Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.1/5 (62 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৫-২১-২০১৮

সংবাদপত্র বন্ধের ধারা কৌশলে যুক্ত করেছিল বিএনপি

মিজানুর রহমান খান


সংবাদপত্র বন্ধের ধারা কৌশলে যুক্ত করেছিল বিএনপি

সংবাদপত্র বাজেয়াপ্ত ও বন্ধের বিষয়টি রহিত করা ছিল স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নন্দিত ফসল। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের যে তিনটি ধারা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাতে এ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

তখন আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সব দল সাহাবুদ্দীন আহমদের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিল। বাংলাদেশ সংবাদপত্র পরিষদও অভিনন্দন জানায়। 

১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদে বিএনপি অনেকটা গোপনে ১৯৭৪ সালের আইনে থাকা পত্রিকা বাতিলের ওই তিন বিধান বিলোপের সিদ্ধান্ত কার্যকর দেখায়। তবে বিএনপি ফৌজদারি কার্যবিধিতে ৯৯ক নামে একটি ধারা যুক্ত করে প্রায় সেই একই বিধান বহাল রাখে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, জানাজানি না হওয়ায় বিষয়টি সেভাবে আলোচনায় আসেনি। সব থেকে চমকপ্রদ হচ্ছে, ৫৭ ধারার যে বিধান নিয়ে এত হইচই এবং বিএনপি যা ২০০৬ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইনে প্রথম যুক্ত করেছে বলে প্রচার পেয়েছে, সেগুলো ১৯৭৪ সালের তৈরি করা বিশেষ ক্ষমতা আইন থেকেই নেওয়া। বিএনপি তখন কোনো তথ্য জেনে ‘নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হওয়া’কে দণ্ডনীয় করেছিল। আওয়ামী লীগ নতুন আইনেও তা রেখেছে।

২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৬ সালে বিএনপির আনা ৫৭ ধারাসহ কয়েকটি বিতর্কিত কালাকানুন আরও কঠোর করে। এখন ২০০৬ সালের আইনের পাঁচটি ধারা বাতিলের ঘোষণা দিলেও এর সব বিষয়বস্তু প্রস্তাবিত নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নানাভাবে যুক্ত করেছে বর্তমান সরকার। এগুলো কেবল অনলাইন প্রকাশনার জন্য প্রযোজ্য হবে।

৫৭ ধারা এখন চারটি ধারায়

২০১৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সিদ্ধান্ত পাস হয়েছে যে ছাপা সংবাদপত্রের জন্য যে অধিকার স্বীকৃত, ঠিক ততখানি অনলাইনের জন্যও রাখতে হবে। বিতর্কিত ৫৭ ধারার মতো ভারতে বাতিল হওয়া ৬৬ক ধারা ঠেকাতে ভারত সরকার সুপ্রিম কোর্টে যুক্তি দিয়েছিল যে ছাপার চেয়ে অনলাইন প্রকাশনার ক্ষতিকর প্রভাব বেশি, তাই কঠোরতম আইন দরকার। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই যুক্তি নাকচ করেন।

সরকার দাবি করছে যে তারা বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিল করছে এবং তথ্য হিসেবে এটি সঠিক। কিন্তু ৫৭ ধারার প্রতিটি উপাদান যে তারা ডিজিটাল আইনে প্রতিস্থাপন করেছে, তার স্বীকৃতি গত ২৩ জানুয়ারি মন্ত্রিসভার জন্য তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা সারসংক্ষেপে দেখা যায়। তথ্যপ্রযুক্তিসচিব সুবীর কিশোর চৌধুরীর সই করা সারসংক্ষেপে তিনি মন্ত্রিসভাকে জানাচ্ছেন, ‘বিদ্যমান বাস্তবতার নিরিখে ৫৭ ধারার উপাদানসমূহ বিবেচনাক্রমে পৃথক ৪টি ধারায় (২৫ [মিথ্যা, ভীতিপ্রদর্শক তথ্য], ২৮ [ ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অনুভূতি], ২৯ [মানহানি] এবং ৩১ [আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো]) বিন্যস্ত করা হয়েছে।

পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, ১৯৭৪, ১৯৯১ ও ২০০৬ সালের পর ২০১৮ সালে এসে আওয়ামী লীগ যে বিল পাস করতে যাচ্ছে, তাতে মুদ্রণ ও অনলাইন মাধ্যমের অধিকারের মধ্যে আকাশ-পাতাল বৈষম্য তৈরি হবে। পুলিশসহ যেকোনো বাহিনী এখন থেকে অনলাইনে প্রকাশিত এবং তাদের মতে আপত্তিকর কিছুর জন্য তল্লাশি চালাতে এবং আপত্তিকর খবর অপসারণ বা ব্লক করার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এমনকি পরোয়ানা ছাড়াই কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারবে।

রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকার

বিএনপি ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর ‘মানহানি’কে পৃথক অপরাধ হিসেবে গণ্য করে আইন করেছিল। সংসদীয় ব্যবস্থা অনুশীলন করা দেশের আইনে সাধারণ নাগরিক থেকে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা আলাদা করে দেখা হয় না। ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় মানহানির যে সংজ্ঞা, তা-ও সবার জন্যই প্রযোজ্য।

ধারণা করা হচ্ছে, ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রবর্তন এবং বিরোধী দলের আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে, বিশেষ করে খালেদা জিয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে ওই বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। মানহানির এই বিশেষ বিধানটি ফৌজদারি কার্যবিধিতে এখনো বহাল আছে।

১৯৯১ সালের ওই বিধানমতে ছাপা পত্রিকায় কেউ রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা স্পিকারের বিষয়ে ‘মানহানিকর’ কিছু প্রকাশ করলে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে ছাপা বই বা পত্রিকার কপি বাজেয়াপ্ত করতে, এমনকি পত্রিকা কার্যালয়ে তল্লাশি চালাতে পারে। তবে সে জন্য পুলিশ কর্মকর্তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের জারি করা পরোয়ানা নিয়ে অভিযানে নামতে হবে।

১৯৭৪ সালের আইনে যেসব কারণে ছাপা পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করা যেত, সেটাই ২০০৬ সালে আরও ব্যাপক মাত্রায় এবং আরও সাজা বাড়িয়ে ২০০৬ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ঢুকিয়েছিল বিএনপি। ২০১৩ সালে সংশোধনী এনে আইনটি আরও কঠোর করা হয়। এর পাঁচ বছরের মাথায় ডিজিটাল আইনে শাস্তির মেয়াদ কিছু ক্ষেত্রে আরও বাড়িয়ে আইন পাস হতে চলেছে।

সাজা বাড়ানো ও কমানো

ডিজিটাল আইনে দণ্ড নির্ধারণ করা নিয়ে বিএনপির পথেই হাঁটছে আওয়ামী লীগ। একই ধরনের অপরাধের সাজা দণ্ডবিধিতে যা আছে, তা বিশেষ আইনে সামঞ্জস্যহীনভাবে বিএনপি বাড়িয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাকে টেক্কা দেয়। এবার তারা বিলে বলেছে, ২০০৬ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারাসহ ৫৪ [কম্পিউটার সিস্টেমের অনিষ্ট], ৫৫ [কম্পিউটার সোর্স কোড পরিবর্তন], ৫৬ [হ্যাকিং] ও ৬৬ [কম্পিউটার ব্যবহার করে অপরাধ] ধারা বিলোপ করবে। এই চারটির মধ্যে তিনটিতে (৫৪, ৫৬ ও ৫৭ ধারায়) সাজা ছিল অনধিক ১০ বছর মেয়াদে।

২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ তিনটি ধারাতেই তা ১৪ বছরে উন্নীত করে। সেই সঙ্গে প্রতিটিতে ন্যূনতম কারাদণ্ড ৭ বছর নির্দিষ্ট করে অপরাধগুলোকে জামিন-অযোগ্য করে। ২০০৬ সালের আইনে ৫৪, ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ ধারার মধ্যে ৫৫ ধারার অপরাধের জন্য তিন লাখ টাকা, বাকি ধারাগুলোতে অর্থদণ্ড ছিল এক কোটি টাকা, যা এখনো বহাল। তবে এবারের নতুনত্ব হলো, দ্বিতীয়বার অপরাধ করলে সাজা দ্বিগুণ হবে। তা ছাড়া প্রস্তাবিত ডিজিটাল আইনে ন্যূনতম কারাদণ্ডের বিধান তুলে দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ডিজিটাল আইনে ৫৭ ধারার অপরাধের সাজা ১৪ বছর এবং ১ কোটি টাকার অর্থদণ্ড হ্রাস করার প্রস্তাব রয়েছে। ৫৭ ধারার অপরাধের জন্য এখন ৩ থেকে ৫ বছরের কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডের পরিমাণ ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

বিএনপি কী করেছিল

১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের আনা ৯৯ক-তে বলা আছে, কোনো মুদ্রণমাধ্যমে দণ্ডবিধির ১২৩ক, ১২৪ক, ১৫৩ক, ২৯২ ধারা, ২৯৫ক, ৫০৫, ৫০৫ক ধারায় যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য রয়েছে, তেমন কিছু প্রকাশ করলে সরকার পত্রিকা বা প্রকাশনা বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। ১২৩ক ধারায় ১০ বছরের শাস্তিযোগ্য বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর কার্য, ১০ বছরের সাজাযোগ্য স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের আলোকে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের নিন্দা, ১২৪ক ধারায় ৩ বছরের শাস্তিযোগ্য সরকারবিরোধী উসকানি, ১৫৩ক ধারায় দুই বছরের শাস্তিযোগ্য নাগরিকের মধ্যে ঘৃণাবিদ্বেষ সৃষ্টি, ২৯২ ধারায় তিন মাসের সাজাযোগ্য ‘অশ্লীল’ কিছু প্রকাশ বা বিক্রি, ২৯৫ক ধারায় দুই বছরের শাস্তিযোগ্য ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, ৫০০ ধারায় ৭ বছরের (২ বছর ছিল, ১৯৯১ সালেই তা ৭ বছরে উন্নীত করা হয়) শাস্তিযোগ্য সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ কিংবা সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ সৃষ্টির কথা বলা আছে।

৫৭ ধারা বনাম ৯৯ক

১৯৯১ সালে বিএনপির আনা ৯৯ক ধারার সঙ্গে ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের আনা ৫৭ ধারার তুলনায় দেখা যায়, কয়েকটি বাড়তি উপাদান যুক্ত করে গোটা ৯৯ক ধারার অপরাধগুলোকেই ৫৭ ধারায় সংকলন করা হয়েছে। তবে ৯৯ক ধারা প্রবর্তনের পর তার প্রয়োগ নিয়ে হইচই হয়নি।পুলিশকে অপরাধ আমলে নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি বলেই তা প্রয়োগ বা অপপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠেনি বলে অনেকে মনে করেন।

২০০৬ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বলেছে, কোনো ব্যক্তি যদি ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা তা কেউ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হওয়া, মানহানি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি বা উপক্রম হওয়া, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা বা কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানিকে অপরাধ বলা হয়েছে।

১৯৯১ সালে বিএনপি ৫ম সংসদে ৯৯ক ধারার ১গ উপদফায় ‘অত্যন্ত অশোভন’, তীব্র বিদ্রূপপূর্ণ, অশ্লীল কিছু মুদ্রণের জন্য পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করারও নতুন বিধান করেছিল। অথচ এগুলোর কোনোটিরই কোনো সংজ্ঞা আইনে দেওয়া হয়নি।

৯৯ক-এর ঘ উপদফায় বিএনপি যে বিধান করেছিল, তাকে বিশেষজ্ঞরা আরও ভয়ংকর বলে বর্ণনা করেছেন। এতে বলা হয়েছে, ‘কোনো শব্দ বা দৃশ্যমান কোনো কিছুর দ্বারা কোনো আমলযোগ্য অপরাধ করতে কোনো ব্যক্তিকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে বা তেমন সম্ভাবনা দেখা দেয়, তেমন কিছু ছাপা হলে তা হবে একটি অপরাধ। আর তেমনটা সরকারের কাছে প্রতীয়মান হলেই তারা পত্রিকা বা বই বাজেয়াপ্ত করতে পারবে।’

বিএনপির ওই পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই বিধানের প্রয়োগ ঘটেনি বলে কেউ প্রতিবাদ করেনি। মানহানির বিষয়টি নিয়ে একটা জগাখিচুড়ি অবস্থা চলছে। তাঁর মতে, শুধু তিনজনের মানহানি সুরক্ষায় আলাদা বিধান সংবিধানে বর্ণিত আইনের সমতার বিধানকে আঘাত করে। ১২৪ক ধারার আওতায় সরকারের সমালোচনা রাষ্ট্রদ্রোহ নয় মর্মে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন, অথচ বাংলাদেশে এমন সমালোচনায় মামলা হয়। এসব কালাকানুন বাতিল হওয়া উচিত।

এমএ/ ০৯:১১/ ২১ মে

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে