Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (56 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৪-০৮-২০১৮

ভাস্কর্য-স্থাপনাশিল্পে একাত্তরের বর্বরতা

দীপংকর বৈরাগী


ভাস্কর্য-স্থাপনাশিল্পে একাত্তরের বর্বরতা

রিপ্রেজেন্টেশন বা প্রতিবর্ণীকরণ শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিল্পী তার অনুভূতিকে আবিস্কার করেন বাস্তব জগতের দৃশ্যাবলি থেকে। দৃশ্যমান আকৃতিটুকু এড়িয়ে গিয়ে নিজস্ব বিশ্বাস আর অনুভূতিকে সঙ্গী করে যে আকৃতি গড়ে ওঠে, তাকে তিনি রূপ দিয়ে থাকেন। গত ২৬ মার্চ ঢাকার সেগুন বাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলো যেন শিল্পীর নিজস্ব অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ।

শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেই চোখে পড়ার মতো মাঠের চারপাশে অনেক বসত বাড়ি এবং বাড়ির সামনে বিচ্ছিন্ন ক্ষত-বিক্ষত মানুষের নিথর দেহ। সারিবদ্ধভাবে দূরে শিশু, বৃদ্ধ, তরুণ ও হাত-পা বাঁধা অর্ধ-নগ্ন তরুণীর লাশ। বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে মায়ের কোলে শিশুর মৃতদেহ। ৭১-এর নারকীয় হত্যাযজ্ঞের সঠিক ইতিহাস নিয়ে শিল্পী মিন্টু দে নির্মাণ করেছেন বর্বরতা '৭১ শিরোনামের স্থাপনা শিল্প।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর এবং নির্মাণ হত্যাযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী চিত্র ফুটে উঠেছে তার স্থাপনা শিল্পে। শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন ককশিট বা শোলা। শৈলীগত দিক থেকে ভাস্কর্যের গাঠনিক দুর্বলতা ঢাকা পড়েছে ভাস্কর্যের কাহিনী আবহে। ভাস্কর্য নির্মাণে প্রচলিত নিয়মের বাইরে এসে নির্মাণ করেছেন বিভিন্ন আকৃতির ১০৭১টি মানুষসহ বিভিন্ন বস্তুর অবয়ব। এই স্থাপনা শিল্পে মানুষের অবয়ব ছাড়াও যুক্ত করা হয়েছে ঘর, গণকবর, কুকুর-বিড়ালসহ আমাদের গ্রমীণ পরিবেশের সামগ্রিকতাকে। 

শিল্পী মিন্টু দে ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে শিল্পচর্চায় মগ্ন থেকেছেন। শিক্ষাজীবন থেকেই ব্যতিক্রমী এ শিল্প প্রচেষ্টা, তার শিল্প শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক হাতেখড়ি খুলনা আর্ট কলেজে। আর এখান থেকেই তার ব্যতিক্রমী শিল্পচর্চার শুরু। সরিষার দানায় রবীন্দ্রনাথ, মোনালিসা কিংবা নজরুলের প্রতিকৃতি অংকন করে ব্যতিক্রমী মিনিয়েচার দিয়ে শিল্পচর্চার স্বাক্ষর রেখেছেন। গীতাঞ্জলি, সঞ্চিতা, লিভিং হিস্ট্রি গ্রন্থের ক্ষুদ্র সংস্করণসহ বিশ্বের দীর্ঘতম চিঠি তৈরি (১২৭ ফুট), যেখানে বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান দিয়ে অলংকৃত।

২০০৭ সালে তিনি প্রথম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এ মহাপরিকল্পনা হাতে নেন। পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ২০১৪ সালে ব্যক্তিউদ্যোগে কাজ শুরু করেন। এ মহাকর্মযজ্ঞে শিল্পীর সাথে বিভিন্ন শিল্প-শিক্ষায়তনের শিল্প শিক্ষার্থীরা শ্রম দিয়ে তার স্বপ্নশিল্পকে রূপায়িত করেছেন। চিত্রশিল্পী মিন্টু দে কখনও জলরং, অ্যাক্রিলিক কিংবা মিনিয়েচার শিল্পী হিসেবে পরিচিতি পেলেও তিনি দেশের প্রতি মমত্ববোধ ও দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তিযুদ্ধের এ স্থাপনা শিল্প রচনা করেছেন। তিনি ভাস্কর্যে ডিটেইল নির্মাণ এড়িয়ে গিয়ে এক্সপ্রেশনকে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন।

মিন্টু দে মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি, কিন্তু পরিবারের কাছ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজ প্রচেষ্টায় মুক্তিযুদ্ধের বিশাল গ্রন্থ একাগ্রচিত্তে পাঠ করেছেন। তারই পুঙ্খানুপুঙ্খ উপস্থাপন দেখি এ স্থাপনা শিল্পে। শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বিস্তৃত মাঠ, মাঠের পাশে অর্ধভগ্ন বাস, নুড়ি পাথরের ঢিবি, মাঠের চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শুকনো এলোমেলো গাছের পাতা। দৃষ্টি প্রসারিত করলে দেখা যায় কতগুলো গহ্বর। পুরনো কবরের মতো। গহ্বরে উঁকি দিলে দেখা যায় কতগুলো লাশ, রিকশা ও নৌকার ওপর বিচ্ছন্নভাবে পড়ে আছে। মৌন সমাহিত লাশ কিন্তু চেয়ে থাকা, ইতিহাসের অবিনাশী এ মুখ। কেউ যোদ্ধা, কেউ সাধারণ মানুষ। পকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্যাতিত সত্য উপস্থাপনে মগ্ন থেকেছেন শিল্পী মিন্টু দে। বাংলাদেশের সমতল ভূমিকে পরিমার্জনা দিয়ে অনেকেই স্থাপনা শিল্প তৈরিতে নিজেদের সম্পৃক্ত রেখেছেন। 

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে বহুমাত্রিক কাজের অপার সম্ভাবনা আছে এই মাধ্যমে। শিল্পী মিন্টু দে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সৃষ্টি করেছেন বর্বরতা '৭১ নামে স্থাপনা শিল্পটি। শিল্পীর প্রত্যাশা, ভ্রাম্যমাণ প্রর্দশনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সব জেলা-উপজেলা পর্যায়ে এ স্থাপনা শিল্পটি প্রদর্শিত হলে নতুন প্রজন্ম শিল্পের প্রতি আগ্রহী হবে ও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করবে। চলমান এ প্রদর্শনীটি শেষ হয় ৩১ মার্চ।

সূত্র: সমকাল
এমএ/ ০৬:৫৫/ ০৮ এপ্রিল

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে