Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (65 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৫-০৪-২০১৮

বাঙালির বাতিঘর জাহানারা ইমাম

রুদ্র মাহমুদ


বাঙালির বাতিঘর জাহানারা ইমাম

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, মুক্তিযুদ্ধে স্বামী ও পুত্র হারানোর শোক কিংবা মৃত্যুব্যাধি ক্যান্সার, কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। দেশের প্রতি অসীম ভালোবাসা নিয়ে যারা লাল-সবুজের পতাকার বিরোধিতা করেছেন, তাদের বিচারের দাবিতে সূচিত করেছিলেন আন্দোলন। একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিরুদ্ধে নব্বই দশকে যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন শহীদ জননী, তারই ফলাফল চার দশক পর এখন বিচার হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের।

মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ লক্ষ মায়ের সন্তান বিয়োগের চিরন্তন যাতনা মূর্ত হয়ে উঠেছে যাকে কেন্দ্র করে তিনি হলেন জাহানারা ইমাম। শহীদ রুমির মা আবির্ভূত হয়েছিলেন লক্ষ শহীদের জননীরূপে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তার সন্তান রুমী ও সঙ্গী মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও খাদ্য দেয়া, অস্ত্র আনা নেয়া ও যুদ্ধ ক্ষেত্রে তা পৌঁছে দেয়া ইত্যাদি ছিল তার মুক্তিযুদ্ধকালিন প্রধান ভূমিকা। যুদ্ধের শেষদিকে রুমী পাকিস্তানীদের হাতে ধরা পড়েন এবং নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। বিজয় লাভের পর রুমীর বন্ধুরা রুমীর মা জাহানারা ইমামকে সকল মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে বরণ করে নেন৷ রুমীর শহীদ হওয়ার সূত্রেই তিনি ‘শহীদ জননী’র মযার্দায় ভূষিত হন ৷

জাহানারা ইমাম ছিলেন আমাদের জোয়ান অব আর্ক। প্রীতিলতা, বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, নীলিমা ইব্রাহিম যেভাবে নানা ইস্যুতে সবাইকে এক সুতোয় গেঁথেছিলেন, তার বড় কাজটি করেছিলেন শহীদ জননী।

মহীয়সী নারী জাহানারা ইমাম জন্মদিন আাজ। ১৯২৯ সালের ৩ মে পশ্চিবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে তিনি জন্ম নেন। ত্রিশ ও চল্লিশ দশকের রক্ষণশীল বাঙালি মুসলমান পরিবার বলতে যা বোঝায়, সে রকম একটি পরিবারেই তিনি জন্মেছিলেন। জাহানারা ইমামের ডাক নাম ছিলো জুড়ু। পরে জুড়ু-কে জাহান নামে ডাকা হতো। জাহানারা ইমামের বাবা সৈয়দ আবদুল আলী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। মা সৈয়দা হামিদা বেগম গৃহিনী।

বাবার সহযোগিতায় লেখাপড়া শুরু করেন তিনি। রংপুরের কারমাইকেল কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর চলে আসেন কলকাতায়। বাবা ও মা হামিদা বেগমের প্রেরণায় উচ্চ শিক্ষা লাভ করতে সক্ষম হন। কলকাতা থেকে বি এ পাস করেন। এরপর বিয়ে হয় ইঞ্জিনিয়ার শরিফুল আলম ইমাম আহমেদের সঙ্গে। ময়মনসিংহ শহরের বিদ্যাময়ী গার্লস স্কুলে শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনের শুরু হয়। স্বামীর কর্মস্থল বদলের কারণে তাঁকে এ চাকরি ছাড়তে হয়। এরপর ঢাকায় আসেন ১৯৪৮ সালে। ১৯৫১ সালে প্রথম সন্তান রুমীর জন্ম। সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন মাত্র ২৩ বছর বয়সে। মাঝে কিছুদিন কর্মবিরতি বাদে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি ওই স্কুলেই প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর মাঝে জন্ম নেয় অপর সন্তান জামী। ছেলেদের দেখাশোনার জন্য চাকরি ছেড়ে দেন। শুরু হয় তাঁর পুরো মাত্রায় সংসার জীবন।

চার বছর পর ১৯৬৪ সালে আমেরিকা যান ফুল ব্রাইট স্কলারশীপ নিয়ে। ফিরে এসে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে যোগ দেন অধ্যাপিকা হিসেবে। জড়িয়ে পড়েন বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনে। পাশাপাশি চলতে থাকে সংসার জীবন ও লেখালেখি। শুরু হয় ৬৯- এর গণঅভ্যুত্থান। এরই ধারাবাহিকতায় ’৭১এ প্রিয় সন্তান রুমী যোগ দেয় মুক্তিযুদ্ধে। ট্রেনিং থেকে ঢাকায় ফিরে রুমী নিয়মিত অংশ নিতে থাকে বিভিন্ন অপারেশনে। রুমী ও তার সঙ্গীদের একজন সহযোদ্ধা হযে যান জাহানারা ইমাম। গাড়িতে অস্ত্র আনা নেয়া, পৌঁছে দেয়া, মুক্তিযোদ্ধাদের বাসায় আশ্রয় দেয়া, খবর আদান-প্রদান, এসব ছিলো তাঁর নিয়মিত কাজ। যুদ্ধের শেষ দিকে রুমী ধরা পড়েন এবং পাকবাহিনীর নির্মম অত্যাচারে শহীদ হন। জাহানারা ইমামের স্বামী শরিফ ইমাম পুত্র হারানোর শোকে হার্টফেল করে মারা যান। যুদ্ধ বিজয়ের আনন্দটুকু তাঁর বিষাদে ছেয়ে যায়।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি থেকে ডায়েরি আকারে লেখা তাঁর অমর গ্রন্থ একাত্তরের দিনগুলি প্রকাশ হয় ১৯৮৬ সালে এ গ্রন্থ দেশ-বিদেশে ব্যাপক সাড়া জাগায়। তিনি হয়ে ওঠেন স্বনামধম্য লেখিকা। এছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হচ্ছে, অন্যজীবন, নিঃসঙ্গ পাইন, সাতটি তারার ঝিকিমিকি, বিদায় দে’মা ঘুরে আসি, প্রবাসের দিনলিপি, ক্যান্সারের সাথে বসবাস এবং একাত্তরের দিনগুলির ইংরেজি অনুবাদ অফ ব্লাড এন্ড ফায়ার। সাহিত্য সাধনার জন্যে তিনি বাংলা একাডেমী ও লেখিকা সংঘ পুরস্কার লাভ করেন।

আশির দশকের শুরুতে তাঁর ওরাল ক্যান্সার ধরা পড়ে। প্রতি বছর তাঁকে দু একবার করে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে অপারেশন করে আসতে হতো। ১৯৯৪ সালে তাঁর অসুস্থতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। প্রিয়তম পুত্র ও স্বামী হারানোর দুঃসহ শোক আর দেহে দুরারোগ্য ক্যান্সার নিয়েও তিনি ছিলেন একজন বলিষ্ঠ, সাহসী আর অবসম্ভব প্রাণবন্ত মানুষ। একাত্তরের ঘাতক-দালাল-যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন সকল মুক্তিযোদ্ধার শাশ্বত জননী। ১৯৯১ এর ২৯ ডিসেম্বর অন্যতম প্রধান যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে জামাতের আমীর ঘোষণা করা হলে সচেতন মহলে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯ জানুয়ারি ১৯৯২ এ ১০১ সদস্যের একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠন করা হয়। জাহানারা ইমাম তার আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, নারী, শ্রমিক, কৃষক, সাংস্কৃতিক জোটসহ মোট ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে ১৯৯২ এর ১১ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন হলে তিনি সর্বসম্মতিক্রমে তারও আহ্বায়ক হন।

তাঁর নেতৃত্বে এ কমিটি সে সময়ের ক্ষমতাশালীদের প্রবল বাধা অতিক্রম করে ১৯৯২ এর ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণআদালতের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অনুষ্ঠান করে। জাহানারা ইমাম ছিলেন ১২ সদস্যের বিচারকমণ্ডলীর চেয়ারম্যান। লাখো জনতার আদালতে তিনি গোলাম আযমের ১৩টি অপরাধ মৃত্যুদণ্ড যোগ্য বলে রায় ঘোষণা করেন। এবং রাষ্ট্রীয় আদালতে বিচারের মাধ্যমে এ রায় বাস্তবায়নের জন্য তিনি সরকারের কাছে দাবি জানান। কিন্তু জাহানারা ইমামসহ গণআদালতের সাথে জড়িত ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে উল্টো রাষ্ট্রদ্রোহের অজামিনযোগ্য মামলা দায়ের করা হয়। পরে হাইকোর্ট তাঁদের জামিন মঞ্জুর করেন।

জাহানারা ইমাম ১৯৯২ এর ১২ এপ্রিল গণআদালতের রায় কার্যকরের জন্য লাখো জনতার পদযাত্রার মাধ্যমে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং বিরোধী দলীয় নেতার কাছে স্মারকলিপি পেশ করেন। আন্দোলনের অংশ হিসেবে এরপর তিনি দেশজুড়ে গণসমাবেশ, গণস্বাক্ষর এবং মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন।

১৯৯৩ সালের ১৮ মার্চ জাহানারা ইমাম আন্দোলনরত অবস্থায় পুলিশের আঘাতে আহত হন এবং সে সময়ের পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে জীবন রক্ষা করেন। তাঁর আপসহীন ভূমিকায় দেশ-বিদেশে এ আন্দোলনের জোয়ার তৈরি হয় এবং বিভিন্ন কমিটি গঠন হয়। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট গোলাম আযমসহ ’৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দেলনকে সমর্থন দেয়।

গণআদালতের তৃতীয় বার্ষিকীতে অর্থাৎ, ১৯৯৪ এর স্বাধীনতা দিবসে জাহানারা ইমাম ৮ জন যুদ্ধাপরাধীর তদন্ত রিপোর্ট পেশ করেন এবং নতুন আরও ৮ জনের বিরুদ্ধে তদন্তের ঘোষণা দেন। ১৯৯৪ এর ৭ মার্চ নারী গ্রন্থ প্রবর্তনা তাঁকে শ্রেষ্ঠ সংগ্রামী নারী হিসেবে জাতীয় সংবর্ধনা দেয়। ১৪০১ সালের পয়লা বৈশাখ ‘আজকের কাগজ’ তাঁকে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধার সম্মান দেয়। তবে এ পুরস্কার গ্রহণের আগেই ১৯৯৪ এর ২ এপ্রিল তিনি চিকিৎসার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা হন। ২২ এপ্রিল ডাক্তাররা জানিয়ে দেন, ক্যান্সারের বিপজ্জনক বীজ অপসারণ আর সম্ভব নয়। ২৬ জুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তখনও তাঁর নামে দেশদ্রোহের মামলা ঝুলছিল। জাহানারা ইমাম এর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী মরদেহ দেশে এনে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

কাজের স্বীকৃতি হিসেবে জাহানারা ইমাম অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন যথাঃ ১৯৮৮ সালেবাংলাদেশ লেখিকা সংঘ সাহিত্য পুরস্কার, কমর মুশতরী সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯১ সালে বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, ১৪০১ সালের ১ বৈশাখআজকের কাগজ হতে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা পুরস্কার, ১৯৯৪ সালের মার্চ মাসে নারী গ্রন্থ প্রবর্তনা পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে স্বাধীনতা পদক, ১৯৯৮ সালে রোকেয়া পদক, ২০০১ সালে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার,ইউনিভার্সাল শিল্পী গোষ্ঠী পুরস্কার, শাপলা ইয়ূথ ফোর্স পদক, কারমাইকেল কলেজ - গুণীজন সম্মাননা, মাস্টারদা সূর্যসেন পদক, মুক্তিযুদ্ধ উৎসব-ত্রিপুরা সাংগঠনিক কমিটি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, রোটারাক্ট ক্লাব অব স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় শিল্পী গোষ্ঠী পুরস্কার, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংঘ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পদক ইত্যাদি।

শুধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলনই নয়; মুক্তবুদ্ধি আর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ায়ও সোচ্চার ছিলেন আমৃত্যু। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা 'একাত্তরের দিনগুলি' তাকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। বাঙালির জীবনে জাহানারা ইমাম বেঁচে থাকবেন অনন্য মহিমায়। লড়াকু, প্রতিবাদের দৃপ্ত প্রতীক শহীদ জননীর জন্মদিনে; তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা।

সূত্র: পূর্বপশ্চিম

আর/০৭:১৪/০৪ মে

শ্রদ্ধাঞ্জলি

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে