Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (65 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৪-২৫-২০১৮

নিরুদ্দেশ হাওয়ায় কবি

নির্মলেন্দু গুণ


নিরুদ্দেশ হাওয়ায় কবি

কবি বেলাল চৌধুরীর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় অগ্নিঝরা সেই সময়, ১৯৭১-এ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলছে। কবি তখন পশ্চিমবঙ্গে ছিলেন। পুরো ষাটের দশক তিনি কলকাতা কাটিয়েছেন। সুনীল-শক্তি তখন বাংলা সাহিত্যে দোর্দণ্ড প্রতাপে বিরাজ করছেন। বেলাল চৌধুরী ছিলেন তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। 

সেই সূত্রে এবং নিজের লেখালেখির হাত ধরেই কলকাতায় তিনি বেশ খ্যাতি অর্জন করেছেন। এমনকি এমনও হয়েছে, তখন অনেকে জানতেনই না যে তিনি পূর্ব বাংলার মানুষ। সবাই বেলালদা বলে ডাকত তাকে।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য পত্রিকা 'কৃত্তিবাস'। বেলাল চৌধুরী অতি তরুণ বয়সে কৃত্তিবাস সম্পাদনা করেছেন, যা অত্যন্ত গৌরবের একটি বিষয়। তার প্রাণখোলা মানসিকতা ও উদার স্বভাবের কারণে তিনি সবার কাছের মানুষে পরিণত হন। সব বয়সী মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন বেলাল চৌধুরী।

তখনও তিনি কবি হিসেবে ততটা পরিচিত বা খ্যাতিমান নন। কিন্তু সম্পাদনা ও প্রখ্যাত সব কবির সঙ্গে তার সখ্যের কারণে এবং সেইসঙ্গে তার দৃষ্টিভঙ্গি ও সহজ সাবলীলতার জন্য তত দিনে সাহিত্যমহলে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তা ছাড়া তৎকালীন পূর্ব বাংলার কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের কবি-সাহিত্যিকদের যোগসূত্র স্থাপনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। 

দেশে ফেরার পর তিনি নানা পত্র-পত্রিকায় কাজ করেন। সচিত্র সন্ধানীতে কাজ করেছেন। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় কাজ করেছেন। ভারত বিচিত্রার সম্পাদক ছিলেন তিনি দীর্ঘদিন। বলা যায়, একটু পরিণত বয়সেই তিনি নিয়মিত কাব্যচর্চা শুরু করেন। তার নম্র বাকভঙ্গি, উড়নচণ্ডী স্বভাব এবং বন্ধুবাৎসল্য তাকে স্বভাবকবি হিসেবে খ্যাতিমান করে তোলে। তিনি প্রবীণদের সঙ্গে যেমন ওঠাবসা করতেন, তেমনি তরুণ সাহিত্যিকদের সঙ্গেও মিশতেন, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। 

আর কবিতা নিয়েও তার ভাবনাটা ছিল আলাদা। তার গদ্যও ছিল অসাধারণ, অনেকটা নিজস্ব গতি ও স্বকীয় দোলাচলে নির্মিত। বেলাল চৌধুরী বলতেন, 'কবিতা জীবনকে শুষে নেয়।' তিনি লিখেছিলেন, 'কবিতাকে ভেবেছিলাম জীবনের এক অবশ্যম্ভাবী জরুরি বিষয় হিসেবে। জীবনের অঙ্গ হিসেবে কবিতাকে জড়িয়েও নিয়েছিলাম মনে-শরীরে। কিন্তু কবিতা তো জীবনকে শুষে নেয়। শুষে নেওয়ার অসীম এক ক্ষমতা আছে কবিতার। কবি মাত্রেই এই শোষণের শিকার হয়। আমি ছাড়লেও আমাকে ছাড়ে না কবিতা। কবিতার হাত দিয়ে আমি প্রকাশ করে চলি আমার পাপ-পুণ্য, দেখা-অদেখা, ধরা কিংবা অধরাকে। জীবনে বেঁচে থাকার অথবা মৃত্যুতে মরে যাবার উপলব্ধিগুলোকে শব্দে শব্দে যতটা প্রকাশ করতে চেয়েছি- তার কিছু হয়েছে প্রকাশিত, কিছু রয়ে গেছে শব্দের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সেই অপ্রকাশিতই তো আমার কবিতাজীবনের লক্ষ্য। এ লক্ষ্য পূরণে কবিতাকে সঙ্গী করেছি। কিন্তু উল্টো কবিতাই আমাকে সঙ্গে নিয়ে কোথায় চলে যাচ্ছে!'... এ রকমভাবে কবিতার আকণ্ঠ প্রেমিক ছিলেন বেলাল চৌধুরী।

বিশ্বসাহিত্যের সব গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিকের বিষয়ে জানতেন তিনি। নিয়মিত পড়তেন তাদের রচনা। যে কারণে তিনি এত দুর্দান্ত মনোমুগ্ধকর অনুবাদ করতে পেরেছেন। এ দেশে লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের অনুবাদের প্রথম জন্মসুতা অনেকটা তার হাতেই। ব্যাপক এবং গভীরভাবে তিনি বিশ্বসাহিত্য পাঠ করেছেন। গ্যাটে, হেনরিখ হাইনে, ফ্রানৎসা কাফকা, গুন্টার গ্রাস, জা পল সার্ত্রে, হেরল্ড পিন্টার- এমন অজস্র সাহিত্যিককে নিয়ে তিনি লিখেছেন। খুবই গভীর সেইসব রচনা। 

তিনি যা লিখেছেন, তার পরিণতি, গন্তব্য ও গভীরতা অনেক ব্যাপক। তার কাব্যগ্রন্থগুলো নিজস্ব সৌন্দর্যে ভাস্বর। বইগুলোর নামও অসাধারণ। যেমন- 'আত্মপ্রতিকৃতি, স্থির জীবন ও নিসর্গ', 'স্বপ্ন বন্দী', 'জল বিষুবের পূর্ণিমা', 'প্রতিনায়কের স্বগতোক্তি', 'যে ধ্বনি চৈত্রে, শিমুলে', 'সেলাই করা ছায়া'। 

ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য কষ্টের হচ্ছে, আমার দীর্ঘকালের একজন অগ্রজ বান্ধব চলে গেলেন। একে একে এভাবেই মাথার ওপর থেকে ছায়া সরে যাচ্ছে। আমাকে ডাকনাম 'নির্মল' বলে ডাকার মতো মানুষের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। আমি তাকে বেলাল ভাই বলে ডাকতাম। তিনি আমাকে ডাকতেন নির্মল নামে। 

এই যে সম্পর্ক এবং কবিদের মধ্যে যে আত্মার বন্ধন থাকে- তা ছিন্ন হলে মহাকালের সেই পুরনো প্রশ্ন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। আমরা কোত্থেকে এসেছি, কোথায় যাচ্ছি? এসব চিরকালীন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বেলাল ভাই চিরকালের হাস্যময় মুখ অসীমের পথে পাড়ি দিয়ে মহাসিন্ধুর ওপারে গেলেন। আর প্রিয় মুখ দেখব না কোনোদিন!

বেলাল ভাই লিখেছিলেন, 'মেঘে মেঘে ঢের বেলা হলো। এই পৃথিবীর আলো-হাওয়ায় কম দিন তো কাটানো হলো না! ভাবি, কীভাবে পেরিয়ে যায় সময়! এই তো সেদিনও আমাদের হাসি-উচ্ছলতায় থইথই করত নানা মাহফিল, আজ সেসব নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায়।'

নিজেরই কথার মতো কবি বেলাল চৌধুরী আজ সত্যি চলে গেলেন যেন চির নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায়।

বেলাল ভাই, অসীমের পাড়ে দাঁড়িয়ে আপনাকে বিদায়। 

সূত্র: সমকাল

আর/১৭:১৪/২৫ এপ্রিল

শ্রদ্ধাঞ্জলি

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে