Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (65 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৫-০৪-২০১৮

ছিন্নপত্রের রবীন্দ্রনাথ

লুৎফর রহমান


ছিন্নপত্রের রবীন্দ্রনাথ

ছিন্নপত্রের রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে

ছিন্নপত্রের ১৪১-সংখ্যক পত্রে রবীন্দ্রনাথ চিঠির দ্বারা পৃথিবীতে একটা নতুন আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। শুধু তাই নয়; চিঠি-যে অন্যান্য শিল্পাঙ্গিকের চেয়েও শ্রেষ্ঠ- সে বিষয়েও তিনি নিশ্চিত। তাই হয়তো নগর কলকাতা থেকে দূরে প্রিয়জন-বিচ্ছিন্ন জীবনে বাংলাদেশে বসে রচনা করেন অসংখ্য চিঠি, ছিন্নপত্র। কবিতা, গল্প, নাটক লেখার অবসরে রচিত ছিন্নপত্রের চিঠিগুলো একান্ত নিজস্ব উপলব্ধি; সদ্য অর্জিত অভিজ্ঞতাজাত অভিব্যক্তি। ব্যক্তিগত চিঠি হয়েও এগুলো রবীন্দ্র-শিল্পীসত্তার এক স্বতন্ত্র উৎসারণ। তাই চিঠিগুলোর ভেতরটা দেখা জরুরি। সে জন্যই কেবল বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বসে যেসব চিঠি তিনি লিখেছেন তারই নির্বাচিত কয়েকটির আলোকে আমরা ছিন্নপত্রের রবীন্দ্রনাথের মানসরূপটি অনুসন্ধান করতে প্রয়াসী। একই সঙ্গে বাংলাদেশ অর্থাৎ পূর্ববাংলা রবীন্দ্র-চেতনায় কী রূপে আবির্ভূত, তা খতিয়ে দেখাও উদ্দেশ্য। 

১৮৮৯ সালের নভেম্বরে শিলাইদহ থেকে লেখা পত্রটি বাংলাদেশে অবস্থানকালে কবি রচিত ছিন্নপত্রের প্রথম চিঠি। রবীন্দ্রনাথ তখন আটাশ পেরোনো তরুণ। যে বয়স কেবল জগতের সবকিছুতে সুন্দরকে খোঁজে; অজানা-অচেনার গভীর রহস্যের কিনারা পেতে চায়। সেই স্বচ্ছ, নিস্কলুষ দৃষ্টিতে তিনি বাংলাদেশের পদ্মাপারের প্রকৃতিকে দেখামাত্র সবিস্ময়ে লিখেছেন- পৃথিবী যে বাস্তবিক কী আশ্চর্য সুন্দরী তা কলকাতায় থাকলে ভুলে যেতে হয় [১০-সংখ্যক পত্র]। এই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি আলোচ্য গ্রন্থের অনেক পত্রে লক্ষণীয়। ছিন্নপত্র যেহেতু কবিতা নয়, গল্প নয়; নাটক কিংবা সঙ্গীত নয়, সেহেতু এতে বর্ণিত সব কথা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের। সব বক্তব্যের ভাষক তিনি; দায় তার। কবির প্রতিটি বক্তব্যকে তার নিজের বলে অবলীলায় বিশ্বাস করা উচিত। সুতরাং ওই ক্ষুুদ্র বাক্যটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তার চেতনাকে নবতর উপলব্ধি দান করেছে। দিনরাত্রির আবর্তন, ঋতুচক্রের আরও সেই বিস্ময়কর সৌন্দর্যের লীলাকে মূর্ত করে। এই সৌন্দর্যের কাছে কলকাতা ম্লান; নাগরিক যান্ত্রিকতায় পরিপূর্ণ ছকে বাঁধা সে জীবন নতুনত্বের অভাবে বৈচিত্র্যহীন, ক্লান্তিকর। এই উপলব্ধির প্রকাশ উপরি-কথিত পত্রে কী আশ্চর্য দার্শনিকতায় গিয়ে পৌঁছেছে, তা পত্রাংশ থেকে দেখে নেওয়া যায়-

...সূর্য আস্তে আস্তে ভোরের বেলা পূর্ব দিক থেকে কী এক প্রকাণ্ড গ্রন্থের পাতা খুলে দিচ্ছে এবং সন্ধ্যায় পশ্চিম থেকে ধীরে ধীরে আকাশের উপরে যে-এক প্রকাণ্ড পাতা উলটে দিচ্ছে সেই বা কী আশ্চর্য লিখন-- আর এই ক্ষীণ পরিসর নদী আর এই দিগন্তবিস্তৃত চর আর ঐ ছবির মতন পরপার ধরণীর এই উপেক্ষিত একটি প্রান্তভাগ -- এই বা কী বৃহৎ নিস্তব্ধ নিভৃত পাঠশালা...।

স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে বিধিবদ্ধ পাঠক্রমে যার দমবন্ধ হয়ে আসত, তিনি পূর্ববাংলার প্রকৃতিকে কী বৃহৎ নিস্তব্ধ নিভৃত পাঠশালা বলে অভিহিত করলেন। কলকাতায় যা অভাবনীয় এখানে তা সহজিয়া। অন্যত্র, কলকাতাটা বড় ভদ্র ও বড় ভারী, গভর্নমেন্টের অফিসের মতো। জীবনের প্রত্যেক দিনই যেন একই আকারে একই ছাপ নিয়ে টাকশাল থেকে তক্‌তকে হয়ে কেটে কেটে বেরিয়ে আসছে--নীরস মৃত দিন, কিন্তু খুব ভদ্র ও সমান ওজনের। পাঠ গ্রহণের কায়দাও ভিন্ন- ঘাটে ঘাটে নৌকা ভিড়েছে তার। গ্রামীণ বাংলার অনুজ্জ্বল জীবন ও অধিবাসীদের বিচিত্র সংগ্রামের বস্তুগত রূপ তার প্রত্যক্ষণের পরিধিকে দান করছে বিস্তৃতি। নিত্য পরিবর্তিত হচ্ছে তার চৈতন্য- নিবিষ্ট পাঠক তিনি, তদগতচিত্তে পাঠ গ্রহণ করছেন, শিক্ষণীয় যা তা অধিগত করে লিখছেন তার পাঠকের জন্য। রবীন্দ্র-শিল্পীসত্তার এ এক ভিন্নতর জাগরণ কাল। ৩২ বছর বয়সে ১৮৯৩ সালে, আর কোথাও যা বলেননি, ছিন্নপত্রে তিনি তা ৯২-সংখ্যক পত্রে জানালেন-

আমি বাস্তবিক ভেবে পাই নে কোন্‌টা আমার আসল কাজ। এক-এক সময় মনে হয়, আমি ছোটো ছোটো গল্প অনেক লিখতে পারি এবং মন্দ লিখতে পারি নে-- লেখবার সময় সুখও পাওয়া যায়। এক-এক সময় মনে হয়, আমার মাথায় এমন এমন অনেকগুলো ভাবের উদয় হয় যা ঠিক কবিতায় ব্যক্ত করবার যোগ্য নয়, সেগুলো ডায়ারি প্রভৃতি নানা আকারে প্রকাশ করে রেখে দেওয়া ভালো ; বোধ হয় তাতে ফলও আছে আনন্দও আছে। ...আমার বুদ্ধিতে যতটা আসে তাতে তো বোধ হয়, কবিতাতেই আমার সকলের চেয়ে বেশি অধিকার। কিন্তু আমার ক্ষুুধানল বিশ্বরাজ্য ও মনোরাজ্যের সর্বত্রই আপনার জ্বলন্ত শিখা প্রসারিত করতে চায়। যখন গান তৈরি করতে আরম্ভ করি তখন মনে হয়, এই কাজেই যদি লেগে থাকা যায় তা হলে তো মন্দ হয় না; আবার যখন একটা-কিছু অভিনয়ে প্রবৃত্ত হওয়া যায় তখন এমনি নেশা চাপে যায় যে মনে হয় যে, চাই কী, এটাতেও একজন মানুষ আপনার জীবন নিয়োগ করতে পারে। আবার 'যখন বাল্যবিবাহ' কিংবা 'শিক্ষার হেরফের নিয়ে পড়া যায় তখন মনে হয়, এই হচ্ছে জীবনের সর্বোচ্চ কাজ। ... স্বীকার করতে হয় যে, ঐ যে চিত্রবিদ্যা বলে একটা বিদ্যা আছে তার প্রতিও আমি সর্বদা হতাশ প্রণয়ের লুব্ধ দৃষ্টিপাত করে থাকি...।

২.

প্রবুদ্ধ কবির এই সত্য ভাষণটি ছিন্নপত্র ব্যতীত অন্যত্র হয়তো প্রকাশ করতে কুণ্ঠা বোধ করতেন। বলা বাহুল্য, সব শিল্পআঙ্গিকের স্রষ্টা এবং সব শিল্পমাধ্যমে অভাবনীয় সফল রবীন্দ্র-শিল্পীসত্তার দ্বিতীয় জাগরণকাল ছিন্নপত্র রচনা-পর্ব। প্রভাত সংগীত রচনকালে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ কবিতার পটভূমি সম্বন্ধে কবির আত্মস্বীকৃতির সাথে উদ্ধৃত বক্তব্যের সাদৃশ্য রয়েছে। শিল্পীর চেতনালোকের সিংহদুয়ার খুলে গেছে। আত্মশক্তিতে বলীয়ান কবির উচ্চারণ প্রত্যয়দীপ্ত। অবাধ কল্পনার সাথে প্রত্যক্ষ বাস্তবতা ঘনীভূত অভিজ্ঞতা রূপে পরিপুষ্টি দান করেছে কবি চেতনাকে। কবিতা, সঙ্গীত, নাটক ও উপন্যাস রচনার প্রয়াস আরও আগে থেকেই অব্যাহত ছিল, কিন্তু গল্প রচনার আরম্ভ ১৮৯১ সালে। ১৮৯৩ সালের আষাঢ় মাসে শাহজাদপুরে বসে রচিত আলোচ্য পত্রে কবি আপন অস্তিত্বের সাথে বোঝাপড়া শেষে নিজের শিল্পীসত্তার প্রবণতা সম্বন্ধে স্থির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। স্থিতধি বিচারকের ভঙ্গিতে নিজের সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের কোনো বক্তব্য ইতিপূর্বে শোনা যায়নি। প্রকৃতির উদার বিস্তারের মধ্যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত কবি পদ্মা ও অন্যান্য নদীতীরবর্তী জীবনের নিবিষ্ট পাঠক- বালিকণা, তরঙ্গচূড়া, ঝুপঝাপ পাড়ভাঙার শব্দ, মহিষের ঘাস খাওয়ার শব্দ, পাখিদের কাকলি, মেঘ-রোদ-বৃষ্টি ও হাওয়ার লীলা, নিরন্ন মানুষের কষ্টসহিষ্ণু সোনার হৃদয়, রমণীহৃদয়ের মৌল প্রকৃতি থেকে নক্ষত্রলোক পর্যন্ত সবকিছুর গঠন রূপ, গতিপ্রকৃতি তার পাঠ্যবিষয়ের তালিকাভুক্ত।

গরু চরানোর সময়কার রাখাল বালকের মনস্তত্ত্বের রহস্য উন্মোচন করতে না পারার জন্য অতি ক্ষীণরেখায় কষ্ট জেগে থাকে মনে। নদীস্রোতের আবর্তন দেখার অভিজ্ঞতার আলোকে বস্তু থেকে তার গতিশক্তিকে আলাদা করে বিচার করতে বসেন রবীন্দ্রনাথ- যেন তিনি বিজ্ঞানী, যেন তুলনামূলক সাহিত্যের নিষ্ঠাবান গবেষক। কালিগ্রামের প্রজাদের দুঃখে বিগলিত রবীন্দ্রনাথ নিরুপায় কবি, যেন তিনি জমিদার নন। একই ব্যক্তি চলনবিল পেরিয়ে কালিগ্রামে যাত্রাপথে বিল আর নদীর ব্যবধান খুঁজে বের করেন অবলীলায়। নদীর দুই তীর তার শোভা এবং গতির কারণ; কবিতার ছন্দও তার অন্তর্গত গতি ও সৌন্দর্যের উৎস। এই কাব্যদর্শন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার স্মারক হিসেবে ৯৪-সংখ্যক পত্রে উল্লিখিত। আমরা আরও অবহিত হই ছন্দের বন্ধনে কবিতায় সৃষ্টি হয় গতির সৌন্দর্য, ধ্বনির সৌন্দর্য এবং আকারের সৌন্দর্য। কবিতার সৌন্দর্য ও বিশ্বজগতের সৌন্দর্য যে অভিন্ন নিয়মেই উৎপন্ন ছিন্নপত্রের আলোচ্য পত্র পাঠের আগে তা আমাদের ভাবনায়ও আসে না। ১৮৯৪ সালের মার্চে পতিসরে বসে রচিত পত্রে রবীন্দ্রনাথ তার উপলব্ধির কথা জানান এভাবে- আমার বোধ হয়, সকল ধর্মের শ্রেষ্ঠধর্ম সর্বজীবে দয়া। প্রেম হচ্ছে সমস্ত ধর্মের মূল ভিত্তি। বোঝা যাচ্ছে দয়া এবং প্রেম এ সময় থেকেই রবীন্দ্রনাথের দর্শনের কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে। ছিন্নপত্রেই দেখি রবীন্দ্রনাথ শিল্পসৃষ্টির যা জাদু- প্রতিদিনের সত্যকে চিরদিনের সৌন্দর্যের মধ্যে তর্জমা করে দেয়া তা রপ্ত করেছেন। সুবিধা, সঙ্গতি ও সৌন্দর্য যে জাগতিক শৃঙ্খলার সার- এই সত্যটিও কবি এ পর্বে আত্মস্থ করেন। শুদ্ধতার যে সাধনা জীবনভর করেছেন তার উন্মেষ যেন ছিন্নপত্রেই। ১৮৯৪ সালের ১৬ আগস্টের পত্রে শিলাইদহ থেকে কবি তার উপলব্ধির কথা বলেন এভাবে- ...আমার মধ্যে যে দুটি প্রাণী আছে, বাইরের আমি এবং আমার অন্তঃপুরবাসী আত্মা, এই দুটিতে মিলে সমস্ত ঘরটি দখল করে বসে থাকি; এই দৃশ্যের মধ্যগত সমস্ত পশু পক্ষী প্রাণী আমাদের অন্তর্গত হয়ে যায়...। ১০ আগস্টের পত্রে এই আত্মোপলব্ধি ও বিশ্বাত্মার বোধ অনুপস্থিত। সেখানে শিলাইদহের দিনরাত্রির পালাবদল রবীন্দ্র-চেতনায় ইউরোপীয় সঙ্গীত ও ভারতীয় সঙ্গীতের মৌল স্বভাবটি আবিস্কারের উপায় হয়েছে। কবি লেখেন- আমার মনে হয়, দিনের জগৎটা য়ুরোপীয় সংগীত, সুরে-বেসুরে খণ্ডে-অংশে মিলে একটা গতিশীল প্রকাণ্ড হার্মনির জটলা। আর, রাত্রের জগৎটা আমাদের ভারতবর্ষীয় সংগীত, একটি বিশুদ্ধ করুণ গম্ভীর অমিশ্র রাগিণী। দুটোই আমাদের বিচলিত করে, অথচ দুটোই পরস্পর বিরোধী। 

অতি সাধারণ একটি দৃষ্টান্ত দ্বারা সঙ্গীতের মতো গুরুগম্ভীর ও বিস্তৃত বিষয়কে অবলীলায় উপস্থাপন বিস্ময়কর। ছিন্নপত্রে এরূপ ছোট্ট ছোট্ট প্রসঙ্গের অবতারণা করে কবি গভীর তত্ত্ব ও দার্শনিক বিষয়ের ধন্দ নিরসন করেছেন। ছিন্নপত্রের বাংলাদেশ অতি ছোট্ট। রবীন্দ্র-বিচরণের ভূগোলটি - কুষ্টিয়া > শিলাইদহ > গোয়ালন্দ > শাহজাদপুর > পাবনা > নাটোর > দিঘাপতিয়া > পতিসর > কালিগ্রাম। কবি শিল্প-সোনা ভরা সোনার তরী বেয়েছেন গোরাই, আত্রাই, ছোট যমুনা, চলনবিল, ইছামতী, পদ্মা, যমুনা এবং আমাদের ছোট নদী নাগরের বাঁকে বাঁকে। শিলাইদহ ও শাহজাদপুরে তিনি কুঠিবাড়িতে অবস্থান করতেন; ভ্রমণ করতেন বোটে। পতিসরে রবীন্দ্রনাথ বোটেই সর্বক্ষণ অবস্থান করতেন। কিন্তু সূক্ষ্ণ প্রত্যক্ষণ এবং অনুভব দ্বারা জীবনের গভীরতর সত্য উপলব্ধি করতেন অনায়াসে। জলপথে দিঘাপতিয়া যাত্রাকালে সেকালের যে-জীবনচিত্র ছিন্নপত্রে উপস্থাপন করেছেন, তা সামাজিক ইতিহাসের অন্যতম দলিলরূপে গ্রাহ্য।

...এক-একটি কুঁড়েঘর স্রোতের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার চার পাশের প্রাঙ্গণ জলমগ্ন। ...জল যেখানে সুবিধা পাচ্ছে প্রবেশ করছে--স্থলের এমন পরাভব আর-কোথাও দেখা যায় না। আর-একটু জল বাড়লেই ঘরের ভিতর জল প্রবেশ করবে। 

৩.

মাচা বেঁধে তার উপর বাস করতে হবে, গোরুগুলো দিনরাত একহাঁটু জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মরবে, রাজ্যের সাপ জলমগ্ন গর্ত ত্যাগ করে ঘরের চালে আশ্রয় নেবে এবং যেখানকার যত গৃহহীন কীটপতঙ্গ সরীসৃপ মানুষের সহবাস গ্রহণ করবে। যখন গ্রামের চারি দিকের জঙ্গলগুলো জলে ডুবে পাতা লতা গুল্ম পচতে থাকে, গোয়ালঘর ও লোকালয়ের বিবিধ আবর্জনা চারি দিকে ভেসে বেড়ায়, পাটপচানির গন্ধে বাতাস ভারাক্রান্ত, উলঙ্গ পেট-মোটা পা-সরু রুগ্‌ণ ছেলেমেয়েরা যেখানে সেখানে জলে কাদায় মাখামাখি ঝাঁপাঝাঁপি করতে থাকে, মশার ঝাঁক স্থির জলের উপর একটি বাষ্পস্তরের মতো ঝাঁক বেঁধে ভেসে বেড়ায়, গৃহস্থের মেয়েরা ভিজে শাড়ি গায়ে জড়িয়ে বাদলার ঠাণ্ডা হাওয়ায় বৃষ্টির জলে ভিজতে ভিজতে হাঁটুর উপর কাপড় তুলে জল ঠেলে ঠেলে সহিষ্ণু জন্তুর মতো ঘরকন্নার নিত্যকর্ম করে যায়-- তখন দৃশ্য কোনোমতেই ভালো লাগে না। ঘরে ঘরে বাতে ধরছে, পা ফুলছে, সর্দি হচ্ছে, জ্বরে ধরছে, পিলেওয়ালা ছেলেরা অবিশ্রাম কাঁদছে, কিছুতেই কেউ তাদের বাঁচাতে পারছে না-- এত অবহেলা অস্বাস্থ্য অসৌন্দর্য দারিদ্র্য মানুষের বাসস্থানে কি এক মুহূর্ত সহ্য হয় [পত্র ১২১ ২ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪]!

উদ্ধৃতাংশের ফটোগ্রাফিক বর্ণনা শুধু যে বর্ণনাকারী দ্রষ্টার, তা নয়; সহানুভূতিশীল ও মানবতাবাদী একটি শিল্পীমন এ-বর্ণনার অভ্যন্তরে নিহিত। মানুষের দুরবস্থা দৃষ্টে করুণা ও সহানুভূতিতে চিত্ত আর্দ্র হলেও তিনি নিরুপায়। তার দৃষ্টান্ত পতিসর থেকে লেখা পুত্র রথীন্দ্রনাথের পত্রে লভ্য। কৃষক ও কৃষিজীবী মানুষের দুরবস্থা দূর করণার্থে পতিসরে কৃষি ব্যাংক স্থাপন ও সমবায় সমিতির মাধ্যমে পল্লীসমাজ গড়ায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন, সে তো সর্বজনবিদিত সত্য। ছিন্নপত্রের অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লেখা পত্রপাঠে ভিন্ন এক রবীন্দ্রনাথের সাথে পরিচয় ঘটে পাঠকের। তিনি সহানুভূতিশীল, মানুষ, দার্শনিক, সৌন্দর্য ও ন্যায়ের পক্ষপাতী, গবেষক, বস্তুজগতের নিহিত সত্যসন্ধানী এবং জীবনপ্রেমী সাহিত্যিক সর্বোপরি একজন শিক্ষক। রবীন্দ্রনাথের অস্তিত্বে বাংলাদেশ কতটা প্রভাবকরূপে বিদ্যমান, তার দৃষ্টান্ত 'শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ' গ্রন্থে প্রমথনাথ বিশীর আলোচ্য বক্তব্য- কলকাতার নাগরিক সন্তানকে মহাকবির পদবী দান করলো বাংলাদেশের জনপদ আর পল্লী আর নদী শস্যক্ষেত্র নিচয়ের ঋতুভেদে বিচিত্র দৃশ্যাবলী...। আমাদের বক্তব্য, রবীন্দ্রশিল্পী মানসের মূল ভিত্তির রচয়িতা পদ্মা-যমুনা ও এদের শাখা নদীবিধৌত বাংলাদেশ। ছিন্নপত্রে চিত্রিত বাংলাদেশ তার অস্তিত্বেরই অংশ যেন- ইন্দিরা দেবীকে লেখা ১১ মার্চ ১৮৯৫, শিলাইদহ থেকে পাঠানো পত্রের শেষ করেন এ কথা বলে- ...আমার গদ্যে পদ্যে কোথাও আমার সুখদুঃখের দিনরাত্রিগুলি এরকম করে গাঁথা নেই। তৎকালীন পদ্মার চরকে দূর ভবিষ্যতে বার্ধক্যের নিঃসম্বল সময়ে এমনি টাটকা ভাবে ফিরে পাওয়ার ব্যাকুলতা ঝরেছে উপরি-উক্ত চিঠিতে।

এমএ/ ১১:৪৪/ ০৪ মে

বইপত্র

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে