Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (55 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৫-১২-২০১৮

যে ধান পাল্টে দিতে পারে দেশের উৎপাদনের চিত্র!

এস এম তাজউদ্দিন


যে ধান পাল্টে দিতে পারে দেশের উৎপাদনের চিত্র!

বাগেরহাট, ১২ মে- কৃষক লেবুয়াত শেখের উদ্ভাবিত “লেবুয়াত ধান” পাল্টে দিতে পারে দেশের খাদ্যশস্য উৎপাদনের চিত্র। আর এজন্য প্রয়োজন সরকারের স্বদিচ্ছা। বাগেরহাটের সাধারণ কৃষক এবং কৃষি বিভাগ এমনটাই মনে করছে।

সম্প্রতি এমন একটি বিষ্ময়কর জাতের উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার চাকুলী গ্রামের কৃষক লেবুয়াত শেখ। আর এই বিশেষ জাতের ধানের খবর ছড়িয়ে পড়ায় কৃষক লেবুয়াত শেখের বাড়ি ভিড় জমাচ্ছেন উৎসুক সাধারন মানুষ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই ধানের খবর ছড়িয়ে পড়ায় অন্যান্য জেলা থেকেও কৃষকরা এই ধানের বীজ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে স্থানীয়রা নতুন এই জাতের ধানের নামকরণ করেছেন উদ্ভাবক কৃষক লেবুয়াত শেখের নামেই।

এই ধান কেজি প্রতি ৪’শ টাকা দরে অনেকে সংগ্রহ করেছেন। এখনও তার বাড়িতে শতশত কৃষক এই ধানের বীজ সংগ্রহ করতে ভিড় জমাচ্ছে। শুধু সাধারন কৃষক নয়, নতুন এই জাতের ধান নিয়ে উৎসুক বাগেরহাটের কৃষি বিভাগও। মাত্র ৩ ছড়া ( ধানের শীষ) ধান দুই বছরে বেড়ে হয়েছে প্রায় ১’শ মণ। খোদ কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন এই জাতের ধান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিলে পাল্টে যাবে দেশের খাদ্য উৎপাদনের চিত্র।

কৃষি বিভাগ জানায়, ফকিরহাট উপজেলার বেতাগা ইউনিয়নের চাকুলী গ্রামের একজন আদর্শ কৃষক লেবুয়াত শেখ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তিনি দীর্ঘদিন ধান ও মাছের চাষ এবং মাছের ব্যবসা করে জীবন ধারণ করে আসছেন। স্থানীয় বেতাগা বাজারে তার একটি মাছের আড়তও রয়েছে। তিনি ও তার স্ত্রী স্থানীয় আইপিএম ক্লাবের সদস্য।

 

কৃষক লেবুয়াত শেখ জানান, ২০১৬ সালে তিনি বাড়ির পার্শবর্তী একটি ক্ষেতে আফতাব-০৫ জাতের হাইব্রীড ধানের চাষ করেন। মাঠে ধান কাটতে থাকা দিনমুজুরদের তার মা ফাতেমা বেগম পানি খাওয়ানোর জন্য যান। এসময় তিনি (ফাতেমা বেগম) সেই ধানের খেতের মধ্যে একটি তুলনামূলক ভাবে অনেক বড় ধানের শীষ (ছড়া) দেখতে পান।

তিনি আর একটু সামনে গিয়ে আরো দু‘টি শীষ দেখতে পান। এই শীষগুলো নিয়ে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। পরে তিনি এই ধানগুলো ছেলে লেবুয়াতকে সংরক্ষন করতে বলেন। ২০১৭ সালে মাত্র ১ শতক জমিতে তিনি ওই ধান রোপন করে সেখান থেকে ২.৫ কেজি বীজ সংগ্রহ করেন। এবছর তিনি ৭৫ শতক জমিতে সেই ধান রোপন করেন। ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শে প্রথম থেকেই তিনি কাজ করছেন বলে জানান।

সরেজমিনে গিয়ে ও কৃষি বিভাগের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই ধানের গাছ, ফলন, পাতা, শীষ সবকিছু অন্য যেকোন জাতের ধানের থেকে সম্পুর্ণ আলাদা। প্রতি গোছে একটি চারা রোপন করা হয়। যা বেড়ে ৮/১২ টি হয়েছে। প্রতিটি ধান গাছ ১১৫ থেকে ১৩০ সেন্টিমিটার লম্বা। এক একটি ছড়ার দৈর্ঘ্য ৩৬- ৪০ সেন্টিমিটার। প্রতি ছড়ায় দানার সংখ্যা ১ হাজার থেকে ১২‘শটি। যার ওজন ৩০-৩৫ গ্রাম।

ধানগাছের পাতা লম্বা ৮৮ সেন্টিমিটার, ফ্লাগলিপ ( ছড়ার সাথের পাতা) ৪৪ সেন্টিমিটার। ধানগাছের পাতা চওড়া দেড় ইঞ্চি। এই জাতের গাছের কান্ড ও পাতা দেখতে অনেকটা আখ গাছের মত এবং অনেক বেশি শক্ত। একর প্রতি ফলন প্রায় ১৩০ মন। অন্য যেকোন জাতের তুলনায় এই জাতের ধান অনেক ব্যাতিক্রম।

অপরদিকে আপতাব-০৫ জাতের হাইব্রীড ধান প্রতি ছড়ায় ১৮০ থেকে ২৫০ টি দানা হয়। এই ধানের বীজ প্রতিবারই বাজার থেকে কিনতে হয়। হেক্টর প্রতি এই ধান উৎপাদন হয় ৫ টন। একই জমিতে কৃষক লেবুয়াত উদ্ভাবিত জাতের ধানের উৎপাদন ১১ টন।

চাকুলী গ্রামের কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান হাফিজ জানান, এই ধান নিজে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা অসম্ভব। প্রতিটি ধানের শীষ ১৩-১৫ ইঞ্চি লম্বা, প্রতি শীষে ১ হাজার থেকে ১২শটি ধান রয়েছে। যার ওজন ৩০ থেকে ৪০গ্রাম। যা দেশের অন্য কোন স্থানে আছে বলে কারো কাছে শুনিনি। মাত্র ৩টি শীষ থেকে আজ ৭৫ শতক জমিতে এই ধানের চাষ করেছে লেবুয়াত। আর এই ভিন্ন জাতের ধান দেখতে প্রতিদিনই অনেক লোক বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে আসছে। এবং তারা ধান সংগ্রহের আগ্রহ প্রকাশ করছে। তিনি সরকারী ভাবে কৃষক লেবুয়াতের নামেই এই ধানের নামকরণের জন্য সবার কাছে দাবী জানান।

কৃষানী রীনা বেগম জানান, সকলের আগ্রহ এখন লেবুয়াতের ধানের দিকে। এই ধান বীজ হিসেবে সংগ্রহ করতে প্রতিদিনই অনেক লোক আসছে। তিনি নিজেও প্রতিকেজি ৪শ টাকা দরে ৪ কেজি ধানের বীজ কিনেছেন বলে জানান।

স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ সোলায়মান আলী জানান, প্রথমে তারা লেবুয়াতের ধানের ক্ষেতে গিয়ে ধানের নমুনা দেখে অবাক হয়ে যান। বিষয়টি তিনি তাৎক্ষনিক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে অবহিত করেন। পরে তার পরামর্শে লেবুয়াতকে হাতে কলমে ও সার্বক্ষনিক পরামর্শ প্রদান করা হয়।

ফকিরহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ মোতাহার হোসেন জানান, স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছে খবর পেয়ে তিনি নিজে সার্বক্ষনিক এই ধানের ক্ষেতে বিশেষ নজরদারী করেছেন। ইতিমধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা লেবুয়াতের এই ধানের ক্ষেত পরিদর্শন করে ধানের নমুনা সংগ্রহ করেছেন। কৃষক লেবুয়াতের উদ্ভাবিত এই বিশেষ জাতের নানা বৈশিষ্ট রয়েছে। এটি অনেক বেশি লবন সহিষ্ণু জাত। গাছের কান্ড অনেক বেশি মোটা ও শক্ত ফলে ঝড়ে হেলে পড়ার কোন সম্ভাবনা নেই।

বৈরি আবহাওয়ায়ও পাতায় কোন স্পট নেই। এই জাতের ধানের শীষ (বাইল) অনেক বেশি লম্বা। এবং প্রতিটি শীষে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২‘শ দানা আছে। যা সাধারণ বিআর-২৮ জাতের ধানের থেকে প্রায় ৬ গুন বেশি। সবচেয়ে বড়কথা হলো এটি “ফাইন রাইস” প্রজাতির ধান। এই ধান ইতিমধ্যে অনেক বেশি সাড়া জাগিয়েছে। গবেষনা করে এটি যদি কৃষকদের জন্য উপযোগী হয় তাহলে সারা দেশে এই জাত ছড়িয়ে দেয়ার জন্য তিনি আহবান জানান।

বাগেরহাট জেলা বীজ প্রত্যায়ন কর্মকর্তা মোঃ হাফিজুর রহমান জানান, কৃষক পর্যায়ে উদ্ভাবিত এটি একটি নতুন জাতের ধান। এই ধান নিয়ে পরিক্ষা-নিরিক্ষা চালনো হচ্ছে। কৃষক পর্যায়ে যে এত উন্নত ধরনের ধান উদ্ভাবন হয়েছে তা স্থানীয়দের মাঝে চমক সৃষ্টি হয়েছে। বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির মাধ্যমে এটি ছাড় করানোর ব্যবস্থা করা হবে।

 
তথ্যসূত্র: বিডি২৪লাইভ
আরএস/০৯:০০/ ১২ মে

 

বাগেরহাট

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে