Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (43 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৫-১৭-২০১৮

বরেন্দ্রভূমির দৃশ্যকাব্য

অনার্য মুর্শিদ


বরেন্দ্রভূমির দৃশ্যকাব্য

নদী নৌকা ধান- উচ্চারণ করলেই যেন অবধারিতভাবে চোখে ভেসে ওঠে বাংলার আদিগন্ত দৃশ্যপট। ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও নদীবেষ্টিত জনপদের কথা বলতে গেলে আবহমান বাংলার কৃষিসমাজের নিজের একটা অবয়ব আছে। সারা পৃথিবীর যে কোনো গ্রাম ও জনপদ থেকে সেটা আলাদা। এই স্বাতন্ত্র্য নির্দিষ্টভাবে কিছু বৈশিষ্ট্য দ্বারা চিহ্নিত করা যায়। কী গানে, কী সাহিত্যের বর্ণনায়। শিল্পীর ক্যানভাসে তো বটেই। নদী-জল, ফসলের মাঠ ও মাটি, এগুলোর বাংলা রঙ, কৃষক সমাজ ও মানুষের জীবনযাত্রা- এই সবকিছুকেই বাংলার স্বতন্ত্র সেই অবয়বে শিল্পীকে বর্ণনা করতে হয় তার চিত্রপটে। এসবই চিত্র রচনার প্রাথমিক ভিত্তিমূল। যা দিয়ে দর্শক দৃষ্টিতে শিল্পী তার কাঙ্ক্ষিত বিষয়কে ফুটিয়ে তোলেন। দর্শকের অভিজ্ঞতার সাথে কখনও তা হুবহু মিলে যায়, কখনও আংশিক। কখনও বা একেবারেই মেলে না। এখানেই কাজ করে শিল্পীর বিষয় ও ভঙ্গি নির্বাচন। শিল্পী সুমন সরকার নির্বাচন করেছেন বাংলারই এক বিশেষ অঞ্চল বরেন্দ্রভূমিকে। প্রদর্শনীর শিরোনামও তাই 'বরেন্দ্রকাব্য-২'। সুমন নিজেও একজন বরেন্দ্রপুত্র। বরেন্দ্রীয় মৃত্তিকা-ঐতিহ্য তার ক্যানভাসের বিষয়। 

কাজগুলো দেখলে এটা স্পষ্টরূপেই প্রতীয়মান হয় যে, শিল্পী হিসেবে সুমনের দায়বদ্ধতা তার মাটির কাছে। তিনি নিছক মনের আনন্দে শিল্প করেছেন বলে মনে হয় না। আনন্দের চেয়ে দায়বদ্ধতাই তার কাছে বড়। এই প্রদর্শনীর বিক্রয়লব্ধ অর্থ সুমন বরেন্দ্র অঞ্চল এমনকি বাংলার আদি জাতিসমাজ সাঁওতালদের জন্য নির্মিতব্য জাদুঘরে ব্যয় করবেন।

চলুন, এবার তার ছবির দিকে যাই। প্রথমে আমরা কথা বলব ছবির বিষয় নিয়ে। তারপর কাজের ধরন-ধারণ নিয়ে। এই প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া ২৯টি ছবির বিষয়ই প্রায় কাছাকাছি। তিন-চারটি বিষয়ই ঘুরেফিরে এসেছে প্রদর্শনীতে! এর মধ্যে আছে বরেন্দ্র অঞ্চল বিশেষত সাঁওতালদের কৃষিজীবন, বাসস্থান, শারীরিক অবয়ব প্রভৃতি। তবে কৃষিটাই সম্ভবত বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। শিরোনাম ছাড়া এ ছবিগুলো আবহমান বাংলার ছবিই মনে হবে। কেউ যদি এগুলোকে নদীয়া বা সমতটের ছবি বলে আমার মনে হয় তাও ভুল হবে না। আলাদা করে বরেন্দ্রীয় ভাবার সুযোগটা কম। তবে বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটির ঘর আর কৃষিবিষয়ক চার-পাঁচটি ছবি এই প্রদর্শনীর বিষয়কে কিছুটা হলেও প্রাসঙ্গিক করেছে। 

বরেন্দ্রীয় বা সাঁওতালিদের খাদ্যাভ্যাস, উৎসব, সাংস্কৃতিক চর্চা, ধর্মাচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো থেকে যদি একটি করে ছবিও প্রদর্শনীতে স্থান পেত তাহলে 'বরেন্দ্রকাব্য-২' নামটি সফল এবং সার্থক হতো। যেমন- সাঁওতালরা ঢোল, তবলা, দোতারা, বাঁশি, মেগোর মতো বাদ্যযন্ত্র নিজেরাই বানায় এবং বাজায়। তারা ঘরের দেয়ালে ছবি আঁকে। সে রকম সাংস্কৃতিক দিক অনুপস্থিত। মাটির দেয়ালে শিল্পীও ছবি আঁকতে পারতেন। কিন্তু তিনি কি বিষয়টি খেয়াল করেননি নাকি জলরঙে দেয়ালে ছবি আঁকাটা কঠিন বলে তিনি ছেড়ে দিয়েছেন! অন্য জলরঙশিল্পীরা হয়তো বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন। আমরা জানি, সাঁওতালরা মাছ, কাঁকড়া, গুইসাপ, ইঁদুর ও খরগোশ খায়। তাদের এই খাদ্যাভ্যাস নিয়েও একটি ছবি সুমনের দর্শকরা আশা করতেই পারেন।

ছবিতে নারী ও কিশোরীর খোঁপায় ফুলের এবং কানে ঝুমকার ব্যবহার শিল্পীর সাঁওতালি অলঙ্কার সম্পর্কে সচেতনতার পরিচয়। কিন্তু পোশাকের দিকটি সমালোচনার দাবি রাখে। আমরা জানি, সাঁওতালি নারীরা 'ফতা' ও 'আরা শাড়ি' পরেন। প্রদর্শনীর নারী চিত্রগুলোর পোশাকের দিক থেকে সাঁওতালের চেয়ে গতানুগতিক বাঙালি নারীরই প্রতিনিধিত্ব করছে বেশি। তবে শিল্পী কি পরিবর্তিত সাঁওতালের রূপটিই ধরতে চেয়েছেন? কিন্তু একই ছবিতে অতীত এবং বর্তমানের মিশেল যৌক্তিক কি-না তা আমাদের বোধগম্য নয়। আবার এমন অনেক ছবি এখানে আছে, যেগুলো শিল্পী তার স্মৃতি থেকে এঁকেছেন; যা বর্তমানে নেই। তবে কি প্রদর্শনীটি অতীত-বর্তমানের মিশেলে? আমরা জানি না। এর জবাব শিল্পীই ভালো জানেন। 

এখন আমরা কথা বলব শিল্পীর কাজের ধরন-ধারণ নিয়ে। আমরা দেখতে পাচ্ছি এই প্রদর্শনীর সবক'টি ছবিই স্বচ্ছ পদ্ধতির জলরঙে আঁকা। কিন্তু তুলির অবাধ্যতা দুয়েকটি ছবির কিয়দাংশ অস্বচ্ছ করে দিয়েছে। কিন্তু এই কিয়দাংশ গোটা ছবির বক্তব্যকেই অস্পষ্ট করে দিচ্ছে। যেমন একটি ছবিতে আমরা দেখতে পাই, লোকজন হাটে যাচ্ছে। শিরোনাম ছাড়া বোঝার উপায় নেই তারা আসলে কোথায় যাচ্ছে! কারণ, হাটে যাওয়ার জন্য ব্যবহূত প্রফসগুলো ছিল অস্বচ্ছ। হয়তো এই জায়গায় গাঢ় রঙকে হালকা রঙ দিয়ে ঢেকে কোনো ভুলকে সংশোধনের চেষ্টা করেছেন শিল্পী। কিন্তু স্বচ্ছ পদ্ধতির জলরঙে তা কি সম্ভব! সম্ভব হতো, যদি তা গোওয়াশ বা টেম্পরা পদ্ধতির ছবি হতো। কিন্তু এ প্রদর্শনীর সব ছবি ওয়াশে করা। তেলরঙের ছবি হলেও এই দুর্বলতাকে দর্শক নতুন অর্থে গ্রহণ করত। স্বচ্ছ পদ্ধতির জলরঙ হওয়ায় সেই সুযোগটি থাকছে না।

তারপরও রঙের ব্যবহারে শিল্পীকে অনেক ক্ষেত্রেই পাকা মনে হয়েছে। সব মিলিয়ে শিল্পীর কাজে আমরা সন্তুষ্ট না হলেও খুশি। ছবির বিষয় এবং কাজের ধারা সংক্রান্ত এই নিছক সমালোচনা নিশ্চয় সুমনের ছবিকে দুর্বল আখ্যা দিতে পারে না। এমনকি তার পবিত্র স্বপ্নকেও না। সাঁওতালদের প্রতি সুমনের অনুভূতিতে মনে হয় তিনি বিলীন সাঁওতালদের একলব্যের ভূমিকা পালন করছেন। এই নগরকেন্দ্রিক শিল্পচর্চার যুগে সুমন বুকের মধ্যে লালন করছেন এক খণ্ড লাল মৃত্তিকা, যা রাষ্ট্রের শোষণের প্রতি তার দ্রোহের বহিঃপ্রকাশ। তার এই বৈপ্লবিক রোমান্টিকতা একদিন সব সুন্দরের কানে নিশ্চিত পৌঁছে দেবে- এ দ্রোহ আমাদের, সবার। 

'বরেন্দ্র কাব্য-২' চিত্র প্রদর্শনীটি গত ৪ মে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে উদ্বোধন হয়। ১০ মে ২০১৮ পর্যন্ত চলবে। দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত।

সূত্র: সমকাল
এমএ/ ১১:৩৩/ ১৭ মে

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে