Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (61 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৫-১৪-২০১৮

আমাদের শহরে স্বাগতম

আফজাল হোসেন


আমাদের শহরে স্বাগতম

আম্মার চোখে পানি, আব্বার চোখেমুখে গাঢ় উদ্বেগ মনে পড়ে। মনে পড়ে রবি ময়রার সন্দেশ, ইলিশ ভাজা, শেভ্রোলে ট্যাক্সি আর দর্পচূর্ণ। কবে কীভাবে ঢাকায় এসেছিলাম, পেছনে তাকালে সার বেঁধে এক এক করে এগুলো মনে পড়ে যায়।

প্রথম ঢাকায় এসেছিলাম ১৯৭০ সালে। আসা মানে সিদ্ধান্ত, রওনা আর পৌঁছানো- এমন সাদামাটা ঘটনা নয়। আসার পেছনে ছিল তুলকালাম কাণ্ড। লেখাপড়ায় মন ছিল না। ছবি আঁকতে ভালো লাগত। তখন ছবি আঁকতে রঙতুলি লাগত, জানা ছিল না। আঁকতাম খাতায়, কাগজে। আঁকাআঁকি চলত পেন্সিল দিয়ে, কলম দিয়ে। পাটখড়ির ডগায় তুলো বেঁধে আলতা দিয়েও আঁকা হতো। আঁকতাম দেয়ালে, উঠোনে, গাছের গায়ে, পাতাতেও। গ্রামের নারীরা সেলাই করবেন বলে রুমাল, দস্তরখান, টেবিল ঢাকনা, বালিশের ওয়ারে ফুল-লতাপাতার ছবি আঁকিয়ে নিয়ে যেতেন। কোনো অনুষ্ঠানে কাউকে মানপত্র দেওয়া হবে, তা আঁকা-লেখার জন্য খোঁজ পড়ত। এঁকে-লিখে দিতে ভালো লাগতে।

আমার কাকা আলতাফ হোসেন বিলেতে ডাক্তারি পড়তেন। ছুটিতে বাড়ি এসে এক বিকেলে উঠোনে বসে আমার সঙ্গে অদ্ভুত এক খেলায় মাতলেন বা আমাকে মাতালেন। কাকা খাতায় একটা রেখা এঁকে দেন, আমি তা থেকে তীর-ধনুক এঁকে ফেলি। তিনি একটা শূন্য এঁকে দিলে আমি এঁকে ফেলি মাছ। চারকোনা ঘর এঁকে দিলে আমি তাকে বানিয়ে ফেলি লেজওয়ালা ঘুড়ি। আমাদের সে খেলা চলতেই থাকে। সন্ধ্যের পর বাড়িতে হারিকেন জ্বলে। বিলেতে বাস করা মানুষ গ্রামে এসেছে বলে জ্বালানো হয় হ্যাজাক লাইট। বাড়িঘরে সেদিনও ঝলমলে আলো। কাকা রাতের বেলায় খাওয়ার টেবিলে আব্বাকে বললেন, ম্যা ভাই ও তো খুব ভালো ছবি আঁকে, ওকে ঢাকায় আর্ট কলেজে ভর্তি করালে ভালো হয়। আব্বা খুব রাশভারী গোছের মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন ভাইদের মধ্যে বড়। তখন বড় ভাই মানে সবাই মান্য করবে তাকে এবং তিনিই সব সিদ্ধান্ত দেবেন এমনই নিয়ম। বিলেতে পড়া তখন দামি ব্যাপার ছিল। তেমন ভাই সাহসের সঙ্গে প্রস্তাব করেছে ম্যা ভাই অর্থাৎ মিয়া ভাই তা গুরুত্ব দিলেন। শুনেও শোনেননি এমনটা করতে পারতেন, করলেন না। পাতের দই আঙুলে তুলে খেতে খেতে বললেন, ওকে মন দিয়ে পড়ালেখা করতে বলো। সামনে ম্যাট্রিক পরীক্ষা, ভালোভাবে পাস যদি করতে পারে আর্ট কলেজে ভর্তি করানো যাবে। 

আমার সেদিন ঈদের আনন্দ হয়েছিল। আর্ট কলেজের নাম জীবনে কখনও শুনিনি। সেখানে ছবি আঁকা বিষয়ে পড়ানো হয় তা জেনে বিশেষ উৎসাহ জাগেনি, সে কলেজ ঢাকাতে এবং সেখানে ভর্তি হতে পারলে ইহ জীবনে আর অঙ্কের সঙ্গে দেখা হবে না- এই আনন্দে সেদিন হয়েছিলাম আত্মহারা। পড়ালেখায় খুব বেশি মনোযোগী না হলেও মনে মনে পণ করেছিলাম, ভালোভাবে পাস করতেই হবে। ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছিল। যখন ভর্তির সময় কাছে এলো, আব্বা জানিয়ে দিলেন আর্ট কলেজে ভর্তি করানো হবে না। কেন হবে না? প্রশ্ন করার সাহস পরিবারে কারোরই নেই। জানান দিলেন তিনি। খোঁজখবর করে জেনেছেন, ওইখানে পড়ালেখা করলে ছেলের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আমার মনে স্বপ্ন ওড়াউড়ি করার জন্য ততদিনে অনেক বড় একটা আকাশ তৈরি হয়েছে, হঠাৎ আব্বার এমন সিদ্ধান্তে সব স্বপ্ন উড়তে ভুলে গেল। আকাশটা হয়ে গেল অন্ধকার। ঠিক করে ফেললাম বাড়ি থেকে পালাব। পালালে অন্য কোথাও ভর্তি হতে হবে না। আগে দু'বার দু-চার দিনের জন্য বাড়ি থেকে পালিয়েছিলাম। কিন্তু তৃতীয়বারের কথা যখন মাথায় এলো, ধরেই নিলাম সে পালানো লম্বা সময়ের জন্য হবে।

সিন্দুকের টাকা চুরি করে পালিয়ে গেলাম কলকাতা। আমার মামার বাড়ি ঘণ্টাখানেকের দূরত্ব। গেলাম না সেখানে, জানাজানি হয়ে যাবে বলে। দিন পাঁচেক পর যখন টাকা ফুরিয়ে যাবে যাবে মনে হলো, চোখ-কান বুজে দিলাম রওনা মামার বাড়ির দিকে। পৌঁছে জানতে পারলাম, আম্মা শয্যাশায়ী আর আব্বা ভুল বুঝতে পেরেছেন। তিনি ফিরতে বলেছেন, ভবিষ্যৎ যেমনই হোক ফেরা মাত্র আমাকে ঢাকাতে যাওয়ার বন্দোবস্ত করে দেবেন। 

যেন যুদ্ধ জয় করে ঘরে ফিরলাম। আগের দু'বারে পলায়ন পর্ব শেষ হয়েছিল প্রায় একই রকমভাবে। হাতেনাতে ধরা পড়ার পর পিঠে বড় মাপের চড় আর কান বা ঘাড় ধরে টেনে ও ঠেলে আব্বার মোটরবাইকে ওঠানো, তারপর সোজা স্কুলের হোস্টেলে। রাস্তার মাঝখানে নিজের গ্রাম, নিজেদের বাড়ি। আব্বা প্রচণ্ড ক্রোধে বাড়িতে থামতেন না। না থামানোর আরও কারণ, আম্মা। পালানো ছেলে ফিরেছে, সামনে পেলে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদবেন- ওই আদর-সোহাগটা যেন না মেলে। যাই হোক তৃতীয় বা বড় পলায়ন পর্ব শেষে একই রকম আচরণ হলো না। সবার হাব-ভাব দেখে মনে হয়েছিল, অন্যায় হয়েছে সবার, আমি নির্দোষ।

কলকাতায় কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাসায় ওঠা হয়নি, জানাজানি হওয়ার ভয়ে। উঠেছিলাম ছোট মামার দুই বন্ধুর আত্মীয়দের বাসায়। সেসব বাসায় এক-দু'দিন করে কাটিয়ে পড়লাম রাস্তায়। কবি নজরুল ইসলাম তখন প্রিয় কবি। তার মতো হওয়ার ইচ্ছা আমার। তিনি রুটির কারখানায় কাজ করেছেন। আমিও করব বলে দিনভর পাউরুটির কারখানা খুঁজে বেড়ালাম। পকেটের হাল খুব খারাপ হয়ে যাওয়াতে বিদ্রোহী কবি হওয়া হলো না। বাসে করে যখন কলকাতা থেকে বসিরহাট ফিরছি, তখন মনে হয়েছিল রুটির কারখানা খুঁজে না পেলেও আমি তো বিদ্রোহীই। আব্বা আর্ট কলেজে ভর্তি করাবেন না। আমি সেখানেই ভর্তি হতে চাই-ই। এই চাওয়া জানান দিতে বাড়ি পালানো, তা সেই আমলে দাপুটে পিতার সঙ্গে বিদ্রোহ ছাড়া কি?

ভয়ে ভয়ে ছিলাম মামার বাড়িতে ফিরলে আব্বার কী প্রতিক্রিয়া জানা হবে? আমাকে সামনে পেয়ে সবারই মনে হলো যেন আকাশের চাঁদ পেয়ে গেছেন। খুব আদর-যত্নের পর গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বোঝানো হলো, আগামীকালই আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে। আব্বার চিঠি দেখানো হলো। বড় মামাকে লিখেছেন, ফিরলে আমাকে ভর্তির জন্য ঢাকা পাঠানো হবে। তাড়াতাড়ি ফেরা দরকার, ভর্তি পরীক্ষার সময় খুব কাছে। ইন্ডিয়ায় আমার মামাবাড়ি। মামাবাড়ি থেকে ঘোজাডাঙ্গা সীমান্ত পনেরো-কুড়ি মিনিটের দূরত্ব। ভ্যানগাড়ি আর রিকশা চলে রাস্তায়। এক ভ্যানগাড়ি ভাড়া করে মামাবাড়ির বেশ কয়েকজন আমাকে সীমান্তের দিকে নিয়ে চললেন। লুকিয়ে সীমান্ত পার হওয়ার পর যে বাড়িতে ঢুকেছি, সামনে পড়ল আব্বার লাল রঙের মোটরসাইকেল উঠানে দাঁড় করানো। বুক ধক্‌ করে ওঠার কথা। দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম। পেছন থেকে কেউ কাঁধে হাত রাখে, ফিরে তাকাতে দেখি আব্বা। নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস হতে চায় না, সত্যি, না স্বপ্ন দেখছি। 

না, এ ফিরে আসায় মারধর, বকাঝকা, কোনো প্রকার মন্দ ব্যবহার কপালে জোটেনি। সবাই এমন ব্যবহার করেছিল, যেন আমি বলে-কয়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম। বিকেলে আমার জন্য সাতক্ষীরা শহর থেকে একটা টিনের বাক্স কিনে আনা হলো। সেটা খুলে দেখা গেল খালি নয়, তার ভেতরে নতুন জামা-কাপড়। দেখতে পাই শহরের দর্জিকে দিয়ে তিনটা প্যান্ট বানিয়ে আনা হয়েছে। মন মোর মেঘের সঙ্গী হয়ে গেল দিকদিগন্তে উড়বে বলে। মনে হলো যে কোনো একটা প্যান্ট পরে এক্ষুনি বাড়ির বাইরে কোথাও ঘুরে আসি। ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে ফুলপ্যান্টের আশা করা, ঘড়ি পরা অন্যায় বিবেচনা করা হতো। অনেক কান্নাকাটির পর একবার বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল একটা প্যান্ট। সাতক্ষীরার দর্জি যখন মাপ নিচ্ছিলেন, তখনই বুঝতে পেরেছিলাম তা নামেই প্যান্ট হবে দেখাবে পায়জামার মতোই। আব্বা সামনে ছিলেন, দর্জিকে বলতে পারিনি নিচের দিকে ঢোলা কম হবে। জীবনের প্রথম প্যান্ট আনন্দের হয়নি। সে কথা মনে হতে নতুন তিনটের ভাঁজ খুলে পরীক্ষা করা হলো, সেগুলোও কি পায়জামার মতো? না, ঢাকা শহরে যাবে ছেলে, তাই আব্বা দয়া করেছেন।

আমাদের গ্রামের নাম পারুলিয়া। কাছের শহর সাতক্ষীরা। বাড়ি থেকে সাতক্ষীরা যেতে বাসে সময় লাগে বেশ। দূরত্ব বেশি তা নয়। রাস্তার দশা খুবই খারাপ। বেশি বৃষ্টি হলে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যেত। বাস চলত সাতক্ষীরা টু কালীগঞ্জ। মাঝখানে আমাদের গ্রাম, আমাদের বাড়ি। বাড়ির ঠিক সামনেই ছিল বাসস্ট্যান্ড। বাস এখানে এসে অনেকক্ষণের জন্য থামত। ইঞ্জিনকে পানি খাওয়ানো, ঢাকনা আলগা করে রেখে ঠাণ্ডা করা হতো পারুলিয়া বাসস্ট্যান্ডে। চায়ের দোকান ছিল অনেকগুলো। সাতক্ষীরা আর কালীগঞ্জ দু'দিক থেকে আসা বাস দাঁড়ালে ড্রাইভার-কন্ডাক্টর আর বহু যাত্রীর চায়ের তেষ্টা সামাল দিতে পড়ে যেত হুলস্থূল। জমজমাট ছিল বাসার সামনের এই রাস্তাটা। রাস্তার পাশে লম্বা বারান্দাওয়ালা আমাদের ফার্মেসি তার পেছনে বাড়ি। বাড়ির উঠানে সেদিন ভোরবেলা থেকে প্রতিবেশীরা এসে জড়ো হচ্ছে। জড়ো হচ্ছে মহিলারা। তখন পর্যন্ত বাড়ির ভেতরে বাইরের পুরুষদের প্রবেশ নিষেধ ছিল। ফার্মেসির বারান্দায় ভিড় জমেছিল পুরুষদের।

সময়টি ছিল ভোরবেলা। পারুলিয়া বাসস্ট্যান্ডের চা দোকানগুলো তখন চুলা জ্বালাতে শুরু করেছে। খানিক পরেই দু'দিক থেকে আসবে প্রথম বাস। হৈ হৈ কাণ্ড রৈ রৈ ব্যাপার ঘটতে থাকবে সামান্য পরেই। আমি বেশ কয়েকবার অযথাই ফার্মেসির বারান্দায় গিয়েছি। একবার গিয়েছি আব্বার পেছন পেছন। তিনি কোথাও যাবেন, কোনো কিছুর কথা হঠাৎ মনে পড়েছে বলে তাড়াহুড়া করে বেরিয়েছিলেন। ফিরলেন মিনিট দশেক পর। হাতে মিষ্টির ঠোঙা। বোঝা গেল রবি ময়রার দোকানে গিয়েছিলেন। বোধহয় মনে পড়েছিল, আমার সন্দেশ খুব পছন্দ। রবি ময়রা এ সময়টাতে গরম সন্দেশ সাজাতে থাকে আলমারিতে। ছেলে গরম সন্দেশ আর কবে খেতে পারবে কে জানে, তাই কাউকে হুকুম না করে আব্বা নিজে দৌড়ে গিয়েছিলেন সন্দেশ আনতে।

আম্মাকে বললেন, ওকে একটু সন্দেশ খাওয়াও। আব্বার গলাটা ভার মনে হলো। আম্মা ছোট একটা প্লেটে দুটো সন্দেশ তুলে দেন- নে দূরের রাস্তায় যেতে হবে মাত্রই দুটোই খা, আবার কবে খেতে পারবি বলে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন আম্মা। সন্দেশ আমার প্রিয় কিন্তু তখন খেতে খুব ইচ্ছা করেনি। একটা খেলাম। আম্মা চোখ মুছছেন কিন্তু চোখের পানি থামছে না। এক প্রতিবেশী মহিলা উঠান থেকে বারান্দায় উঠে এলেন, তুমি কাইন্দো না ভাবি, ছেইলে পড়তি যেতেছে। যেতেছে বড় কাজে, তারে দোয়া করো মন খুলে। তাতে তার ভালো হবে। আম্মা কান্নামাখা গলায় তার জবাব দেন, বুঝতি পারতিছি সব কিন্তু মন তো বুঝতেছে না।

সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কালীগঞ্জ থেকে প্রথম বাস পারুলিয়া বাসস্ট্যান্ডে এসে থামে। আমার পেছনে মানুষের মিছিল। সবার আগে বাড়ির গরুগুলোকে দেখাশোনা করত যে মানুষটা, কালো বেঁটে খাটো কিন্তু সুঠাম গড়নের জব্বার। মাথায় করে নিয়ে চলেছে আমার কালো রঙের টিনের বাক্স আর হোল্ডঅলে ঢোকানো তোশক। আমার কাঁধে ঝোলানো একটা ব্যাগ। তখন সামনে ড্রাইভারের পাশে দু'জন যাত্রী বসার জায়গা। তার পেছনে পাঁচজন যাত্রী বসার জন্য ঘেরাও করা কেবিন। বাসে যাত্রীদের বসার জন্য আসল জায়গা ছাড়া কেবিন আর সামনের সিটের ভাড়া ছিল অনেক বেশি। টিনের ট্রাঙ্ক বা বাক্সটা আর হোল্ডঅল গাড়ির ছাদে তুলে দেওয়া হলো। সামনের সিটের দুটো টিকিট কেটে আমাকে আব্বা বললেন, 'উঠে বসো'। উঠলাম গাড়িতে। সামনের কাচ ভেদ করে আম্মার মুখ দেখতে পাই ফার্মেসির আধা খোলা জানালায়। বাসের পাশে মানুষের ভিড়ে সবচেয়ে লম্বা মানুষটি আমার আব্বা। মোটা ভ্রূ, বড় চোখ। যে চোখের দিকে কোনোদিন তাকাতেও সাহস হয়নি। যে মানুষটার সামনে কোনোদিন মুখ তুলে দাঁড়াতে পারিনি। যাকে কোনো কথা বলার থাকলে বরাবর আম্মার পেছনে দাঁড়িয়ে বলেছি। সেই প্রবল ব্যক্তিত্বের মানুষটা আমার মুখের দিকে অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে রয়েছেন। সেইক্ষণে আমি তার ভয়ে ভীত পুত্র, কোনো দ্বিধা-ভয় ছাড়া চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকতে পারলাম। মনে হলো আমাদের কথা হচ্ছে না, তবে ভাষা বিনিময় হচ্ছে। মনে হলো আব্বা আমাকে বলছেন, ভালোভাবে থেকো। মনে হলো আব্বা আমাকে বলছেন, পৌঁছে চিঠি দিও। আমরা তাকিয়ে থাকি পরস্পরের দিকে। আব্বার চোখ স্থির, আমার চোখ স্থির। সময় আমাদের মতো স্থির থাকতে পারে না। পানের বোঁটায় চুন নিয়ে ড্রাইভার আমার পাশে এসে বসে। তার ডানের দরজায় লাগিয়ে রাখা হর্ন বাজায়। যাত্রীদের উদ্দেশে জানান দেওয়া- গাড়িতে উঠে বসো তোমরা, জানান দেওয়া গাড়ি ছাড়ার সময় হয়েছে। আমি অনুভব করতে পারি, হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠলেন আব্বা। সামনে দাঁড়ানো দু-চারজন মানুষ ঠেলে গাড়ির আরও নিকটে এলেন। স্পর্শ করলেন বাসের শরীর। মুহূর্তের মধ্যে দুটো হাত উঠে এলো জানালায়। শক্ত মুঠো। যেন বাসটাকে তিনি আটকে রাখতে চান। বহুকাল ধরে সন্তান ও পিতার সম্পর্কে অসীম এক দূরত্ব কামড়ে ছিল। সেদিন তার সামান্যই টিকে থাকে। একধরনের দ্বিধায় কখনোই আমাদের দু'ভাইয়ের হাত ধরা বা কাছে টেনে আদর করার মতো পিতৃস্নেহ, ভালোবাসা দেখাতে পারেননি আব্বা। টের পাই হঠাৎ আমার বাম কাঁধে তার হাতের স্পর্শ। জানালার চতুস্কোণে তার বিপন্ন উদ্বিগ্ন মুখখানা খুব নিকটে। তিনি ভেজা গলায় বলেন, এতদিন তোমাকে ভালোমন্দ কী বুঝিয়ে বলতে পেরেছি, আজ থেকে তোমাকেই বুঝতে হবে তোমার ভালোমন্দ। 

আমার চোখ জ্বালা করতে থাকে। দেখতে পাই বাসকন্ডাক্টর দ আকৃতির লোহার হ্যান্ডেলটা নিয়ে বাসের সামনে দাঁড়িয়েছে। সেটা ঘুরিয়ে গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়া হবে। আমি শেষবারের মতো ফার্মেসির জানালায় তাকাই। খানিকটা খোলা জানালার কপাট তখন পুরোটাই খোলা। সেই স্বাধীন জানালায় আটকা পড়ে আছেন আম্মা। ঘোমটায় তার মুখখানা দূরত্বের বেদনায় অসহায়। বাঁ দিকে দূরের পিতা দ্বিধা ভেঙে হয়েছেন নিকট, আর ডান দিকে নিকটের মা আটকা পড়ে রয়েছেন দূরে। দুয়ের শোক ছিঁড়ে গাড়ি গর্জন করে ওঠে। অসংখ্য চায়ের কাপে চিনি গোলানো চামচের ঠোকাঠুকি চাপা পড়ে যায়। অসহায়ত্ব আমাকে জাপটে ধরে। হঠাৎ একটা শোরগোল ওঠে। চলতে শুরু করে তুফান মেইল।

গাড়ি সাতক্ষীরা পর্যন্ত যাবে। সেখান থেকে রিকশা নিয়ে যেতে হবে খুলনাগামী বাসস্ট্যান্ডে। সেখান থেকে খুলনা বা যশোরে যাবে এমন একটা বাসে উঠে যশোরে পৌঁছে আবার বদলাতে হবে বাস। ঢাকা তখন অনেক দূরের শহর। মনে আছে, এগারোবার বিভিন্ন যানবাহনে চড়ে ও বদলে শেষমেশ ঢাকায় এসে পৌঁছেছিলাম। টিনের ট্রাঙ্ক আর হোল্ডঅল বারবার নামানো-ওঠানো বেশ ঝক্কির, তবু মনে করতে পারি না তা ক্লান্তিকর লেগেছিল বা পথ শেষ হচ্ছে না ভেবে অস্থিরবোধ হয়েছিল। পেছনে ফেলে এসেছি বাড়িঘর, মা-বাবা, ছোট ভাই, চেনা পুকুর, খেলার মাঠ, প্রিয় নদী, পথঘাট। ফেলে এসেছি বাড়ির পেছনের ছোট আমগাছ। সে গাছের চার ডালের ফাঁকে উঁচুতে বাঁশ দিয়ে বানানো মাচা, যেখানে শুয়ে-বসে অবসর কাটাতাম। পোষা টিয়ার ডাকে ঘুম ভাঙত, সকালে হাঁস-মুরগির ঘর খুলে দিলে তাদের হৈচৈ করে বের হওয়া দেখতে ভালো লাগত। বহুদিন তা আর দেখা হবে না। তার শোক মনে জাগে না। আমি দেখতে থাকি দৌড়ানো পথ। যে পথ আমাকে ঝাঁকিয়ে, দুলিয়ে, নাচিয়ে ঢাকা নিয়ে যাচ্ছে।

সেই আমার প্রথম ঢাকা যাত্রা, ঢাকা দেখা হবে সেই প্রথম। তার আগে খুলনা শহর পর্যন্ত দেখা হয়েছে আর ওদিকে কলকাতা যাওয়া হয়েছে বহুবার। এই বহুবারের কারণ- ঢাকার চেয়ে কলকাতা ছিল নিকটের শহর। ভারত আর পাকিস্তান দুটো দেশ হলেও সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের নিত্য এপার-ওপার করা দেখলে তখন মনে হতো না সে কথা। আমাদের ওদিকটায় সীমান্তের শেষ গ্রামের নাম ভোমরা। ভোমরার ওপারে ঘোজাডাঙ্গা গ্রাম। মাঝখানে ছোট একটা খাল। সে খাল আয়তনে বিশাল চওড়া হলেও পানি থাকত সামান্য। হাঁটু ভিজত না। খাল পার হয়ে যখন-তখন মানুষ চলে যেত ওপারে। আড়াই-তিন ঘণ্টায় যাওয়া যেত কলকাতায়। টানা বসে যাওয়া যেত, যাওয়ার জন্য ছিল ট্রেন। সে হিসেবে ঢাকা অনেক দূরের শহর। সচরাচর শোনা যেত না, আমাদের গ্রাম থেকে কেউ ঢাকা যাচ্ছে। আমি ঢাকা যাচ্ছি। সে শহরটা কেমন দেখতে তা নিয়ে আমার তেমন কোনো কৌতূহল নেই। মনে তখন নতুন আনন্দ, আমার পড়ালেখার ধরন হবে অন্যরকম। কারও মতো নয়। ছবি আঁকা নিয়ে পড়াশোনা, তা নিশ্চয়ই খুব উপভোগের হবে। বই পড়তে হবে না, অঙ্ক কষতে হবে না। অনেককাল অঙ্ক আমাকে খুব জ্বালাতন করেছে। বিষয়টা আমার মাথায় ঢোকে না। সে কারণে শিক্ষকদের মারধর কম খাইনি। শাস্তি থেকে, দোষ থেকে মুক্তি পেতে যাচ্ছি। মুক্তি পাব অঙ্ক থেকে। আরও একটা আনন্দের হাতছানিতে আমার দীর্ঘযাত্রা মোটেও দীর্ঘ মনে হচ্ছে না। মাঠ দৌড়াচ্ছে, দৌড়াচ্ছে ফসলের ক্ষেত, গ্রাম, পুকুর, মসজিদ, বাজার-ঘাট, ছোট নদী, সেতু সব পেছনে ফেলে ছুটে চলেছি ঢাকা। সেখানে আমি দেখতে পাব আর এক আমিকে।

সেই ভোরবেলা আম্মার হাতের পারশে মাছের ঝোল, বেগুন-চিংড়ি, মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম। সারাদিন আর ভাত খাওয়া হয়নি। কাঁধের ছোট ব্যাগে হাতরুটি আর ডিম ভাজা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল, পথের খাওয়া। তখন পুরু সর আর দুধ দিয়ে ভাত খেতে না পারলে কোনো বেলার খাওয়া সম্পূর্ণ হতো না। সেই ভোরবেলায় তা হয়নি। বাটিতে সরওয়ালা দুধ দেওয়া ছিল। আম্মার চোখে জল টলমল, সর-দুধ সামনে দিয়েছেন আবার নিষেধও করেছিলেন, খাসনে এত দূরের পথ।

খাইনি। সেই সর পড়া দুধ না খাওয়া বা দুপুরে পেট পুরে খাওয়া হয়নি, কোনোটারই কষ্ট অনুভব করেছি তা নয়। আমি কতকিছু দেখতে দেখতে সারাদিন পার করে দিচ্ছি। সেই আনন্দ খিদের চেয়ে বড়। মনে হয়েছে আমি মুক্ত, স্বাধীন হয়ে গেছি। আমার জীবনে আর শাসন নেই, নেই বিধি। এটা করবে না, ওটা করা যাবে না- আদেশ পালনের দিন শেষ হয়ে গেল। কিন্তু আব্বার কথাটাও মনে হয়ে যায়। কানে বাজতে থাকে, এতদিন তোমাকে ভালোমন্দ কী বুঝিয়ে বলতে পেরেছি, আজ থেকে তোমাকেই বুঝতে হবে তোমার ভালোমন্দ।

বিকেল বেলায় চড়লাম বড় ফেরিতে। উঠে দেখি কত্ত বড় নদী। যতদূর চোখ যায় পানি আর পানি। এর আগে যতগুলো ফেরি পারাপার হতে হয়েছে নতুনটার হিসেবে খুবই ছোট ছিল। আগেরগুলোয় অনুমান করা গিয়েছিল কতক্ষণে ওপারে পৌঁছাতে পারব। সামনের দিকচিহ্ন না পাওয়া নদীর পানি দেখে বুঝতে পারি না কোনদিকে তীর, কতক্ষণে পৌঁছানো যাবে। ফেরিতে বাজারের মতো কতকিছু বিক্রি হচ্ছে। খাদ্যদ্রব্যও বেচাকেনা চলছে নানান রকমের। সিদ্ধ ডিম, মুড়ি-চানাচুর, শিঙ্গাড়া, চা- কত কিছু কিনে খাচ্ছে মানুষ। আব্বা না করে দিয়েছে রাস্তায় কিছু কিনে খাবে না। খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না কিন্তু খাদ্যদ্রব্য ও মানুষের খাওয়া দেখে পেটে ক্ষুধা জাগ্রত হয়।

ঘণ্টাখানেকের কাছাকাছি লেগে যায় ফেরি ঘাটে ভিড়তে। ঘাটে নামতেই ভাজা ইলিশের গন্ধ ছুটে আসে। দেখতে পাই, মানুষ পড়িমরি করে ছুটে ঢুকে যাচ্ছে ছোট ছোট হোটেলে। হাঁকাহাঁকিও চলছে সব হোটেল থেকে- আসেন আসেন, তাজা ইলিশ ভাজা, ইলিশ। সেই ডাক, ইলিশ ভাজার গন্ধ সামলানো মুশকিল। মুটের মাথার টিনের ট্রাঙ্ক আর হোল্ডঅল হোটেলে রেখে তাকে বিদায় করতে চাইলাম। সে বলল, নামিয়ে রাখছি এখানে, খাইয়া নেন আমি ঘুইরা আসতেছি। খিদে কতটা ছিল বুঝলাম। পাশেই ভাজা হচ্ছে ইলিশের টুকরো। নামিয়ে রাখামাত্র এ টেবিল-ও টেবিল থেকে হাঁকডাক, এখানে আরও একটা, আরও দুইটা।

আমাদের গ্রামটা বা ওই অঞ্চল সুস্বাদু মাছের জন্য বিখ্যাত। ভেটকি, ট্যাংরা, পারশে, পায়রাতালি ইত্যাদি নানান নামের মাছ নিত্যদিন খায় মানুষ। ইলিশ খাওয়া, সে তো বরফ দেওয়া পুরনো ইলিশ। সেই প্রথম আরিচা ফেরিঘাটে দেখা হলো- একদিকে মাছ ধরা হচ্ছে নদীতে আর নদীপাড়ের হোটেলগুলোতে সঙ্গে সঙ্গেই তা কেটেকুটে ভাজা আর বিক্রি চলছে। ভেজে রাখা হয়েছে, মানুষে এসে কিনে খাচ্ছে- তেমন নয়।

ফেরি থেকে দেখেছিলাম ছোট ছোট নৌকায় বড় বড় জাল টেনে তুলছে মানুষ, আর সেই জালের ভেতর লাফাচ্ছে রুপোর টুকরো। নদীর বুকে তখন শেষ রোদের দাপট। অসংখ্য নৌকা আর জালে জালে চলছে রুপালি ঝিলিক। হোটেলে ভাজার পর তার স্বাদ যেমন হয়, কোনোদিন ভোলার মতো নয় তা। গুনে গুনে চার টুকরো ভাজা ইলিশে অনেকক্ষণের চাপা খিদেকে শান্ত করা গেল। সেই মুটে যথাসময়ে এসে হাজির। খানিকটা হাঁটতে হবে, তারপর পাওয়া যাবে ঢাকা যাওয়ার গাড়ি। উঠলাম নতুন এক গাড়িতে, জানা নেই সেটাই ঢাকা যাওয়ার শেষ গাড়ি কি-না, জানা নেই ঢাকা আর কতদূর। সেসব ভাবনাও অস্থির করে তুলছে না। মনই বলছে পৌঁছে যাবে খুব শিগগিরই। গ্রামের মানুষ, যাচ্ছি বড় শহরে। তখনও শহরের দিশা পাইনি। সেই ক্ষেত, ফসল, গরু, ঘরবাড়ি- এসবে চোখ পড়ে, চোখে দেখা মানুষগুলোর মতোই মানুষ দেখতে থাকি। গাড়িতে উঠে বসার সময় আমি জানালার পাশের সিট বেছে নিই। দেখতে দেখতে পথ পাড়ি দিতে আমার ভালো লাগে। এখনও সেই ভালো লাগাটি আছে। যখন কোথাও যাই শুটিং বা বেড়ানোর উদ্দেশে- গাড়ির জানালা থেকে গ্রাম, গ্রামের নাম, মানুষ, মানুষের বিচিত্র ব্যস্ততা, পথঘাট, হাটবাজার দেখতে দেখতে যেতে ভালো লাগে। 

গাড়ি থামে। আবার নামতে হবে। সামনে আরেকটা ফেরিঘাট। ওঠা হলো সে ফেরিতে। ফেরি বড় নয়, নদীও এপার-ওপার দেখা যায়। ফেরিতে বলাবলি শুনতে পাই, ওপারে গিয়ে গাড়িতে উঠলেই ঢাকা পৌঁছানো যাবে। ফেরি থেকে নেমে উপরের দিকে উঠে দেখতে পাই দু'ধরনের বাহন। একদিকে বড়সড় বাস আর একদিকে ট্যাক্সি। তেমন ট্যাক্সি কলকাতা শহরেও দেখিনি। বড়সড় শরীর। নাক-মুখ বেশ মোটা ধরনের আর সামনের দিকে ঠেলে বের করা। পেছন দিকটাও ভারী গোছের। বেশ কাছিম কাছিম ভাব। তেমন অনেকগুলো ট্যাক্সি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। তাদের চালক যাত্রী ডাকছে- আসেন আসেন, ঢাকা যাবে ঢাকা। বাসের কন্ডাক্টররা হাঁকছে-ডাকছে ঢাকা যাবে ঢাকা। ট্যাক্সিতে চড়লে তাড়াতাড়ি আর বাস যাবে হেলেদুলে, থেমে থেমে। ভাড়া অনেক বেশি, তবু অনেক মানুষকে দেখা গেল ঝাঁপিয়ে ট্যাক্সিতে চড়ছে। আমি দোনামনা করে শেষ পর্যন্ত চড়ে বসলাম ট্যাক্সিতেই। চড়ার আগ পর্যন্ত যতক্ষণ বাস না ট্যাক্সি, বাস না ট্যাক্সি করেছি, দাঁড়িয়ে ট্যাক্সির নাম পড়ে পড়ে মুখস্থ হয়ে যায়। বড় রুপালি ইংরেজি হরফে লেখা 'শেভ্রোলেট'। অনেক পরে জেনেছি নামের শেষ অক্ষর উচ্চারিত হবে না, ওটা হবে শেভ্রোলে। গাড়িতে উঠে বসে টের পাই গাড়িগুলো খুব আরামের। পেছনে চারজন প্যাসেঞ্জার। সামনে ড্রাইভারকে নিয়ে চারজন। আমি জানালার কাছে। কোনো দিকে নড়াচড়ার সুযোগ নেই। সেই ট্যাক্সি স্টার্ট দিতেও হ্যান্ডেল ঘোরাতে হলো। দ আকৃতির লোহার হ্যান্ডেলের এক চক্করে ঘরঘর করে জেগে ওঠে শেভ্রোলেট মহাশয়।

ঢাকায় ঢুকতে সন্ধ্যা হয়ে গেল প্রায়। নিউমার্কেটের কাছে ট্যাক্সিস্ট্যান্ড। ট্যাক্সির ছাদের ওপর থেকে নামানো হলো আমার টিনের ট্রাঙ্ক আর হোল্ডঅল। পকেটে একটা ঠিকানা। জায়গার নাম আজিমপুর। রিকশা ডেকে রওনা হলাম সেখানে। হাঁফ ছাড়া ভাব। শহরে এলাম শেষ পর্যন্ত। ঢাকা শহর। এটা দেখি, ওটা দেখি। হঠাৎ দেখি বলাকা সিনেমা হল। এই সিনেমা হলের নাম কাগজে কত পড়েছি। কোনো সিনেমা মুক্তি পেলে বিজ্ঞাপনের নিচে গুলিস্তান, বলাকা এসব হলের নাম পড়া হয়েছে কতশত বার। বলাকা হলে ঝকমকে ব্যানার। যে সিনেমা চলছে তার নাম দর্পচূর্ণ। রাজ্জাক, কবরী, ফতেহ লোহানী, আনোয়ার হোসেনের বড় বড় ছবি আঁকা। সিনেমা হলের পাশ দিয়ে রিকশা যাচ্ছে। নাকে ভেসে এসে লাগে অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ। আমার কেমন যেন লাগতে থাকে। পায়ের কাছে পড়ে থাকা টিনের বাক্স আর হোল্ডঅলের ওপর রেগে যাই। তারা না থাকলে আমি রিকশা থেকে নেমে পড়তে পারতাম। ঢুকে পড়তে পারতাম সিনেমা হলে। মুহূর্তে ঠিক করে ফেললাম, যেখানে আমার ওঠার কথা তা যদি তেমন দূরে না হয় আজ রাতেই আমি সিনেমা দেখব। থাকার জায়গায় পৌঁছাতে দেরি হলো না। ঠিকানায় পৌঁছানোর আনন্দ মনে নেই। কোথায় এলাম, মানুষগুলো কেমন, সুবিধা-অসুবিধা কোনো কিছুর জন্য মনে চিন্তা নেই। হাত-মুখ ধোয়া, নাশতা এসবেও আগ্রহ নেই। আমার মন পড়ে রয়েছে সিনেমা হলে, বলাকায়। যেখানে চলছে টাটকা তাজা মুক্তি পাওয়া দর্পচূর্ণ। গ্রামের ছেলে, সাতক্ষীরা শহরে তখন একটা মাত্র সিনেমা হল, নাম মিলনী। যে রকমই গরিব দেখতে হোক সেখানে সিনেমা চলে। সেখানে হাতেগোনা কয়েকবার সিনেমা দেখার সুযোগ হয়েছে। সিনেমা দেখাটা তখন ভালো কিছু মনে করা হতো না বলে সিনেমা হলের দিকে যাওয়ার কথা ভাবতেও পারতাম না। মামার বাড়িতে গেলে বসিরহাট শহরে দৌড়ে দৌড়ে যেতাম সিনেমা দেখতে। মনে পড়ে, আব্বা একবার নিজে আগ্রহ করে অগ্রিম টিকিট কেটে আমাদের সিনেমা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। বোধহয় এই কথা ভেবে, ছবিতে নায়ক-নায়িকার প্রেম, গান, নাচানাচি থাকবে না। নিশ্চয়ই তিনি ভেবেছিলেন- ইতিহাস নিয়ে ছবি, তাই দেখা উচিত। সে ছবির নাম ছিল 'নবাব সিরাজউদ্দৌলা'।

ঠিকই ছুটে এলাম বলাকা সিনেমা হলে। মন ভরে গেল সুগন্ধে, সৌন্দর্যে। স্বপ্নের মতো লাগতে থাকে। কোথায় এসেছি আমি। কী ঝলমলে আলো, চকচকে মানুষ। ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি নেই। দেয়ালে দেয়ালে কত রকম ছবি। বড় ফ্রেমের কোনোটায় লেখা চলিতেছে, কোনোটায় লেখা আসিতেছে। বাংলা, ইংরেজি, উর্দু কত কত ছবি। যেসব ছবির বিজ্ঞাপন আগে কাগজে ছাপা হতে দেখেছি। ছবি পছন্দ হলে তা কেটে খাতায় সেঁটে গোপন অ্যালবাম তৈরি করেছিলাম। কাটা ছবি সেঁটে হোস্টেলের দেয়ালে সাজাতাম। রাজ্জাক-কবরী, আজিম-সুজাতা, নাদিম-শাবানা, মোহাম্মদ আলী-জেবা, শবনম-ওয়াহিদ মুরাদ- স্কুলের কড়া শাসনের জাঁতাকলে থেকেও এসব তারকা এবং তাদের অভিনয় করা সিনেমা নিয়ে কম চর্চা হতো না।

মনে হলো সিনেমা থেকে ছিলাম হাজার মাইল দূরে, এখন এসে দাঁড়িয়েছি সিনেমা জগতের মধ্যখানে। গ্রামে থাকতাম বলে বছরখানেকের পুরনো ছবি ছাড়া দেখার সুযোগ হতো না। মনে উদ্বাহু নৃত্য করে খুশি। এখন থেকে ঝলমলে হলে চকচকে সিনেমা দেখতে পারব। দেখতে পারব বাংলা ছবি, উর্দু ছবি, ইংরেজি ছবি। কাঁড়ি কাঁড়ি ছবি দেখার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে বহুদিন পর, যখন গ্রামে ফিরব- বড় আয়োজন করে সেই সব চমৎকার অভিজ্ঞতার কথা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ভাগাভাগি করব।

ঢাকা শহরে আসব বলে ভোর থেকে কত কিছু। সারাটা দিন গেল অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতায়। সিনেমার প্রবল পাগলামি তো ছিল মনে। বলাকা ও দর্পচূর্ণের আনন্দে কানায় কানায় পূর্ণতা পেল দিনটা। দিনটা কোনো কালে অমলিন না হওয়ার মতো। যে এই শহরে নবাগত, যে এই শহরের কিছুই চেনে না, সে অতি সামান্য চেনা শহরে প্রথম আগমনের আনন্দে টলমলে হয়ে অস্থায়ী আস্তানায় ফিরছে। সে রাতটা জীবনের অন্যরকম রাত্রি। অন্যরকম। আমি চেনা বাসায় ফিরছি না। সারাজীবন ভোগ করা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, ভালোবাসা, স্নেহ সেখানে না থাকার কথা। যেখানে ফিরে যাচ্ছি সেটা বাড়ি হলেও বাড়ি নয়, আশ্রয়। চোখ-কান বুজে থাকতে হবে। অভাবে-অনুযোগে, চাওয়া-পাওয়ার মিল না পেলে থাকতে হবে গুটিয়ে। মাথার ওপর উন্মুক্ত আকাশ, সে আকাশ শহরের। আমার আকাশ আমি ফেলে রেখে এসেছি বহুক্রোশ দূরে- এমন মনে হলো। তার জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলিনি। আলো-আঁধার চিরে রিকশাটা এগোচ্ছে। একটা দমকা হাওয়া এলো দু'হাত বাড়িয়ে। পাই তার আলিঙ্গনের অনুভব। এই শহরের হাওয়া। সে আলিঙ্গন অপরিচিতের নয়। আমাকে বলে, যুবক আমাদের শহরে স্বাগতম।

সূত্র: সমকাল
এমএ/ ০৫:১১/ ১৪ মে

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে