Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (35 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৬-০২-২০১৮

'জীবন আমাকে ব্যর্থতা শিখিয়েছে'

'জীবন আমাকে ব্যর্থতা শিখিয়েছে'

বাংলা ভাষার অন্যতম আধুনিক কবি জয় গোস্বামী। তার প্রথম কবিতা ছাপা হয় ১৯ বছর বয়সে। সেই যে শুরু। অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেছে। থামেননি। 

বাংলা সাহিত্যের কাব্যাকাশে বীরদর্পে হেঁটে চলেছেন দুই বাংলায় সমান পাঠকপ্রিয় কবি জয় গোস্বামী। উপন্যাস লিখেও পেয়েছেন দারুণ খ্যাতি। 

১৯৫৪ সালের ১০ নভেম্বর কলকাতায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ বছর বয়সে সপরিবারে চলে যান রানাঘাট। কলকাতার সল্টলেকের শ্রাবণী আবাসন প্রকল্পের বাসভবনে চলতি বছরের ১৭ মে মধ্যদুপুরে কথা হয় কবির সঙ্গে। কথা হয় জীবন ও মৃত্যু নিয়ে। প্রেম ও বিরহ নিয়ে। জয় গোস্বামী শোনান তার কবি হয়ে ওঠার গল্প। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইজাজ আহ্‌মেদ মিলন
 
-আপনার সময় কাটছে কেমন?
 
--কেটে তো যাচ্ছে। কেটে যায়-সময়।
 
-জীবনের শুরুর কথা দিয়েই শুরু করি-
 
--আমি কলকাতায় জন্মেছি। পাঁচ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে রানাঘাটে চলে যাই। রানাঘাটের একদিকে ছিল নদী, আরেকদিকে রেলস্টেশন। সেই স্টেশনের ওপারের মাঠ পেরিয়ে ছিল গ্রাম। নদী পেরোলে পুরোটাই গ্রাম। সেখানেই ছিলাম আমি পরবর্তী ৩১ বছর। ৩১ বছরের মাথায় আমি কলকাতা এসে থাকতে শুরু করি। আট বছর বয়সে বাবা মারা যান। মা স্কুল পড়াতেন। ১৯৮৪ সালে মাও চলে যান। আমি কবি হবো বলে ছোটবেলা থেকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়নি। আমার মাথায় কতগুলো লাইন আসত, সেগুলো খাতায় লিখে রাখতাম। এ রকমভাবে আপন মনে মাথায় কয়েকটা লাইন আসা এবং সেই লাইনগুলো নিয়ে পরিশ্রম করতে করতে একটা কবিতা দাঁড় করানো, এই পদ্ধতির মধ্যে আমি চলে যাই। আর অনেক কবিতা আমি পড়তাম ছোটবেলা থেকে। কবিতা পড়তে আমার ভালো লাগত। ফলে এভাবেই আমি লিখেছি। 
 
-কবি হওয়ার স্বপ্ন দেখলেন কবে?
 
--না। কবি হতে হবে এ রকম কোনো বড় উচ্চাশা আমার মধ্যে ছিল না। লিখতে লিখতে একসময় কবিতার চেহারা নেয়। তারপর একসময় মনে হলো, লোভ হলো যে, এটা ছাপালে কেমন হয়! বা আমার লেখা ছাপা হয় কি-না। এই ভেবে আমি ডাকযোগে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা পাঠাতাম। দেখা গেল দুটো ছাপা হলো, আটটা হলো না। তাতে আমি মন খারাপ করতাম না। ভাবতাম লেখা হয়তো ভালো হয়নি। এভাবে ডাকে পাঠিয়ে পাঠিয়েই আমার কবিতার জগতের মধ্যে আসা, যা পাঠাতাম তার বেশিরভাগই ছাপা হতো না। ১৯ বছর বয়সে আমার প্রথম কবিতা ছাপা হয়। একই সঙ্গে পদক্ষেপ, সীমান্ত সাহিত্য ও হোমশিখা নামে তিনটি ছোট পত্রিকায় আমার কবিতা ছাপা হয়। ১৯৭৬ সালে 'দেশ পত্রিকায়' আমার কবিতা ছাপা হয়। ডাকযোগে দেশ পত্রিকায় কবিতা পাঠাতাম। পরে অবশ্য নিয়মিত লিখতে থাকি দেশ-এ। 
 
-আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে কিছু বলুন?
 
--একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। আমি অন্য কিছু করতে পারতাম না। বেশি লেখাপড়া শিখিনি তো। স্কুলে পড়ানো, কলেজে পড়ানো বা ব্যাংকে চাকরি করা- এই ধরনের কোনো যোগ্যতা আমার নেই। সাগরময় ঘোষ আমাকে বলেছিলেন, তুমি এসো দেশ পত্রিকায় চাকরি করো। তার কথায় আমি চাকরি করতে শুরু করি। পরবর্তীকালে ঋতুপর্ণ ঘোষ আমাকে নিয়ে আসেন সংবাদ প্রতিদিনে। 
 
-দাদা, একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলতে চাই 
 
--বলো।
 
-সংক্ষেপে যদি বলেন, জীবনটা কীভাবে কাটালেন?
 
--যে জীবন আমি কাটিয়েছি, সেই জীবনে আমি একজন ব্যর্থ মানুষ। আমি আমার নিকটজনদের কাউকে সুখী করতে পারিনি। তাদের কাউকে আনন্দ দিতে পারিনি। ব্যক্তিজীবনে আমি একজন ব্যর্থ মানুষ। আমি এটাকে এখন স্বীকার করে নিয়েছি। জীবনের এই ব্যর্থতাকে স্বীকার করেই আমাকে চলতে হবে। 
 
-এই যে জীবন, তা আপনাকে কী শিক্ষা দিল?
 --ব্যর্থতা। জীবন আমাকে ব্যর্থতা শিখিয়েছে। 
 
-'মৃত্যু', মৃত্যু মানে কী? মৃত্যুটা আপনার ভাবনায় কীভাবে আসে।
 
--মৃত্যু সম্পর্কে বলতে গেলে, মৃত্যুকে আমার খুব ভয় আছে। মৃত্যু যন্ত্রণাকে আমি খুব ভয় পাই। সে তো আসবেই একসময়। মৃত্যু যন্ত্রণা যে আমার দীর্ঘ না হয়। এটুকুই আমার কামনা। 
 
-মৃত্যু সম্পর্কে আপনার ধারণাটা কেমন? মৃত্যু মানে কি শেষ?
 
--মৃত্যুর পরে কোনো জীবন আছে বলে আমার মনে হয় না। 
 
-আপনি পাগলীর সঙ্গে যেভাবে জীবন কাটানোর কথা বলেছেন পাঁচালি : দম্পতি কথায়? কবিতায় বলা বাসনাময় সেই জীবন কি কাটানো হলো? কতটা পূর্ণ হয়েছে, কতটা অপূর্ণ রয়েছে?
 
--(কিছু সময় নীরব থেকে) কবিতা তো আক্ষরিক অর্থে যাকে বাস্তব বলে- তা নয়। কবিতায় যা লেখা হয়, তা কবিতায় শুদ্ধ। আকরিক অর্থে যা বাস্তব তাই তো কবিতা নয়। সুতরাং এটাই আমার উত্তর।
 
-সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান কখন? 
 
--আমার জীবন সম্পর্কে যদি কেউ যা হয়নি তাই বলে তাহলে খুব দুঃখ হয়। আমার জীবনে যা ঘটেনি তা যদি প্রচারিত হয় এবং সে কথা ছাপা হয় এবং তা প্রায়ই হয়। অনেক সময় নাম করে, অনেক সময় নাম না করে। এসব যখন লোকমুখে ফেরে তখন অসম্ভব কষ্ট হয়। সেই কষ্টে অন্তরটা শুকিয়ে যায়। যারা করেন তারা জানেন, এভাবে আমাকে কষ্ট দেওয়া যায়। 
 
-এখন সাহিত্য আড্ডাগুলোতে কি যাওয়া হয়?
 
--পশ্চিমবঙ্গে কোথাও কোনো কবিতা সমাজে আমার যাতায়াত নেই।
 
-আপনার ফরমায়েশি লেখা নিয়ে কেউ কেউ নেতিবাচক মন্তব্য করেন।
 
--আমি যে সব সময় ফরমায়েশি কবিতা লিখি তা নয়। নিজের ইচ্ছায়ও লিখি। 

শোনো, পিকাসো একটা কথা বলেছিলেন, 'একবার একটা ক্যানভাসের সামনে যখন দাঁড়াই মনে হয়, আমি নিজেকে শূন্যের মধ্যে ছুড়ে দিচ্ছি কী উঠে আসবে সেটা না জেনেই '। আমি কিন্তু সেই পদ্ধতিটার সঙ্গে পরিচিত। পত্রিকাগুলো থেকে বিষয় বলে দেওয়া হয়- আমি সেই বিষয়ের ওপর লিখি। এ কারণে পশ্চিমবঙ্গের একটি মহল আমাকে বিদ্রুপ করে। তারা যে ভুল সেটা আমি বলি না। কারণ তারা মনে করেন, কোনো একটা বিষয় দিয়ে দেওয়া হলে, সেভাবে লিখে দিলে কবিতারও অপমান, নিজেরও অপমান। এটা হলো এক ধরনের যুক্তি। আবার নিজের অভিজ্ঞতা আমি যদি বলি, আমিও আগে অনেকটা এ রকম ভাবতাম। যখন আমি এই ধরনের কোনো বিষয়ের ওপর কবিতা লিখতাম, তখন এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইনি। যারা এ কথা বলেন, তারা আমার মতো এমন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাননি। কারণ তাদের পেশা সাহিত্য নয়। সাহিত্যটাকে তারা অনেক শুদ্ধ রাখতে পেরেছেন। কিন্তু আমি শুদ্ধ রাখতে পারিনি। আমি আমার অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমি এভাবেই চলেছি। চলে যাচ্ছে।
 
-বেণীমাধব কবিতাটি আমার প্রিয় একটি কবিতা। 
 
--ওটার নাম তো বেণীমাধব নয়। কবিতার শিরোনাম 'মালতিবালা বালিকা বিদ্যালয়'।
 
-কবিতাটি লেখার নেপথ্য কথা শুনতে ইচ্ছে করছে।
 
--আজ না। অন্যদিন আবার বলব। আজ সব বলে ফেললে হবে? 
 
-বাংলাদেশের লেখকদের লেখা তো আপনি পড়েন। কার লেখা ভালো লাগে।
 
--অনেকের লেখাই আমি পড়ি। তবে এই মুহূর্তে কারও নাম বলতে পারব না। বাংলাদেশের অনেক লেখকের লেখার জন্য আমি অপেক্ষাও থাকি। 
 
-আমাকে সময় দেওয়ার জন্য আপনার প্রতি আমার অন্তহীন কৃতজ্ঞতা রইল।
 
--বাংলাদেশ থেকে তুমি এসেছ, কষ্ট করে আমার পর্যন্ত পৌঁছেছ, ধন্যবাদ তোমাকে। 

এমএ/ ১০:৩৩/ ০২ জুন

সাক্ষাতকার

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে