Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (44 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৫-২৭-২০১৮

ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বক্তব্যে থলের বিড়াল বেরিয়ে এলো

আবদুল গাফফার চৌধুরী


ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বক্তব্যে থলের বিড়াল বেরিয়ে এলো

এবার মাহে রমজানের শুরুতেই বিএনপি ঢাকায় একাধিক ইফতার পার্টি করেছে। তার মধ্যে পহেলা রমজান করেছে রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতাদের জন্য। ইফতার পার্টি তো রমজান এলে সব দলই করে থাকে। এবারও তারা করছে। তবে বিএনপির ইফতার পার্টির এবারের উদ্যোক্তা খালেদা জিয়ার বদলে তার পুত্র এবং দলের ভারপ্রাপ্ত নেতা তারেক রহমান। তবে তিনিও এই ইফতার পার্টিতে হাজির থাকতে পারেননি। তার মা জেলে। তিনিও দুর্নীতির দায়ে দেশের উচ্চ আদালতের বিচারে কারাদণ্ডাদেশ পেয়ে বিদেশে দীর্ঘদিন ধরে পলাতক জীবনযাপন করছেন।

এ ছাড়াও বিএনপির এবারের ইফতার পার্টির কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। এক. এই ইফতার পার্টিতে আগেকার মতো আওয়ামী লীগের নেতাদের দাওয়াত দেওয়া হয়নি। যদিও আগেকার বছরগুলোতে আওয়ামী লীগ কখনও এই দাওয়াতে আসেনি। এবার তারা দাওয়াতই পায়নি; দুই. ড. কামাল হোসেন ও তার দল গণফোরামকে এই মাহফিলে সাদর আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ড. কামাল হোসেন আগে এসেছেন, এবার আসেননি। ইতিপূর্বে ্িবএনপির দাওয়াতে তিনি এসেছেন এবং খালেদা জিয়া ও মতিউর রহমান নিজামীর ('৭১-এর যুদ্ধাপরাধী হিসেবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত) পাশে আসন গ্রহণ করেছেন। এবার একটি নির্বাচনী বছরে তিনি কেন এলেন না, তা নিয়ে কথা উঠেছে; তিন. কর্নেল (অব.) অলির লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সদস্য। কিন্তু বিএনপির ইফতার মাহফিলে এবার তিনি আসেননি। অবশ্য তার দলের প্রতিনিধি এসেছেন। এই ব্যাপারটিও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি এড়ায়নি; চার. ইফতার পার্টিতে দেওয়া বিকল্প ধারার সভাপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বক্তৃতা অধিকাংশ বিএনপি নেতার পছন্দ হয়নি। আবার নিরপেক্ষ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকের কাছে তা দেশের রাজনীতির জন্য অশনিসংকেত মনে হয়েছে।

এবারের এই ইফতার পার্টির বৈশিষ্ট্যগুলো থেকে কেউ কেউ মনে করেন, বিএনপি জোট এখন ঐক্যরক্ষার প্রশ্নের সম্মুখীন। ঢাকার কাগজেই প্রকাশিত হয়েছে, পর্দার আড়ালে ড. কামাল হোসেন, ডা. বদরুদ্দোজা, কর্নেল (অব.) অলি, আ স ম আবদুর রব প্রমুখ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে বিরোধীদলীয় আরেকটি জোট গঠন করতে চাইছেন। কোমর ভাঙা বিএনপির সঙ্গে তারা জোট বাঁধতে চান না। অন্যান্য কারণ ছাড়াও বিএনপিতে দুর্বিনীত তারেক রহমানের নেতৃত্ব তাদের অনেকের কাছে অসহ্য ও অস্বীকৃত।

সম্প্রতি ঢাকার একটি দৈনিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেনারেল জিয়ার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং জিয়ার মৃত্যুর বেশ কিছুদিন পর খালেদা জিয়া একেবারেই অনভিজ্ঞ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার রাজনৈতিক মনিটর ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন, 'আমরা শঙ্কিত যে, খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান যদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়, তাহলে দেশের সর্বনাশ হয়ে যাবে।' তারেক রহমানের মতো এক দণ্ডিত অপরাধী যে দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য নন, শুধু এই কারণে নয়, তার ওপর ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ব্যক্তিগত রাগও রয়েছে।

২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিএনপির তৎকালীন অন্যতম শীর্ষ নেতা ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রথমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরে রাষ্ট্রপতি হন। এ সময় জামায়াত বিএনপির কাঁধে ভর করেছে। এই জামায়াতের সঙ্গে চক্রান্ত করে তারেক রহমান এই বর্ষীয়ান নেতা এবং পিতৃবন্ধুকে অপমান করে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করেন। পরে মহাখালী রেলক্রসিংয়ের কাছে এক শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেওয়াকালে তিনি তারেক বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত ও লাঞ্ছিত হন। কর্নেল (অব.) অলিকেও চট্টগ্রামের রাজনীতিতে জামায়াতকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য তারেকই দল ছাড়তে বাধ্য করেন।

দলের মধ্যেও তারেক নেতৃত্ব বিতর্কিত। খালেদা জিয়া পুত্রকে দলের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ায় দলের বহু নেতাকর্মী প্রকাশ্যে তা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু মনে মনে মেনে নিতে পারেননি। বিএনপি জোটেও যেসব দল ও বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা রয়েছেন, যেমন বীরবিক্রম ইবরাহিম কিংবা জোটের বাইরের কাদের সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না প্রমুখ বিএনপির ইফতার পার্টিতে এসেছেন বটে। কিন্তু তারেকের বিএনপির নেতা হওয়ার সুবাদে তার জোটেরও নেতা হওয়া কি তারা মেনে নিতে পারবেন? সন্দেহ নেই- ড. কামাল, ডা. চৌধুরী, কর্নেল অলি প্রমুখের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক জোট গঠিত হলে এরা সেদিকেই ছুটবেন। আমার ঢাকার বন্ধুরা বলছেন, অর্ধডজনের বেশি দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ছাড়বে। বিএনপি জোটের অবস্থা হবে ত্রিশঙ্কু মহারাজের মতো। এই ঐক্য আদৌ টেকসই হবে কিনা, তা এখন দেখার বিষয়।

এবার আসি বিএনপির ইফতার পার্টিতে ডা. বি. চৌধুরীর বক্তৃতার কথায়। আমি জানি না, তিনি নিজের জ্ঞাতসারে, না অজ্ঞাতসারে একটি থলের বিড়াল বের করে দিলেন কিনা। এই বিড়ালটি আবার আমাদের একটি সুশীল সমাজের দ্বারা পোষা। ডা. চৌধুরী বিএনপির ইফতার পার্টিতে বলেছেন, 'আজ বিএনপি নেতাদের অনেকের বুক ভয়ে দুরুদুরু করে। করবে না কেন? তারা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। কী হবে? যদি আবার সরকারি দল ক্ষমতায় আসে? এটা স্বাভাবিক ভয়। আমার অভিজ্ঞতা বলে, কারোই খুব সুবিধা হবে না। এখন এমন একটা শক্তি দরকার, যে শক্তি এদিক কন্ট্রোল করতে পারে এবং সেদিকও কন্টোল করতে পারে।'

মনে হয়, একটা থার্ড ফোর্স বা তৃতীয় শক্তির প্রতি তিনি ইঙ্গিত করেছেন। এই তৃতীয় শক্তি কারা, তা তিনি ব্যাখ্যা করেননি! এই শক্তি কি কেবল সিভিল, না এর সঙ্গে অন্য কোনো শক্তির যোগ হবে, তাও তিনি স্পষ্ট করেননি। অন্য শক্তির যোগ না হলে দু'পক্ষকেই সামলাবে কারা? আমাদের একটি সুশীল সমাজ এবং একটি 'নিরপেক্ষ' মিডিয়া গ্রুপের দিনের সাধনা এবং রাত্রির তপস্যা তো গুড গভর্ন্যাসের নামে এ ধরনের শক্তির দ্বারা গঠিত সরকারের জন্য। সেই সরকার হবে দুর্নীতিমুক্ত ধোয়া তুলসী পাতা। তাদের সেই অভিলাষের কথাই কি ডা. চৌধুরী নিজের অজান্তেই প্রকাশ করে ফেললেন? থলের বেড়ালটি কি এমনি করেই বেরিয়ে এলো?

আমার ধারণা, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী মাইনাস টু থিয়োরিরই একটা নতুন ভার্সনের কথা বলছেন। কিন্তু এই থিয়োরি নিয়ে একটা এক্সপেরিমেন্ট তো এক-এগারোর আমলে হয়ে গেছে। পরীক্ষাটি অল্প সময়ে ব্যর্থ হয়েছে। এক-এগারোর সিভিল কাম মিলিটারি সেই সরকার দেশকে গুড গভর্ন্যাস বা সুশাসন তো দিতে পারেনি। তদুপরি অল্পদিনের মধ্যে দারুণভাবে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ে। সুশীল সমাজ ও 'নিরপেক্ষ' মিডিয়া গ্রুপ তাদের জোর সমর্থন দিয়েও ক্ষমতায় রাখতে পারেনি।

ড. কামাল, ডা. বি. চৌধুরী প্রমুখ তথাকথিত সুশীল নেতারা যে আশায় গোঁফে তা দিচ্ছেন, তা এবারের নির্বাচনে সফল হবে না। এমনকি ২০০১ সালের সাহাবুদ্দীন-লতিফুর মার্কা নির্বাচনেরও পুনরাবৃত্তি হবে না। বিএনপি অবশ্য অতি আশায় বুক বেঁধে বিদেশি, বিশেষ করে পশ্চিমা কূটনীতিকদের জন্য জমকালো ইফতার পার্টি দিয়েছেন। কিন্তু ২০০১ সালের মতো একদল শক্তিশালী বিদেশি কূটনীতিক দেশীয় একটি সুশীল সমাজ ও পত্রিকা গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলিত হয়ে হাসিনা সরকারকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামাতে চাইবে, সে সম্ভাবনা কম।

প্রথমত, হাসিনা সরকারের পররাষ্ট্রনীতি এখন অনেক প্রাগমেটিভ এবং হাসিনা নেতৃত্ব বিশ্বময় স্বীকৃত ও সম্মানিত। এই সরকারের বিরুদ্ধে বড় শক্তির কোনো অবস্থান নেই। আর যদিও তাদের কেউ বিরোধী জোটের প্রতি অপ্রকাশ্য পক্ষপাতিত্ব দেখাতে চান, সেটা যাবে ড. কামাল হোসেনদের সম্ভাব্য জোটের দিকে। বিএনপি জোটের দিকে নয়। ড. কামাল হোসেনদের জোট গঠিত না হলেও বিএনপির ভাঙা শিবিরের পক্ষে এবার সেই পক্ষপাতিত্ব লাভ সম্ভব হবে কি?

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, 'গোপন কথাটি রবে না গোপনে।' আমাদের তথাকথিত সুশীল সমাজ ও তথাকথিত সুশীল নেতাদের মনের গোপন কথাটি এখন আর গোপন নয়। সম্ভবত ডা. বি. চৌধুরীর মুখ থেকে তার জ্ঞাতসারে অথবা অজ্ঞাতসারে বেরিয়ে এসেছে। এক ব্রিটিশ দার্শনিক বলেছেন, 'অ মড়ড়ফ মড়াবৎহসবহঃ রং হড়ঃ ধষধিুং সু মড়াবৎহসবহঃ' অর্থাৎ জনগণের কাছে গুড গভর্নমেন্টই সবসময় বড় কথা নয়। তাদের কাছে বেশি কাম্য নিজেদের সরকার। বাংলাদেশের ব্যাপারে কথাটা আরও সত্য।

পাকিস্তান আমলে আইয়ুব সরকার তাই উবাবষড়ঢ়সবহঃ ৎধঃযবৎ :যবহ ফবসড়পৎধপু বা গণতন্ত্রের চাইতে উন্নয়ন ভালো স্লোগান তুলে ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। জনগণ ভালো-মন্দ মিশ্রিত নির্বাচিত সরকার ফিরিয়ে এনেছে। বাংলাদেশে কোনো সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসন টেকেনি। দারুণ ভালো-মন্দ মিশ্রিত গণতান্ত্রিক সরকার জনগণ চেয়েছে এবং তার জন্য রক্ত ঢেলেছে। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনেও জনগণের শুভ শক্তি ও শুভ ইচ্ছার জয় হবে।

সূত্র: সমকাল

আর/১০:১৪/২৬ মে

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে