Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (102 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৪-২৩-২০১৮

থাকো ধরণীতে থাকো আকাশে

আকতার হোসেন


থাকো ধরণীতে থাকো আকাশে

তুমি ঢাকতে থাকো। ঢাকতে থাকো। ঢাকতে ঢাকতে আদিম মমি হয়ে যাও যেন নিজেকেই আর চিনতে পার না। পারলে চলন ঢাকো। বলন ঢাকো। প্রেমময় অনুভূতি ঢাকো।

তুমি স্বতন্ত্র ছিলে, আজ সেই স্বাতন্ত্র্য ঢাকো। তুমি মায়া ঢাকো, ছায়া ঢাকো, তুমি বিশালতাকে ঢেকে রাখো। অনিশ্চিত আক্রোশ কামনায় তুমি আবৃত কর মায়ার বাঁধন। অভিমানে, বিচ্ছেদের খেলা খেল। তুমি অন্তহীন নিজেকে আড়াল করে রাখো, তুমি ঢাকতে থাকো।

এখানে ঢাকো। ওখানে ঢাকো। দুই তিন কিংবা চারবার করে ঢাকো। ওটা ঢাকো, সেটা ঢাকো। সবদিক দিয়ে ঢেকে রাখো। জগতে ঢাকাঢাকি ছাড়া তোমার অন্য কোন কাজ নেই। যতোটুকু চিনি মেশালে পানি সরবত হয়ে যায়, তার থেকে বেশি ঢালতে থাকো। পানি আর চিনি একই পাত্রে অবস্থান তবুও ওরা পারবে না মিশতে। কারণ সে অতিরিক্ত। তুমি তেমনি অতিরিক্ত ঢাকতে থাকো নিজেকে।

আমিও ঢাকি। যতোটুকু যেখানে প্রয়োজন ততোটুকু মান্য করি। কাউকে অবিশ্বাস করে কিছু ঢাকি না। ঢাকি লজ্জা না পেতে। তোমার ঢাকাঢাকি আমাকে লজ্জা দেয়। আমি যতোটুকু ঢেকে রাখি, যে কারণে ঢাকি, তুমি তার থেকে অনেক বেশি ঢেকে রাখো। ভুলে যাও যে, আমি হাজার বার বলি, বারবার বলি এক সঙ্গে থাকবার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছি আমরা। আমি পদে পদে তোমার লুপ্ত সম্মানের কথা বলি, বলি হারানো মর্যাদার কথা। বলি সমতার কথা। তবুও আমার আর তোমার মধ্যে একটা অবিশ্বাসী গিলাফ চড়িয়ে রাখো তুমি। তুমি নাকি তাতে শান্তি পাও।

তোমার ঢাকাঢাকি থেকে একদিন দূরে চলে যাব। জানি, তোমার তাতে কিছু আসে যায় না। কেননা তোমার সুখ ওই ঢাকাঢাকির মাঝে। অতএব, তুমি একাকী সুখে থাকো। আরও ঢাকতে থাকো। আমি কোথাও থাকবো না। এর চেয়ে বেশি অভয় কি করে দেবো? তুমি তোমার মধ্যে সুখ খুঁজে নাও। তুমি একাই থাকো।

প্রতিদিন যে আকাশ আমি দেখি সেই আকাশ ছাড়া অন্য কোন আকাশ নেই। তুমিও সেই আকাশ দেখ। চন্দ্র তারা আমাদের আলো দিল অথচ আলোর নিচে দাঁড়িয়ে তুমি তোমাকে আড়াল কর। তুমি মনে কর আমার গায়ে হয়তো কোনদিন আলো লাগেনি। আমি বিশাল এক অন্ধকার।

যে পানি আমি পান করি সে পানি ছাড়া অন্য কোন পানি নেই শহরে। তুমিও সেটাই পান কর। আমাদের তৃষ্ণা মেটে একই পানিতে তবুও এক মাটিতে তুমি দূরত্ব রাখ।

যে পথ দিয়ে হেঁটে গেলে আমার পায়ে ধুলো লাগে। তোমার শরীরেও সেই ধুলো। তবু তুমি ঢাকতে থাক। পথ আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেয় তবুও আমরা নিজেদের দেখতে পাই না।

যে বাতাসে তোমার মনে দোল দেয় আমার গায়েও লাগে সে বাতাস। তবু তুমি ঢাকতে থাক। কোন গুরুত্ব নেই একই সূর্যতাপে তোমার মত আমিও উষ্ণ হলাম কিনা। তোমার ছোঁয়া লাগা বাতাস আমাকে স্পর্শ করে কি না? আমাদের ছোঁয়াছুঁয়ি প্রকৃতি মেনে নিলো কিন্তু আমাদের চোখাচোখি তুমি মেনে নিলে না। প্রয়োজন বোধ করলে আমার ছায়া থেকেও নিজেকে বাঁচিয়ে রেখো। পারলে ছায়ার মধ্যে অসভ্যতা খুঁজে দেখো। তারপর অনেক আগে যেমন ছুত অচ্ছুৎ ছিল। নিচু জাতের ছায়া দেখে উঁচু জাত সরে যেত। তুমিও আমাকে দেখে সরে যেও। ছায়ার মধ্যে অল্প স্বল্প আমি থাকি। আমার মধ্যে ফণা থাকলে ছায়ার মধ্যে বিষ আছে।

বলত দেখি, তোমার সূর্যটা দেখতে কেমন? তোমার পানির রঙ, বাতাসের গন্ধ? সেগুলো নিশ্চয় অন্যরকম। আপেল, পেয়ারা কমলালেবু? যে দশ হাত ঘুরে সেগুলো তোমার কাছে যায় তুমি কি সেই শ্রমিকের হাত চেন? হা হা হা, তুমি ঢাকতে থাকো। কে কোথায় কোন আপেল পেরেছে, কোন তরমুজ লাগিয়েছে, শস্যদানায় দিয়েছে হাত। সেই লোক যদি শরীরে হাত দেয় এই ভেবে ভেবে তার হাতের ছোঁয়া থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখো। নিজের জন্য নিজেকে ঢাকতে থাক। এতো কিছু ঢাকাঢাকি কর অথচ তুমিও রূপবান ইলিশ কেন এক হাজার টাকায়। এক কিলো রিক্সা ভাড়া দাও বিশ টাকা। তোমার জন্য কোন আলাদা দাম দর নেই। আমার জন্যও নেই কোন বিশেষ ছাড়। তবু তুমি নিজেকে ছাড় দিতে চাও।

কি লাভ, কি ক্ষতি, কতটুকু অনুন্নত থেকে উন্নত হল পৃথিবী! মনে কর আমি এক দুধ-ওয়ালা। তুমি নির্ভয়ে দুধ নিতে ঘরের বাইরে আসো, দুধের উপর নেই কোন সন্দেহ। আমি দুধ-ওয়ালা আমাকেই তুমি সন্দেহ কর। তুমি নৌকায় উঠেছ কি নিশ্চিত। তুমি নদীকে ভয় কর না, তুফান এলে কি হবে তা নিয়ে ভাবো না, অথচ আমি মাঝি বলে নিজেকে ঢেকে রাখো। একদিকে পানি কাটা কৌশল দেখে ভাব, কি হত মাঝি যদি নৌকা না বাইতে জানত? তুমি বিশ্বাস রাখ তোমাকে পার করে দেব জীবন বাজী রেখে কিন্তু অন্যদিকে তুমি আমাকে বিশ্বাস কর না একবিন্দু। বিশ্বাস করলে ওভাবে গজ ফুট দিয়ে বানাতে না ঢাল।

তোমার চোখে আমি ঘৃণা। কোন দোষ না করেও আমি হয়ে আছি দোষী। অথচ আমাকে ছাড়া তোমার চলে না। না দুধ, না আম না জাম আর লিচু। নদীর উপর এক টুকরো কাঠ তার উপর ছিলাম তুমি আর আমি। অথচ তুমি ঢাকতেই ব্যস্ত। আমার প্রতি প্রচণ্ড অবিশ্বাস তোমার। তুমি আমার বিরুদ্ধে জ্বলন্ত পোস্টার। তুমি আমার জন্য লিখে রেখেছ বিল বোর্ডের বানী। তুমি কাঁটাতারের বেড়া করে সীমান্ত করে দিয়েছ। আমি সীমান্ত এপার ওপারের নিষেধ মান্য করি কেননা এছাড়া কোন উপায় নেই।

আসলে তুমি কি ঢাকো তা নিজেই জানো না হয়তো। তোমাকে বলা হয়েছে অবিশ্বাস করতে তুমি অবিশ্বাসকে তুলে ধরেছ। তোমাকে বলা হয়েছে, তোমার কিছু গয়না আছে তাই তুমি আমাকে চোর ভেবে বসে আছো। তুমি আদতে কিছুই ঢাকো না। ইচ্ছে করলে আমি এক দুই করে বলে দিতে পারি স্থান কাল পাত্র।

তুমি আসলে কুকুর হইতে সাবধান সাইনবোর্ড নিয়ে ঘুরে বেড়াও। তুমি কুকুরকে ভয় পেয়ে ঢাকো না কিছু। ঢাকো আমার জন্য। কুকুরটা কুকুর নয় তোমার কাছে। আমার শরীরে অতিরিক্ত দুটি পা লাগিয়ে আমাকে কুকুর জাতীয় করে রাখ। অথচ কুকুরগুলো কত বিশ্বস্ত হয়। শুধু আমি থাকি অবিশ্বাসীর দলে।

জন্ম নেবার পর মা কেন এক মুঠো লবণ খাইয়ে মেরে ফেললেন না আমাকে। মা কি বুঝতে পারেনি তাঁর সন্তানকে আজীবন সন্দেহ করা হবে। সেই সন্দেহের জন্য চিরস্থায়ী বিধিব্যবস্থা থাকবে। তোমার কাছে আমি অবিশ্বাসী এবং যখন তখন হয়ে যেতে পারি প্রতারক। এ বিশ্বাস তুমি দিনে দিনে রঙিন করে দিচ্ছ। আমৃত্যু আমাকে অবিশ্বাসী হয়ে বাঁচতে হবে। আমি নিজেকে দেখে নিজেই লাথি মারি। আমার লেজটা খুঁজে ফিরি। আমি একটা ইতর, হারামি, বদমাইশ গোত্রের মানুষ। আমাকে তুমি শুধু মানুষ ভাবতে পারলে না, তাই ভয় কর। একবারও ভেবে দেখ না এই অহেতুক ভয় আমাকে বিব্রত করে কি না?

তোমার কাছে আমি আজীবন আতঙ্ক। তোমার নিজের ইজ্জৎটাই বড়। আমার ইজ্জৎ বলতে কিছু নেই। তোমার তর্জনী সর্বদা আমার দিকে তাক করা। অথচ তুমি ভালো করেই জান যে, কোন দুর্ঘটনা না হলে তোমার ইজ্জৎ অটুট থাকবে, যা তোমার কাম্য। তাতেই তোমার পুণ্যি। আমি জন্ম থেকে বেইজ্জত হয়ে আছি। আমি জন্ম থেকেই সন্দেহভাজন আসামী। কোন ঘটনা ঘটতে হয় না আমার জন্য। আমি ঘটনা বিহীন অপরাধী। যে অপরাধ আমি কখনো করিনি, কোনদিনও করবো না, তবুও সে দোষের পয়গাম তুমি মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াও। আমি তোমার জন্য কাল সাপ, আমি আজীবন চরিত্রহীন। চরিত্র বলতে যা আছে সব তোমার, আমি কোথাকার কে? তুমি ঢাকতে থাকো।

মনে হয় সরকারি দপ্তরে গিয়ে বলি। এই যে সমতা সমতা করছেন। আমদের কি সমতা পাবার যোগ্যতা নেই? আমি অনায়াসে খাপ খাওয়াতে চাই তোমার সাথে। নির্ভীক দাঁড়াতে চাই পাশাপাশি। এতে কোন সন্দেহ নেই, কোন ভয় থাকে না আমার মনে। তুমি শুধু ভয় পাও আমাকে, আমার আচরণ এবং বিশ্বাসভঙ্গের। তাই ‘অবিশ্বাস থেকে মুক্তি চাই’ শ্লোগান দিতে ইচ্ছে করছে রাজপথে। যা হয় নি, যা হবে না তার জন্য আমাকে সন্দেহ করা ঠিক কি না, জানি না? অপরাধ না করেও যাকে শাস্তি দেওয়া হয় এবার তার জবানবন্দী শোন।

আমি ক্ষুধা নিবারণের জন্য শস্য ফলাই। আমি চাষ-হীন নই। আমি পুস্তক বিহীন থাকি না। তোমার পিতা মাতা যার পিতা মাতা নয়, তারও যে পিতা মাতা আছে সে কথা তুমি গ্রাহ্য কর না। আমার পিতামাতা আমাকে অন্যায় কাজের শিক্ষা দেননি। তারাও নীতিবাক্য শিখিয়েছেন। আমি সমাজের আইন মানি, আমি রাষ্ট্রের আইন মানি। আমি বুদ্ধির আইন মানি। বিবেকের আইন মানি। এমন কি আমি ধর্মের আইনও মানি। প্রতিটি আইন দ্বারা নির্ধারিত সাজার পরিমাণ আমি জানি। শুধু তুমি মানো না এত কিছুর পরও আমি কিছুতেই আদিম হতে পারি না, পারি না গুহাবাসী হতে। আমি কলেজের শিক্ষক, আমি স্কুলের দপ্তরি। আমি ফেরিওয়ালা। আমি আযান দেই। কবর খুঁড়ি। আমি লাল সবুজ রঙে ছক্কা হাঁকাই। আমি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নেই। রাজস্ব দেই। আমি ভ্রমণ করি। আমার একটা সই পেল কারো কারো ফাঁসি হয়ে যায়। আমি নবজাতককে মায়ের গর্ভ থেকে সযত্নে হাতের তালুতে তুলে আনি। তবুও আমার জন্মই আজন্ম পাপ। তুমি আমাকে সন্দেহ কর।

কবে, কোথায়, কখন, কেউ তোমাকে দেখে ফেলবে তারপর তারা অমানুষ হবে, সেই ভয়? ‘কবে’ হবার সম্ভাবনা কবে হবে, কার জীবনে কখন আসবে কেউ তা জানে না। আদৌ আসবে কিনা তা নিয়ে শতকরা নিক্তি কি বলে কেউ দেখে না। আমি তার আগেই মন্দ হলাম। করতে পারি, হতে পারি, যদি করি, এই সন্দেহ তালিকাভুক্ত হয়ে আমি পথে ঘাটে ঘুরি।

তুমি কবে গাড়ী এক্সিডেন্ট করবে তার জন্য আগেভাগে সব চালকের নামে মামলা করে রেখেছ কিনা জানি না। কোনদিন যদি মালিক বেতন না দেয়, তার জন্য প্রতি মাসে অগ্রিম চাকুরীর দরখাস্ত পাঠাও কি না জানি না। কোন অনিশ্চয়তা নিয়ে তোমার মাথা ব্যথা নেই শুধু আমাকে নিয়েই এত অগ্রিম সতর্কতা।

তোমাকে কে কবে আঁচড় কাটবে, পথে দেখে বলে দেবে তুমি অমুকের সন্তান, সেই ভয় পাও। অথচ পিতা মাতার সন্তান হওয়া গৌরবের কথা। তুমি সেই গৌরব ঢেকে রাখো। তুমি ভয় পেতে থাক আর নিজেকে ঢাকতে থাক। তুমি ভয় পেত থাক আর নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখ। এভাবেই যদি চলতে থাকে আমি বিশ্বাসকে সমুদ্র ভাসিয়ে দিব। বিশ্বাসকে বাতাসে উড়িয়ে দিব। আমি বিশ্বাসকে বলবো মরে যেতে। যে বিশ্বাস তোমাকে ভরসা দেয় না, যে বিশ্বাস আমাকে অহংকারী হতে দেয় না। সে বিশ্বাস পুষে রেখে আর কত ফরিয়াদ করবো। তোমার ঢাকঢোলের মাঝে আমি নিজের কবর দেখি। ভরসা দেবার অক্ষমতার কবর। এ জন্মে আর তোমাকে দেখা হবে না। দেখা হবে না তুমি কতটুকু মানুষ ছিলে কতটুকু ছিলে নাটোরের বনলতা সেন। জানি বলবে, না দেখা মানুষ কি মানুষ না? অথবা মানুষ হলেই মানুষকে দেখতে হবে এমন আদিখ্যেতা কেন?

তোমার কথাও ঠিক। দিও না দেখা, যদি বল, আমিও কখনো তোমার পথ, তোমার খেলার মাঠ, তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে হেটে যাব না। ভেবে নিব, তুমি মেঘের মত দেখতে ছিলে। তুমি মানুষ না মেঘ নাকি মেঘ মানুষ, তা নিয়ে থাকুক সুপ্ত ঘোর। তোমার ভাবনারই জয় হোক। আমাকে নিয়ে তোমার অবিশ্বাস থাকুক গোল্লাছুট। তুমি মেঘ। তুমি মেঘ মানুষ। তোমার চোখে উড়তে থাকুক অবিশ্বাসের ফানুস।

এমএ/ ১১:৫৫/ ২৩ এপ্রিল

মুক্তমঞ্চ

  •  1 2 > 
Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে