Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (25 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৬-০৫-২০১৮

তিস্তা টালবাহানায় সুষমা দিলেন আসল বার্তা  

আনিস আলমগীর


তিস্তা টালবাহানায় সুষমা দিলেন আসল বার্তা
 

২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ্যে বলেছিলেন তার এবং শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়সীমার মধ্যেই তিস্তাচুক্তি সম্পাদন করা হবে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন আর ২০১৯ সালের মে মাসে ভারতের লোকসভা নির্বাচন। এরমধ্যে তিস্তাচুক্তি সম্পাদন করা সম্ভব হয়নি। লোকসভা নির্বাচনের পূর্বে এ চুক্তি মোদি কিংবা মমতা কেউই আর করতে সাহসী হবেন না বলা যায়। কারণ, তারা কেউই নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে কোনও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে চাইবেন না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করে আসার পরপরই সম্ভবত সে কথাটিই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। মোদি সরকারের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে ২৮ মে ২০১৮ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বহু প্রতীক্ষিত তিস্তা নদীর জলবণ্টন চুক্তি সম্পর্কে বলতে গিয়ে সুষমা স্বরাজ বলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতামতকে অগ্রাহ্য করে কোনও কিছু করবে না।

সুষমা স্বরাজ আরও বলেছেন, ২০১৭ সালের এপ্রিলে শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছোট ছোট তিনটি নদী- ধরলা, জলঢাকা, শিলতোর্সার জল বণ্টনের যে বিকল্প প্রস্তাব করেছিলেন তা কতটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব তা এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আরও বলেছেন, তিস্তাচুক্তি শুধু বাংলাদেশ আর ভারতের বিষয় নয়, এখানে পশ্চিম বাংলাও গুরুত্বপূর্ণ স্টেক-হোল্ডার। তিনি বলেছেন, তাই আমরা মমতার সঙ্গে কথা বলাকে গুরুত্ব দিচ্ছি।

১৯৬০ সালে ভারত আর পাকিস্তানের মাঝে সিন্ধু নদীর জল বণ্টন নিয়ে চুক্তি হয়েছিলো। সেখানে পাঞ্জাব রাজ্য ছিল চরম গুরুত্বপূর্ণ স্টেক-হোল্ডার। কিন্তু জওহরলাল নেহরু এতো বাজে প্রশ্ন তুলে আলোচনাকে বিভ্রান্ত করেননি। নেহরু জানতেন সিন্ধু আন্তর্জাতিক নদী, তার জলের হিস্যা পাকিস্তানও পাবে। সুতরাং উভয় রাষ্ট্রের অসুবিধা না হয় অনুরূপ একটা চুক্তির প্রয়োজন। উভয়ে পরস্পরকে সাহায্য করেছিলেন যেন শান্তিপূর্ণভাবে চুক্তিটা সম্পাদন করা যায় এবং বিশ্বব্যাংক তার মধ্যস্থতা করেছিলো। বিকল্প নদী খননের জন্য যে অর্থের প্রয়োজন হয়েছিল তাও বিশ্বব্যাংক সরবরাহ করেছিল। নেহরুর কাছে নৈতিকতাবোধ ছিল যে কারণে তিনি বর্তমান ভারত সরকারের মতো এত অজুহাত, এত টালবাহানা সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালাননি।

গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘ ২৪ বছর আলোচনা হয়েছে। আর যৌথ নদী কমিশনের যখনই বৈঠক হয়েছে তখন ভারত সংযোগ খাল খননের প্রস্তাব করেছে। যমুনা থেকে খাল খেটে পানি এনে গঙ্গায় ফেলতে হলে খাল কাটতে গিয়ে যে ভূমি বিনষ্ট হয়, পরিমাপ করে দেখা গেছে যে তা কুষ্টিয়া জেলার সমান। বাংলাদেশের মতো ছোট একটা দেশের পক্ষে এত ভূমি বিনষ্ট করা কি সম্ভব? কিন্তু ভারত বারবার সেই প্রস্তাবই করতো। বড় দেশ ছোট দেশের সঙ্গে কথা বলতে মাপজোক রেখে কথা বলতো না।

নেহরুর পরে ভারতীয় কোনও প্রধানমন্ত্রীই প্রতিবেশীদের সঙ্গে নৈতিকতাবোধ নিয়ে সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করেননি। নিজেদের প্রয়োজনে প্রতিবেশীকে ব্যবহার করা ছাড়া অধিক কোনও চিন্তাই তারা করেননি। এখন সম্ভবত আমাদের প্রধানমন্ত্রী বুঝেছেন যে ভারত তিস্তার পানি নয়-ছয় করে দেবে না। মমতা যে বিকল্প প্রস্তাব করেছেন এখন সুষমা স্বরাজের কথায় বুঝা গেলো কেন্দ্রীয় সরকার তাই নিয়ে চিন্তা করছে। হয়ত তারা নিজেরাই কোনও সময় বিনয়ের সঙ্গে সে প্রস্তাব বাংলাদেশ সরকারের কাছেও উত্থাপন করতে পারেন।

সম্ভবত সে কারণে শেখ হাসিনা তার ২৫-২৬ মে’র পশ্চিমবঙ্গ সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিস্তা প্রসঙ্গে বলেছেন, তিনি কারও ওপর ভরসা করেন না। আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি, সুষমা স্বরাজ বারবার বাংলাদেশকে মমতার সঙ্গে কথা বলার কথা বলেছেন। মমতা ভারত সরকার নয়। সুতরাং বাংলাদেশ কেন মমতার সঙ্গে কথা বলবে? তিস্তা আন্তর্জাতিক নদী। মমতা কখনও পানি এক তরফাভাবে প্রত্যাহার করতে পারেন না। সে কথা তো দিল্লি সরকারই পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বুঝাবে।

গঙ্গা চুক্তির আগে অবশ্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মরহুম আব্দুল সামাদ আজাদ পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত জ্যোতি বসুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। জ্যোতি বসু ছিলেন সিজনড পলিটিশিয়ান এবং নৈতিকতাবোধসম্পন্ন লোক। তিনি গঙ্গা চুক্তি সম্পর্কে সহযোগিতার পরিপূর্ণ আশ্বাস দিয়েছিলেন এবং সম্পাদন না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়াকে বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিয়ে চুক্তি সম্পাদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। কিন্তু মমতা আর জ্যোতি বসু এক নন। মমতার সঙ্গে আমাদের প্রধানমন্ত্রী কথা বলেও কোনও সুরাহা করতে পারছেন না।

মমতার ঢাকার কথার সঙ্গে কলকাতার কথার মিল নেই। কলকাতার কথার সঙ্গে দিল্লির কথার কোনও সামঞ্জস্য নেই। ভারতীয় বর্তমান সময়ের নেতাদের কথায় আস্থা রাখাই মুশকিল। সম্ভবত এ কারণেই দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে কোনোভাবেই ভারতের সুসম্পর্ক নেই এখন। এমনকি ছোট দেশ মালদ্বীপের সঙ্গেও সুসম্পর্ক অব্যাহত রাখতে পারেনি তারা। পার্শ্ববর্তী বৃহৎ রাষ্ট্র চীন থাকাতে ছোট রাষ্ট্রগুলোর নিঃশ্বাস নেওয়ার অবকাশ হয়। না হয় ভারত ছোট প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে চোখ রাঙানির ওপর রাখার চেষ্টা করতো। নেপালকে দীর্ঘ চার মাস অবরোধ করে রেখেছিল। কারণ, নেপাল তার প্রদেশ বিন্যাসের সময় ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকে ভরা মাদিসি এলাকাকে ভারতের পরামর্শ মতো পৃথক প্রদেশ করেনি।

তিস্তার পানিবণ্ট ন নিয়ে যখন কোনও সুরাহা হচ্ছে না, তখন আমরা পরামর্শ দেব যেন আমাদের সরকার একজন মধ্যস্থতাকারী রাখার প্রস্তাব করেন। সিন্ধুর পানিবণ্ট ন চুক্তিতে বিশ্বব্যাংক ছিল ভারত-পাকিস্তানের মাঝে মধ্যস্থতাকারী। বিশ্বব্যাংক খাল খননের জন্য প্রচুর টাকাও প্রদান করেছিলো।

তিস্তা নিয়ে লিখতে হচ্ছে সুষমা স্বরাজের সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য শুনে। সুষমা স্বরাজ পশ্চিম বাংলাকে স্টেকহোল্ডার বলে তিস্তা পানিবণ্ট ন চুক্তিটাকে দ্বিপক্ষীয় বিষয় না রেখে বহুপক্ষীয় বিষয় করার চেষ্টা করছেন। পশ্চিম বাংলা ভারতেরই রাজ্য। আন্তর্জাতিক নদীর পানিবণ্টনে তার যে ভূমিকা তা ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। ভারত সরকার ইচ্ছা করলে পশ্চিম বাংলাকে অবগত করে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকারকে আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদন করতে কোনও রাজ্য বাধা দিতে পারে না।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী ভারত গিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন করার জন্য। তিনি এবং নরেন্দ্র মোদি যৌথভাবে ভবনটি উদ্বোধন করেছেন। নরেন্দ্র মোদি বিশ্ব ভারতীর আচার্য্য। শেখ হাসিনার সফরটা সরকারি সফর ছিল বলা যাবে না। বিশ্ব ভারতীর অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল বাংলাদেশ। সেই উপলক্ষে মোদির সঙ্গে, মমতার সঙ্গে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর পৃথকভাবে একান্ত বৈঠক হয়েছে। ধারণা করা যায় তারা সেখানে তিস্তা নিয়েও আলোচনা করেছেন। কিন্তু সরকারিভাবে যেহেতু সে সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি, আমরাও জানি না কী আলোচনা হয়েছে।

সে কারণে ধরে নিচ্ছি এই সফরে সরকারিভাবে তিস্তা নিয়ে বৈঠকে কোনও আলোচনা হয়নি। হলেও ফলাফল শূন্য হতো। গত এপ্রিলে লন্ডনে কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনকালেও মোদি-হাসিনা দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন। তিস্তা নিয়ে তখনও আলোচনা করেছেন বলে সরকারিভাবে জানানো হয়েছিল। পানি নিয়ে আলোচনার তিক্ত অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় বলেছেন, বহু সমস্যার সমাধান হয়েছে, আরও সমস্যা রয়েছে, তার কথা তুলে এ অনুষ্ঠানকে ভারাক্রান্ত করবেন না।

প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ প্রবাসী সরকার থিয়েটার রোডের যে ‘অরবিন্দ ভবন’ থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন সে অরবিন্দ ভবনে মুজিব মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার যে প্রস্তাব করেছেন পশ্চিম বাংলার সরকার তাতে সম্মতি দিয়েছে। ভবনটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত। সুতরাং তার রক্ষণাবেক্ষণ ঐতিহাসিক দায়িত্ব। আশা করি জাদুঘরটা এমনভাবে সাজানো হবে যেন দর্শনার্থীরা ভবনটা ঘুরে মুক্তি সংগ্রামটা আগা-গোড়া বুঝে নিতে পারে।

শুনতে পাচ্ছি বাংলাদেশের প্রস্তাবে নাকি আপত্তি শ্রী অরবিন্দ ভবন ট্রাস্টি বোর্ডের। ভবনের অধিকার না ছাড়ার আবেদন করে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিচ্ছে ট্রাস্টি বোর্ড। থিয়েটার রোড এখন নতুন নামকরণ হয়েছে শেক্সপিয়র সরণি। মমতা বাংলাদেশের আবেগ রক্ষায় কতটা সচেতন হয় দেখা যাক।

লেখক: সাংবাদিক

এমএ/ ০২:৩৩/ ০৫ জুন

মুক্তমঞ্চ

  •  1 2 > 
Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে