাসীদের হাতে মৃত্যু ঘটে, লন্ডনের থানা পুলিশ ও অভিজাত দোকানপাটের ওপর বোমা হামলা চলে, তখন অন্যত্র আইরিশ সন্ত্রাসীদের নির্বিচারে হত্যা করা হলো কেন? তখন একজন ব্রিটিশ পুলিশ বা সেনা নিহত হলে সেনা অভিযান চালিয়ে আইরিশ সন্ত্রাসীদের হত্যা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কত নির্দোষ আইরিশ নাগরিক ছিলেন?

আয়ারল্যান্ডে আইরিশ সন্ত্রাস দমনের নামে প্রায় ২০০ বছর যে কয়েক ডিভিশন ব্রিটিশ সেনা মোতায়েন ছিল, তাদের হাতে যে শুধু সন্ত্রাসী নয়, কত শত নিরীহ আইরিশ নারী-পুরুষ ও শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তার গোনাগুনতি নেই। টনি ব্লেয়ার ক্ষমতায় এসে এই যুদ্ধ ও হত্যাকাণ্ডের অবসান ঘটান। একটি ব্রিটিশ মিডিয়া আইআরএর সন্ত্রাস দমনের জন্য এই হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন জানাতে গিয়ে লিখেছিল, ‘সন্ত্রাসীদের প্রতি মানবতা দেখাতে গিয়ে ব্রিটিশ পুলিশ তো আর তাদের হাতে গুলি খেয়ে মরতে পারে না।’

লন্ডনে কয়েকজন ব্রিটিশ সাংবাদিককেও আমি বলেছি, বাংলাদেশেও মানবতার শত্রু সশস্ত্র মাদক ব্যবসায়ীদের প্রতি মানবতার দরদ দেখাতে গিয়ে পুলিশ তো সন্ত্রাসীদের গুলিতে মারা যেতে পারে না। সন্ত্রাসীদের হাতে তো বহু পুলিশ মারা গেছে। একবার জামায়াতিরা ঢাকার এক মসজিদে এক পুলিশ কনস্টেবলকে টেনে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করেছে। হত্যাকারীদের কোনো বিচার হয়নি। আরেকবার থানা-ফাঁড়ির কাছে দণ্ডায়মান এক পুলিশকে জিহাদিস্টরা আকস্মিক হামলা চালিয়ে হত্যা করে। এ রকম ঘটনার উদাহরণ অসংখ্য।

আমি বাংলাদেশের পুলিশ ও র‌্যাবের পক্ষে কোনো সাফাই গাচ্ছি না। তবে এ কথা দৃঢ়তার সঙ্গে বলব, আগের সন্ত্রাসগুলোর মতো ভয়াবহ মাদক সন্ত্রাস দমনেও শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন আছে। মানবতার জঘন্য শত্রুদের সঙ্গে মানবিক অথবা মানবতাবাদী আচরণ করা চলে না। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একবার এক নদীর পার ধরে হাঁটছিলেন। দেখলেন, এক ব্যক্তি তার হাত চেপে ধরে ভীষণ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন—‘বাপু, তোমার কী হয়েছে?’ লোকটি বলল, ‘একটা বিচ্ছু নদীর জলে ভেসে যাচ্ছিল। আমি তার প্রাণ রক্ষার জন্য হাতে তুলে এনেছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে সে আমার হাতে ভয়ানক কামড় দিয়ে লাফিয়ে পালিয়ে গেছে।’ বিদ্যাসাগর বললেন—‘বাপু, তুমি দেখছি একেবারেই বোকা। বিচ্ছুর ধর্মই হচ্ছে অন্যকে কামড়ানো। তুমি জেনেশুনে গেছ তাকে মায়াদয়া দেখাতে?’

আরও পড়ুন: ইয়াবা অভিযান নিয়ে একটি ‘অসুশীল’ লেখা

সন্ত্রাসীরা এই বিচ্ছুর চেয়েও ভয়ানক হিংস্র। পুলিশ যাবে তাদের সঙ্গে মানবতা ও দয়ামায়া দেখাতে? যেখানে তাদের দায়িত্ব হচ্ছে, এই সমাজশত্রুদের সমাজজীবন থেকে সমূলে উচ্ছেদ করা। আমাদের এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্টের তো আর জীবন বাজি রেখে সশস্ত্র ও ঘাতক সমাজশত্রুদের মোকাবেলা করতে যেতে হয় না। সুতরাং মানবতার শত্রুদের প্রতি তাদের মানবতার দরদ উথলে উঠতে পারে বৈকি।

তবে সমাজশত্রু দমন করতে গিয়ে ভুলক্রমেও কোনো নির্দোষ লোক হত্যা আমি অমার্জনীয় অপরাধ মনে করি। এ জন্য কক্সবাজারে একরাম হত্যার তীব্র নিন্দা জানাই। খবরে বলা হয়েছে, র‌্যাব ভুল খবর পেয়ে অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীকে ধরতে গিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এ খবর সঠিক হলে এটি নির্দোষ মানুষ হত্যা। এই ভুলের পুনরাবৃত্তি একেবারেই কাম্য নয়। সরকারের উচিত এটা ভুল, না ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড, তার তদন্ত অবিলম্বে শুরু করা এবং তদন্তে কারো অপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া। এমন হত্যাকাণ্ডের যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে কঠোরভাবে সতর্ক করে দেওয়া। প্রয়োজনে তাদের কার্যকলাপ মনিটরিংয়ের জন্য বিচার বিভাগ ও জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা কমিটি গঠন করা।

সাম্প্রতিক অতীতে র‌্যাব ও পুলিশ দেশ থেকে রাজনৈতিক সন্ত্রাস, ধর্মান্ধদের সন্ত্রাস, ব্লগার হত্যাকারীদের সন্ত্রাস ইত্যাদি দমনে প্রশংসাযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। মাদক ব্যবসায়ী মাফিয়াচক্র দমনেও তারা সফল হবে—এটা দেশের মানুষ আশা করে। কিন্তু এ ব্যাপারেও বাধা আসছে বিএনপি জোটের কাছ থেকে। অতীতে যখনই আওয়ামী লীগ সরকার সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজদের দমনে অভিযান চালিয়েছে, তখনই তারা দাবি করেছে, ধৃত সব ব্যক্তি তাদের দলের কর্মী ও নেতা। আওয়ামী লীগ সরকার তাদের সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজ সাজিয়ে মিথ্যা মামলায় জেলে ঢোকাচ্ছে এবং বিএনপিকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে।

দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত করার জন্য হাসিনা সরকারকে প্রায় ৮০ হাজার দুর্বৃত্তকে আটক করতে হয়েছিল। বিএনপি তখনো দাবি করেছিল, এই ৭০-৮০ হাজার ধৃত ব্যক্তি কেউ দুর্বৃত্ত নয়, তারা বিএনপির সাধারণ নেতাকর্মী। তখন আমার এক কলামে লিখেছিলাম, ‘দেশে সন্ত্রাস ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ও আদালতের বিচারে দণ্ডিত এই বিপুলসংখ্যক মানুষ যদি বিএনপির সাধারণ নেতাকর্মী হয়, তাহলে বিএনপি তো সাধারণ রাজনৈতিক দল নয়, চোর-বাটপার, দুর্নীতিবাজদের দ্বারা গঠিত ও পরিচালিত মাফিয়াতন্ত্রের দল। খালেদা জিয়া আবার ক্ষমতায় এসে এই হাজার হাজার দুর্বৃত্তের জন্য জেলের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। দেশে আবার শুরু হয়েছিল সন্ত্রাস ও খুনখারাবি। যার বলি হয়েছেন আহসানউল্লাহ মাস্টার, এসএএমএস কিবরিয়া, হুমায়ুন আজাদের মতো অসংখ্য রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবী। দেশের রাজনীতিও হয়েছে কলুষিত।’

আরও পড়ুন: বাংলাদেশের রাজনীতির তৃতীয় শক্তি কে বা কারা?

২০০১ সালে আমাদের ‘সুশীল’ সমাজের সমর্থনে বিএনপি যখন ক্ষমতায় এসে হাজার হাজার অভিযুক্ত ও দণ্ডিত ব্যক্তিকে জেল থেকে ছেড়ে দিতে শুরু করে এবং দাবি জানায়—এরা সবাই তাদের দলের সাধারণ নেতা ও কর্মী, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। তখন আমার এক জুনিয়র সাংবাদিক বন্ধু কৌতুক করে বলেছিলেন, ‘বিএনপি যা দাবি করছে তা সত্য। দেখছেন না, তাদের সরকারে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী কারা হয়েছে? একাত্তরের ঘাতক-দালাল ও যুদ্ধাপরাধী, খুনের মামলার একাধিক আসামি। এমনকি পুলিশের খাতায় চোরাকারবারি হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিকে করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।’ এই সরকারকে আমরা কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধু নাম দিয়েছি ‘government of the criminals, by the criminals and for the criminals’. অর্থাৎ অপরাধীদের দ্বারা, অপরাধীদের জন্য, অপরাধীদের সরকার।

বর্তমানেও আওয়ামী লীগ সরকার যখন বিশ্বের অন্যান্য সভ্য দেশের অনুসরণে সমাজশত্রু মাদক ব্যবসায়ী মাফিয়াতন্ত্র ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের অভিযান শুরু করেছে, তখন সেই অভিযানকে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সমর্থন দেওয়া দূরের কথা, বিএনপি এই অভিযানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এবং সমাজশত্রুদের তাদের নেতা ও কর্মী বলে দাবি করছে। বিএনপি নিজেই তার আসল চরিত্র বারবার দেশবাসীর কাছে তুলে ধরছে।

তথ্যসূত্র: কালেরকণ্ঠ
আরএস/০৯:০০/ ০৫ জুন

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে